জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা প্রামাণ্য দলিল ও পীরের মতলব:সামসুল আলম

 পীর হাবিব পাকা লেখক। কিন্তু লেখার শিরোনামে যদি দু’টি মস্ত নেগেটিভ শব্দ (বিএনপির বোঝা এবং আওয়ামীলীগের শত্রু) দিয়ে শুরু করেন, তাহলে এই লেখার পুরোটা আর কষ্ট করে পড়ার দরকার আছে কি? পীর সাহেব রাজনৈতিক কলাম লিখতে গিয়ে ভিন্ন দলের নেতাকে গালমন্দ করে নিজেই গর্দভ সেজে বসে আছেন কি না সে প্রশ্ন উঠছে! কেননা তার লেখাটি কোনো রাজনৈতিক মূল্যায়ন নয়, বরং হয়ে গেছে একটি দলের মেনিফেস্টো। দুঃখিত, ঐ প্রাণীটির সঙ্গে তুলনা করা উদ্দেশ্য ছিলনা, কেবল রূপক অর্থেই বলা হলো।

রচনার শুরুতেই পীর সাহেব বাংলাদেশে বৃহত্তম দল বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন ইতিহাস মিথ্যাচারের, এবং এটাকে তিনি মানসিক বিকারগ্রস্ততা, আক্রোশ, প্রতিহিংসা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, নিজের ওজনের বাইরে বলা কথাবার্তা__ইত্যাদি বিবিধ কুবাক্যে তারেক রহমানকে গালমন্দ করেছেন। গালমন্দ করার কারন হিসাবে তিনি বলেছেন- তারেক রহমান নাকি মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান খাটো করেছেন, অন্যদিকে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে প্রচার করেছেন। মূলত এটাই পীর সাহেবের মাথাব্যথা। অত্র আলোচনা এই পীরের পয়েন্টের মধ্যেই থাকার চেষ্টা করব। পীর সাহেব আরও বলছেন, তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নাকি আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে, তাই দেশবাসী শুনতে পেলো না_ তারেক রহমান কতটা খারাপ কাজ করেছে! প্রশ্ন উঠছে, পীর সাহেব নিজেই নিষিদ্ধ আইটেম পাঠ করে আলোচনার মাধ্যমে জাতিকে জানিয়ে আদালতের সেই নিষেধাজ্ঞা লংঘন করলেন কি না!

আওয়ামীলীগের পূর্নজন্ম
যে শেখ মুজিবের জন্য হাবিবের আজ অন্তঃপ্রাণ, তিনি কি একথা ভুলেই গেছেন যে আওয়ামীলীগ নামক দলটি দু’বার নিহত হয়েছে শেখ মুজিবেরই হাতে, সেই আওয়ামীলীগকে পূর্নজন্ম দিয়েছিলেন শহীদ জিয়া, সেটা যেভাবেই হোক না কেনো। ১৯৪৯ সালে রোজ গার্ডেনের বাড়িতে গঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ দলটি জন্মের পরে ২য় কাউন্সিল হয় মুকুল সিনেমা হলে, ১৯৫৫ সালে রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত ৩য় কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি কাটা পরে অর্ধেক নিহত হয়, তখন দলটির সাধারন সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিব। ৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি ১১ মিনিটে সংসদীয় ক্যু করে একদলীয় শাসন (বাকশাল) কায়েম করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নামক দলটির অপমৃত্যু ঘটে শেখ মুজিবেরই হাতে। ১৯৭৮ সালে সেই আওয়ামীলীগের পূর্নজন্ম ঘটে রাষ্ট্রপতি জিয়ার বদান্যতায়। চাইলে তিনি আওয়ামীলগের রেজিষ্ট্রেশন নাও দিতে পারতেন।

১৯৪৯ সালে রোজ গার্ডেনে ও পরে একাধিক সিনেমা হলে কাউন্সিল করেও আওয়ামীলীগের টাইটেল হয় না ‘সিনেমাহল পার্টি’, কিন্তু ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা রেস্তোরায় প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি প্রতিষ্ঠা হলেও পীর সাহেবরা বিএনপিকে ‘সেনা ছাউনী‘র দল টাইটেল দেয়! কি বিস্ময়! অথচ তারা ভুলে যায় বাকশাল গঠনের পরে সেনাবাহিনীর সার্ভিং অফিসারদেরকেও বাকশালে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন মুজিব। তবে হ্যা, সেনানিবাসে সৃষ্ট দল খুঁজতে গেলে পাওয়া যাবে আওয়ামীলীগকে, কেননা রাষ্ট্রপতি জিয়া তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় বসেই সিদ্ধান্ত নেন- আওয়ামী লীগসহ ২১টি দলের পুনর্জন্ম দিবেন!

