নারী অধিকার- বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী: সাবিনা আহমেদ

 

ব্যক্তিগত আর পারিবারিক দিক থেকে আমি ছোটবেলা থেকেই কনজারভেটিভ। তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বুয়েটের এডমিশান নিয়ে বসে আছি, ক্লাস শুরুর অপেক্ষায়। কোন এক রোগের কারণে এক চিকিৎসকের কাছে আম্মা আমাকে নিয়ে যেতেন। ডাক্তার দেখতে একেবারে ওসামা বিন লাদেনের মত ছিলেন। পরনে সবসময় লম্বা পাঞ্জাবী আর মুখে লম্বা দাড়ি।

চিকিৎসা চলাকালে উনি টূকটাক প্রশ্ন করে আমার সম্বন্ধে জানতে চাইতেন। জানালাম আমি অংক আর বিজ্ঞানে যেমন ভালো সাহিত্য সংস্কৃতিতে তেমন না। মানুষ যেমন মজা পেতে গল্পের বই পড়ে, আমি তখন মজা পেতে বিজ্ঞানের বই পড়ি। গনিতের প্রবলেম দেখলেই তাকে সল্ভ করতে বসে পড়ি। বলতে পারেন গিক টাইপের একজন মেয়ে।

আমিও কৌতূহল বসত পালটা প্রশ্ন করতাম। সাধারণত এত ধার্মিক ছেলেরা মেয়েদের সাথে আলোচনা করেনা, গল্প তো দুরের কথা। তাই এই সুযোগে জানতে চাইতাম জীবন নিয়ে ওনার চিন্তা ভাবনা।

আমাকে জানালেন ওনার ঘরে কোন খাওয়ার টেবিল নাই, সবাই সুন্নতি কায়দায় মাটিতে বসে। বিয়ের পর বউ চাকুরি করবে না। স্ত্রী বাচ্চাকাচ্চা পালবে আর স্বামী সংসার দেখবে। আর পুরাদস্তুর হিজাব তার জন্য অপরিহার্য, একেবারে নেকাব সহ।

তবে বিয়ে করবেন আমার মতন ক্যালিবারের একজন মেয়ে। বললাম আমার মতন মেয়ে হলে তাকে তো ঘরে আটকে রাখা কষ্টকর হবে। তাতে সংসারের শান্তি চলে যাওয়ার রিস্ক আছে। জানালাম আপনি তাকেই বিয়ে করুন যেই মেয়ের জীবনের আশা আকাংখা আপনার সাথে মিলে, তাহলেই সুখি হবেন। আমার মতন মেয়েরা হাড়ি আর রকেট দুইই একসাথে ঠেলতে চায়। চাকুরি আর সংসার দুই এক সাথে করতে চায়। অফিসের বস, আর বাসায় স্ত্রী-মা-বউ সব একসাথে হতে চায়।

তবে কেন আমার ক্যালিবারের মায়ে বিয়ে করতে চায় জিজ্ঞেস করলে ব্রিলিয়ান্ট একটি উত্তর দিলেন। বললেন, ” তোমার ছেলেরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে, দুনিয়া কাঁপাবে, আর আমার ছেলেরা মিডিওকার হয়ে জন্ম নিয়ে অপরের তলে থাকবে, তা হবে না। আমি তোমার মতন একজন ব্রিলিয়ান্ট মেয়েকেই বিয়ে করতে চাই, যাতে আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ব্রিলিয়ান্ট হয়।”
ফেয়ার এনাফ। আমি এক ধরনের জানার আগ্রহ থেকেই ওনার সাথে আলোচনা চালাতাম। এমন উদাহরণ দিয়ে কথা বলতাম যা ওনার পক্ষে বুঝতে সুবিধা। দেখতে চাইতাম কার মত কে বদলায়।
বললাম বিবি খাদিজা (রাঃ) এর কথাই ধরুন। উনি নিজের ব্যবসার মালিক ছিলেন। এখনকার যুগের সাথে তুলনা করলে উনি ছিলেন নিজ কোম্পানির সিইও। নিজের থেকে ১৫ বছরের ছোট মুহম্মদ (সঃ) কে নিজ কোম্পানিতে নিয়োগ দিয়ে পরে নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বিয়ে করেছিলেন। যেন একেবারে উনিবিংশ শতাব্দীর মেয়ে। উনি ব্যবসা করতে পারলে এখনকার মেয়েরা চাকরি-ব্যবসা করতে পারবে না কেন?

