তুরস্কের নির্বাচন ও ভীতিকর বৈশ্বিক পরিস্থিতি: ইব্রাহিম কারাগুল অনু:মাসুমুর রহমান খলিলী

তুরস্ককে নির্বাচনের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এ জন্য সম্ভবত নিকটতম কোন তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার বিষয়সূচি থেকে নির্বাচনী ইস্যুটি সরিয়ে ফেলতে হবে তুরস্ককে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়গুলির উপর নির্ভরশীল হওয়ার বিপদকে দূরে সরাতে হবে। নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরে বিলম্ব না করে একবারেই তাতে উত্তরণ করতে হবে আর এ ব্যাপারে অভ্যন্তরীণভাবে কোন বিরোধিতা তৈরি হলে সেটাকে গুরুত্ব দেয়া যাবে না।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিযানে দূরত্ব তুরস্কেকে ঘুচাতে হবে। সব ধরনের অস্পষ্টতা দূর করতে হবে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শক্তিকে সুসংহত করে, সামাজিক গতিবিধি রক্ষা করে। আর “বিরোধী দল” এর নামে পরিচালিত নতুন “বহুজাতিক হস্তক্ষেপ” এর প্রচেষ্টা প্রতিহত করে লক্ষের দিকে এগুতে হবে। অস্বাভাবিক কোন পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক ধরনের সিদ্ধান্ত নেবার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।এখন বৈশ্বিক জরুরী পরিস্থিতি, ঝুঁকির মুখে তুরস্ক২০১৯ সালের নির্বাচন ২৪ জুন ২0১৮ সালে আনার সাথে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অথবা নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফলের কোনও সম্পর্ক নেই। এ সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে সম্পূর্ণরূপে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়কে কেন্দ্র করে এবং এ সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে তুরস্কের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অবয়ব দিতে। যাতে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও দায়িত্বানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিকল্পনাসমুহ বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়।
তুর্কি জাতি, তুরস্ক রাষ্ট্র এখন অনেক বড় হুমকির সম্মুখীন। শুধু তুরস্কই নয়, সমগ্র পৃথিবী বড় ধরনের ঝড়ের মুখে রয়েছে। বিশ্বের অবস্থা এখন এক ধরনের জরুরী পরিস্থিতিতে রয়েছে। একটি বিধ্বংসী তরঙ্গ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ, রাশিয়া, চীন আর মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি কোণের দিকে ধেয়ে আসছে। এটি কোনদিকে গড়াবে সেটি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।বিভিন্ন ফ্রন্ট দিয়ে ঘেরাও তুরস্ক, যুদ্ধ ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে পড়তে পারেপ্রায় সব দেশ এই বিপদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছে; তারা একযোগে তাদের নির্বাচন সম্পন্ন করছে এবং প্রায় সতর্ক অবস্থায় তাদের দেখা যাচ্ছে। এই কারণে অনেক দেশকে আগাম নির্বাচন করতেও দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়গুলির বাইরে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলির উপর বিশেষভাবে নজর রাখছে। তারা আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষযের উপরে জাতীয় প্রতিরক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আর মনোযোগি হচ্ছে সম্ভাব্য কম ক্ষতির মাধ্যমে যাতে ঝড়ের পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়।
যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আশেপাশের যুদ্ধ এলাকাগুলোর কেন্দ্রে চলে এসেছে তুরস্ক । বস্তুত, এই সংকটগুলির কোনও স্থানীয় ইস্যু নেই, এর সবগুলি বৈশ্বিক প্রকৃতির। বিশ্বশক্তিগুলো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে এখানে। এখন মনে হচ্ছে যে কিছু দেশ এতে ভাগও হয়ে যেতে পারে। আর এ ধরনের পরিকল্পনাও কাজ করছে।
