তুরস্কে এরদোয়ানের জন্য এবার কেন অন্য রকম নির্বাচন : মাসুম খলিলী

তুরস্কের এবারের নির্বাচন নিয়ে পাশ্চাত্য জগতে যতটা হই চই সুরগোল উঠেছে ততটা সম্ভবত এর আগে কোন সময় হয়নি। চলতি বছরের জুনেই ভোট দিতে যাচ্ছে তুরস্কের নাগরিকরা। হঠাৎ করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ান। চলমান জরুরি অবস্থা, মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্কের অবস্থানগত পরিবর্তন এবং সিরিয়ায় দেশটির সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির এক পটভূমির মধ্যেই এই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের ১৮ মাস আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে তুরস্কে। এরদোয়ানের প্রধান মিত্র ও জাতীয়তাবাদী নেতা দেভলেত বাসেলির আহ্বানের পর পরই এরদোয়ান আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

প্রশ্ন হলো কি এমন রয়েছে তুরস্কের এবারের নির্বাচনে। এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সম্ভবত আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আর এরদোয়ানের রাষ্ট্রপতি কার্যালয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে।২৪ জুনের এই নির্বাচনে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা সংসদীয় শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে:বিরোধী পক্ষের কোনও প্রার্থী কি এরদোয়ানের জন্য বড় কোন বিশ্বাসযোগ্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হতে পারছে? এর জবাব নেতিবাচক হবার সম্ভাবনাই বেশি।

এই নির্বাচনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

২০১৭ সালে এরদোয়ান ৫০ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে সাংবিধানিক সংশোধনীর একটি প্যাকেজ প্রস্তাবে জনগণের অনুমোদন লাভ করেন। এতে সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে একটি কার্যনির্বাহী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থায় তুরস্ককে রূপান্তর করার কথা ছিল। এই সংশোধনীগুলির কার্যকারিতা শুরু হবে এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এ নির্বাচন ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রায় দেড় বছর আগে সেটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৮ই এপ্রিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক দিনের কথা জানিয়ে দেয়া এরদোয়ানের ঘোষণা তুরস্কের অনেককে বিস্মিত করে। এরদোয়ান এর ক্ষমতাসীন জাস্টিজ এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রায় ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের এতটা আগে নির্বাচন অতীতে কখনও দেয়নি একেপি সরকার।

কোন বিষয়টি আগাম নির্বাচনে উদ্ভুদ্ধ করেছে?

এরদোয়ান এই অঞ্চলে অবস্থার উন্নয়নের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর পাশাপাশি সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আইএস এর বিরুদ্ধে যে আন্তসীমান্ত অভিযান পরিচালনা করার কথা বলেছেন সেটি এই আগাম নির্বাচনের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে বলেছেন শেষ পর্যন্ত মন্দা অনিবার্য হয়ে দেখা দিলে এরদোয়ানের জন্য নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে।

এরদোয়ানকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থনকারী ইয়েনি সাফাক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ইব্রাহিম কারাগুল এই অঞ্চলে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন তুরস্কের জন্য পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর নিরাপত্তা সঙ্কট নিয়ে আসতে পারে। এই অবস্থায় রজনৈতিকভাবে দেশটির একটি স্থিতিশীলতা অর্জন করা উচিৎ। তিনি উল্লেখ করেন,এখন তুরস্কের জনগণকে হয় স্বদেশের অক্ষ হতে হবে অথবা বহুজাতিক হস্তক্ষেপের পরিস্থিতিতে যেতে হবে। তুরস্ক অব্যাহতভাবে বড় বড় পদক্ষেপ নিতে থাকবে। সবাইকে এই পথে ডাকতে হবে। কারাগুলের মতে,নির্বাচনের ব্যাপারে যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাতে তুরস্কের গভীর রাজনৈতিক মনন সক্রিয় হয়েছে। আর সম্ভবত তুরস্কের ভবিষ্যত নিরাপদ হয়েছে।