আরবে যখন বহুবিবাহ নর্মাল একটা ব্যাপার তখন বিবি খাদিযা (রাঃ) যতদিন বেচে ছিলেন নবীজি দ্বিতীয় বিয়ে করেন নাই। কতটা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থাকলে নবীজি বহুবিবাহ থেকে বিরত ছিলেন একবার ভাবুন। এও বললাম আপনি কি জানেন নবীজি বিবি খাদিজাকে এতট শ্রদ্ধা করতেন যে ওনার বান্ধবীরা আসলে নবীজি উঠে দাঁড়াতেন? শেষ কবে এদেশের ছেলেরা নিজ স্ত্রীকে এতটা শ্রদ্ধা জানিয়েছে বলেন তো?এবার বিবি আয়েশার (রাঃ) এর কথা ধরুন। ইসলামের প্রায় ৩০% হাদিস আয়েশা (রাঃ) থেকে এসেছে। এইসব হাদিস কেবল বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা আর স্ত্রীদের কর্তব্যের উপরে নয়, বরং অর্থনীতি, আইন, চিকিৎসা, সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের উপরে এসব হাদিস। অনেকেই ওনার কাছে আসতো হাদিস শুনতে, তার ব্যাখ্যা জানতে। উনি রীতিমত ক্লাস নিতেন নিজ বাড়িতে, আর দূরে কোন এক সাহাবার বাড়িতে। সেই হিসাবে উনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, বিশ্লেষক, বিদুষী একজন বুদ্ধিজীবী।

ইসলামিক ইতিহাসে এমন প্রায় ৮০০০ নারী স্কলার ছিলেন, যারা কেবল ঘর সংসার করেন নাই, বরং জ্ঞান বিতরন করেছেন, ক্লাস নিয়েছেন। ইসলামিক জুরিস্প্রূডেন্স তৈরিতে সাহায্য করেছেন। তাহলে এখনকার নারীদের বুদ্ধিজীবী হতে, শিক্ষিকা হতে ধর্মীয় দিক থেকে বাঁধা কোথায়?
হযরত মুহম্মদ (সঃ) থেকে যাবতীয় শিক্ষা মেয়েদের বেশী শেখার সুযোগ ছিল। এক বাইরে, সেইসময় মেয়েদের মসজিদে গিয়ে জ্ঞান আহরনে কোন বাঁধা ছিল না, আর দ্বিতীয়ত ওনার বাসায়, যা পুরুষদের জন্য এলাউড ছিল না। বিবি আয়েশাতো ওনাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলতেন, অথচ তিনি ছিলেন নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। তো নবীজি যে মেয়েদের এত এত শিক্ষা দিয়ে গেলেন তা কি কেবল হাড়ি ঠেলে বাচ্চা কাচ্চা বড় করার জন্য? আমার মতে না। মেয়েদের একটি সমাজে বিশাল ভূমিকা আছে তার জন্যই এই ব্যবস্থা উনি করেছিলেন। জানো , জানাও, ব্যবস্থা নাও। পিছনে পড়ে থেকো না।

দাতব্য, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নারীদের ভূমিকা ইসালামে অনস্বীকার্য। একেবারে স্বল্প কিছু উদাহরনঃ

– ৭৬৬ খ্রিষ্টাব্দে যাত্রীদের সুবিধার জন্য বাগদাদ থেকে মক্কার পথে পথে পানির কূপ আর সরাইখানা স্থাপনের বিশাল প্রজেক্টটি হাতে নিয়ে শেষ করেছিলেন একজন নারী, যার নাম জুবাইদা খাতুন। ইনি খলিফা হারুন উর রশিদের স্ত্রী ছিলেন।

– ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন চলমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মরক্কোর একজন মুসলিম নারী, নাম ফাতেমা আল-ফিহরি।