শেখ মজিব কি স্বাধীনতা চেয়েছিলেন?
পীর হাবিবের দাবী করা শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতার ঘোষক হন, তবে লীগ ও হাসিনার হেড অফিস ভারত কেনো বলছে ভিন্ন কথা?

১) যুদ্ধকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় কেনো বলেছিলেন, “The cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as I know, has not asks for independence even now.” (Bangladesh Documents Vol-II, Page-275, Ministry of External Affairs, Government of India-1972) অর্থাৎ আটকের আগে বা অদ্যাবধি শেখ মুজিব নিজে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নি, বরং তিনি আটক হওয়ার পরেই এই দাবী ওঠে।

২) স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে বিতর্কটির সমধান পাওয়া যায় ২০১১ সাল অবধি ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে প্রকাশনায়, “Yahya Khan left Daca abruptly on 25 March 1971 and Tikka Khan let loose his reign of terror the same night. The next day, while the whereabouts of Mujib remained unknown, Major Ziaur Rahman announced the formation of the Provisional Government of Bangladesh over Radio Chittagong” অর্থাৎ মুজিবের নিখোঁজ অবস্থায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। আওয়ামীলীগের কান্নাকাটিতে এই পেইজটি ডাউন করে রাখা হয়েছে, তবে ভারত রক্ষক হার্ড কপিতে বহাল আছে। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংক্রান্ত তাবৎ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল ভারত, তাই তাদের রেকর্ডকেই আমরা বার বার দেখব)

৩) কলকতায় ২৭ জওহরলাল নেহেরু রোডে অবস্থিত ভারতীয় জাতীয় জাদুঘরে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি প্রদর্শিত আছে। সেখানে জিয়াউর রহমানের পরিচয় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীনতা প্রথম ঘোষক। অন্য কেউ না। ঢাকা থেকে হাসিনা সরকারের কান্নাকাটির চোটে আজকে সরিয়ে রাখা হয় ছবিটি।

৪) ১৯৭১ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান হতে নির্বাচিত ন্যাপ নেতা খান ওয়ালী খান পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন ২২ মার্চ। সাক্ষাৎকালে তিনি জানতে চান, তিনি (মুজিব) এখনও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন কি না। জবাবে মুজিব বলেছিলেন, ”খান সা’ব, আমি একজন মুসলিম লীগার” (সুত্র: মাহবুবুল আলম, বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত, নয়ালোক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫ এবং Bangladesh Documents)।

৫) আমেরিকার NBC টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার প্রচার হয় ২৬ মার্চ ১৯৭১, তাতে শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করা হয় – Do you mean Independence? মুজিব জবাব দেন, “No, I don’t mean that, I want Autonomy, It can be achieved many ways.”

৬) ২৫ মার্চ ‘৭১ রাত আটটার দিকে দলীয় সাধারন সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ একটি টেপরেকর্ডার এবং ছোট্ট একটি খসড়া ঘোষণা শেখ মুজিবকে এগিয়ে দিয়ে সেটা তাকে পড়তে বলেন, বাণী রেকর্ড করবেন। সেটা ছিলো “ স্বাধীনতার ঘোষণা এবং লড়াইয়ের আহবান।” কিন্তু মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তার ভয় ছিলো, এ কাজ করলে পাকিস্তানীরা তার বিরুদ্ধে এটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করবে। (‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ প্রথমা প্রকাশনী ২০১০)।

