ডা. মঈনের পাশে সিলেটে রাজনীতিবিদ চিকিৎসকরা দাঁড়ায়নি কেন ?!

ডা. মঈন উদ্দিন কোনো রাজনীতি করতেন না। মানুষের সেবা করতেন। শিশু বয়সে বাবা হারিয়েছিলেন। মা কষ্ট করে মানুষ করেন। মেধার জোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেন। সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। করোনা আক্রান্ত হলে তাকে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দিতে, এমনকি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স দিতেও সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা বা বিএমএ এগিয়ে আসেনি। ভেন্টিলেশনও তার কপালে জোটেনি। পরে ওয়েসিস হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা আসেন।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডা. মঈন উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত হন। তিনিই সিলেটের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী। গত ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। গত ৩০ মার্চ থেকে তিনি তার বাসায় কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ৭ এপ্রিল সিলেট নগরের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনা আইসোলেশনে সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।

৮ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালেই তার চিকিৎসা চলছিল। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে তাকে আইসিইউয়ে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেয়া হয়। আইসিইউয়ে থাকা অবস্থায় বুধবার ভোরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সুনামগঞ্জের ছাতকের উত্তর খুরমা ইউনিয়নের নাদামপুরে গ্রামের বাড়িতে বুধবার সন্ধ্যায় ডা. মঈন উদ্দিনকে তার মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

ডা. মঈন উদ্দিনের পিতা মুনসী আহমদ উদ্দিন ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে পঞ্চম ডা. মঈন উদ্দিনের বড় ভাই যুক্তরাজ্য প্রবাসী শফিক উদ্দিন বছর খানেক পূর্বে সেখানে মারা গেছেন। মেঝভাই সিরাজ উদ্দিনও মারা যান কয়েক বছর পূর্বে। তার তিনবোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ডা. মঈনের বাবা যখন মারা যান তখন তার বয়স দুই বছর। মা সংগ্রাম করে ছেলে মেয়েদের পড়ান। নাদামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন মঈন। তিনি ধারণ নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেলে। সেখান থেকে কৃতীত্বের সঙ্গে এমবিবিএস পাসের পর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ কলেজে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী ডা. রিফাত জাহান সিলেটের বেসরকারি পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (চলতি দায়িত্ব)। তার বড় ছেলে জিহাদের বয়স ১২ বছর। আর ছোট ছেলে জায়ানের বয়স ৭ বছর। তারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করছে।

ডা. মঈন উদ্দিন সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্যোগে গঠিত সিলেট করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি এ হাসপাতালের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটিসহ আরো কয়েকটি কমিটির দায়িত্ব পালন করেন।

দূরদূরান্তে রোগীদের বাড়ি গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেয়ার কারণে তাকে গরিবের মঈন উদ্দিন ডাক্তার বলা হতো। পল্লী চিকিৎসক পিতা মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন এলাকার অসহায় রোগীদের যেন নিয়মিত সেবা দেন ছেলে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবার কথা রেখেছেন ডা. মঈন উদ্দিন। ২০১৪ সালে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গ্রামে এসে অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে সেবা দিতেন ডা. মঈন। যারা একেবারেই অসহায় তাদেরকে বিনামূল্যে ওষুধও দিতেন। কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত ওষুধের স্যাম্পল তিনি বিলিয়ে দিতেন এলাকার অসহায় রোগীদের মধ্যে। সিলেটের চেম্বারে এলাকার কেউ গেলে তাদেরকেও বিনামূল্যে সেবা দিতেন। ৯ দিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে হার মানা মানবদরদি চিকিৎসক মঈনের মৃত্যুর খবর সিলেটে ছড়িয়ে পড়ার পর তার সহকর্মী, ছাত্রছাত্রীসহ সিলেটবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জন্মস্থান সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ এমন গরিবের বন্ধু ডাক্তারকে হারিয়ে শোকে কাঁদছেন।

এলাকার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আছকির মিয়া বলেন, ‘এলাকার অসহায় হিন্দু-মুসলিম সবাই ডা. মইনুদ্দিনের কাছ থেকে বিনামূল্যে সেবা পেয়েছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসে তিনি এলাকার রোগীদের চিকিৎসা দিতেন। বিনা ফিতে দেখা দরিদ্র রোগীদের কম্পানি প্রদত্ত ওষুধও বিলিয়ে দিতেন।’