– ৯৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সিরিয়ার হালেবে একজন বিখ্যাত এস্ট্রোলোব বা কম্পাস মেকার ছিলেন, নাম মরিয়ম আল-ইজলিয়া। ওনার বানানো এস্ট্রোলোবের ডিজাইনগুলি এত জটিল এবং উদ্ভাবনী ছিল যে তিনি শহরের শাসক সাইফ আল দাউলা কর্তৃক চাকুরীতে নিযুক্ত ছিলেন। (আমি তো দেখি এনার গোত্রের  )

– ৯৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সুতাইতা আল-মহামালি নামক একজন ব্রিলিয়ান্ট মুসলিম নারী ছিলেন। যিনি একধারে ছিলেন অঙ্ক শাস্ত্রবিদ, অন্যদিকে হাদিস শাস্ত্র আর ইসলামিক আইন বিশেষজ্ঞ। It is said also that she invented solutions to equations which have been cited by other mathematicians, which denote aptitude in algebra. (আমিও ওনার মতন অংক ভালবাসি  )
– ১২৩৭ থেকে ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিরিয়ার হালেব (এলোপ্পো) এর রানি ছিলেন দায়ফা খাতুন। তিনি বিচারক, পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাদের প্রচেষ্টার সমর্থনে অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত দানবান ছিলেন আর নগরবাসির উপর থকে অনেক ট্যাক্স তুলে নিয়েছিলেন। ইসলামের সেই স্বর্ণযুগে তিনি ছিলেন প্রচন্ড ফরোয়ার্ড থিঙ্কিং একজন নারী শাসক।

অল্প কিছু উদাহরন, কিন্তু বিশাল একেকজন পথপ্রদর্শক। তাহলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোন অজুহাতে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার জন্য পুরুষদের এত প্রচেষ্টা আর আলোচনা? আমাদের পূর্বপুরুষ, যাদের আমলে মুসলিমদের জয়জয়কার, ইসলামিক সভ্যতা সভ্যতার স্বর্ণ শিখরে, তখন তারা নারীদের কাজে লাগিয়েছিলেন, নারীদের অবদান গ্রহন করেছিলেন। তাহলে এখন বাঁধা কোথায়? আমার মতে মেয়েদের বাইরে বেরুনোর যেসব বাঁধা মানুষ আবিষ্কার করেছে তা নিছক পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা।

জানেন কি, মুসলমানেরা কখন থেকে মেয়েদের দুর্বল, অবলা, পাপাচারী, বোকা ইত্যাদি ভাবা শুরু করেছিল? মুসলিম স্কলাররা যখন গ্রীক ফিলোসফি পড়া আর অনুবাদ করা শুরু করেছিল তখন থেকে। গ্রীক ফিলোসফার অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন নারীরা পুরুষদের চাইতে নিকৃষ্ট, এই কারণে পুরুষ হবে শাসক আর নারী হবে তার প্রজা।

এর আগ পর্যন্ত মুসলিম নারীরা অনেক স্বাধীনতাই ভোগ করত, বিশেষত সেইসব স্বাধীনতা যা ইসলাম নারীদের দিয়েছিল সেই ১৪০০ বছর আগেই। সম্পত্তির অধিকার, ডিভোর্সের অধিকার, সাক্ষ্য প্রদানের অধিকার ইত্যাদি। কালের গর্ভে তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে কোন কোন দেশে। অনেক মুসলিম প্রধান দেশের পুরুষ ঐ গ্রীক ফিলোসফারদের মতই বিশ্বাস করে নারীরা বোকা, ইনফেরিওর, তাদের অবস্থান কেবল ঘরের মধ্যে।

তাই তো তালেবান, আইসিসের মতন চরমপন্থি মুসলমানেরা মনে করে মেয়েদের জন্য শিক্ষা হারাম। মেয়েরা কেবল চুলা সামলাবে আর বাচ্চা পয়দা করবে। মেয়েরা বোরখা পড়ে ভিক্ষা করতে পারবে, কিন্তু শিক্ষক-ডাক্তার পর্যন্ত হতে পারবে না। সব দেখি একেকজন এরিস্টটল!!

উৎস:

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!