ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে কতদূর এগুলো বাংলাদেশ ?

শিবলী সোহায়েল
শিরোনাম দেখে অনেকে হয়ত কপাল কুঁচকে ফেলেছেন। কোথাও যখন আশা ভরসার কোন খবর নেই, ভোট ডাকাতি করে ফ্যাসিবাদ যখন জাতীর বুকের উপর আরও চেপে বসেছে, তখন এমন প্রশ্নে অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। অনেক দেশেই স্বৈরাচার সত্তর, আশি বছর এমনকি আরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে, কিন্তু সেখানকার মানুষ আন্দোলন তো দুরের কথা সামান্য প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া অথবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কথা বলা যেতে পারে। সে তুলনায় বাংলাদেশ কি যথেষ্ট ব্যতিক্রম নয়? বাংলাদেশের মানুষ কি গত দশ বছরে এই চরমপন্থি ফ্যাসিবাদকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে পারেনি?
আমার মতে, ভারতীয় সমর্থন, দলীয় প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, দল-দাস মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী এবং র‍্যাব-পুলিশ নিয়ে যে মাফিয়া বাহিনী, তার বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ পর্যন্ত যে অর্জনগুলো করেছে তা প্রত্যাশা জাগাবার মত। যেমন, বিপুল বিনিয়োগে সৃষ্টি করা শাহাবাগী গণজাগরণ নামের ফ্যাসিবাদী কুটচালকে মুখ থুবড়ে ফেলা এবং প্রচুর অর্থ ব্যয়ে সাজানো ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালের মুখোস খুলে উলঙ্গ করে দেওয়া। অনেকেই হয়ত প্রশ্ন তুলবেন, এতজনের ফাঁসি হয়ে গেল তারপরেও এটাকে আমি অর্জন বলছি কেন? কথা সত্যি। কিন্তু শুধু আইনি লড়াই এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ করে নিরস্ত্র মানুষের পক্ষে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া কি সম্ভব ছিল?
পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে আওয়ামী লীগ একসময় ত্রিশ থেকে চল্লিশ পার্সেন্ট জনগণের ভোট নিয়ে রাজনীতি করত। কিন্তু এখন ওরা জানে যে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ওদের আর কোন স্থান নেই, তাই ভোট ডাকাতিই একমাত্র সম্বল। এদিকে বাংলাদেশের সকল মানুষকে ভারত-প্রেমী বানানোর প্রজেক্টও প্রায় মাঠে মারা গেছে। এছাড়া জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, ইউএস, অস্ট্রেলিয়ার সিনেট এবং অন্যান্য দেশগুলোর বক্তব্য বিবৃতি থেকে বোঝা যায় যে আন্তর্জাতিক মহলে এদের অবস্থান বর্তমানে তলানির দিকে। তবে আমি মনে করি, জনগণের একটি বড় অর্জন হল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই দলটির নাৎসিবাদি চরিত্র উন্মোচন করে দেওয়া।
আওয়ামী লীগের একটি বড় ব্যর্থতার কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, আর তা হচ্ছে, বিরোধী দলগুলোকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার যে উদ্দেশ্য তাদের ছিল, সে প্রচেষ্টায় তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত তারা জাসদ সহ প্রায় সবকটি বিরোধীদলকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। সেই তুলনায় গত দশ বছরের চরম নিষ্পেষণের পরও বিরোধীদলগুলো এখনও টিকে আছে এবং আরও বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। আর ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের ভয় এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
গন মানুষের আরও একটি বড় অর্জন হল প্রবল ঘৃণা-চাষ ও বিভক্তির রাজনীতির মধ্যেও মোটামুটিভাবে ঐক্য ধরে রাখা। চরমপন্থিদের অন্যতম প্রধান রাজনীতি হল জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ ও বিভক্তি সৃষ্টি করে ক্ষমতায় টিকে থাকা। এই চরমপন্থি দলটি ক্ষমতা দখলের পরপরই উগ্র চেতনা ও ঘৃণা-চাষের মাধ্যমে দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে ভাগ করে ফেলার চেষ্টা করে। এছাড়াও নাস্তিক-আস্তিক বিতর্ক, বিডিআর বিদ্রোহ, বৌদ্ধ মন্দিরে আক্রমণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, পাহাড়-সমতল বিতর্ক, ব্লগার খুন, বিদেশী ডিপ্লোম্যাট খুন ইত্যাদি ইস্যুর পর ইস্যু তৈরি করে জনসাধারণকে বিভক্তি, বিদ্বেষ আর ঘৃণার অতলে টেনে নামায় । কিন্তু ওরা যতটা সফল হবে ভেবেছিল ততটা সফল হতে পারেনি। দুহাজার আঠারো সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ এই সমস্ত বিভক্তিকে একপাশে সরিয়ে রেখে ফ্যাসিস্ট শোষকের বিরুদ্ধে এক হতে পেরেছিল। এটা ছিল ওদের চরম পরাজয়। ওরা ভিত হয়ে পড়েছিল বলেই রাতের আঁধারে ভোট ডাকাতি ছাড়া ওদের আর কোন উপায় ছিলনা।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এই ঐক্য, আমার মতে, জনগণের অন্যতম বড় সফলতা ছিল। অসংখ্য ভিন্নতা সত্ত্বেও মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তারা সেদিন এক হতে পেরেছিল। দুহাজার আঠারো সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত লড়াইটা ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জামাতের অথবা বিএনপির। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে এ লড়াই সমগ্র বাংলাদেশ বনাম আওয়ামী লীগের লড়াইয়ে পরিণত হয়। এই ঐক্য বিরোধী দলগুলো ছাড়াও কোটা আন্দোলনের তরুণদের সহ সমস্ত জনগণের সমর্থন পেয়েছিল।