৭) ২৫ মার্চ ‘৭১ রাতে আওয়ামীলীগের সর্বশেষ ঘোষণা ছিল, ২৭ মার্চ সারা দেশে হরতালের। ২৫ মার্চ রাতে এ সংক্রান্তে একটি বিজ্ঞপ্তি সকল প্রেসে যায় এবং ইত্তেফাকসহ অন্যান্য পত্রিকায় ২৬ তারিখে ছাপা হয়। এতে বোঝা যায় কোনো স্বাধীনতা নয়, বরং আওয়ামীলীগ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ক্ষমতায় বসার পথে হাটছে। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের বিশিষ্ট বন্ধু এন্থনী মাসক্যারেনহাস লিখেছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১জন সংবাদবাহক স্থানীয় এবং বিদেশী সাংবাদিকদের মাঝে ১টি প্রেসনোট বিলি করেন যেটিতে মুজিবের পক্ষ থেকে আবেদন ছিলো, “প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা চুড়ান্ত হয়েছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের মতৈক্য হয়েছে এবং আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট তা ঘোষনা করবেন।” এ বিষয়ে মাসক্যারেনহাস মন্তব্য করেন, “আমার দুঃখ হয়, এই নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে আমার কোন মন্তব্য নেই” (সূত্র: এন্থনি মাসকারেনহাস, ১৯৭৩, ‘রেপ অব বাংলাদেশ’, অনুবাদঃ মযহারুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১১৩), অথচ ততক্ষণে আক্রমন শুরু হয়ে গেছে।

এরকম ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে যেখানে শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙতে চাননি, বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, মূলত রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার ভয়ে। সেখানে তাঁর দ্বারা স্বাধীনতা ঘোষণার দাবীটি তো অবান্তর। আর মুজিব যদি ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেই গ্রেফতার হয়ে থাকেন, তবে যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ফেরার কালে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী তিনি কি করে শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবে নতুন পাসপোর্ট বানালেন (ডঃ কামাল হোসেনের সাক্ষাৎকার)? এর পরে কি আর কোনো সন্দেহ থাকে যে, মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি।

জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা
১) শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে থাকলে সেটা প্রথমেই জানা থাকার কথা ছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারন সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদের। কিন্তু তিনি বলছেন ভিন্ন কথা। প্রবাসী সরকার গঠনের প্রাক্কালে ১১ই এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিভাবে চলছে, সে সম্পর্কে তাজউদ্দিন আহমদ জাতিকে অবহিত করেন স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত এক ভাষণে, “The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the People’s Republic of Bangla Desh, first announced through major Zia Rahman, to set up a full-fledged operational base from which it is administering the liberated areas.” (Ref: Bangladesh Document vol-I, Indian Government, page 284). তাজউদ্দিনের কোনো বক্তব্যেই শেখ মুজিব কখন কিভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন এরূপ কেনো বর্ণনা নাই। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সেখান থেকে সরকার ও পুর্নাঙ্গ একটি ”অপারেশনাল বেস” পরিচালিত হবার কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছেন তাজউদ্দিন। প্রকৃত পক্ষে জিয়া রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে (মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট টেলিগ্রাম ৩১ মার্চ ৭১, ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডকুমেন্ট “ভারত রক্ষক” ৯৩ পৃষ্ঠা, আনন্দ পাবলিকেশনের ‘বাঙলা নামের দেশ’ পৃষ্ঠা ৮১, Bangladesh Emergency of a Nation: AMA Muhit page 227, মাইদুল ইসলামের মূলধারা:৭১ পৃষ্ঠা ৫)

২) ভারতের রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক হিসাবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াকে উদ্দেশ করে রাষ্ট্রপতি রেড্ডি বলেন, ‘Your Position Is Already Assured In The Annals of the History of Your Country As A Brave Freedom Fighter Who Was The First To Declare The Independence of Bangladesh’.

৩) “মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করেছিলেন এবং নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁরা চট্টগ্রাম শহর দখল করে নিয়েছিলেন।” (বাংলাদেশের জন্ম, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিঃ পৃষ্ঠা ৮৭)

৪) পীর বলছেন, জিয়া জীবদ্দশায় কখনও দাবী করেননি স্বাধীনতা ঘোষক। সেই সময় দাবী করার মত কোনো পরিস্থিতি তৈরী হয়নি। তাই বলে এ নিয়ে যে কোনো উচ্চারন হয়নি, তা কিন্তু নয়। বরং জিয়াউর রহমান যখন দেশজুড়ে পদযাত্রা শুরু করেন, এরূপ একটি অনুষ্ঠানে আমার নিজ কানে শোনা_স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া। অনুরূপ একটি খবর পড়ুন- ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমীতে মুক্তিযুদ্ধের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের উপস্থিতিতে যখন জিয়াউর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়, “২৫ মার্চ পাক বাহিনীর বর্বর হামলার পর চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনাকারী ও তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৃতিত্বের অধিকারী কর্নেল জিয়াউর রহমান” তুমুল করতালির মধ্যে বক্তৃতা করতে ওঠেন জিয়া (দৈনিক বাংলা ২০/২/১৯৭২)।

