তোষামোদির চাকরি তালাশ নাকরে আলেমদের উচিত উদ্যোক্তা হওয়া

মোঃ মোশারফ হোসেন
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন”। সুরা বাক্বারা আয়াত- ২৭৫। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ “যখন সালাত সমাপ্ত হয় তখন তোমরা আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহ অন্বেষণে জমিনে ছড়িয়ে পড়; আর আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো যাতে তোমরা সফল হও। সুরা জুমুআ আয়াত- ১০। আল্লাহর রাসুল (স) বলেনঃ তোমরা ব্যবসা করো; নিশ্চয়ই ব্যবসার মধ্যে সমস্ত সম্পদের দশ ভাগের নয় ভাগ অর্থাৎ ৯০% রয়েছে। উপরিউক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে সহজেই অনুমান করা যায় মহান আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসুল (স) বৈধ উপার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের নবী মুহাম্মদ (স) নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। নিঃসন্দেহে বৈধ ব্যবসা আল্লাহ ও রাসুলের (স) এর সুন্নত। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ৯০% সম্পদের বিচরণ যদি ব্যবসার মধ্যে থাকে তাহলে বাকি ১০% সম্পদ আর সমস্ত পেশা তথা চাকরি, কৃষি ও অন্যান্য পেশায় রয়েছে। নবুওয়াতের আলো বহনকারী আলেমগণ আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করে বেঁচে থাকেন এবং সে ভয়ের অনুভূতি থেকে নিজের, পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বদা মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা সুচিন্তা প্রয়োগ করে বিভিন্নভাবে মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলেমগণ ধর্ম প্রচারে ব্যস্ত থাকেন বলে অর্থনৈতিক খাত তাঁদের কাছে প্রাধান্য পায়না। এক্ষেত্রে কেউ শিক্ষকতা, ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত ও দাওয়াতি কাজে নিয়োজিত থেকে জীবনের শেষ অবধি ধর্ম সেবা করে যান। এ ছাড়া জীবন ও জীবিকার বিশাল ক্ষেত্র পতিত ও তুচ্ছজ্ঞান করা হলেও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় আলেমগণের জীবনে নেমে আসে বিরূপ ও বিপত্তিকর পরিস্থিতি। বিত্তবানদের জন্য সমৃদ্ধির দোয়া করলেও নিজের জন্য রেখে দেন আখিরাতে। তাছাড়া উপার্জনের পথ পরিবর্তনশীল হওয়ায় আলেমগণ সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারায় নিজ সন্তানদেরকে নিজের মত জাঁদরেল আলেম বানাতে বেশিরভাগই ব্যর্থ হন এবং আলেম নামক ধর্ম বীরের শেষ জীবন চলে যায় আর্থিক দৈন্য দশায়। একজন আলেমের জ্ঞানের জোরের সমান ধনের জোর না থাকায় অবশেষে ধর্ম শিক্ষা ও আলেমগণ হয়ে ওঠেন অবহেলার উদাহরণ। এভাবে চলতে চলতে আজ পরম শ্রদ্ধার পাত্র মসজিদ, মাদ্রাসা ও আলেমগণ অন্যের অনুদান নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আলেমগণ ধনী হলেই ধনী হবে মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় কার্যক্রম এবং ইসলাম প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে সবখানে। উপমহাদেশের আলেমদের চরম বাস্তবতা হলো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সফল করায় তাঁদের অর্থনৈতিক শিকড় কেটে দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। সেই ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব থেকে এ অঞ্চলের আলেমদের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক কাজে জড়ানোকে নিছক জাগতিক কাজ বলে ঘৃণা করা। আর ধর্ম রক্ষার দায়বদ্ধতা থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্মকাÐ পরিচালনায় যেতে হয় জাগতিক পেশার মানুষদের কাছেই। দানের অনেক সওয়াব আলেমগণ প্রচার করলেও সামর্থের অভাবে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও সে দান আর করা হয়ে ওঠেনা। যদিও কিছু ত্যাগী দানবীরদের বদান্যতায়ই ইসলাম বেশি বেগবান হয়েছে যুগে যুগে। কর্মময় পৃথিবীতে কর্মহীন ও অকর্মা বেকারের তালিকা এত দীর্ঘ যে ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশের কোন সরকারের পক্ষেই সকলকে চাকরি দেয়া সম্ভব না এ আশা স্বপ্নের বিড়ম্বনা। ওখঙ এর তথ্যমতে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ এবং কর্মক্ষম মানুষের ৮৫% মানুষের নির্দিষ্ট কোন বৃত্তি মূলক পেশা নেই। দৈনিক ইত্তেফাক, ০৫/০৭/২০২০। আর করনা কালে এ সংখ্যা ধারণাতীত বেড়ে যাবে। তাছাড়া সরকারি জরিপে আলেমগণ তালিকার কোন স্থানে থাকে তা তো সবারই জানা।
হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে অনেক উদ্যোক্তা আলেম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে থাকেন যেখানে হাতে গোনা কয়েক জনের নাম মাত্র কর্মসংস্থান হয়। কারণ সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে দান দক্ষিণা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠান চালানো কতটা কঠিন তা প্রত্যেক পরিচালকই জানেন। এদিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও লিখা থাকে শিক্ষকের বেতন হবে আলোচনা সাপেক্ষে। সে আলোচনায় অনেকের সংসার চলে আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাস্টার’ কবিতার মাস্টারের ন্যায়। একজন ইমাম দিয়েই তো একটা সমাজ চলে যায়। সে পদটিও রক্ষা করতে হয় অনেক তোষামোদের মধ্য দিয়ে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এ দেশের শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠাতা এবং আমদানী-রফতানীকারক হিসেবে যে কারণেই হোক আলেমদের নাম নেই। একটি মাদ্রসায় যদি ৫-১০ জনের কল্যাণ করা যায় একজন শিল্প কারখানার মালিক শত শত, হাজার হাজার মানুষের কল্যাণ করতে সক্ষম। দ্বীন প্রচারে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আছে তেমনি ধর্ম বাস্তবায়নে, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য বহুমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও সমান প্রয়োজন রয়েছে। তা সত্তে¡ও উক্ত খাত অআলেমদের দখলে। অর্থনৈতিক খাতকে ইসলামি করন করতে হলে আলেমদেরই এক খাতে শিক্ষাখাতের ন্যায় সরব উপস্থিতি দরকার। এ জন্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের উদ্যোক্তা হতে হবে। এককভাবে সক্ষম না হলে যৌথভাবে করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে ইসলামে যাকাত ও দান-সদকা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে গ্রহণের জন্য নয়। কারণ ইসলাম বিশ্বাস করে “উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম। মহান আল্লাহ তায়ালা আলেমদেরকে ইসলামি অর্থনৈতিক চেতনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মোঃ মোশারফ হোসেন
প্রভাষক
শহর গোপিন পুর ফাযিল মাদ্রাসা
ঘাটাইল, টাংঙ্গাইল।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!