নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ইসি সচিবের সঙ্গে গোপন বৈঠক প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের

“পুলিশ সূত্রের খবর : ৩৩টি সিট নৌকার কনফার্ম, ৬০-৬৫টিতে কনটেস্ট, বাকি সিটগুলোতে নৌকার সম্ভবনা নেই”“কাজেই সাংঘাতিক কিছু করা ছাড়া উৎরানো যাবে না”
২০ নবেম্বর মঙ্গলবার রাতে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের চতুর্থ তলার পিছনের কনফারেন্স রুমে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা গোপন মিটিং করেছেন বলে দাবি করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী করতে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে প্রতিনিয়ত গোপন বৈঠক চলছে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ধরপাকড় বাড়ানো হবে, প্রার্থী গুম-খুন করে এমন অবস্থা তৈরি করা হবে যেন, নির্বাচন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হই। গতকাল শনিবার নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বিএনপি নেতা রিজভী।
রিজভী বলেন, পুলিশের বিতর্কিত ও দলবাজ কর্মকর্তারা জনসমর্থনহীন আওয়ামী লীগকে ফের ক্ষমতায় বসানোর জন্য নানা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। গত ২০ নবেম্বর মঙ্গলবার রাতে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের চার তলার পিছনের কনফারেন্স রুমে এক গোপন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব সাজ্জাদুল হাসান, জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমদ, নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দীন আহমদ, পানিসম্পদ সচিব (শেখ হাসিনার অফিসের প্রাক্তন ডিজি) কবির বিন আনোয়ার, বেসামরিক বিমান পরিবহন সচিব মহিবুল হক, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও মহানগরী রিটার্নিং অফিসার) সদস্য সচিব আলী আজম, প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ (বিচারক কাজী গোলাম রসুলের মেয়ে) কাজী নিশাত রসুল। এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব, ডিএমপি ও কাউন্টার টেররিজমের কর্মকর্তারা। রাত সাড়ে ৭টা থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এ মিটিংয়ে সারাদেশের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সেট-আপ ও প্ল্যান রিভিউ করা হয়। ডিআইজি হাবিব জানায়, পুলিশ সূত্রের খবর অনুযায়ী ৩৩ টি সিট নৌকার কনফার্ম আছে এবং ৬০-৬৫ টিতে কনটেস্ট হবে, বাকী আর কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজেই সাংঘাতিক কিছু করা ছাড়া এটি উৎরানো যাবে না।
তিনি বলেন, বিস্তারিত আলোচনা শেষে মূল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, নির্বাচন কমিশন থেকে বিএনপি-ফ্রন্টকে চরম অসহযোগিতা করা হবে, যতই চাপ দেয়া হোক প্রশাসনে হাত দেয়া যাবে না, ধরপাকড় বাড়ানো হবে, প্রার্থী গুম-খুন করে এমন অবস্থা  তৈরী করা হবে যাতে তারা নির্বাচন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেটির আলামত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে যশোর জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি ও বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী আবু বকর আবুকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে।
বৈঠকে আরও বলা হয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি শেষ পর্যন্ত ভোটে থেকে যায় তাহলে ভোটের দিন পর্যন্ত ধরপাকড়ের তাণ্ডব চালানো হবে নির্দয়ভাবে, যেনো ভোট কেন্দ্রে কেউ হাজির হতে সাহস না করে। আর যদি ধানের শীষের অনুকূলে ভোটের হাওয়া ঠেকানো না যায়, তবে মিডিয়া ক্যু করে নৌকাকে জিতানো হবে, বিটিভির মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করে সব মিডিয়াতে তা রিলে করার ব্যবস্থা করা হবে। একবার ফল ঘোষণা করতে পারলে তারপরে নির্মমভাবে সব ঠাণ্ডা করা হবে।
এরপর থেকে এ ধরনের সভা খুব বেশি করা যাবে না, তবে কনসালটেশন করে কাজ করা হবে। এছাড়াও উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির নামে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ৮ জন আওয়ামী দলীয় কর্মকর্তা দিয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে পুলিশ সদর দপ্তর। এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান ৪৫ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ৬৪ জেলার উপদেষ্টা (মেনটর) নিয়োগ করে একটি নজিরবিহীন সরকারি আদেশ জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ নিয়ে বিএনপির লিখিত আপত্তির  প্রেক্ষিতে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু গোপনে ঐসব কর্মকর্তারা জেলায় জেলায় মনিটরিংয়ের কাজ এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। এর বাইরে সারাদেশের ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা প্রথম তালিকার ৬ জন সচিবকে নিয়ে একটি গুপ্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে। মুলত এখানে সব ধরনের অফিসারদের গমনাগমন ঘটে থাকে, তাই বিরোধী পক্ষের চোখ এড়ানো সহজ হবে মনে করে অফিসার্স ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সভাটি বসে।
