প্রবাসের গল্প #মিরন:মাহবুব সুয়েদ

এক-‘আপনার কাগজ প্রস্তুত।সাত তারিখ বিকেল ৩ টায় সংগ্রহ করার অনুরুধ রইল’ লেখা মেসেজ দেখে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল মিরন।কী আছে তার ভাগ্যে?সে কী সত্যি সত্যি স্বপ্নের দেশে যেতে পারবে।সবাই যাচ্ছে তার ও ভিসা হওয়ার কথা।নানা ভাবনায় আর উত্তেজনায় দিন পার করে দিল সে।সে রাতে একফুটো ঘুমও আসেনি তার চোখে।আগ্রহ আর অপেক্ষায় রাত পার করে পরদিন ৭ তারিখে মা আর বাবার দোয়া নিয়ে রওয়ানা দিল শহরের উদ্দেশ্যে।সাথে প্রিয় বন্ধু আলিমকে নিয়ে।যথা সময়ে সে পৌছাল ভিসা সেন্টারে।সিরিয়ালে ডাক পড়তে গেল সে।উত্তেজনায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।কত স্বন বুনছে সে।তার মা-বাবা আর প্রিয়তমা মোনার ও কত উতসাহ আর স্বপ্ন জড়িয়ে আছে যে।এসব ভাবতে ভাবতে মিরন তার রশিদ জমা দিল।কাউন্টার থেকে অফিসার তাকে বলল জনাব মিরন আপনাকে অভিনন্দন।আপনি ইউকের ভিসা পেয়ে গেছেন।খুশিতে উত্তেজনায় দু’চোখে জল চিকচিক করছে তার।মনের গভীর থেকে মুখে আসল ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

