ধানের শীষে ভোট করায় দলে সংকট হবে না:সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট করাটা তার দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। এভাবে ভোট করলে দলের কোনো সংকট হবে না। তিনি বলেন, যেসব আসনে জোটগতভাবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট করছি সেখানকার বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করছি। আবার আমরা যেখানে ছাড় দিয়েছি সেখানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করছে। তাই আমাদের এবং বিএনপির ভোটার, কর্মী ও সমর্থকদের চিহ্নিত করতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এ কথা বলেন তিনি। তার কাছে প্রশ্নগুলো পাঠালে লিখিতভাবে উত্তর পাঠান। প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনেও কথা হয়েছে ডা. শফিকুর রহমানের। তিনি ঢাকা-১৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করছেন।

ধানের শীষে প্রার্থী হওয়াতে সাংবিধানিক কোনো সংকট হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন— না, তা হবে না। নির্বাচনে জনগণের কাছে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি কী জানতে চাইলে বলেন, জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার আজ ভূলুণ্ঠিত। গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নারী-শিশু নির্যাতন, নৈতিক অবক্ষয় এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, অপসংস্কৃতির সয়লাব, নীতি-স্বজনপ্রীতি, লুটপাট, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক নিপীড়ন, প্রতিহিংসা, বিরাজনীতিকরণ, মিথ্যাচার, অনৈক্য-বিভক্তি, হামলা, মামলার কারণে জনগণ এখন শান্তিতে নেই। সংখ্যালঘুদের সম্পদ ও সরকারি সম্পত্তির জবরদখল, সন্ত্রাস ও শ্রমিক নির্যাতন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেটে সীমাহীন লুটপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈরাজ্য এবং চাঁদাবাজিতে দেশ যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আজ নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত। এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী একটি দায়িত্বশীল ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে মনে করে জনগণের ভোটে সৎ ও যোগ্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এ সংকট সমাধান সম্ভব। সে লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জনগণের দোয়া, ভালোবাসা ও জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জনগণের ভোটে জামায়াত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

নির্বাচিত হলে ঢাকা-১৫ আসনে জনগণের জন্য আপনার ভূমিকা কেমন হবে? ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা-১৫ (মিরপুর-কাফরুল) এলাকা আমাদের দেশেরই একটি সংসদীয় আসন। এটিকে অন্যান্য আসন থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব কাজই হবে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক। সামর্থ্য ও প্রয়োজনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সামর্থ্যের বাইরে কোনো কিছু করা সম্ভব নয় এবং আমরা জনগণের কাছে সে প্রতিশ্রুতিও দিই না। তবে একথা সত্য যে, ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসন অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত রাজধানীর একটি এলাকা। এ এলাকায় বিপুলসংখ্যক পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য কারখানা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন সুবিধা নেই। এমনকি কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশও উন্নত নয়। বিশেষত পোশাক শ্রমিকরা অধিকাংশই নারী হওয়ায় তারা অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে নিরাপদবোধ করেন না। তাই তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা জরুরি। যুব সমাজকে বাঁচাতে মাদক সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরি, গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, যুবসমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বিত করা হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে।

তরুণ ভোটার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারিগর হলো যুবসমাজ। যুবসমাজকে সম্পদে পরিণত করতে ভিশনারি পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কর্মবিমুখ শিক্ষা, অপসংস্কৃতি ও তথ্য-প্রযুক্তির বিরূপ আগ্রাসন যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ জন্য আমাদের আন্দোলন হলো ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। তাই আমাদের সব কর্মসূচিই হচ্ছে সর্বজনীন। আজকের তরুণরাই যেহেতু আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, সেহেতু ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য দেশে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, যুবসমাজের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টিতে আমরা অগ্রাধিকার দেব। যুবসমাজের শারীরিক ও আত্মিক বিকাশ এবং আত্মসচেতন করে তোলার জন্য ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতনতা, সুস্থধারার সংস্কৃতি ও বিনোদন এবং ক্রীড়াচর্চাকে উৎসাহিত করা হবে।

ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানান, ১৯৮৩ সালে সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি ডা. আমিনা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয়। অষ্টম জাতীয় সংসদের সদস্য  ছিলেন।  ২ মেয়ে ও ১ ছেলে। প্রথম মেয়ে এফসিপিএস (কার্ডিওলজি) অধ্যয়নরত এবং একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। অপর মেয়ে এমবিবিএস ও পাবলিক হেলথে মাস্টার্স সম্পন্ন করে একটি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করছেন। একমাত্র ছেলে এমবিবিএস চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ সভাপতি ও সিলেট শহর শাখা সভাপতি। ছাত্রজীবন শেষ করে ১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান এবং পর্যায়ক্রমে সিলেট শহর, জেলা ও মহানগর আমির, কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য। ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এরপর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এবং বর্তমানে সেক্রেটারি জেনারেল। এই পদে থাকা অবস্থায় এক বছর কারান্তরীণ ছিলেন।

source:বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!