বিএনপির সিনিয়র এই নেতা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীনরা আসন্ন ভোট নিয়ে কি ভয়ঙ্কর পরিকল্পনায় মেতে উঠেছে। উপরোক্ত দলবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও কর্মকাণ্ড সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাচন কমিশনকে লিখিত আকারে জানানো হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সরকারের এজেন্ডা নির্বাচন কমিশন কখনো প্রকাশ্যে কখনো নীরবে-নিভৃতে বাস্তবায়ন করছে-এই অভিযোগ এখন সর্বত্র ভুরি ভুরি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিরসন করতে সক্ষম হয়নি। মোদ্দাকথা তফসিল ঘোষণার পরও আওয়ামী প্রশাসনিক দাপটের ছবিটা মোটেও বদলায়নি। কিন্তু কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে কতিপয় কমিশনার তাদেরকে স্বপদে বহাল রাখতে তৎপর। নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে কাজ করছে বলেই এই অভিযোগগুলো থেকে ছিটকে আসা কাদা তারা ঠেকাতে পারে না। বিতর্কিত নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্বাচনী কর্মকা- থেকে সরাতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে তাদেরকে প্রত্যাহার করতে হবে।
গ্রেফতার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরী সাবেক সংসদ সদস্য। এজন্য তিনি কারাগারে কারাবিধি অনুযায়ী ডিভিশন পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তাকে আটক করার পর প্রথমে ডিভিশন দেয়া হলেও শুক্রবার তা বাতিল করে সাধারণ কয়েদিদের সাথে আমদানি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। কারাগারেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্যাতনের মুখে রাখতে হবে, এটাই হচ্ছে এই সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। সেই কারণে মানসিক ও শারীরিকভাবে যন্ত্রণা দিতেই কারাগারে গিয়াস কাদের চৌধুরীর ডিভিশন বাতিল করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্যই আইনি প্রক্রিয়ার নামে বার বার হয়রানি করা হচ্ছে। হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করার পরও  সেই আদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছে সরকার পক্ষ। উদ্দেশ্য টুকুকে আটকিয়ে রাখা, যাতে সে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে।
রমনা থানা ছাত্রদল নেতা মোঃ জুয়েল রানাকে গত ২১ নবেম্বর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ, এখনও তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার পরিবারসহ দলের নেতাকর্মীরা চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। অবিলম্বে তাকে জনসম্মুখে হাজির করে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
ঢাকা মহানগর উত্তরের খিলক্ষেত থানাধীন ৪৮ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হক ভূঁইয়াকে গতকাল সকালে গ্রেফতার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ।  এছাড়া রুপনগর থানা যুবদলের সহ-সভাপতি মোঃ ফখরুল ইসলাম শিপু, প্রচার সম্পাদক মোঃ জাহাঙ্গীর বিশ্বাস, যুবদল নেতা শাহজাহান সিকদার, মিন্টু মিয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোঃ আলাউদ্দিনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আমি গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।
কিশোরগঞ্জ জেলা কয়েকদিন আগে ভৈরবে বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ একটি উঠোন বৈঠক চলাকালে পুলিশের সহায়তায় আওয়ামী ছাত্রলীগ-যুুবলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে নেতাকর্মীদের গুরুতর আহত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্টো পুলিশ বাদী হয়ে গত ১৯ নবেম্বর ৪৮ জনকে জ্ঞাত ও ৩৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা দায়ের করেছে। একই ঘটনায় গতরাতে  ভৈরবে যুবলীগের পৌর সভাপতি বাদী হয়ে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ৯৮ জনকে জ্ঞাত ও ১০০ জন নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামী করে আরেকটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। বিএনপি নেতা জামাল ডাক্তার ও আলমগীর মেম্বারসহ ইতোমধ্যেই পাঁচজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কয়েকদিন থেকেই পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালাচ্ছে। বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী শরিফুল আলমসহ নেতাকর্মীরা এখন এলাকাছাড়া।  বিএনপির শান্তিপূর্ণ উঠোন বৈঠকে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা হলেও উল্টো বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও  ভৈরব পৌর যুবলীগের সভাপতি বাদী হয়ে মামলা দায়েরের ঘটনার আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এই সকল বানোয়াট ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি করছি। পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশী তল্লাশি বন্ধেরও জোর দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া, হাবিবুর রহমান হাবিব, কেন্দ্রীয় নেতা মুনির হোসেন, শরীফুল আলম, আবদুল আউয়াল খান, হারুনুর রশীদ, আশরাফউদ্দিন বকুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!