ফের পিটুনি কোটা আন্দোলনকারীদের, রাশেদ রিমান্ডে

রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ফের হামলা চালিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। রাজধানীতে এক ছাত্রীকে শারীরিক লাঞ্ছিত করা হয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। এ সময় আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হাসানসহ দুজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসব ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এদিকে কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদকে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

কোটা সংস্কারের পক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এতে সরকার সমর্থকদের হামলায় অর্ধশত আন্দোলকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে পূর্ব ঘোষিত মানববন্ধন ও পতাকা মিছিল কর্মসূচি পালন করতে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা সেখানে কোটা আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হাসানসহ আন্দোলকারীদের বেদম মারধরের পর দুজনকে শাহবাগ থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। এর আগে সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে বাইক নিয়ে মহড়া দিতে থাকেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। মধুর ক্যান্টিন থেকে টিএসসি, শাহবাগ, শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন তারা। আন্দোলনকারী হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলেই তাকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে হয়রানির শিকার হন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন জানান, বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধনের প্রস্তুতিকালে হঠাৎ কয়েকজন তাদের ওপর হামলা করে। যুগ্ম-আহ্বায়ক লুত্ফন নাহার মিলা বলেন, শনিবারের ঘটনার প্রতিবাদে শহীদ মিনারে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ছিল। সেখানে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে মেয়েদেরও লাথি-ঘুষি মেরেছেন। এতে এক মেয়ের মাথা ফেটে গেছে। জানতে চাইলে শহীদ মিনার থেকে দুজন আন্দোলনকারী আটকের কথা স্বীকার করেছেন শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান। এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী।

ঢাবি ইংরেজি বিভাগের মানববন্ধন : কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসনীম মাহবুব জানান, কতিপয় ছাত্র (ছাত্রলীগ) তাদের বাধা দিয়েছে। তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি, বিভিন্ন কটূক্তি, ধমক ও ছবি তুলে ভয় দেখানো হয়।

ছাত্রলীগের বাইক মহড়া : শনিবার বিকাল থেকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বাইকে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মহড়া অব্যাহত রেখেছেন। গতকাল বিকাল ৩টার দিকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বাইকে করে মহড়া দিতে দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করেন। তারা হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে গেটে অবস্থানরত আনসার সদস্যদের বাধায় ফিরে আসেন। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, কোটা আন্দোলনের নামে যারা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের প্রতিহত করার জন্য আমরা কাজ করব। এদিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় করা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খানকে পাঁচ দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম রায়হান উল ইসলাম রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই মো. সজীবুজ্জামান আসামিকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর— রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পতাকা মিছিলের সময় কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর আবারও লাঠি, রড, হাতুড়ি ও ছুরি নিয়ে হামলা চালিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এতে একজন মারাত্মক আহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত শিক্ষার্থীর নাম তরিকুল ইসলাম তারেক। তিনি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ রাবি শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। হামলায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন। তবে তাদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে পতাকা মিছিল বের করেন কোটা আন্দোলনকারীরা। তারা বিনোদপুর বাজারের দিক থেকে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটকের দিকে আসতে থাকেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ফটক থেকে ছাত্রলীগ নেতারা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করেন। ছাত্রলীগ সহসভাপতি গোফরান গাজী, মিজানুর রহমান সিনহা, এহসান মাহফুজ, আহমেদ সজীব, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান লাবণ, মেহেদী হাসান মিশুসহ ৩০-৩৫ জন লোহার রড, বাঁশের লাঠি, হাতুড়ি ও ছুরি নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান। এ সময় পুলিশ দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ রাবি শাখার আহ্বায়ক মাসুদ মোন্নাফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলাম। তারা এ সময় আমাদের ওপর অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আমাদের চারজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তারেক নামের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক লুত্ফর রহমান বলেন, ‘ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু কথিত কোটা আন্দোলনকারীরা বিনোদপুর হয়ে লাঠিসোঁঠা নিয়ে ছাত্রলীগকে ধাওয়া করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছে বলে শুনেছি।’ জাবি : কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পূর্ব ঘোষিত গতকালের বিক্ষোভ মিছিল শাখা ছাত্রলীগের বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে। মিছিল শুরুর আগমুহূর্তে আন্দোলনের জাবি শাখার আহ্বায়ক শাকিলুজ্জামানকে টেনেহিঁচড়ে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যান ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কর্মসূচি প্রতিহত করতে সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নিতে থাকেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এ ছাড়া মোটরসাইকেলযোগে তারা পুরো ক্যাম্পাসে টহল দেন। তবে শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘শাকিলকে ছাত্রলীগ তুলে নিয়ে যায়নি। শাকিল তার আবাসিক হল কক্ষে রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল— এমন তথ্য আমাদের কাছে থাকায় ক্যাম্পাসের সার্বিক সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আমরা সেখানে অবস্থান নিয়েছিলাম। ক্যাম্পাসে যাতে কোনো দুষ্কৃতিকারী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে না পারে সেজন্য ভবিষ্যতেও জাবি ছাত্রলীগ সদা তৎপর থাকবে।’ এদিকে ছাত্রলীগের হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাবি সাংস্কৃতিক জোট। জোটের সভাপতি মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের হামলা ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করছে।’ এর প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক জোট ও প্রগতিশীল ছাত্র জোটের পক্ষ থেকে সন্ধ্যায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। বরিশাল : কোটা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা রাশেদ খানসহ গ্রেফতার সবার মুক্তি ও কোটা আন্দোলন নেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপনের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল ১০টায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে এ মিছিল বের করা হয়। দিনাজপুর : কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা-গ্রেফতারের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে পতাকা হাতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করেন।

(বাংলাদেশ প্রতিদিন)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!