ফরাসি মুসলমানদের বর্তমান ও ভবিষ্যত

বদরুল বিন হারুন
ফ্রান্স আধুনিক বিশ্বের শক্তি শালী দেশ সমূহের একটি।ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর আগমন এখানে কয়েকটি ধাপে হয়েছে।মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের সাথে মূলত ফ্রান্সে ইসলামের আগমনের সেতুবন্ধন হয়েছে।স্থায়ি ভাবে মুসলমান ও ইসলামের বৃক্ষের জড় গেঁথেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেখানে ফ্রান্সের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন ।মুসলমান।মারা গেছেন অগনিত ।পরবর্তীতে কৃতজ্ঞ ফরাসি জাতি যুদ্ধাবশিষ্ট গাজী মুসলমানদের এখানে স্থায়ী ভাবে থেকে পুনর্বাসন সুযোগ দেয় ও তাদের ধর্ম কর্মের সুবন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়।প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয় এর কৃতজ্ঞতা হিসেবে “Grande mosquée de Paris “প্যারিস বড় মসজিদ “।মূলত এখান থেকেই ফ্রান্সে ইসলাম ও মুসলমানদের আগ্রযাত্রার সোপান তৈরি হয়েছে।

Grande mosquée de Paris লক্ষাধিক মুসলিম প্রাণের নজরানা স্বরূপ 1926 সালের 15ই জুলাই তত্কালীন ফরাসি শাসক Gaston doumerque ফ্রান্সের প্রাণকেন্দ্র বিশাল স্হান দান করেন।শুরু হয় ইসলামের এক মানবিকতার ইতিহাস।সৌন্দর্য প্রকাশ।মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও তত্কালীন প্রেসিডেন্ট si kaddour benghabrit আলজেরিয়ান ও ইউরোপিয়ান ইয়াহুদীদের গোপনে আশ্রয় দিতেন এই মসজিদে।তিনি তাদের থাকা খাওয়া,নকল মুসলিম সনদ দেওয়া,গোপনে বের হওয়ার ব্যাপারে কড়া নিরাপত্তা দিতেন।যাতে করে তাদেরকে মুসলিম মনে করে জার্মানরা হত্যা করা থেকে বিরত থাকে।মুসলমানদের এই অবদান আজ ও ফ্রান্সের মানুষ এবং ইয়াহুদীরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে।

ফ্রান্সে ইসলামের ইতিহাস পুরাতন হলেও প্যারিস বড় মসজিদ ও তার দাওয়াতি কার্যক্রম এখানে ইসলামের নবদিগেন্তের সূচনা হয়।ফ্রান্সের মুসলমান ও ইসলামের সূর্যোদয় ছিলো মানবতার কল্যাণে।তাই এখানকার মুসলমানদের রয়েছে এক গৌরবোজ্জল ইতিহাস।

ফ্রান্সে মুসলমানদের ধর্মীয় অবস্থান:
———————————————
1905 সালে ফ্রান্স সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করেছে।গির্জার প্রভাবকে রাজনীতিমুক্ত করেছে।তবে ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।আর ধর্মের ব্যাপারে উত্সাহ বা নিরুত্সাহ কিছুতে নেই।ধর্ম যার যার ব্যাক্তিগত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।ভিন্ন ধর্মের বিষয়ে সমান দৃষ্টিভঙ্গি রাখে।এজন্য ফ্রান্সে প্রায় শতকরা ত্রিশ জনের কোন ধর্ম নেই।

2003 সালে নিকোলাস সার্কোজি ফ্রান্সে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা কালীন ফ্রান্সে মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো 5-6 মিলিয়ন।যা মূল জনগোষ্ঠীর 10%।কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছাত্রী,শিক্ষক,ডাক্তার,ইন্জিনিয়ারও রাজনৈতিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।মসজিদ ছিলো ২১০০টি।১৬এপ্রিল ২০১৮ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মেক্রো তার এক ভাষণে বলেছিলেন-ফ্রান্সে বর্তমান মুসলিম জনসংখ্যা হচ্ছে ৬ মিলিয়ন।তিনি আরো বলেছেন যে,আমি ফ্রান্সের হিজাব পরিহিতা মহিলাদের সম্মান করি।

২০১৪-২০১৬ সালে সর্বকালের রেকর্ড সংখ্যক শরণার্থী ফ্রান্সে আশ্রিত হয়েছেন, যার অধিকাংশ ছিলেন মুসলিম।গবেষণায় দেখা গেছে এ হারে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা বর্তমান সংখ্যার তিনগুণ হবে ২০৫০সালে এবং ইউরোপিয়ান মুসলিম সংখ্যা হবে মূল জনগোষ্ঠীর ১৪%।ধর্মের বিবেচনায় ইসলাম হবে ইউরোপের প্রধান ধর্ম।(pew research center )