এলাকার মুরুব্বী সোহেল আহমদ বলেন, ডা. মঈনুদ্দিন শুধু গরিবের ডাক্তার ছিলেন না। এলাকার কোন রোগী তার সিলেট চেম্বারে গেলেও তিনি তাদের ফ্রি দেখতেন। মানুষের সঙ্গে এমন ভালো ব্যবহার করতেন যাতে রোগীর রোগ অধেক কমে যেতো। মানুষের সেবা করতে গিয়েই মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন। এমন মানুষের মৃত্যু নেই। তার কর্মেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

ডাক্তার মঈন উদ্দিনের গ্রামের বাসিন্দা গিরিধর দাস বলেন, ডা. মঈন উদ্দিন ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। গরিব মানুষকে তিনি বিনামূল্যে সেবা দিয়ে গেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে মানুষ কাঁদছে।

ডা. মঈন উদ্দিনের কাছ থেকে চিকিৎসা নেয়া একজন নিম্নবিত্ত পরিবারের রোগী নগরের আখালিয়া এলাকার আরব আলী তার মৃত্যুর খবর শুনে বলেন, তিনি আমার চিকিৎসক ছিলেন। তাকে আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেটে দেখিয়ে আসছি। ১০০/২০০ যাই রোগী দেখার ফিস দিয়েছি হাসিমুখে নিয়েছেন। কোনোদিন মুখ কালো করেননি। এই সমাজে তার মতো একজন ভালো চিকিৎসক পাওয়া বিরল।

সিনিয়র এই চিকিৎসক নিজ কর্মস্থলসহ সিলেটে চিকিৎসা না পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল সামাজিক যোাগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে লিখেছেন, একটা মানুষ একদিন মারা যাবে এটা জেনেই সে বেঁচে থাকে, মানুষ মারা যাবে, যাবেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন অক্ষম হাহাকার আমাদের সবকিছু চুরমার করে দেয়। একজন ডা. মঈন প্রথমে নিজ শহরে একটা ভেন্টিলেটর চেয়েছিলেন, তারপর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছিলেন, তারপর চেয়েছিলেন নিদেনপক্ষে একটা আইইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। আর আমরা ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম’ তার এই চাওয়াগুলোকে অগ্রাহ্য করবার জন্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডা. মঈনের এক ছাত্র বলেন, অক্সিজেনসহ স্যারের স্যাচুরেশন থাকে ৯০%। কিন্তু, অক্সিজেন ছাড়া ৮০%। এটা একটা খারাপ সাইন। ভেন্টিলেটর সাপোর্টের পূর্ব লক্ষণ। শামসুদ্দিনে ভেন্টিলেটর আছে। কিন্তু, মেইনটেইনেন্সের টিম (ডাক্তার, নার্স) নেই। যা ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। ওসমানীর ডাক্তারদের একাংশ স্যারকে সেখানে শিফট করতে চেয়েছিলেন। ওসমানীর এক ৪টি ভেন্টিলেটর আছে। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে তা নাকচ করে দেন ওসমানীর পরিচালক।

অভিযোগ করে ওই ছাত্র আরও বলেন, এমতাবস্থায় মঈন স্যার ঢাকায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, এমন আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় যাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স করোনা রোগী নেবে না। বিমান বাহিনীর একটি অ্যাম্বুলেন্স আছে, সেটি ব্যবহার করতে হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সুপারিশ লাগে। এমতাবস্থায় মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুপারিশ করতে অপরাগতার কথা জানান।

ওই চিকিৎসকের সহকর্মী ওসমানী মেডিকেল কলেজের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ইনচার্জ ডা. মঈনুল ইসলাম ডালিম সাংবাদিকদের বলছিলেন, ডা. মঈন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেহেতু ওই হাসপাতালের ২০ বেডের আইসিইউ ইউনিটে ১৫ বেডে রোগী রয়েছে, একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে অনেক রোগী, তাই তাকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। করোনা আক্রান্ত রোগী নিলে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!