তুরস্কের সংকল্প : ইবরাহিম কালিন

(ইবরাহিম কালিন (জন্ম ১৯৭১) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিশেষ উপদেষ্টা এবং তুর্কি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র। তিনি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল সেন্টার ফর মুসলিম-খৃস্টান আন্ডারস্টান্ডিংয়ের একজন সিনিয়র ফেলো। কালিন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর ডেইলি সাবাহ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কলামটি সাবাহ থেকে নেয়া)

গুলেনিস্ট সন্ত্রাসি চক্রের (ফেটো) সদস্যরা ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা শুরু করার পর অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক তুর্কি রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির সম্পূর্ণ পতনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অন্ধকারের দিন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে তুরস্ক আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে।এর দুই বছর পর, ট্র্যাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একজন যাজককে কেন্দ্র করে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর মুদ্রা বাজারের উঠানামা নিয়ে সংকট তুরস্কের সংকল্পকে প্রভাবিত করবে না।

৫ কোটির বেশি তুর্কি ভোটার ২৪ জুনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে রাষ্ট্র চালানোর জন্য রায় দিয়েছেন।এই নির্বাচনী ফলাফল নতুন নির্বাহি রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার প্রতিও অনুমোদন ছিল, যা আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য কমিয়ে আরো দক্ষ শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে।

গত সপ্তাহে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান চলমান এবং নতুন প্রকল্পের ব্যাপারে ১০০ দিনের কর্ম পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ট্রেজারি ও অর্থমন্ত্রী বারাত আলবায়রাক মধ্য মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন এবং তুর্কি অর্থনীতির জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন। ২৯ অক্টোবর নতুন ইস্তানবুল মেগা এয়ারপোর্টের উদ্বোধন করা হবে। এই বছর তুরস্ক ভ্রমণকারী পর্যটকদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রধান সরকারি প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই সব কিছুতে তুর্কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতাই দৃশ্যমান হয়।

বলা হচ্ছে যে, এটি একটি বাস্তব সত্য যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে তুর্কি লিরার মূল্য হারানো একটি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এটি এমন একটি চ্যালেঞ্জ তুরস্ককে যা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হতে হবে। তবে, এই ইস্যুটি শুধু একটি মুদ্রা যুদ্ধ নয় তার চেয়েও বড় কিছু। তুরস্কে বসবাসরত একজন মার্কিন যাজককে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত অভিযোগে অভিযুক্ত করে গৃহবন্দি রাখার অভিযোগে দুই তুর্কি মন্ত্রীর উপর ট্র্যাম্প প্রশাসনের বিধি নিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত তুর্কি-মার্কিন সম্পর্ককে নিম্ন স্তরে নিয়ে গেছে। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানে তুর্কি প্রচেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তুরস্কের ভাল উদ্দেশ্য এবং ফলাফল ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ট্রাম্প প্রশাসনের হোয়াইট হাউসের মতাদর্শপ্রধান মনোভাব এবং “আমার পথ অথবা মহাসড়ক” ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তছনছ করে দিয়েছে।

ন্যাটো জোটের কাছে তার নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে দাবি করার অধিকার রযেছে তুরস্কের। কিন্তু এর বিপরীতে ওবামা এবং ট্রাম্প উভয় মার্কিন সরকারই পিকেকে’র সিরিয়া শাখা – ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি (পিএইচডি) এবং পিপল’স প্রোটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি) -র সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সম্পর্কের ব্যাপারে তুরস্কের আপত্তির ব্যাপারে কার্যত কিছুই করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেটো নেটওয়ার্কের উপস্থিতি দায়েশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সিস্টেম বা নীতির অজুহাত দিয়ে তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থে আঘাত এবং তুর্কি-মার্কিন সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যুক্তি হতে পারে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ তুরস্ককে হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে। তুরস্কের বৈধ নিরাপত্তা দাবি উপেক্ষা করে সমগ্র তুর্কি জনসাধারণকে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। তুরস্কের বিরুদ্ধে হুমকি, নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘাত চাপানো এক্ষেত্রে কোন কাজ করবে না, বরং এটি কেবলই তুরস্কের সংকল্পকে জোরালো করবে। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক উভয় দেশেই এবং আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটের উপরও আরো বেশি প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে কানাডা, মেক্সিকো, কিউবা, চীন, রাশিয়া, ন্যাটো, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কারণে বিরোধ সৃষ্টি করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার ও সহযোগী হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।এই ধারণা তুরস্কের ব্যাপারেও আলাদা কিছু নয়।

তুরস্ক তার মুদ্রা এবং আর্থিক বাজারের বিরুদ্ধে হুমকি, চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক অপারেশনের ক্ষেত্রে ছাড় দেবে না। তুরস্ক নিজের নিরাপত্তার দাবির ওপর অন্যদের দাবি পূরণে ছাড় দেবে না। ন্যাটোর সহযোগী হিসাবে এটি অন্য সবার নিরাপত্তার জন্য তার অংশের চেয়ে বেশি কাজ করেছে। তুরস্ক সব ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সহযোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশটি সহযোগি দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দূর করতে তাদের সাথে সহযোগিতা করেছে। এটি স্বাভাবিক যে তুরস্ক তার মিত্রদের কাছে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে বিনিময় দাবি করতে পারে। অথচ এখনো পর্যন্ত তার মিত্ররা তুরস্কের পিকেকে এবং ফেটো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামান্যই করেছে অথবা কিছুই করেনি।

তুরস্ক তার বৈদেশিক নীতির দৃষ্টিভঙ্গির য়ে বিস্তার ঘটিয়েছে তাতে দেশটি তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ছাড় দেবে না। এটি সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সব দেশের সাথে সম্পর্কের বিকাশ অব্যাহত রাখবে। এটেই তার শক্তির উত্স এবং আর্থিক বিকল্পগুলির বৈচিত্র্য অানার প্রচেষ্টাও তুরস্ক অব্যাহত রাখবে। তুরস্কের ভূ রাজনৈতিক অবস্থান এবং ২১ শতকের কূটনৈতিক বাস্তবতার কারণে এটিই কেবলমাত্র তুরস্কের জন্য স্বাভাবিক বিষয়।

সামরিক অভ্যুত্থান, সন্ত্রাসী হামলা এবং আর্থিক অপারেশনে দেখা গেছে, তুরস্ক শুধুমাত্র তার সমাধান প্রয়াস এবং স্থিতিস্থাপকতাকে জোরদার করেছে। কোন হুমকি বা আক্রমণে এর কোন পরিবর্তন করা যাবে না।

অনুবাদ: মাসুমুর রহমান খলিলী

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!