ফ্রান্সে সর্ববৃহত্ ধর্মীয় কনফারেন্সর আয়োজন:
———————————————————–
আরবী আলখালিজ অন লাইন এর এপ্রিল ২০১৮ এর রিপোর্ট অনুযায়ী একটি নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদন তৈরি করেছে ফ্রান্সে সর্ববৃহত্ ধর্মীয় কনফারেন্সর ৩৪তম আয়োজন।যা ১৯৮৪ সাল থেকে নিয়মিত হয়ে আসছে।তিনদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রসিদ্ধ ইসলামিক স্কলার,গবেষক,মুসলিম সমাজ বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি হয়েছে।বর্তমান বিশ্বের নাম করা মুসলিম দার্শনিক ডঃ তারেক রামাদান জেলে থাকায় এবার শুধু উপস্থিত থাকতে পারেননি।তা ছাড়া সুদানের ডঃ বশির,অল ইউরোপিয়ান মুসলিম কমিউনিটির চেয়ারম্যান এবং ফ্রান্সের মুসলিম শিক্ষাবিদ আহমদ জাবাল্লাহ সহ বহু সমাজবিজ্ঞানি ও রাজনৈতিক উপস্থিত ছিলেন।প্রায় দুই লক্ষাধিক মুসলিমদের উপস্থিতি ছিলো এবারের এই কনফারেন্স এ।

উক্ত কনফারেন্স থেকে ফ্রান্সের মুসলমানদের সর্বশেষ তথ্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
1-ফ্রান্সের বর্তমান জনসংখ্যা হলো ৬২মিলিয়ন।
2-মুসলিম জনসংখ্যা হচ্ছে ৬মিলিয়নের ও বেশি।
3-বর্তমানে ফ্রান্সে ৩০০০হাজার মসজিদ আছে।পাঁচ শতের বেশি রয়েছে শুধু পেরিস শহরে।
4-ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়,কলেজ ও মসজিদ কেন্দ্রিক মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের অধিক।
5-ফ্রান্স সরকারি ইসলিমক ইনস্টিটিউট মাত্র ৩৬টি।ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় একে বারে কম।

যে সমস্ত বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে তার সংক্ষেপ-
১-বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে ফ্রান্সে ইসলাম দ্রুত অগ্রসরমান।
২-বিশ্ব মুসলিমদের সাথে সন্ত্রাসের তকমা লাগানো হলেও ইসলামই ফ্রান্সের দ্রুত অগ্রসর ধর্ম।প্রায় এক মিলিয়ন মুসলমান যারা মূল ফরাসি।কন্ভারটি মুসলিম।ইউরোপিয়ান মুসলমানরা সন্ত্রাসের তকমা এখন আর তাদের গায়ে মাখেনা।

৩-ইউরোপিয়ান মুসলমানরা এখন নিজেদেরকে ভিন্ন জনগোষ্ঠী ভাবে না।তাঁরা এখন ইউরোপের মাটি ও মানুষের একাংশ।

ইসলামোফুবিয়া ইন ফ্রান্স:
_______________________
১৫এপ্রিল ২০১৮ ভাষণে ইমানুয়েল মেক্রো বলেছেন,ইসলাম হচ্ছে ফ্রান্সের দ্রুত অগ্রসরমান এক মাত্র ধর্ম,যা খুবই দ্রুততার সাথে বিস্তার লাভ করছে।মুসলিম এই জনগোষ্ঠীর রীতিনীতির সাথে এদেশের জনগণ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।সত্যিকারের মুসলিম র্যাডিকাল হয় না।তারা সন্ত্রাসী নন।আসলে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সাথে জুড়ে দেওয়া এটি ইসলামো ফুবিয়া।
গত ৪ জানুয়ারি মেক্রোন বলেছেন তিনি ফ্রান্সের মুসলমানদের ঢেলে সাজাতে চান।মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো সাংগঠনিক নেতৃত্ব তৈরি,ইমামদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে।

France Le Figaro এর রিপোর্টে বলা হয়েছে অতীতের সকল প্রেসিডেন্ট ফরাসি মুসলমানদের সমস্যা সমাধানের বিফল হয়েছিলেন।এই বিফলতার মূলে ছিলো তারা ইসলাম ও আরব জাতিকে মিলিয়ে উভয়ের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন।কোন আরব অপরাধ করলে এটাকেই ইসলাম ও সন্রাস বানানোর প্রবণতা ছিলো।