কারা প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে

তুরস্কের নির্বাচনী বোর্ড – এসবিসির তালিকা অনুযায়ী, আগামী নির্বাচনে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। খসড়া তালিকায় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন, বামপন্থী জাতীয়তাবাদী প্যাট্রিয়টিক দলের ডোগু পেরিনচেক, ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল গুড পার্টি থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেরাল আকসেন, প্রধান বিরোধি দল রিপাবলিকান পিপলস দলের (সিএইচপি) মুহাররাম ইনসে, জাস্টিস এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টির (একেপি) বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ান, পিপলস ডেমোক্রেটিক দলের (এইচডিপি) সালাউদ্দিন দেমিরতাস ও ফ্যাসিলিটি পার্টির (এসপি) তেমিল কারামোল্লাগলু।

নানা মেরুকরণ

প্রেসিডেন্ট পদে আগাম নির্বাচন ঘিরে তুরস্কের রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে ঠেকাতে বিভিন্ন স্যেকুলার ও ইসলামী দল এক কাতারে এসেছে। প্রেসিডেন্ট পদে আলাদা ভাবে লড়লেও সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে লড়বে সিএইচপি, গুড পার্টি, সাদাত পার্টি ও ডেমোক্রেটিক পার্টি। অর্থাৎ এই চারটি দল এখন চেষ্টা করছে এরদোগান প্রেসিডেন্ট হলেও যাতে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়।বিরোধি জোট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবশ্য পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এ জোটের পক্ষ থেকে অভিন্ন প্রেসিডেন্ট প্রার্থি না দিয়ে আলাদা আলাদা প্রেসিডেন্ট প্রার্থি দেয়া হয়েছে। এরদোয়ান ২৪ জুনের প্রথম দফা নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে ৮ জুলা্ইয়ের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে তার সাথে যিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তাকে জোটের সব দল সমর্থন দেবেন।

সরকারি জোটের তিন দলের মধ্যে রয়েছে একে পার্টি, এমএইচপি ও গ্রেট ইউনিয়ন পার্টি বা বিবিপি।এরদোগান হলেন এ তিন দলের যৌথ প্রেসিডেন্ট প্রার্থি। জোটের বা্ইরে একমাত্র বড় দল রয়েছে কুর্দি অধিকার আন্দোলন এইচ ডিপি। সালাউদ্দিন ডেমিরেটাস কারাগারে থেকে এই দলের প্রার্থি হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করছেন।
জোটবদ্ধ দলগুলো সংসদ নির্বাচনে ঐক্যের বিশেষ সুবিধা পাবেন। জোট ১০ শতাংশ ভোট পেলে এর অন্তর্ভুক্ত দলগুলো সংসদে আসন পাবেন। এর আগে এই ন্যুনতম ভোটের শর্তের কারণে সংসদে সাদাত পার্টির কোন আসন ছিল না। সাদাত পার্টির ইসলামপন্থী হলেও বেশ কয়েক মেয়াদে একেপিকে সমর্থন দেয়নি।

ভোটের পরে কি হবে?

ভোটের পর তুরস্কের সংসদীয় পদ্ধতি দ্রুত কার্যকর রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাহি বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হবেন। তিনি আইন প্রণয়নের জন্য ডিক্রি জারির ক্ষমতা পাবেন। বাজেট প্রস্তুতকরণ ও সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা পাবেন তিনি।তবে সংসদ আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে একই সময়ে। রাষ্ট্রপতি মন্ত্রী এবং কিছু বিচারপতিসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে পারবেন। এর পর সামরিক আইন আর থাকবে না। রাষ্ট্রপতি জরুরী অবস্থা ঘোষণা করতে সক্ষম হবেন। এ ধরনের অবস্থায় কর্তৃপক্ষকে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে।

এরদোয়ান কি জয়ী হবেন?