সিরিয়াতে তুরস্ক যুদ্ধ করছে। তুরস্কের বিরুদ্ধে সব হামলা প্রতিরোধের প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। এজিয়ান সাগরে “দুর্ঘটনা” র পরের ঘটনাগুলির সাথে যুক্ত কিছু পরিস্থিতিও রয়েছে। সব ধরনের অবস্থায় সংঘর্ষের সৃষ্টি হতে পারে। পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরও অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। সিরিয়া ও লেবানন প্রাকৃতিক গ্যাসের মধ্য দিয়ে একটি অগ্নিকুণ্ডের দিকে ঘুরছে আর এতে ভূমধ্যসাগর অস্থিরতায় এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।এটি কোন নির্বাচন নয় , এটি হলো অস্তিত্বের বিষয়১৫ জুলাই ছিল তুরস্কের উপর একটি প্রকাশ্য আক্রমণ। তুরস্ককে বিভক্ত করার পরিকল্পনা ছিল তখন। নতুন একটি কিছু সৃষ্টি হতো। তারা সে মিশন এখনো ছেড়ে দেয়নি। তারা দক্ষিণ ও পশ্চিমে আঘাত করার মাধ্যমে”স্থানীয় অপারেটার,” এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে আঘাত করতে চাইছে । তারা ১৫ জুলাইয়ের অনুরূপ এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আঘাত করতে চাইছে। তুরস্ক এই আঘাত যেমন প্রতিহত করতে যাচ্ছে; তেমনি তারাও অবিরত আঘাত করতে চাইছে। এটি শতাব্দী-পুরোনো এক সংগ্রাম এবং তুর্কিরা “অবিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের” যুদ্ধ করছে।
২৪ শে জুনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। এটি নিছক একটি নির্বাচনের বিষয় নয়, নির্বাচন ফলাফল বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উদ্বেগের বিষয়ও কেবল নয় এটি। এই নির্বাচন শুধু গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি একটি দেশের, একটি জাতির গঠনের সাথে সম্পর্কিত একটি নির্বাচন হবে। এটি ২১ শতকব্যাপি প্রাতিক্রিয়াশীল হবে, এর মাধ্যমে তুরস্ক তার উত্থান অব্যাহত রাখবে, ইতিহাস তৈরির ভূমিকায় ফিরে আসবে, এবং শতাব্দী-প্রাচীন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।১৫ জুলাইয়ের ‘গোপন মানচিত্রবাদীদের’ নকশা বাস্তবায়নকে অসম্ভব করে তোলা হবেতুরস্ক ২৪ জুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তুর্কিরা যুদ্ধ- ঝড়ের বিরুদ্ধে সজাগ থাকবে এবং নিজেকে রাখবে সক্রিয় তরঙ্গের মধ্যে। তুর্কিরা দৃঢ় থাকবে নিজেদের অস্তিত্ব সুরক্ষায়। তারা কখনো থামবে না, পেছনে ফিরে তাকাবে না। তাদের পদক্ষেপ কম্পিত হবে না। তুরস্ক জানে এই নির্বাচনে কি ধরনের প্রতিরোধ তৈরি করতে হবে। এই নির্বাচন রাষ্ট্রের জন্য সিদ্ধান্ত নির্মাণ করবে।
তুরস্ককে দ্রুত নতুন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, শক্তি সঞ্চয় করতে হবে, নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করতে হবে, অসাধারণ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সক্ষম হতে হবে এবং বাধাগুলিকে ডিঙাতে হবে, ষড়ডন্ত্রকারীদের পরাস্ত করতে হবে।
বহুজাতিক হস্তক্ষেপকারীদের স্থানীয় অংশীদারদের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন ১৫ জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যারা সেই পুরণো দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায় সেসব মানচিত্র পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা জাতীয় মননকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং দেশকে বহুজাতিক আগ্রাসীদের কাছে উত্সর্গ করার প্রচেষ্টা নেয় তাদের বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে।
যেহেতু রাষ্ট্রের চিন্তাভাবনা সেই ইচ্ছারই প্রতিনিধিত্ব করে যা এই অঞ্চলের জন্য হাজার বছরের ইতিহাস তৈরি করবে। কারণ রাষ্ট্রের সামনে হুমকি দৃশ্যমান হচ্ছে, খোলা চোখে দেখা যাচ্ছে বিপদ আর কি করতে হবে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই পর্বের পর আর কোন রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকবে না যার এতটা গুরুত্ব থাকবে।