ফ্রান্সের শারলী হেবদো আক্রমণ পরবর্তী ইসলাম:
__________________________________________
২০১৫ ফ্রান্সের শারলী হেবদো আক্রমণের গোটা বিশ্ব কেঁপে ওঠে।এর দায় স্বীকার করছিলো সন্ত্রাসী আলকায়েদা গোষ্ঠী।ফ্রান্স ততা বিশ্ব মিডিয়া একাট্রা হয়ে যায় ইসলাম ও মুসলমানদের সন্রাসী লকব দিতে।ফরাসি মিডিয়া অতিউত্সাহী হয়ে ওঠে ইসলামের ব্যাপারে।রাত দিন মিডিয়া গুলো ব্যাপক ভাবে এর প্রচার চালায়।মনে করা হয় এর পর আর ইসলামের আগ্রযাত্রা থমকে দাঁড়াবে।কিন্তু,হলো তার উল্টো।জনগন ইসলাম থেকে পলায়নের পরিবর্তে কৌতূহলী হয়ে ওঠে।শুরু করে নতুন ভাবে ইসলাম নিয়ে গবেষণার।

পেরিস বড় মসজিদের ইমাম RTL এর সাক্ষাত্কারে বলেন-“এই ঘটনার কোনো প্রভাব ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর উপর হয়নি।বরং মহাগ্রন্থ আল কোরআনের বিক্রি অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে।Amazon থেকে লক্ষ লক্ষ কপি সেল হয়েছে।ফরাসি মুসলিম কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব কারী সংস্থাগুলো,আল মাহাদ আল ইসলামী,UOIF এবং CFCM এর মত বড় দায়িত্বশীল মুসলিম সংগঠনগুলো অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী দায়িত্ববান হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষায় তাদের কার্যক্রম আরো জোরদার করেছে এবং নিজেদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয়েছে।গবেষণা সংস্থা “মান্তিনিন”এর রিপোর্টর ভিত্তিতে শারলী হেবদো আক্রমণ পরবর্তী যে সমস্ত পরিবর্তন হয়েছিল তা প্রেসিডেন্ট মেক্রোন এর বিশেষ সহযোগী,কলামিসট ও সাংবাদিক হাকিম আল কারভীর ভাষায়-
১-ফরাসি মুসলমানদের সম্পত্তির হার তুলনামূলক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।মুসলমান ব্যাবসায়িরা ফ্রান্সের টপ ধনীদের তালিকায় ডুকে গেছে।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের হার ফ্রান্সে সর্বকালের বেশি সংখ্যক কন্ভারটি হচ্ছে।মুসলিম নতুন প্রজন্ম শিক্ষা দীক্ষার সাথে সাথে ধর্মের প্রতি অধিক হারে ঝুঁকছে।
২-মসজিদ ও মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যা যে কোন সময়ের তুলনায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩-ফ্রান্সের শেষ দশ বছরে মসজিদ,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

অবশেষে,বলতে হয়,ফ্রান্সের ইসলাম ও মুসলিম কমিউনিটির উপরে কড়া নজরদারি,অহেতুক সন্দেহ ও আতংক সৃষ্টি,তুলনামূলক সিনাগগ,গির্জা ও মন্দিরের তুলনায় এখানে মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ এখানকার মুসলিম কমিউনিটিতে এক প্রকার হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
ফরাসি মুসলিম কমিউনিটির হাজারো সমস্যার সাথে যোগ হয়েছে “সালাফিজমের”কটোরতা।যা তাদেরকে উগ্রপন্থী ও ভয়ভীতি ছড়ানোর আরেক মসিবত বলা যায়।বর্তমান সরকার তাদের ও মধ্যম পন্থী মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য করলেও ইসলামোফবিয়া দমন হচ্ছে না।এদের বিরুদ্ধে একশন নিতে গিয়ে ইসলাম ও তাদের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলা হচ্ছে।
তবে সব কিছু অতিক্রম করার মতো মনোবল,ইমানি চেতনা লালন ও বুদ্ধিভিত্তিক আত্মরক্ষায় ফরাসি মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য এখন বিশ্বে দিবালোকের মত সুস্পষ্ট।তাঁরা তাদের এই আগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলে ফরাসি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বলতর !
লেখক-
বদরুল বিন হারুন,প্রিন্সিপাল এম সি ইনস্টিটিউট,ফ্রান্স।সাবেক প্রভাষক শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
26/11/2019

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!