তুরষ্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: সম্ভাব্য জোট সমূহ:মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ

 

আগামী ২৪ জুন তুরষ্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তুরষ্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অর্থনীতি এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচন তুরষ্ক, ক্ষমতাসীন দল একেপি, আঞ্চলিক রাজনীতি তথা মুসলিম বিশ্বের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্য ক্ষমতাসীন একে পার্টি এবং ডানপহ্নি জাতীয়তাবাদী দল (এমএইচপি) এর জোট গঠিত হয়েছে। জাতিয়তাবাদী এমএইচপি ছাড়াও আরো কিছু ছোট দল এই জোটে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তুরষ্কের বাম ও কট্টর সেকুলার আদর্শে বিশ্বাসী আতার্তুকের সিএইচপি বা পিপলস রিপাবলিকান পার্টি, নব গঠিত ইয়ি পার্টি বা গুড পার্টি, তুরষ্কের ইসলামী দল সাদাত পার্টির সমন্বয়ে সম্ভাব্য জোট গঠনের প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্য ২২ এপ্রিল ২০১৮ সিএইচপির ১৫ জন সংসদ সদস্য ইয়ি পার্টিতে যোগ দিয়েছে। এই জোট ইয়ি পার্টির নেত্রীকে জোটের প্রাথী করানো অথবা সরকার থেকে নির্বাচনের খরচ বহনের জন্যও হতে পারে। উল্লেখ্য, তুরষ্কে ২০ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন না পেলে প্রেসিডেন্ট প্রাথী হতে পারেনা। অপরদিকে ৩% এর অধিক ভোটারের সমর্থিত জনপ্রতিনিধি দলে থাকলে সরকার নিজেও নির্বাচনের বেশিরভাগ খরচ বহন করবে। ইতিমধ্য একেপি, সিএচপি, এমএইচপি, এইচডিপি সংসদের এই চারটি দল নির্বাচন পরিচালনার খরচ পেয়েছে।

অপরদিকে গতকাল ২৩ এপ্রিল সাদাত পার্টির চেয়ারম্যান ড: তেমেল কারামুল্লাহ সিএইচপির প্রধানের সাথে দেখা করে একসাথে প্রেসে কথা বলেছে, তাতে ধারনা করা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত সিএইচপি, ইয়ি পার্টি এবং সাদাত পার্টির জোট গঠনের সম্ভাবনা বেশি। এই জোট গঠিত হলে সিএইচপি প্রধান কেমাল ক্লিসদার অথবা ইয়ি পার্টি প্রধান মেরাল আকসেনের মধ্যে কে প্রার্থী হবেন তা এখনো চুড়ান্ত নয়। আজ ২৪ এপ্রিল সিএইচপির সংসদীয় গ্রুপ মিটিংএ প্রার্থী ঘোষনার সম্ভাবনা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত ঘোষনা হয়নি। সাদাত পার্টির প্রধান জোট প্রাথী হবার সম্ভাবনা না থাকলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুলকে প্রার্থী করানোর গুজব রয়েছে। তবে তা আদোও সম্ভবপর নয় বলে মনে করেন তুরষ্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষকররা।

দীর্ঘ দিন যাবত ক্ষমতার বাহিরে থাকা আতার্তুকের সিএইচপির অস্তিত্বের জন্যও একটা বড় লড়াই। ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের অভাবে সিএইচপি দীর্ঘদিন যাবত ক্ষমতার বাহিরে। আতার্তুকের শাসনামলের একদলীয় শাসনের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন ছাড়াই তারা ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলো। ১৯৪৬ সালে সিএইচপির তত্ত্বাবধানে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনে একবারই তারা এককভাবে ক্ষমতায় এসেছিলো। এরপর ১৯৬০ সালে সোলাইমান দেমিরালের আদালত পার্টির সাথে জোট, ১৯৭৪ সালে নাজমুদ্দিন এরবাকানের মিল্লি সালামত পার্টির সাথে জোট, ১৯৯৯ সালে আনাভাতান ও দওরু ইওল পার্টির সাথে জোট করে সর্বশেষ তারা ক্ষমতায় এসেছিলো। ১৯৬০ সাল হতে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সংঘটিত ৪ টি ক্যুয়ের সাথেই এই দলটি প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো। এবং ওসমানী খিলাফতের ঐতিহ্যের ধারক তুরষ্ক হতে সকল ইসলামী কালচার মুছে ফেলায় এই দলটি ভুমিকা রেখেছিলো।

