বাংলাদেশী চিকিৎসক হাবিবা জেসমিনের চোখে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের করোনাকাল !

আমি দীর্ঘ দিন ফ্রান্স থাকি। ২৫ বছর আগে আমার এখানে আসা। তখন আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে, ইন্টার্নী শেষের পর মাত্র কিছু দিন চাকরি করা একজন নতুন ডাক্তার। চোখে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমার স্বপ্নভংগ হলো। কারন এরা ইংরেজি জানে না, জানলেও অফিস-আদালতে ইংরেজির ব্যবহার নেই। রীতিমতো বিভীষিকাময় দিন!
এরপর আমি সরবন ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষা শিখলাম। আরও ক’টা ইউনিভার্সিটি থেকে ডিপ্লোমা নিলাম। আর এ করতে করতেই চোখের পলকে চলে গেলো ১০ বছর। পরে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি প্যারিসের একটা নামকরা হাসপাতালে ইন্টারভিউ দেয়ার সুযোগ পেলাম। ওই সুযোগটা শুধু বিদেশী ডাক্তারদের জন্যেই ছিল, পোষ্ট একটা। আমার সাথে যে দুজন ছিলেন তাদের একজন আলজেরিয়ান আর একজন তিউনিশিয়ান। দু’টোই ফরাসি কলোনি থেকে আসা। ওরা মেডিক্যালও পড়েছে ফরাসি ভাষায়। স্বভাবতই আমি আশা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল আমাকে নিল। এটাই আমার প্রথম ফরাসিদের সাথে পরিচয়। ডিরেক্টর বললেন, ‘আমাকে নেয়ার হলো হাসপাতালের মাল্টিকালচার রোগীদের সুবিধার্থে।’
আমি আজ ১৫ বছর ধরে ওদের সাথে আছি, একমাত্র বাদামী কালারের ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। এদের কয়েকজনের সাথে আমার গভীর বন্ধুত্ব। তাদের বিষয়ে লিখতে গেলে গোটা একটা বই লিখে ফেলা যাবে।
কিন্তু আজ আমি শুধুই করোনাকালের কথাই বলবো। করোনা এখানে শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা এক অন্তস্বত্তা রোগী পেলাম। ৩৪ সপ্তাহের প্রেগনেন্ট। রোগীর অবস্থা ভাল না। বাচ্চা ও ভাল নেই। সাথে সাথেই সিজারিয়ানের প্রস্তুতি নিলাম। তবে আমাদের করোনার প্রিপারেশন ছিল না। কিন্তু রোগীকে অন্য জায়গায় পাঠালে মা বাচ্চা দুজনই মারা যেতে পারে, এমন শঙ্কা ছিলো। আমরা দায়িত্ব নিলাম। মা ও বাচ্চা দুজনেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল।
কিন্তু ওই রাতে যারা ডিউটিরত ছিলেন তাদের ২০ জনের ১৫ জনই করোনায় আক্রান্ত হলেন। যদিও পরে তারাও সুস্থ হলেন, একজন বাদে। আমার ক্ষেত্রে যেটা হলো; আমি পরের দিনই একটা চিঠি পেলাম যেখানে লেখা, আমি আর হাসপাতালে যেতে পারবো না। কারণ আমি ক্রনিক আ্যজমা ও হাইপারটেনসনের রোগী এবং বাচ্চাদের নিয়ে একা থাকি। সুতরাং আমি খুবই রিস্ক জোনে আছি। আমার এই ঘটনা কিন্তু আমার প্রতিবেশী জানে, কিন্তু তিনি বাংগালী নন। উনি সব শুনে বরং আমাকে বললেন, ‘যে কোনো দরকারে উনাকে ডাকতে!’
আমাকে লকডাউন করা হয়নি। আমাদের হাসপাতালের ওই সার্ভিস কিন্তু লকডাউন হয়নি। আমাদের এখানে যেহেতু হাসপাতালের প্রচুর কর্মী আক্রান্ত হয়েছে তাই মেডিক্যালের সেকেন্ড ইয়ার থেকে সব শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আর এই যে আমি বাসায় বসে আছি, আমাকেও প্রতিদিন সকালে একজন করোনার ডাক্তার আর বিকেলে একজন আ্যজমার ডাক্তার ফোনে খোঁজ নিচ্ছেন। এখানেই শেষ না আমি যে মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পড়েছি সেজন্য একজন সাইকোলোজিস্ট আমাকে ফোন দিচ্ছেন। আমার বাসায় বাজার আছে কিনা এটাও তাদের প্রশ্নে থাকে! আর কলিগ দের কথা নাই বললাম, বলে শেষ হবে না।
এখন আমার যথেষ্ট সময়। সাথে ভাবনারও। ভাবি, আমার দেশের মানুষের কথা, ডাক্তারদের কথা, আমরা কোন দুনিয়ায় আছি? একজন লোক অসুস্থ হলে পুরো পরিবার লকডাউন, একজন করোনার রোগী হাসপাতালে পাওয়া গেলে গোটা হাসপাতাল লকডাউন- এভাবে কতদিন চলবে, চিকিৎসা ব্যবস্থার কি হবে?
করোনা যে কবে দূর হবে এটা কিন্তু এখনও কেউ জানে না। এখনও বাংলাদেশ সরকার কোন নির্দিষ্ট প্রটোকল বলেন বা সিস্টেম বলেন কোনটাই করছে না বা পারছে না। শুধু বড় বড় কথা বলছে, ডাক্তারদের কোন সুরক্ষার ব্যবস্থা করছে না। আমার বন্ধুদের ভাল উন্নত মানের ভেনটিলশনের সুবিধাসহ হাসপাতাল আছে ওই গুলোকে করোনা রোগী ভর্তির পারমিশন দিচ্ছে না। কী হচ্ছে এসব?
আবার ভিন্ন চিত্রও আছে। অনেক ডাক্তার ভয়ে রোগী দেখছে না। আমি ওদেরও দোষ দেই না। কারন, ওদের তো প্রস্তুত করা হয় নি। ওদের করোনা হলে কি চিকিৎসা হবে?

