নির্বাচন কমিশন কেন বিতর্কিত ভুমিকায়?

একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের মুল কাজই হলো একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। এই কাজটি করার জন্য সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে কমিশনকে যথেষ্ট সহযোগিতাও দেয়া হয়েছে। জনগন প্রত্যাশা করে যে সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে এবং স্বাধীনভাবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাবে। তবে বাংলাদেশের চিত্র পুরোটাই বিপরীত। বিগত কয়েক বছর ধরে আওয়ামী সরকারের আমলগুলোতে যে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলো হয়েছে সেখানে নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা ছিল সরকারের হাতের ইশারায় নৃত্য করা পুতুলের মতই। ফলে সাম্প্রতিক কোন নির্বাচনই জনগনের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি।

আগামী ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে একাদশ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে একটি রাজনৈতিক তথা দলীয় সরকারের অধীনে। তাই জনমনে সন্দেহ এই নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হবে কিনা নাকি বিগত বছরগুলোর মতই একটি প্রহসন হয়ে রবে। সর্বশেষ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোর পর নির্বাচন কমিশনের উপর মানুষের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়। খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটে সিটি নির্বাচনে স্মরনাতীতকালের মধ্যে ভয়াবহতম ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় বিএনপি বরাবরই নির্বাচন নিয়ে তাদের আশংকার কথা ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বরাবরই জানিয়েছে নির্বাচন নাকি সুষ্ঠুই হবে। সর্বশেষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে শেখ হাসিনার যে সংলাপ হয় সেখানে ফ্রন্টের দাবী অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করেন সরকারী দলের নেতারা। তবে তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এই সব রাজনৈতিক হিসেব নিকেষের বাইরে নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই তার ভুমিকাকে প্রশ্নের উর্ধ্বে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও তাদের কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজ করার কথা নয়, কিন্তু তারপরও কমিশন প্রথম প্রশ্নবিদ্ধ হয় যখন সংলাপ চলাকালেই ৮ নভেম্বর তাড়াহুড়ো করে নির্বাচন কমিশন ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসীল ঘোষণা করে। রাজনৈতিক দলগুলো সেটা মানতে না পারায় তারা পরে আবার এক সপ্তাহ পিছিয়ে নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারন করে। বিরোধী দলগুলো আরো ৩ সপ্তাহ পেছানোর দাবী নিয়ে আবারও কমিশনকে অনুরোধ করেছে। প্রশ্ন হলো, তফসিল ঘোষনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই অহেতুক তাড়াহুড়োর কারন কি? এর পেছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংলাপ প্রক্রিয়াকে কেন তারা বাঁধাগ্রস্ত করলো?

যা হোক, তফসিল ঘোষনার পরপরই ৯ নভেম্বর থেকে আওয়ামী লীগ তাদের ধানমন্ডিস্থ কার্যালয় থেকে মনোয়ননপত্র বিতরন ও বিক্রি কার্যক্রম শুরু করে। নির্বাচন বিধির পরিস্কার লংঘন করে আওয়ামী মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিরাট সব শোডাউন করে ধানমন্ডি কার্যালয়ে এসে মনোনয়ন সংগ্রহ করে। এতে গোটা শহর জুড়েও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। তারপরও তারা নির্ভিগ্নেই কাজটি সম্পাদন করে।

একইভাবে বিএনপি তার নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে মনোনয়ন পত্র বিতরণ ও বিক্রি শুরু করে ১২ নভেম্বর। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও নানা ধরনের মিছিল নিয়ে এসে উৎসবপূর্ন পরিবেশে মনোনয়ন সংগ্রহ করে। এই কার্যক্রম চলাকালে ১৩ নভেম্বর হঠাৎ করেই নির্বাচন কমিশন আচরন বিধি লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চিঠি দেয়। ১৪ নভেম্বর বিএনপি অফিসের সামনে বিপুল সংখ্যক আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়। সেদিন বিএনপির নেতাকর্মীর সাথে পুলিশের ব্যপক সংঘর্ষ হয়। বেশ কয়েকজন পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মী এই ঘটনায় আহত হন। নিপুন রায়সহ বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মীকে ৫ দিনের রিমান্ডেও নেয়া হয়।

এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে, নির্বাচন কমিশন কি আদৌ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে? তারা কি কারও উপর বিরাগভাজন হয়ে কোন কাজ করছে? একটি দলকে ঝামেলামুক্তভাবে কাজ করতে দিয়ে আরেক দলের একই কর্মকাণ্ডের সময় কেন পুলিশ দিয়ে হয়রানি? কেনই বা প্রশাসনকে চিঠি? আগে কেন এই চিঠিটি দেয়া হলোনা?

নির্বাচন কমিশনের কাজ হলো একটি সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করা। ১০০ ভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন পৃথিবীর কোথাও হয়না বা বাংলাদেশেও হবেনা- এটা বলা তাদের কাজ নয়। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম সম্প্রতি এই ধরনের একটি মন্তব্য করে সবমহলে সমালোচিত হয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা কমিশনাররাই যখন এহেন মন্তব্য করেন তখন সাধারন ভোটাররা অনেকটাই দ্বিধায় পড়ে যায়। এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদাও ৭ আগষ্ট বলেছিলেন যে নির্বাচনে কোন অনিয়ম হবেনা- এটা তিনি গ্যারান্টি দিতে পারবেন না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই সরকারের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠানের মতই কথা বলছে। তাদের উচিত ছিল সকল দলকে আস্থায় নিয়ে নির্বাচন করা। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রথম থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য কোন উদ্যেগ নিতে রাজী ছিলেন না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মুল কর্তা হিসেবে তার এহেন দলীয় মানসিকতা কাম্য নয়। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনটিও কতটা দলীয় মানসিকতার বাইরে যাবে আর এই সব অযোগ্য কমিশনাররাই বা কতটা গনমানুষের পক্ষ নিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ভুমিকা পালন করবেন- সেটা নিয়ে আশংকা থেকেই যাচ্ছে।

তাছাড়া এত অকর্মন্য নির্বাচন কমিশন এর আগে বাংলাদেশে কখনো দেখাও যায়নি। তফসিল ঘোষনা দেয়া হয়েছে অথচ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বা লাইসেন্স করা অস্ত্র থানায় জমা দেয়ার কোন সার্কুলারও এখনো জারি হয়নি। প্রচারনার সময় শুরুই হয়নি। অথচ প্রতিটি রাস্তাঘাট, পাড়া মহল্লার মোড় পোস্টারে আর ব্যানারে ছেয়ে গেছে। গতকাল পোস্টার সরানোর নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। ইসি সচিব বললেন, ৯০ শতাংশ পোস্টার নাকি সরানো হয়েছে। জানিনা, ইসি সচিব বা কমিশনাররা কোন শহরে থাকেন। ৯০ শতাংশ পোস্টারই এখন আগের মতই ঝুলছে। প্রার্থীরা নির্বাচন বিধি লংঘন করছে ইচ্ছেমত। পুলিশ বা প্রশাসনের উপর নির্বাচনকালীন সময়ে শত ভাগ নিয়ন্ত্রন থাকার কথা ইসির, কিন্তু প্রশাসন পরিচালনায় তাদের অসহায়ত্ব দিবালোকের মত স্পষ্ট। এরকম একটি অকার্যকর নির্বাচন কমিশন নিয়ে আর যাই হোক গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

উৎসঃ   অ্যানালাইসিস বিডি

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!