বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে এরদোয়ানের ঐতিহাসিক বিজয়:হাফিজুর রহমান

১. একে পার্টির ক্ষমতায় আসার ষোল বছর হতে যাচ্ছে। যুবক বয়সী প্রায় ১৭ মিলিয়ন ভোটার একে পার্টি পূর্ববর্তী তুরস্ক দেখেনি কিংবা কিছুটা দেখলেও তাদের মানসপটে সেই তুরস্কের স্মৃতি মনে থাকার কথা নয়। তাই, একে পার্টি সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশী। আর একে পার্টিও সেই প্রত্যাশা দিন দিন বাড়িয়েছে। সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির জায়গা থেকে এ নির্বাচনটি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারন আপনি ১ থেকে ১০ কিংবা সর্বোচ্চ বিশ করতে পারেন, ১০০ কিংবা ১০০০ করা সম্ভব কি?

২. বিরোধীদের সম্মিলিত জোট: আদর্শিক কোন মিল না থাকা সত্ত্বেও শক্তিশালী একটি বিরোধী জোট ছিল রীতিমত চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে কুর্দিদের সাথে সিএইচপির মাখামাখি ছিল সবচেয়ে উদ্বেগের, অথচ এই কুর্দিদেরকে সবচেয়ে বেশী নির্যাতন করেছে আতাতুর্কের এই দলটি। নির্বাচনে গুলেনপন্থীদের দল ছিল ইয়ি পার্টি, যারা বিদেশী প্রভুদের সহায়তায় রমরমা প্রচারনা চালাচ্ছিল। ইসলামপন্থী ভোটগুলো নষ্ট করার জন্য সাদেত পার্টিকেও বিরোধী জোটে নেওয়া হয় এবং সাদেত পার্টি সবচেয়ে নিকৃষ্টভাবে সরকারের সমালোচনা করেছে।

৩. বিরোধী দলগুলোর এবারের প্রচারনায় সবচেয়ে বেশী ছিল একে পার্টির সফলতাগুলোকে ম্লান করার ও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা এবং বড় বড় সকল উন্নয়ন প্রজেক্টগুলোকে বন্ধ করার ঘোষণা। তাতে সরকার বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরী হতে পারতো। সম্মিলিত আওয়াজ তোলার চেষ্টা করা হয়েছে পরিবর্তনের। আর সেই পরিবর্তন স্লোগান ছিল মুলত এরদোয়ানের বিরুদ্ধে।

৪. পশ্চিমা মিডিয়া ও লবিগুলো এরদোয়ানকে সরাতে কম চেষ্টা করেনি। গত কয়েকদিন ধরে টানা প্রচার করেছে, “এরদোয়ান জামানা শেষ/ এরদোয়ানের মোজেজা শেষ/ এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা শেষ…. ইত্যাদি ইত্যাদি”।

এ সবকিছু মিলে এ নির্বাচনটি ছিল এরদোয়ান ও একে পার্টির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জের।নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে কথা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা কয়েকজন মুরুব্বীর সাথে। তাদের বক্তব্যের সামারীটা অনেকটা এরকমই, “আমার মনে হয়না যে এরদোয়ান এবার সহজেই জিততে পারবে, নির্বাচন হয়তোবা সেকেন্ড রাউন্ডে যেতে পারে…… আর যদি জিতে যায় তাহলে বুঝতে হবে যে, এরদোয়ানকে আল্লাহ এখনও ভালবাসেন এবং বিশেষ সহায়তা করেন….”।

এদিকে নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই পুরো মুসলিম বিশ্বের সব জায়গাতেই এক ধরনের অস্বস্তি ছিল, এরদোয়ান কি পারবেন! না পারলে মুসলিম বিশ্বের কি হবে? বিশ্বাস করুন এরদোয়ান শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে নয় বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের একমাত্র আশার আলো। নির্বাচনের পূর্বে মালয়েশিয়ায় খতমে কুরআন ও দোয়ার অনুষ্ঠান হতে দেখেছি। আফ্রিকার দেশগুলোতে কত মানুষইনা সেজদায় পড়ে কেদেছে। ফিলিস্তিন, আরাকান, সিরিয়ানসহ বিশ্বের সব মজলুমদের কান্নায় ভারি হয়েছে জায়নামায। সবার প্রত্যাশা ও দোয়া একটাই ছিল, “এরদোয়ান যেন জয় পান”…”আল্লাহ যেন তাকে রহমতের ভারিধারা বর্ষন করেন”।

গতকাল সারাদিন আনকারার বিভিন্ন জেলায় ঘুড়েছি। ভোটকেন্দ্রগুলো ঘুড়ে দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু আশঙ্কা কাটছিলো না। মনে হচ্ছিল, সবাই নিরব। যা করার সিল মারার সময়ই করবে। আমার মনে হয় তুর্কি ভোটাররা শেষ মুহুর্তে চিন্তা করে দেখেছে যে, এরদোয়ানই তাদের একমাত্র বিকল্প এবং প্রত্যাশিত নেতা যিনি পারবেন তাদের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে ও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এজন্য আগে নানা চিন্তা করলেও কিংবা বিরোধীদের দ্বারা মোটিভেটেড হলেও সিল মারার সময় নাম ও ছবির দিকে তাকিয়ে সিলটা তাকেই মেরেছে।

আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে বিজয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে জিতার কথা চিন্তা করলেও এতটা স্বস্তির বিজয় হবে তা ভাবিনি। আমার ধারনা ছিল কোনরকম জিতবে হয়তো কিন্তু পার্লামেন্টে সরকারী জোট সংখ্যাগরিষ্টতা হারাবে অথবা কোনরকম সংখ্যাগরিষ্টতা পাবে। কিন্তু না, আলহামদুলিল্লাহ… ৫২% এর উপরে ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়লাভ করলেন এরদোয়ান আর সরকারী জোট ৩৪২ টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্টতা পেল।

টান টান উত্তেজনায় ফলাফল ঘোষণার সেই মুহুর্তে যখন মোটামুটি জয় নিশ্চিত তখন বাসার আশেপাশে লোকজনের আনন্দ মিছিল শুরু হয়েছে। আমরা, সম্মিলিতভাবে আলহামদুলিল্লাহ পড়লাম। কিছুক্ষণ পর মোয়াজ্জিন এশার আজান দিল। বাসায় থাকা বাংলাদেশীদের নিয়ে মসজিদে গেলাম। প্রথম রাকায়াতে ইমাম সূরা ফাতিহার পর সুরা আল ফাতহ থেকে পড়তে শুরু করলেন, “ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবিনা………… (নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়…..)। দ্বিতীয় রাকায়াতে এসে পড়লেন সূরা আন নসর। “ইজা জায়া আনাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহি……” (যখন আল্লাহর সহযোগীতা ও বিজয় আসবে তখন দেখবে দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করছে……)।

আলহামদুলিল্লাহ…… এগিয়ে যাক, তুরস্ক। এগিয়ে যাক মুসলিম বিশ্ব।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!