তারা ৭ জুন তারিখে জটিল পরিস্থিতি আনতে চেয়েেছিল। তারা একে পার্টির এককভাবে ক্ষমতায় আসা প্রতিহত করতে চেয়েছিল যাতে প্রধান বিরোধি দল সিএইচপির সাথে জোট করতে তারা বাধ্য হয়। জোটের মাধ্যমে জিম্মি করে রেখে তুরস্কের নতুন উত্থান ইতিহাসকে তারা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল।
ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির (এমএইচপি) নেতা দেভলেত বাসেলি ৭ জুন সন্ধ্যাবেলা সব পরিস্থিতিতে রূদ্ধ করেননি, রাষ্ট্রপতি রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান ১ নভেম্বর এককভাবে নির্বাচনের জন্য সিদ্ধান্ত নেননি। তখন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না গেলে আজ আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করতাম যা হতো জিম্মি, ক্লান্ত এবং বিভক্ত। সম্ভবত ডজন ডজন সশস্ত্র সংগঠন রাস্তায় ঘুরতো এবং এমনকি আমরা একটি গৃহযুদ্ধেও জড়িয়ে যেতে পারতাম।তাদের সমস্ত নোংরা দৃশ্যকল্প উবে গেছে’এরপরও, ১৫ই জুলাইকে পুরো বন্ধ করা যায়নি, তারা এটা করেছিল … যদি তারা সফল হতো, তাহলে তুরস্কের রাস্তা আজ রক্তের সাগরে ভাসতো এবং তুরস্ক সিরিয়াতে পরিণত হতো। সেই রাতে, আমাদের লোকেরা তুরস্ক এবং বিশ্বের ইতিহাস উভয়ই পরিবর্তন করেছে। তারপর দক্ষিণ থেকে আঘাত হানা শুরু হয়। সর্বশেষ আফরিন অপারেশন দিয়ে সেটি প্রতিহত করা হয়। এখন, তারা পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে আজিয়ানে তুরস্ককে যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই বিপদ অনেক বড়। এই বিপদ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত নয়, এটি তুরস্কের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত। যারা এটাকে উপেক্ষা করে তাদের অধিকাংশের মস্তিষ্ক কাজ করে না। তাদের গুরুত্বের সাথে নেয়া যাবে না।
রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান ও বাসেলির বৈঠকের মধ্য দিয়ে ২৪ শে জুনের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। এটি ছিল চক্রান্তকারীদের জন্য একটি বড় আঘাত। ২০১৯ সালে তাদের হস্তক্ষেপের সব দৃশ্যপট পরিকল্পনা উবে গেছে। তারা নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় পাবে না। এখন থেকে, তারা সব অপারেশন দ্রুততর করতে চাইবে আর তারা তাদের মুখের সামনেই ব্যর্থতা দেখতে পাবে।তুরস্কের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়েছে, এটি কেবল নির্বাচন নয়তুরস্কের জনগণকে অবশ্যই জানতে হবে যে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের মধ্যে যাচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশ্বব্যাপী সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। তুরস্কের দিকে আক্রমণ তীব্রতর হয়ে আসছে প্রতিটি ফ্রন্ট থেকে । ফলে এই নির্বাচন কোন ভাবেই একটি নির্বাচন নয়, তুরস্কের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে এর মাধ্যমে।
তুরস্কের সবাইকে নিজ দেশের স্বার্থকে সবকিছুর উপর স্থান নিতে হবে। যারা সন্ত্রাসী সংগঠন, কাঠামো, গোষ্ঠীকে সহায়তা করে যারা আমাদের দেশে বাইরের হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে চায় তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ভুলে যাওয়া যাবে না যে, যখন সারা বিশ্বের মানুষ জরুরী অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন তুরস্ককে রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
এখন তুরস্কের জনহণকে হয় স্বদেশের অক্ষ হতে হবে অথবা বহুজাতিক হস্তক্ষেপের পরিস্থিতিতে যেতে হবে। তুরস্ক অব্যাহতভাবে বড় বড় পদক্ষেপ নিতে থাকবে। সবাইকে এই পথে ডাকতে হবে।
নির্বাচনের ব্যাপারে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তুরস্কের গভীর রাজনৈতিক মনন সক্রিয় হয়েছে। এবং সম্ভবত তুরস্কের ভবিষ্যত নিরাপদ হয়েছে। জনগণকে সে অবস্থার সাথে পরিচিত হতে দিতে হবে।ইয়েনি সাফাক থেকে অনুবাদ মাসুমুর রহমান খলিলী
#

Image may contain: one or more people and people standing

 

LikeShow more reactions

Comment

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!