দুই-ভিসা সমেত পাসপোর্ট পেয়েছে সে।কিন্তু হাতে সময় একদম নেই।লন্ডনে ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে।একদিকে নতুনের সন্ধানে নতুন জায়গায় যাত্রার উত্তেজনা অন্যদিকে সবাইকে ছেড়ে যাওয়ার আবেগ।রাতে ঘুম হচ্ছেনা।ভিসা পাওয়ার দিন থেকেই প্রিয় মানুষগুলোও কেন যেন আলাদা ব্যাবহার শুরু করেছে।সবাই একটু বেশি আদর যত্ন শুরু করে দিয়েছে।গম্ভীর মেজাজের প্রিয়তম বাবাও আজ থেকে তাকে ছাড়া খাওয়ার খাচ্ছেননা।মা আলতো করে তার প্লেটে বড় মাছের মাথাটা তুলে দিয়ে অপরদিকে তাকিয়ে চোখ মুছেন।মিরন দেখে।ফোনে প্রিয়তমা মোনা শুধু ফুপিয়ে কাদে নিঃশ্বব্দে।কথা যেন বেরুতে চায়না তার মুখ দিয়ে।কান্নার চাপা আওয়াজ তারও আসে।তার বুক ফেটে যাচ্ছে।কত দিনের জন্যে সে যাচ্ছে।আর কবে ফিরে আসবে।সবকিছু কী সে আর আগের মত পাবে আবার ফিরে আসলে?এইসব নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে।ভিসাপ্রাপ্তির নয়দিন পর মিরন উড়াল দিল নতুন দেশের সন্ধানে।নতুনের উদ্দেশ্যে।আবেগ,উত্তেজনা,কান্না,ভালোবাসার ঠান,নতুনের সন্ধান,নতুন জীবনে পদার্পন।সবকিছুকে সঙ্গি করে সে পৌছাল রানী এলিজাবেথের সাম্রাজ্য গ্রেট বৃটেনে। তিন-দুই বছরের ভিসা ছিল মিরনের।লন্ডনে পৌছে সে কলেজে ক্লাশ শুরু করল।অনেক কষ্টে একটা পার্ট টাইম জব ও পেয়ে গেছে সে।জব আর ক্লাশ।বাড়িতে ফোন দিলে মা কাদেন।বাবা উতসাহ দেন।তোকে অনেক বড় হতে হবে।টাকা পয়সা উপার্জন কর।সুন্দর জীবন কাটাও।আর মোনা!শুধুই হতাশার বানী শোনায়।আর কবে দেখা হবে।তুমি কবে আসবে।আমাকে কী এসে পাবে?মিরন শুধরায়।আশ্বাস দেয়।বলে জান যাবে তবু তোমাকে হারাতে পারবনা।আশ্বাস দেয়।সঠিক সময়ে সে চলে আসবে।এদিকে কলেজ থেকে শুধু নোটিশ করছে।সে যে এজেন্সির মাধ্যমে এসেছিল তারা পুরু টাকা দেয়নি।কলেজ ফি বাকী রেখে দিয়েছে।মিরন কী করবে ভেবে পায়না।একদিকে কলেজের চাপ,ক্লাশের চাপ আর সেই সাথে কাজের অনুমতি নেই পুরু সপ্তাহের।কী করবে মিরন কিছু বুঝে পাচ্ছেনা।মাথায় ঝিম ধরে যাচ্ছে।আস্তে আস্তে স্বপ্নের প্রবাস জীবন এক ধরনের বিষাদময় হয়ে যাচ্ছে।ভিসা জটিলতা পেয়ে বসল।কলেজ কতৃপক্ষ তার ফি না দেয়া আর নিয়মিত ক্লাশে উপস্থিতির অভাব জানিয়ে ইমিগ্র্যাশান কতৃপক্ষ তাকে বৃটিশ হোম অফিসে টার্মিনেট করে দিয়েছে।বন্ধু বান্ধব আর শুভাকাংখিরা পরামর্শ দিচ্ছে তাকে ইউরোপে অন্য কোথাও চলে যেতে।এখানে তার ভিসা প্রাপ্তি খুবি জটিল হবে।মাথা যেন কাজ করছেনা মিরনের।এদিকে মোনার ফোন!তুমি যেকোন ভাবে বৈধতা নেয়ার চেষ্টা কর।তাড়াতাড়ি এসো।এই তো মাত্র দুইদিন আগে আমেরিকা থেক বিয়ের আলাপ এসেছে।কী করবে মিরন!স্বপ্ন আর স্বাদের লন্ডন জীবন যেন দিনে দিনে বিষাদময় হয়ে উঠছে।যথারীতি সিদ্বান্ত নিয়ে মন শক্ত করে সে রওয়ানা দিল ইউরোপের পথে।খোজ নিয়ে জানতে পেরেছে সে পর্তুগাল নামক সাগর কন্যার দেশে বৈধতা পাবে।আবারো নতুনের সন্ধানে মাত্র এক বছরের মাথায় মিরনের যাত্রা শুরু।সে আসল নতুন দেশ।নতুন ভাষাও সংস্কৃতির দেশ পর্তুগালে। চার-উচুনিচু পাহাড়ের দেশ পর্তুগাল।বিশাল মহাসাগর আটলান্টিকের পাদদেশে অবস্থিত বিখ্যাত ভাস্কো দা গামার দেশ।মিরন এসেছে একবুক আশা নিয়ে।উচ্ছাকংখা নিয়ে ভিসা লাগিয়ে অনেক কষ্টে যে লন্ডনে সে এসেছিল সেই লন্ডনে মাত্র এক বছরের মাথায় স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে যাবে দারুন ভিসা বা সামান্য ডকুমেন্টের জন্যে তা সে ভাবেনি।এবার সম্পুর্ন অপরিচিত দেশে এসেছে একি আশায়।এসে দেখে আরো প্রায় হাজার খানেক বাঙ্গালী আছে এখানে একি আশায় বুক বেধে।সবার ধ্যান আর সাধনার বিষয় একটাই ‘ডকুমেন্ট’ নামক সোনার হরিণ।তার সাথে জুড়ে আছে তার প্রিয়াকে পাওয়ার স্বপ্ন।ইউরোপে সুন্দর ছিমছাম নিরব একটা জীবনের স্বপ্ন।রাতে বিছানায় গা এলিয়ে সে স্বপ্নবুনে।একদিন সে লিগ্যাল হবে সেও হবে ডকুমেন্টধারী।মোনাকে নিয়ে ছোট্র ফ্লাট আর একটা গাড়ি থাকবে।সবার কাছে শুনে এসেছিল ডকুমেন্ট নামের এ সোনার হরিণ ধরতে গেলে তার সাত থেকে আট মাস সময় লাগবে আর টাকাও খরচ করতে হবে কিছু।কিন্তু হায় কপাল!সময় আর প্রকৃতি যেন তার বিরুপ আচরন মিরনের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়।নিজের সাথে আনা সামান্য পুজি শেষ হয়ে গেল মাত্র কয়মাসে।দালাল আর দান্ধাবাজদের কবলে পড়ে সে বাড়ি থেকে টাকা আনতে বাধ্য হল।নিজ পিতা অনেক কষ্টে প্রতি মাসে টাকা পাঠান আর সাথে করে একরাশ আশ্বাসযুক্ত ভালোবাসা।একটাই চাওয়া মিরনসহ সবার।ছেলে তো ইউরোপের ডকুমেন্ট পাবে।লিগ্যাল হবে।সাত আট মাসে আকাংখিত ডকুমেন্টের আশায় এলেও আচানক পর্তুগীজ ইমগ্র্যাশান অথরিটির বৈরী আচরন শুরু হয়। পাচ-ছয় মাসে যেই সোনার হরিণ পাওয়ার কথা মিরনের দেখতে দেখতে প্রায় ১৮ মাস লেগে গেল তা নিশ্চিত করতে।প্রায় আঠারো মাস সম্পুর্ন কর্মহীনাবস্থায় থেকে অবশেষে মিরন স্বাদের ডকুমেন্টের খোজ পেল।তার হাতে কাংখিত পেপার পেয়ে গেল।’কারতাও রেসিডেন্সিয়া’ বা পর্তুগীজ রেসিডেন্ট পার্মিট সে হাতে পেল।মিরন জীবনে যে কয়বার খুব বেশি খুশি হয়েছে তার মাঝে আজকের দিনটি অন্যতম।বাড়িতে ফোন দিয়ে ফুপিয়ে কাদল অনেক্ষন।মা -বাবা সবাই খুশিতে আত্মহারা।এবার তো একটা উপায় হল তাদের আদরের মিরনের

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!