উই রিভোল্ট এবং যুদ্ধকালে আওয়ামীলীগ
জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার ছিলেন, যিনি সঠিক সময়ে সাহস করে পাকিদের বিরুদ্ধে বলতে পেরেছিলেন- We Revolt, যেটা শেখ মুজিব সাহসও করেননি। ৭১ সালে জিয়ার সাথে ঐ রিভোল্ট করেছিল গোটা বাংলার সাড়ে সাত কোটি জনতা, যুদ্ধে সামিল হয় ১১ হাজার সোলজার। সেটা কি অপরাধ ছিলো জিয়ার? জিয়ার সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে বাঙালি সৈন্যরা যখন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে মরনপণ লড়াইতে ব্যস্ত, তখন আওয়ামীলীগের প্রবাসী সরকারের মন্ত্রীদের পাওয়া যায় সোনাগাছির বেশ্যালয়ে। এসব কি ভুলে গেছেন পীর? আওয়ামীলীগের কোনো বড় নেতা বা এমএনএ/এমপিএ স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছি কি? উল্টো তাদের ৮৭ জন বাংলাদেশের সাথে বেইমানী করে ইয়াহিয়ার প্রতি আনুগত্য করেছিলেন। এসব কি অস্বীকার করবেন পীর?

মুজিব হত্যার কথা জানতে পারা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরে জিয়াকে ক্ষমতায় দেখতে পান হাবিব! আসলে যে ক্ষমতায় বসেছিল, সেই মোশতাককে তিনি দেখতে পান না। পর দু’জন রাষ্ট্রপতি (মোশতাক এবং সায়েম)কে বাইপাস করে পীর কেবল জিয়া জিয়া করছেন কোন মতলবে? তবে কি পীর হাবিব আসলে মোশতাকেরই লোক ছিলেন, তাই এড়িয়ে যাচ্ছেন খোন্দকার মোশতাককে? শেখ মুজিবকে হত্যা করা হতে পারে- এটা কেবল জিয়া জানতেন না, জানতেন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ (তিনি এখনও আওয়ামী বান্ধব), সিজিএস খালেদ মোশাররফ, ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার সাফায়াত জামিল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ আবদুর রাজ্জাক, বিলুপ্ত আ’লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমদ, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, এমনকি শেখ মুজিব নিজেও তা জানতেন! এখন দোষ হয় কেবল জিয়ার, তাই না হাবিব?

স্বাধীনতার ঘোষণায় জিয়া
শেখ মুজিব ছাড়া আর কেউ স্বাধীনতার ঘোষক হতে পারবে না, এমন তত্ত্ব কোন্ বাইবেলে পেয়েছেন পীর? যে ফরমুলায় হাবিব বলছেন, ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা জিয়া না দিলে ক্যাপ্টেন রফিক দিতে পারত; স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়ার অবদান আর মেজর খালেদ ও তাহেরকে সমান দেখছেন হাবিব__মুজিব যখন বাংলার সাড়ে সাত কোটি জনতার প্রাণের দাবী ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হলেন, সেই একই ফরমুলা অনুযায়ী মুজিবের যায়গায় অন্য কেউ ঘোষণা দিতেই পারেন। জিয়া সে কাজটিই করেছেন। যায়গা কখনও খালি থাকে না__এটাই ইতিহাসের নিয়ম।

পীর হাবিব ২৭ মার্চ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রের ঘোষণায় জিয়াকে খুঁজে পেলেন, অথচ ২৫ মার্চ দিবাগত রাত দেড়টায় (২৬ মার্চ) চট্টগ্রামের ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টে জিয়াকে খুঁজে পান না, কেনো? যেখানে জিয়া ৮ম বেঙ্গলের সব বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের একত্র করে বিদ্রোহ, স্বাধীনতা, এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে নামার ঘোষণা দিলেন? এ কথা শহীদ জিয়া নিজ হাতেই লিখে গেছেন (একটি জাতির জন্ম)। সেখানে যে লাইনে মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণে সিগনাল বুঝেছিলেন জিয়া, সেটা হাবিব মানেন, কিন্তু রাত দেড়টায় যে অসম্ভব ঘটনা (স্বাধীনতা ঘোষণা) ঘটিয়েছিলেন, ঐ সময় চোখ বন্ধ হয়ে যায় পীরের! ছি, লজ্জা।

