খেলার মাঠ থেকে যেভাবে ক্ষমতার মসনদে ইমরান খান!

Pakistan's cricketer-turned politician Imran Khan of the Pakistan Tehreek-e-Insaf (Movement for Justice) speaks to the media after casting his vote at a polling station during the general election in Islamabad on July 25, 2018. Pakistanis voted July 25 in elections that could propel former World Cup cricketer Imran Khan to power, as security fears intensified with a voting-day blast that killed at least 30 after a campaign marred by claims of military interference. / AFP PHOTO / AAMIR QURESHI

ভোট দেয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন ইমরান খান – এএফপি

এই রিপোর্ট লেখার সময় আনুষ্ঠানিক কোন ফল ঘোষণা করা হয়নি। তবে বেসরকারিভাবে গণনার ফলে দেখা যায় বড় ব্যবধানে জয় পেতে যাচ্ছেন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিতে আসা ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ অনানুষ্ঠানিক ঘোষণায় ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি এককভাবে ১২২টিরও বেশি আসন পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দলটির পেছনে মাত্র ৫৫টি নিয়ে রয়েছে মুসলিম লীগ-নওয়াজ।
পাঞ্জাবে ৭৫টি অ্যাসেম্বলি আসন পেয়েছে ইমরানের দল। সেখানে দুটি আসন কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নওয়াজের পিএমএল।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিষদের (এনএ) ১৪৩, ১৪৯, ১৫২, ১৫৪, ১৫৬, ১৫৭, ১৫৮, ৬, ৮, ৯, ১১, ১২, ১৪, ১৬, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩২, ৩৫, ৪১, ৪৩, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৫৯-সহ আরও কিছু আসনে এগিয়ে রয়েছে পিটিআই।

অনানুষ্ঠানিক ঘোষণায় ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি এককভাবে ১২২টিরও বেশি আসন পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দলটির পেছনে মাত্র ৫৫টি নিয়ে রয়েছে মুসলিম লীগ-নওয়াজ।
পাঞ্জাবে ৭৫টি অ্যাসেম্বলি আসন পেয়েছে ইমরানের দল। সেখানে দুটি আসন কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নওয়াজের পিএমএল।

এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২৬টি এগিয়ে রয়েছেন। মুত্তাহিদা মজলিস আমল (এমএমএ) এগিয়ে রয়েছে ১১টি আসনে ও গ্র্যান্ড ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (জিডিএ) এগিয়ে আছে ছয়টি আসনে।

বুধবার পাকিস্তান সময় সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করা হয়েছে।

পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন বলছে, জাতীয় পরিষদের ২৭২ আসনের বিপরীতে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ হাজার ৪৫৯ প্রার্থী। এরমধ্যে শুধুমাত্র পাঞ্জাব থেকেই এক হাজার ৬২৩ জন, সিন্ধ থেকে ৮২৪ জন, খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে ৭২৫ জন ও বেলুচিস্তান থেকে ২৮৭ জন। এছাড়া দেশটির দুটি আসন এনএ-৬০ ও এনএ-১০৮ এ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।

কোনো একক দল ক্ষমতায় যেতে হলে থলেতে ভরতে হবে কমপেক্ষ ১৩৭ আসন; তবেই দেশ শাসনের জন্য সরাসরি সরকার গঠন করতে পারবে। এছাড়া কোনো দলই যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে তাহলে ঝুলে যাবে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। দ্বারস্থ হতে হবে ছোট-খাট দলগুলোর; জোট গঠন করে তবেই মসনদে যেতে হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা ও পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খানকে এগিয়ে রেখেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। এক প্রতিবেদনে ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অধিনায়ক ইমরান খানই রয়েছেন এগিয়ে।

মধ্য-ডানপন্থী পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের এই প্রধান দুর্নীতিবিরোধী প্ল্যাটফর্মে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। দেশটির তিনবারের প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি নওয়াজ শরিফের রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করছেন ৬৫ বছর বয়সী ইমরান।

লন্ডনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় ও কর ফাঁকি দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-পাচার এবং বিদেশে কোম্পানি খোলার দায়ে অভিযুক্ত নওয়াজকে গত বছর দেশটির আদালত প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। ২০১৫ সালে পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নওয়াজের নাম আসার পর দেশটির আদালত তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তে অবৈধ সম্পত্তির খোঁজ পাওয়ার পর দেশটির দুর্নীতিবিরোধী আদালত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। কার্যত কোণঠাসা নওয়াজের দল যে এবারের নির্বাচনে জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হতে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিতও মিলতে শুরু করেছে।

দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে জড়িত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইমরান খান ১৯৯৬ সালে তার রাজনৈতিক দল পিটিআই গঠন করেন। ২০১৩ সাল থেকে দেশটির জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে পরিষ্কার প্রতিবাদ জানিয়ে দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান সাবেক এই ক্রিকেট তারকা।

সমালোচকরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নেমে দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন ইমরান খান। ১৯৫২ সালের ৫ অক্টোবর লাহোরে জন্ম নেয়া ইমরান খান সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইকরামুল্লাহ খান নিয়াজি ও শওকত খানম দম্পতির একমাত্র ছেলে। অক্সফোর্ডের কেবলে কলেজে ভর্তির আগে ইংল্যান্ডের আইতচিশন কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় ১৯৭১ সালে। দূরন্ত এই অলরাউন্ডার ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একেবারে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ১৯৯২ সালে দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসেন গৌরবোজ্জ্বল বিশ্বকাপ ট্রফি। দেশের হয়ে ৩৮০৭ রানের পাশাপাশি ৩৬২ উইকেট নিয়েছেন তার উজ্জ্বল ক্রিকেট ক্যারিয়ারে।

ইংলিশ কাউন্টিতে উস্টারশায়ারের হয়ে খেলা ইমরান খানের জায়গা হয়েছে আইসিসির হল অব ফেমে ২০১০ সালে। ইমরান খানের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘কাপ্তান : দ্য মেকিং অব অ্যা লিজেন্ড’ চলচ্চিত্র তৈরি হয় একই বছরে।

খেলা থেকে অবসর নেয়ার পর ইমরান খান সমাজের উন্নয়নে হাত বাড়িয়ে দেন। তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত শওকত খানম মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেন তিনি।

১৯৯১ সালে পাকিস্তানের প্রথম ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে এই ট্রাস্ট। লাইবেরিয়ার ফুটবলার জর্জ উয়িয়াহ, সেনেগালের সংগীত শিল্পী বাবা মালের মতো খেলোয়াড়ি খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন ইমরান খান। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক পারভেজ মুশাররফের ব্যাপক সমালোচনা করে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের শিরোনামে আসেন তিনি।

মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সুর নরম করে প্রগতিশীল নারীবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা করেন তিনি। এই মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবানও রয়েছে। মৌলবাদ ঘেঁষা দলগুলোর প্রতি তার নমনীয়তার কারণে অনেকেই তাকে ‘তালেবান খান’ বলেও ডাকেন। শুধু এখানেই থেমে নেই ইমরান খান, দেশটির কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে ব্ল্যাসফেমি আইন বলবৎ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। ব্ল্যাসফেমি আইনে ইসলামের সমালোচনাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

২০১৩ সালে দেশটির সাধারণ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ব্যাপক প্রতিবাদের ডাক দেন ইমরান। মাত্র ১৯ শতাংশ ভোট পায় ইমরানের পিটিঅাই। এর কিছুদিন পরে পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাম আসার পর দুর্নীতির মাধ্যমে গড়া পিএমএল-এনের এই নেতার অবৈধ সম্পত্তির ফৌজদারি তদন্ত দাবি করেন ইমরান।

এছাড়াও প্রতিবেশী আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও ড্রোন ব্যবহারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ইমরান খান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, ট্রাম্প পাকিস্তানের ইতিহাস এমনকি আফগানিস্তানের জনগণের চরিত্র বোঝেন না।

ব্যক্তিগত জীবনে ইমরান খানের যশ রয়েছে প্লেবয় হিসেবে। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমিমা গোল্ডস্মিথ ১৯৯৫ সালে বিয়ে করার কারণেও ব্যাপক অালোচনায় ছিলেন তিনি। ধর্ম ত্যাগ করে জেমিমা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৪ সালে। জেমিমা-ইমরানের সংসারে ছিল দুই সন্তান। ব্রিটিশ এক ট্যাবলয়েডে অভিনেতা হাগ গ্রান্ট ও রাসেল ব্র্যান্ডের সঙ্গে জেমিমার সম্পর্কে জড়িয়ে খবর প্রকাশ হওয়ার পর ইমরানের সংসারে টানাপড়েন শুরু হয়।

জেমিমা ছাড়াও ব্রিটেনের আরেক সাংবাদিক ও বিবিসির সাবেক উপস্থাপিতা রেহাম খানকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু তাদের এই সংসার টিকে মাত্র ১০ মাস। পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক গুরু ও পাঁচ সন্তানের জননী বুশরা মানিকাকে বিয়ে করেন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!