নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের গণগ্রেফতারের অভিযোগ:আল-জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশে বহু প্রত্যাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র একসপ্তাহ ও প্রধান বিরোধীদল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতারের অভিযোগ তুলেছে। নভেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরেও তাদের প্রায় সাতহাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সোমবার এ অভিযোগ জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। জোটটি অভিযোগ এনেছে যে, তারা পুলিশ ও শাসক দল আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দ্বারা সহিংস আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। তাদের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও কর্মীরা বার বার হামলার শিকার হচ্ছেন। ফলে, তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে সমাবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত শোচনীয় নির্বাচনকালীন অবস্থা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২২শে ডিসেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দমনমূলক আখ্যায়িত করে সংস্থাটি বলেছে, এর ফলে আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যাপক নজরদারি ও বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনের মতো নানা কর্তৃত্ববাদী আচরণ একটি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি রোববার তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ৫৪টি সংবাদ ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দলটির প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে থাকায় তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি এ রায়কে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন। বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদু অভিযোগ করেছেন, বিরোধীদল হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। কিন্তু এর জন্য ন্যূনতম স্বাধীনতা দরকার, যা বর্তমানে নেই। আমরা প্রচারণা চালাতে পারছি না। আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে।

বিএনপি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল। এবারো তারা অভিযোগ করছে, পুলিশ শাসক দলের হয়ে কাজ করছে। দুদু বলেন, যদি কাল থেকে মাঠে কোনো পুলিশ না থাকে তাহলে নির্বাচন আরো বেশি অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। পুলিশের একমাত্র কাজ নির্বাচন থেকে বিরোধী নেতাদের সরিয়ে দেয়া। ঢাকা-৯ আসনের বিরোধী প্রার্থী আফরোজা আব্বাসের ওপর হামলার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, তার সমাবেশকে লক্ষ্য করে লাঠি ও ইট-পাটকেল দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে। ১২ ডিসেম্বর তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি চারবার হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, আমি হামলার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ নির্বাচন কমিশনারদের দেখিয়েছি। তারা বলেছেন, পুলিশকে এ জাতীয় হামলা ঠেকাতে ভালোভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু হামলা চলছেই। আমার ড্রাইভার সর্বশেষ হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। তার ২২টি সেলাই লেগেছে। একইসঙ্গে, এসব হামলার জন্য কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

তবে বিরোধীদলের তোলা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের প্রতি ওপর থেকে আইন অনুযায়ী কর্তব্য পালন করার বিষয়ে সপষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হলে তার প্রতিটা অভিযোগ তদন্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল সোহেল রানা। তিনি বলেন, আমরা অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারি না। যদি কোথাও কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। নির্বাচনী সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ছয়জন নিহত হয়েছেন। সোমবার দেশজুড়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল হোসেন এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। আল-জাজিরা নির্বাচন কমিশন ও শাসক দলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় নি। অ্যাসিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল) এর পর্যবেক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভিসা না দেয়ায় তারা তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়। এ নিয়ে শুক্রবার, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বাংলাদেশ সরকারের প্রতি হতাশা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিবৃতিতে বাংলাদেশ মর্মাহত।

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেছেন, ঘটনাটি পরসপরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নকারীরা যদি বাংলাদেশের এ আচরণকে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ইচ্ছার অভাব হিসেবে দেখে থাকেন, তবে আমি অবাক হব না। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারই সবথেকে কম বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন। তিনি আরো বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতি, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী ও প্রার্থীদের গণগ্রেফতার এবং শাসক দলের কর্মীদের সহিংসতার দায় থেকে মুক্তি দেয়ায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিশুদ্ধতা ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

আল জাজিরা

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!