সেনাশাসক জিয়া!
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে জিয়াউর রহমান সিভিল লাইফে এলেন, নির্বাচন করে জনগনের ভোটে রাষ্ট্রপতি হলেন, রাজনৈতিক দল গঠন করলেন, তারপরও পীর হাবিবরা ‘সেনা শাসক’ জিয়া বলেই বিকৃত সুখ লাভ করতে চেষ্টা করেন! কিন্তু বিএনপির লোকজন তো ৭২-৭৫ আমলকে বলেন না ‘দালাল-শাসন’ (আলফা টোব্যাকোর বেতনভুক্ত এজেন্ট বা দালালগিরি করার কারনে)! ফরমুলা তো একই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১২ জন জেনারেল সেদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নিজেও ছিলেন একজন জেনারেল, যিনি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে আমেরিকা সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি সে দেশের ফাউন্ডিং ফাদার্সদের মধ্যে প্রথম। এদের কাউকে কিন্তু সেনাশাসক বলা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে পীরেরা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে কথায় কথায় ‘সেনা শাসক’ আখ্যা দেয়। ভাবটা এমন যে, সেনা মানেই বুঝি খারাপ কিছু? জিয়ার শাসন যদি সেনা শাসন হয়, তবে সেই শাসনে ১৯৭৯র নির্বাচনে আওয়ামীলীগ কি অংশ নেয়নি? তারা কি বিরোধী দলীয় নেতার আসন নেয়নি? তাহলে ঐ শাসনের অংশ কি আওয়ামীলীগ ছিল না? থুথু উপরে মারলে নিজে মুখেই এসে পড়ে, মিস্টার হাবিব।

স্বাধীনতার ঘোষণা না করে যুদ্ধে নেতৃত্ব না দিয়েই জাতির পিতা?
বর্তমান বাংলাদেশে সরকারী ক্ষমতার জোরে যাকে “জাতির জনক” বানাতে প্রাণান্তর চেষ্টা চালাচ্ছে, অথচ এই প্রস্তাবটি গণভোটে দিলে নিশ্চিত ফেল করবে। কারন তিনি দেশবাসীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে ‘আগে থেকে গুছাইয়া রাখা সুটকেস নিয়ে’ চলে গিয়েছিলেন বন্ধু ইয়াহিয়ার রাষ্ট্রীয় মেহমানখানায়। নামে যদিও জেলখানা, কিন্তু সেখানে তার জন্য ছিল বিশাল বাংলোতে আলাদা বাবুর্চি, লাইব্রেরি, রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া আইনজীবি ব্রোহি, আর দেশে মুজিব পরিবারের ভরণ পোষনের জন্য ১৫০০ রূপি মাসিক ভাতা, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকা।
লায়ালপুর কোর্টে ২৯ বার এফিডেভিট দিয়ে যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবীকে অস্বীকার করেছিলেন, তার উপর স্বাধীনতার ঘোষণার কঠিন কাজটি আরোপ করতে চান কেনো পীর হাবিবরা? তাই তাকে স্বাধীনতার সংগঠক বলাই সর্বোচ্চ।

বিএনপি জামায়াত সখ্যতা
জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করায় বিএনপির উপর খুব ক্ষুব্ধ পীর হাবিব! এ জন্য তিনি তারেক রহমানকে দায়ী করেছেন। কিন্তু বিএনপি কার সাথে জোট করবে আর কার সাথে করবে না, এটা তো বিএনপির বিষয়। প্রশ্ন হলো উনার দল আওয়ামীলীগ কেনো ৯৪-৯৬ সালে জামায়াতের সঙ্গে সখ্যতা, এক টেবিলে বসে সভা করা, জামায়াতের প্রস্তাবে কেয়ারটেকার সরকারের জন্য একসাথে আন্দোলন করা, এমনকি সংসদে শেখ হাসিনা নিজে ঘোষণা করেন- তিনি জামায়াতেরও নেতা! হাবিব, এসব কি? ওগুলা কি ছিল লীলা খেলা?