নব গঠিত ইয়ি পার্টির দলীয় নেত্রী তুরষ্কে কট্টর জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত মেরাল আকসেন এক সময় আনাভাতান বা মাদারল্যান্ড পার্টির মন্ত্রী ছিলেন। অত:পর জাতীয়তাবাদী পার্টি এমএইচপি থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য এবং দলীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দলীয় সভাপতির নির্বাচনে হেরে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করে দীর্ঘদিন পর জাতিয়তাবাদী দলের ৫ এমপিকে সাথে নিয়ে ইয়ি পার্টি খুলেছে। তবে অল্প সময়ে তিনি তুরষ্কে বড় ধরনের সাড়া ফেলেছেন। তার নারী পরিচয়, মিডিয়া ও পশ্চিমাদের সমর্থন এবং ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের গুনে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না।

অপর দিকে সিএইচপির সাথে তুরষ্কের মুল ইসলামী দল সাদাত পার্টির জোট হলে তা ১৯৭৪ সালের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আবারো তুরষ্কে কট্টর বাম-সেক্যুলারের সাথে ইসলামপহ্নিদের জোট হবে। ১৯৭৩ সালে সিএইচপি অন্য কোনো দলকে কোয়ালিশনের জন্য না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারী তৎকালীন সিএইচপির প্রধান বুলেন্ট এজভিতকে প্রধানমন্ত্রী এবং ড: নাজমুদ্দিন এরবাকানকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে। তবে বিশ্বাস আর আস্থার অভাবে তা মাত্র ৭ মাস ২২ দিন স্থায়ী ছিলো।যদিও এই অল্প সময়ে নাজমুদ্দিন আরবাকান সাইপ্রাস দখল, ভারি শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন।

একেপির মিত্র তুরষ্কের জাতিয়তাবাদী দল এমএইচপি সাবেক সেনা অফিসার আরসলান তুর্কেশের হাত ধরে ১৯৬৯ সালে গঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে তুর্কেশের মৃত্যুর পর বর্তমান প্রধান দেভলেত বাহচেলি দলের হাল ধরেন। দেভলেত বাহচেলি দলটির এক সময়ের স্বসস্ত্র গ্রুপ ” উলকুযু” এর দ্বায়ীত্বে ছিলো। তারা একাধিকবার বিভিন্ন জোটের সাথে কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় এসেছিলো।

সেই সাথে জোটের বাহিরে কুর্দিশ পিকেকের সমর্থিত এইচডিপি আলাদা প্রার্থী দেবার সম্ভাবনা বেশি। সাধারন তার্কিশদের আক্রোশ হতে রক্ষা পেতে তুরষ্কের কোনো রাজনৈতিক দল তাদের জোটভুক্ত করতে চায়না। তবে সাধারন ধর্মপ্রান কুর্দিশরা সব সময়েই সুযোগ পেলে তুরষ্কের ডানপহ্নি এবং ইসলামিস্টদের ভোট দেয়। যদি সাধারন জনগন পিকেকের হস্তক্ষেপে কুর্দিশ অঞ্চলে সুষ্ঠভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ কম পায়।

সব মিলিয়ে একটি পূর্ন প্রতিযোগীতামুলক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশিটি। এরদোগান ১৫ জুলাই ক্যু এর পরিকল্পনাকারীদের পরবর্তী ষড়ন্ত্রের সুযোগ না দিয়ে অগ্রিম নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশ গঠনে তার সকল ক্ষেত্রে একক আধিপত্য এবং যোগ্য উত্তরসূরি না রাখায় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তার গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেননা। তবে তুরষ্কের অর্থনীতি, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য এরদোয়ানের বিজয়ী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে তুরষ্কের সাধারন জনগন।

মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ
পিএইচডি গবেষক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
গাজি ইউনিভার্সিটি, আংকারা, তুরষ্ক।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!