জনগণের ঐক্য সম্পর্কে অ্যামেরিকার প্রাক্তন সেক্রেটারি অব স্টেট এবং “Fascism: A Warning” বইয়ের লেখিকা মেডলিন অলব্রাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উক্তি করেছিলেন। তিনি দুহাজার আঠারো সালের ত্রিশে জুলাই ‘দি ইকোনোমিস্টের’ সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “The right response to thuggish politics is not more thuggery; it is a coming together across the ideological spectrum of people who want to make democracies more effective”. বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, সহিংস রাজনীতির জবাব আরও সহিংসতা নয় বরং বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ যারা গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে চায় তাদের সবার একসাথে হওয়া।
ঐক্য মানে সবাই ভিন্ন ভিন্ন দল ছেড়ে একদলে যোগ দেবে তা নয়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য সবাইকে এক ব্যানারে আসতে হবে, সবাইকে একই স্লোগান দিতে হবে, সবাইকে একই আদর্শ বা মতের হতে হবে তা কিন্তু রাজনীতি শাস্ত্রের কথা নয়। তবে শর্ত হল, সবার লক্ষ্য এক হতে হবে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথাই ধরুন। তখন একদিক থেকে স্লোগান উঠত, “নারায়ে তাকবীর” আবার অন্যদিক থেকে শোনা যেত, “বন্দে মাতরম”। এরা সবাই কিন্তু এক ব্যানারে আন্দোলন করেনি, সেটা সম্ভবও ছিলোনা। কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল ‘ব্রিটিশ খেদাও’।
এমন উদাহরণ আরও অনেক টানা যাবে। যেমন বায়ান্ন সালে ধর্মপ্রাণ তমদ্দুন মজলিসের ভাষা আন্দোলনের ডাকে বামপন্থীরাও যোগ দিয়েছিল। তাদেরকে ব্যানার পরিবর্তন করতে হয়নি, আদর্শ ত্যাগ করতে হয়নি। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা উনসত্তর বা নব্বইয়ের এর গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলনের দিকে তাকালেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাই। ব্যানার, স্লোগান ভিন্ন ভিন্ন ছিল কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক।
উনিশশ উনিশ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের কথা প্রায় সবারই জানা আছে। সেদিন অমৃতসরে অসংখ্য শিখ ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ এবং শিশুরা একত্রিত হয়েছিল ডা. সাইফুদ্দিন কিচলুকে গুম করার প্রতিবাদে। দেখা যাচ্ছে, একজন মুসলিম নেতার পক্ষে দাঁড়িয়ে শিখ ধর্মাবলম্বী নারী, পুরুষরা অকাতরে জীবন দিয়েছিল। বাংলাদেশেও যেদিন সবাই নিপীড়িত মানুষের দল, ধর্ম, আদর্শ না দেখে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতীবাদ করতে পারবে সেদিন থেকে বিজয়ের যাত্রা শুরু হবে।
আমার মনে হয়, দুহাজার আঠারো সালের পর থেকে বাংলাদেশ এপথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, গণতন্ত্র-কামী মানুষেরা এখন ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে একমত হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই ঐক্যকে এক সুতোয় গেঁথে একই দিকে ধাবিত করা। অপরপক্ষ থেকে বিভেদ সৃষ্টির কাজ কিন্তু মোটেও থেমে নেই বরং বেড়ে গেছে এবং আরও বাড়তেই থাকবে। তবে আমার বিশ্বাস, স্বাধীনতাকামী এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে খুব বেশী দিন শোষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি খুব স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে আওয়ামী লীগের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
ফ্যাসিবাদকে বাইরে থেকে দেখতে খুব শক্তিশালী মনে হলেও এদের ভিত্তি থাকে খুব দুর্বল। এরা মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমন করে রাখতে চায়। কিন্তু একবার যদি মানুষ ভয়কে জয় করতে পারে তাহলে ফ্যাসিস্ট কাঠামো খুব দ্রুতই ভেঙ্গে পড়ে। কারণ এরা জানে এদের অপরাধের মাত্রা কতটা গভীর। গণতন্ত্র-কামী মানুষের গণ জোয়ার ঠেকানোর সাধ্য এদের নেই।
(লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় )

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!