ফ্রান্সের ঘটনা ও আওয়ামী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি: প্রয়োজন সতর্কতার

শিবলী সোহাইল
একটি দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরেকটি দেশের মানুষকে স্পর্শ করা স্বাভাবিক । ফ্রান্সে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মহানবী (সা:) কে নিয়ে ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছে। মানুষ তাই ক্ষুব্ধ। আর বিক্ষুব্ধ হলে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে এটাই স্বাভাবিক। এটাই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ, যদিও বেশ কিছু ধর্মান্ধ ও ধর্ম বিদ্বেষী চরমপন্থি রয়েছে। এছাড়াও একটি বড় অংশ রয়েছে সুযোগসন্ধানী। যাদেরকে যে কোন পরিস্থিতিতে ফায়দা লুটতে ওঁত পেতে থাকতে দেখা যায়। বিক্ষোভ কারিদের প্রয়োজন, এই সুযোগসন্ধানীদের স্বরূপ বুঝে তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে। লালমনিরহাটের মত বীভৎস ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের কিছু ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেবার খবরও শোনা গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে কারা এসব করছে? এগুলো কি চরমপন্থিদের কাজ নাকি সুযোগসন্ধানী ফায়দা লুটেরাদের অপকর্ম ? বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে না পারলে সমস্ত দোষ ধর্মপ্রাণ মানুষের ঘাড়ে এসে পড়বে।
কোনভাবেই সরকারের আশায় থাকলে চলবে না। কারণ নিশ্চয় পাঠকদের মনে আছে এই অবৈধ সরকার ইতিপূর্বে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে বুকলেট ছাপিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ধর্মপ্রাণ মানুষদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সারা বিশ্বে প্রচার করেছিল। কোন সরকারের পক্ষে নিজের দেশকে নিয়ে এধরণের প্রচারণা একেবারেই নজিরহীন। কিন্তু তারা তা করেছিল ? কেন করেছিল? দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে তারা বরং এথেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছিল। আওয়ামী লীগ বিশ্ববাসীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল তারা ক্ষমতায় না থাকলে এদেশ আল-কায়েদা, আইএসে ভরে যাবে। যে কোন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফায়দা লোটার অপরাজনীতিতে এরা যে কতটা নিচে নামতে পারে তা ভেবে অবাক হতে হয়।
লালমনিরহাটের ঘটনাটাও কোন সুযোগসন্ধানীদের কাজ কিনা সে ব্যাপার আমরা এখনও নিশ্চিত নই। তবে এই বীভৎস ঘটনা ইতিমধ্যেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এদিকে শোনা যাচ্ছে রসুল (সা.) কে ব্যাঙ্গ করার প্রতিবাদে এলাকায় এলাকায় যে বিক্ষোভ হচ্ছে সেখানে ছাত্রলীগ যুবলীগের সন্ত্রাসীদেরকেও দেখা যাচ্ছে। রসুল (সা.) এর অবমাননায় তারাও ক্ষুব্ধ হয়েই মিছিলে এসে থাকেতে পারে। কিন্তু মানুষ এদেরকে সন্দেহ করছে। এই সন্দেহের কারণ অতীতের বেশ কয়েকটি ঘটনা।
উনিশশ বিরানব্বই সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঢেউ বাংলাদেশে এসেও লেগেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছিল। কিছু এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ও উপাসনালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছিল ছয়ে ডিসেম্বর বুধবার। তার পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর কিছু কিছু আক্রমণের ঘটনা ঘটতে থাকে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা টাঙ্গাইলের বাজিতপুরের তাঁতিবাজারেও সেদিন বেশ কয়েকটি সন্ত্রাস ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তবে তা কারা করেছিল সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। এর পরদিন আটই ডিসেম্বর, শুক্রবার, জুমার নামাজের পর টাঙ্গাইল জেলা সদর মসজিদের ইমাম, মৌলানা আব্দুল হামিদ ও অন্যান্য আলেমদের ডাকে বিভিন্ন মসজিদ থেকে দলে দলে মুসল্লিরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হয়। সমস্ত মিছিলগুলো একসাথে হয়ে বিন্দুবাসিনি হাইস্কুল ময়দানে এসে জড় হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন মৌলানা আব্দুল হামিদ সহ আরও অনেকে। এরপর দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভের কর্মসূচি সেখানেই শেষ করে সবাই যার যার বাড়ী ফিরে যায়। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসীরা, যারা মুসল্লি সেজে বিক্ষোভকারীদের সাথে মিশে ছিল, তারা জঙ্গি মিছিল নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত মহল্লাগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান এসময় মিছিলের পুরোভাগে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ষণ্ডাদেরকে দেখা যায়। জঙ্গি মিছিল নিয়ে একদিকে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে আগুন জালিয়ে দিতে থাকে আর অপরদিকে চলতে থাকে লুটপাট। কোলের শিশুদের নিয়ে প্রাণ ভয়ে পলায়নপর মানুষদেরকেও এরা রেহায় দেয় নি। মহিলাদের শরীর থেকে খুলে নিতে থাকে সোনার গহনা। এরা অগ্নিকান্ড, লুটপাট ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