নির্বাচনের সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, এরদোয়ান প্রথম রাউন্ডে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে সরাসরি জয়ী হতে পারবেন। অবার অন্য কিছু জরিপ অনুসারে তিনি প্রথম রাউন্ডে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও ৫০ শতাংশের কম ভোট পাওয়ায় দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে যেতে হবে তাকে। আর সে নির্বাচনে তার জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। জরিপ অনুসারে,এরদোয়ান তুরস্কের এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। আগে প্রধানমন্ত্রী এবং এখন রাষ্ট্রপতি হিসাবে এরদোয়ানের নেতৃত্ব তুরস্কে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্থিতি এনেছে বলে মনে করা হয়।

দেশটির অখন্ডতা রক্ষার জন্য তার নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে তার রাজনৈতিক বিরোধিদের মধ্যেও অনেকে বিশ্বাস করেন। এটি ৫০ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে এরদোয়ানকে। তার দল একে পার্টি গত তিন মেয়াদে একক সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠন করে। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর পর আর কেউই এটি করতে পারেনি। আতাতুর্ক ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রধান এবং তার সময় প্রথম দিকে কেবল একটি মাত্র দলই নির্বাচনে অংশ নিতে পারত। পরবর্তীতে তিনি গণতন্ত্র কায়েম করলেও সেটা ছিল ডিকটেটরশিপ ধরনের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। ১৯৭০ এর দশক থেকে অবাধ গণতন্ত্র কায়েমের পর এখন পর্যন্ত তুরস্কে একে পার্টি ছাড়া আর কেউই একটানা তিনবার একক সংখ্যাগরিষ্টতা পায়নি।

সংসদের কি হবে?

কার্যকর রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর সংসদের কি হবে এই প্রশ্ন সামনে আাসছে। রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার পরও সংসদ চলতে থাকবে। সংসদের সদস্য সংখ্যা হবে আগের সাড়ে ৫শ’র পরিবর্তে ৬০০ জন। ৮৫টি ইলেকট্ররাল জেলা থেকে তারা অনুপাতিক পদ্ধতিতে দলের তালিকা অনুসারে নির্বাচিত হবেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ দেবতুগ্লু এবার একেপির সংসদ সদস্য তালিকায় নেই।
সংসদ রাষ্ট্রপতি তার ডেপুটি বা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে উদ্যোগ নিতে পারবে। এ জন্য সংসদে ৩৬০ সদস্যের ভোট বা সুপারিশ প্রয়োজন হবে। এ ব্যাপারে তদন্তের সময়, রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনের জন্য আহ্বান জানানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। ৪০০ ভোটের সমর্থনে সংসদ রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ আদালতে একটি মামলা রুজু করতে পারবে।সেখানে রাষ্ট্রপতির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্রপতির দ্বারা ঘোষিত জরুরী অবস্থা সংক্ষিপ্ত, প্রসারিত বা তুলে নিতে পারবে সংসদ।

কতদিন রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন?

সংশোধিত সংবিধান অনুসারে পাঁচ বছর মেয়াদের দুইবার পর পর একজন রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারবেন। তবে এখানে এটি সুযোগ রয়ে গেছে। সেটি হলো দ্বিতীয় মেয়াদে যদি আগাম নির্বাচন করা হয় তাহলে তৃতীয় বারও তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। এটি ঘটলে ২০০৩ সাল থেকে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৪ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে নেতৃত্ব দানকারী এরদোয়ান ২০২৯ সাল পর্যন্ত দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন।

নির্বাচনে আর্থিক বাজারের প্রভাব

এরদোগান আগাম নির্বাচনের আদেশ দেওয়ার পর তুরস্কের মুদ্রা এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বিনিয়োগকারীদের দুই মাসের জন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়াকে এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এ অনিশ্চয়তা সংক্ষিপ্ত সময়ের হলেও, উচ্চতর বৈশ্বিক সুদের হারে তুরস্কের ঝুঁকি এবং একজন নির্বাহী রাষ্ট্রপতির অধীন অর্থনৈতিক নীতির গুণ মান কতটা চেক এবং ব্যালেন্সের মধ্যে উদ্দীপ্ত থাকে তা নিয়ে জল্পনা বিরাজ করছে। এরদোয়ান অবশ্য কিছুটা অগতানুগতিক পথে স্থানীয় মুদ্রার মান অবনয়ন ঠেকানোর উদ্যোগ নিয়ে তুর্কিদের বিদেশি মুদ্রাকে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর ফলে লিরার মান অবনয়ন অনেকখানি বন্ধ হয়েছে।
#

Image may contain: 1 person, text

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!