ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া স্বপ্নের ফাইনাল আজ:ফরাসি বিপ্লবের সফল সমাপ্তি ঘটাতে প্রস্তুত ফ্রান্স

বছর-মাস-সপ্তাহ-দিন পেরিয়ে অপেক্ষা মাত্র কয়েক ঘণ্টার। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের সমাপনী। তার আগে মস্কোর লুঝনিকিতে রাত ৯টায় কাক্সিক্ষত শিরোপার মুখোমুখি হবে একবারের বিশ্বকাপজয়ী দল ফ্রান্স এবং প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠা ক্রোয়েশিয়া। এক মাস আগে যে উন্মাদনা নিয়ে রাশিয়ায় শুভমুক্তি হয়েছিল ৩২ দেশের বিশ্বকাপÑ সেই উন্মাদনা, উৎসবমুখর পরিবেশ, ভিন্ন আমেজ, কোলাহলে টইটম্বুর পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটবে আজ ম্যাচের পরেই।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ নানা দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গেছে আগেরবারের আয়োজনকে। রাশিয়া সত্যিকারের ফুটবল দেশে পরিণত হয়েছে। স্টেডিয়াম ৯৮ শতাংশ ভরা ছিল। এক লাখ মানুষ বিদেশ থেকে এখানে এসে দেশটাকে আবিষ্কার করেছেন। তিন বিলিয়নের বেশি মানুষ টেলিভিশনে খেলা দেখেছেন আর নিশ্চিতভাবে এক বিলিয়ন ফাইনালটি দেখবে।
খেলোয়াড়দের জীবন-যাপন, চিন্তা-সাধনা, দ্বন্দ্ব-দহন, আনন্দ-স্বপ্নগুলোকে বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করে। যেহেতু নামকরা খেলোয়াড় মাত্রই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ, তার হৃদয় প্রবলভাবে সংবেদী, তাই সবুজ মাঠের নানা রূপ ও রঙ তিনি উপলব্ধি করেন সর্বাগ্রে। জীবনকে দেখার তার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণের মতো নয়, বরং আলাদা। তাই রাষ্ট্রে-সমাজে আলো ছড়ানো ফুটবলারেরা একজন বিশেষ মানুষ। আজ মডরিচ, মানজুকিচের কল্যাণে দেশের প্রেসিডেন্ট জার্সি গায়ে গ্যালারিতে নৃত্য করেন। মন্ত্রিসভায় বৈঠক হয় খেলোয়াড়দের নামের জার্সি পরে।
দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা, দহন, পীড়ন, চিন্তা, মোহ, কামনা, প্রেম, বিরহ ইত্যাদি সবই একজন খেলোয়াড় মাঠে খুঁজে পান। দীর্ঘ দিনের অনুষঙ্গ হিসেবে তারা সাহিত্যের নদী, বৃষ্টি, জ্যোৎস্না, বৃক্ষ, ফুল, পাখি, মাছ, মাটি, মা, প্রিয়তমা ইত্যাদি খুঁজে বেড়ান মাঠে। নিজে কতটুকু দিতে পারলেন কিংবা কতটুকু প্রতিপক্ষকে বাধা দিতে পারলেন। সর্বাগ্রে তারা দেশের স্বার্থেই নিজেকে উজাড় করে দেন। অর্থ, বিত্ত, কীর্তি, সম্পত্তির অবস্থানও ওই দেশপ্রেম থেকেই সৃষ্টি। আজ বিশেষ করে ফাইনালে নজর থাকবে কয়েকজন নামকরা খেলোয়াড়Ñ ফ্রান্সের এমবাপ্পে, গ্রিজম্যান, মাতুইদি, গিরুদ, পগবা এবং ক্রোয়েশিয়ার মডরিচ, র্যাকিটিচ, মানজুকিচ ও পেরিসিকের দিকে।
স্বপ্ন দেখতে জানলে জীবনের কাঁটাগুলোও ধরা দেয় গোলাপ হয়ে। দুঃসময়ের অন্ধকার কখনো কখনো আমাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তটির দ্বার খুলে দেয়। ফাইট দিতে হবে, হেরে গেলে আবার নতুন উদ্যমে সব শুরু করার উদ্যম থাকতে হবে। অক্লান্ত পরিশ্রম করেও যখন ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদ পেতে হয় তাতে দুঃখের কিছু নেই। এই কঠোর পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে হতে হবে আরো শক্তিশালী, আরো অভিজ্ঞ, আরো দক্ষ। এটাই সত্যিকারের বিজয়! ১৯৯৮ সলে প্রথমবার এসে ক্রোয়েশিয়া তৃতীয় হয়েছিল। এবার তারা ফাইনালে। ওই বছর শিরোপা জেতা ফ্রান্সের একই উদ্দেশ্য।
যেখানে পরাজয় নেই সেখানে জয় নেই। জয়-পরাজয় আছে, থাকবে। পরাজিত হয়েছে স্তম্ভিত হয়ে থাকবে এমনটা নয়। বরং পরাজিত হওয়ার পর সেখান থেকেই উপায় বের করতে হবে কিভাবে জয়ী হওয়া যায়। রাত পোহালেই শিরোপার লড়াই। শক্তি ও ফুটবল ঐতিহ্যে শিরোপার দাবিদার হিসেবে এগিয়ে ফরাসিরাই। তবে ফুটবল ঐতিহ্যে পিছিয়ে থাকলেও বিশ্বকাপের একটি পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকছে ক্রোয়াটরাই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রতি ২০ বছরে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেখেছে বিশ্ব। ১৯৩৮ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কারণে ১২ বছর অনুষ্ঠিত হয়নি বিশ্বকাপ ফুটবল। যুদ্ধ শেষ হলে ১৯৫০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আসরে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। তারপর ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। মানে তৃতীয় আসরের ঠিক ২০ বছর পর সেবার নতুন চ্যাম্পিয়ন পায় বিশ্ব। তার ২০ বছর পর ১৯৭৮ সালে বিশ্ব দেখে আরেক নতুন চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। এর ঠিক ২০ বছর পর ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স নতুন চ্যাম্পিয়ন হয়। গাণিতিক সে হিসাবে ২০ বছর পর এবারো নতুন কোনো দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা। যদিও এই পরিসংখ্যানের বাইরেও শিরোপা জিতেছে দুইটি নতুন দেশ। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড ও ২০১০ সালে স্পেন।
এবারের বিশ্বকাপে ফেবারিট দলগুলোর মধ্যে ফ্রান্স ছিল অন্যতম। অন্য ফেবারিটরা একে একে বিদায় নিলেও পগবা-এমবাপ্পে-গ্রিজম্যানে গড়া দল ঠিকই পৌঁছে গেছে ফাইনালে। ১৯৯৮ সালের পর আরেকটি ফরাসি বিপ্লবের সফল সমাপ্তি ঘটাতে প্রস্তুত দলটি। অন্য দিকে ১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় ক্রোয়েশিয়া। সে বছরই তৃতীয় হয় দলটি। হার না মানা মানসিকতার দলটি এবার বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের শক্তি জানান দিতে চায়।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!