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
ভারতের উলফার ১০ ট্রাক অস্ত্র আসে সেদেশে যাওয়ার জন্য, সেটা তারেক রহমান এনেছিলেন অভিযোগ পীরের। ক্ষমতায় ছিল বিএনপি, তারেক রহমান জড়িত থাকলে ঐ অস্ত্র ধরা কারো বাপের সাধ্য ছিলো? উলফার নেতা পরেশ বড়ুয়া তো এখন মুক্ত, ওদের অস্ত্র তারেক রহমানের আনা কি না, সেটা পরেশের জবানবন্দী নিয়ে শোনাচ্ছেন না কেনো? ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় সন্দেহ আর অভিযোগের তীর তারেক রহমান দিকে যদি তারা দেন, তবে উনারা বলুক- কেনো সেদিন ১ ঘণ্টার নোটিশে নিরাপদ মুক্তাঙ্গণ থেকে জনসভা নিজ অফিসের সামনে নিয়ে এলেন? ঐ সিদ্ধান্তও কি তারেক রহমানের ছিল? তাহলে উনারা কেনো তারেক রহমানকে জড়িয়ে মুফতি হান্নানকে দিয়ে মিথ্যা ভিডিও প্রকাশ করলেন, আবার সেই মুফতি হান্নানই আদালতে লিখিত আবেদন করে যান- তারেক রহমানকে জড়িয়ে দেয়া জবানবন্দী ছিল পুলিশের সাজানো? তাহলে অপরাধী কে? তারেক রহমান নাকি আওয়ামীলীগ?

নির্বাসিত নেতা
বিএনপির ‘নির্বাসিত নেতা তারেক রহমান’- বলে পীর সাহের বিকৃত আনন্দ পেতে চান তো, স্মরণ করিয়ে দেই- আপনার নেত্রী শেখ হাসিনাও কিন্তু ভারতে ৬ বছর নির্বাসিত ছিলেন, তাঁর পরিবার ভারত সরকারের দাক্ষিণ্যে চলত কিনা সেটা প্রকাশ করুন, হাবিব। তাছাড়া ভবিষ্যতে আর কার কার নির্বাসনে যেতে হবে, সে তালিকা বোধ হয় হাবিব চেষ্টা করলেই জানতে পারবেন। কানাডার বেগমপাড়ায়, লন্ডন, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে কেবল বর্তমান অবৈধ কেবিনেট সদস্যরা নয়, দলের আতি পাতি নেতারাও সেকেন্ড হোম করে রেখেছেন। সময়মত দেখা যাবে দৌড় কাহাকে বলে!

তারেক রহমানের উত্থান
হাবিবের ভাষায় “যখনই তারেক রহমানের উত্থান ঘটল”….তার মানে এটাই পীরদের পেটব্যথা। তারেক রহমান কেনো বিএনপির কর্নধার হবেন__পীর সাহেবরা অন্য দলে থেকে এই প্রশ্ন করতে পারেনকি? প্রশ্ন করার আগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ নিতে হবে যে! দলের লোকজন যদি তারেক রহমানকে চায়, আপনি বা আপনারা প্রশ্ন করার কে?

আসল পেট ব্যথা
জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম রাষ্ট্রপতি মানা যাবে না, তারেক রহমানের উত্থান সহ্য করা যাবে না__পীর হাবিবদের এমন থিউরির পিছনে নিশ্চয় একটা মতলব আছে। আর তা হলো- রাষ্ট্র ক্ষমতার লড়াই। বিএনপি যেহেতু দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, নির্বাচন হলে তারাই ক্ষমতায় আসবে, তাই জিয়াকে ছোট করো, তারেক রহমানকে নানাভাবে গালিগালাজ করো_এটাই হলো হাবিব-বোরহানদের প্রোপাগান্ডার মূল কাজ। কিন্তু এসব করে কি কোনো লাভ হয়, নাকি একটা ভোটও কমে? যে যেখানে থাকার সে সেখানেই থাকে। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি পরিস্কার বিভাজিত। আর আওয়ামীলীগ তারেক রহমানকে শত্রু মনে করে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সেটা তিনি নিজ দল আওয়ামী লীগকেই জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

সামসুল আলমের ফেইস বুক থেকে

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত,  সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।

(শীর্ষ খবর ডটকম)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!