অথচ ছাত্রলীগ যুবলীগের এই সন্ত্রাসের দোষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ঘাড়ে পড়ে। টাঙ্গাইল জেলা সদর মসজিদের ইমাম, মৌলানা আব্দুল হামিদ সহ বেশ কয়েকজন আলেম, ওলামারা সে ঘটনায় গ্রেফতার হন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এরপর ছাত্রলীগ যুবলীগের সন্ত্রাসীরা এক ব্যবসা ফেঁদে বসে। তারা আতঙ্কিত অসহায় হিন্দু পরিবারগুলোকে পুনরায় আক্রমণের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে সেই আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করে। শুধু তাই নয় অনেককে ভয় দেখিয়ে দেশ ছেড়ে পালানর পরামর্শ দেয়। দেশ ছেড়ে যারা পালিয়ে যায় এই সন্ত্রাসীরা তাদের সম্পত্তি দখল করে নেয় অথবা নাম মাত্র মূল্যে কিনে নেয়। অবাক ব্যাপার হল, সেদিন যাদেরকে হিন্দু বাড়ীতে আগুন দিতে, মহিলাদের গা থেকে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিতে এবং জমি দখল করতে দেখা গিয়েছিল তাদেরকেই পরে ঐ এলাকার আওয়ামীলীগের এমপি, মেয়র এবং বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হতে দেখা যায়।
এছাড়া দুহাজার বার সালের রামুর ঘটনা, দুহাজার তের সালের নভেম্বরে পাবনা ও বরিশালের ঘটনার দিকে তাকালেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাই। দুহাজার বার সালের রামুর ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার স্পষ্ট প্রমাণ দেখা যায়। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের রিপোর্টে উল্লেখ করে, “… different vested interest groups including a section of the ruling Awami League were involved in the communal attacks..” – অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি অংশসহ বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত ছিল। এদিকে আইন সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্টেও প্রায় একই কথা দেখা যায়। তারা উল্লেখ করেছে, “… factionalism in the ruling Awami League’s Ramu branch contributed to the attacks of September 29” – অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রামু শাখা ২৯ শে সেপ্টেম্বরের হামলায় ভূমিকা রেখেছিল।
এছাড়াও দুহাজার তের সালের পাবনা সাঁথিয়ার ঘটনার ক্ষেত্রে পত্র পত্রিকা দেখলে রীতিমত অবাক হতে হয়। সাতই নভেম্বর ২০১৩ তারিখে ডেইলি স্টার লিখছে, “Mithu, one of the men alleged to have vandalised over 100 Hindu houses and temples, inset, at Bonogram in Santhia of Pabna on Saturday, is seen behind State Minister for Home Shamsul Hoque Tuku when he visited the area yesterday” – অর্থাৎ, মিঠু, যার বিরুদ্ধে পাবনার সাঁথিয়ার বনগ্রামে ১০০টিরও বেশি হিন্দু বাড়িঘর ও মন্দির ভাঙচুরের অভিযোগ, তাকে গত শনিবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর সাথে দেখা যায়, যখন তিনি আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শনে যান। পত্রিকাতে আরও প্রকাশ, “হিন্দুদের ওপর হামলা, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিয়াই তসলিম উদ্দিন খান কে গ্রেফতার (পরিবর্তন ডট কম, ১৩ নভেম্বর ২০১৩)”। এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম লিখেছে, “পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় হিন্দুদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর এক আত্মীয়কে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ (১২ নভেম্বর , ২০১৩)”।
বরিশালের ঘটনায় দুহাজার তের সালের একুশে নভেম্বর আওয়ামী সমর্থক পত্রিকা কালের কণ্ঠে রিপোর্ট করেছিল, “বরিশালে মন্দির ও বাড়িতে আগুন দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা” । স্বাধীনতার পর থেকে উল্লেখ করার মত সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা বাংলাদেশে মাত্র হাতে গোনা চার থেকে পাঁচটি। এর প্রতিটিতেই একইভাবে আওয়ামী সুযোগসন্ধানীদের ফায়দা লোটার রাজনীতি দেখতে পাওয়া যায়।
এই ফায়দা লুটেরারাই আঁধার রাতে ভোট লুট করে ক্ষমতা দখল করে আছে। আর তাই ফ্রান্সের ঘটনায় উদ্ভূত আজকের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদেরকেই যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
[লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক]

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!