বাংলাদেশ অনেকেই টাকায় ধনী হয়েছি, ছোট থেকে বড় রকমের চুরি চামারি শিখেছি। পরের ধনে পোদ্দারি শিখেছি কিন্তু মানবিক গুন নিয়ে মানুষ হতে পারিনি। আংগুল গরম হলেই সিঙ্গাপুর যেতে শিখেছি। সেই টাকা যদি দেশে থাকতো তাহলে আজ দেশেও অনেক ভাল উন্নত মানের হাসপাতাল থাকতে পারতো। যেগুলোকে আজ করোনায় ব্যবহার করা যেত। আল্লাহ আমাদের হেদায়েত করুন। চুরি করে, অন্যের ধন লুঠপাট করে দান করে টিভি মিডিয়াতে ছবি দিয়ে মহৎ হওয়ার ভন্ডামি না করে মানুষকে শুধু মানুষ ভাবার গুন আল্লাহ আমাদের দান করুন।
আর আমার দেশের গরীব মানুষগুলোর যেন করোনা না হয়, এই দোয়া করি। ওদের তো কোনো হাসপাতাল নিবে না, বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

পরিশেষে বলব সবাই ঘরে থাকুন। তারাবী বাসায় পড়ুন। বেঁচে থাকলে একদিন সব করতে পারবেন। আর তরুণদের বলছি, আপনারা বাইরে যাবেন না। কারন ওই ভাইরাস আপনাকে হয়তো কাবু করতে পারবে না কিন্তু আপনি যে অদৃশ্য ভাইরাস নিয়ে বাসায় আসলেন, তাতে আপনার মা-বাবা কিংবা যে বয়স্ক মানুষের ডায়বেটিস বা হাই ব্লাড প্রেসার আছে তারা কিন্তু করোনার সাথে যুদ্ধে পেরে উঠবেন না। মে-জুন বাংলাদেশের জন্য খুব খুবই খারাপ সময়।
আমরা চরম দুর্ভোগ আর দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি। মহামারি কাল অতিক্রম করছি।
সবাই সাবধানে থাকুন, ভাল থাকুন।

লেখক –
ডাঃ হাবিবা জেসমিন (মিমচা মিঃ ২৪ ব্যাচ) এখন কর্মস্থল, হাসপাতাল ল্যাম্পেরিয়ার, ফ্রান্স।from her FB timeline

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!