জিয়াঃপাকিস্তানি মেজর থেকে বাংলাদেশী প্রেসিডেন্ট – মাহবুব সুয়েদ

 বগুড়া জেলা।প্রাচীন ঐতিহ্যের এ জেলা থেকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারে একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।তার নাম উচ্চারন করলে অটোমেটিকভাবে সবাই তার জেলার নাম উচ্চারন করত।আমি মোহাম্মদ আলী বগুড়ার কথা বলছি।গনতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক সময়ের ব্যাক্তিগত সচিবকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেছিল সামরিক গভর্নর জেনারেল।এবং সেই সাথে সোহরাওয়ার্দীকে তার মন্ত্রী সভার আইনমন্ত্রী হতে হয়েছিল গনতন্ত্র প্রতিষ্টার সংগ্রামের অংশ হিসেবে।সেই মোহাম্মদ আলীর নাম উচ্চারন হলে মানুষ আজো বলে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী।মোহাম্মদ আলী যখন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তখন তার নামের সাথে যুক্ত “বগুড়া” নামক স্থান থেকে উঠে এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে উদিয়মান চৌকষ অফিসার হিসেবে ক্রমে নিজেকে প্রতিষ্টিত করছিল আরেক তরুন সেনা কর্মকর্তা।সময়ের ব্যাবধানে সে হয়ে উঠেছিল দক্ষিন এশিয়ার অন্যতম আলোচিত চরিত্র।১৯৬৫র ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্বে অসাধারন বীরত্বের কারনে যাকে পাক প্রেসিডেন্ট “হেলাল ই জুরাত” উপাধি দিয়ে ধন্য করেছিলেন রাষ্ট্রকে।আমি মেজর জিয়ার কথা বলছি।সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া পাকিস্তানে বসবাসকারি জিয়া সময়ের ব্যাবধানে যে কিছু একটা হবেন তা বুঝা যাচ্ছিল পাক আর্মিতে থাকাবস্থায়ই।সবাই নিশ্চিত ছিল তার ব্যাক্তিত্বের প্রখরতা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে।৬৫র যুদ্বে পাকিস্তানের পক্ষে জীবনবাজি রেখে লড়ে যাওয়া জিয়া দেশপ্রেমের চুড়ান্ত প্রমান দিয়েছিলেন সেই সময়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অন্যসব বাঙ্গালি অফিসারদের মত নিষ্টার সাথে দায়িত্ব পালনরত যখন জিয়া তখন রাষ্টের উভয় অংশের মাঝে চলছে রাজনৈতিক লড়াই ও দেশে চলছে সামরিক একনায়কের দুঃশাসন।বৃহৎ জনগোষ্টির মতামতকে উপেক্ষা করে তখন চলছে লুটপাটের রাজনীতি।বঞ্চনা ও শোষন তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে।রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় পদক্ষেপ ও জনরোষ তখন বৃদ্বি পাচ্ছিল দিনে দিনে।৭০র নির্বাচনে সবপক্ষ এক হয়ে যায় এবং পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা স্বাধীন দেশ গঠনের মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় আওয়ামীলীগকে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা দানের মাধ্যমে।মজলুম নেতা মাওলানা ভাসানি তখন “ভোটের বাক্সে লাথি মার-বাংলাদেশ স্বাধীন কর” স্লোগান দিয়ে ও তার মার্কা কুড়েঘরকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়ে দেশ স্বাধীনের আরেক ধাপ এগিয়ে দেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাত্রলীগের চৌকষ নেতৃত্বের ফর্মুলায় ৭ই মার্চ রেসকোর্সে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্বে সর্বাত্তক প্রতিরোধের ডাক দেন।১৯৪৭ থেকে চলে আসা বঞ্চনার বিরুদ্বে জন প্রতিরোধ শুরু হয় এবং উত্তাল জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।প্রতিরোধের ঘোষক ও সেই সময় রাজনীতির মঞ্চে মুল নায়কের ভুমিকায় থাকা বঙ্গবন্ধু আত্মগোপনে চলে যান এবং স্বেচ্ছায় গ্রেফতার বরন করেন।এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বর্বর হামলা শুরু করলে নেতৃত্বে শুন্যতায় ভুগতে থাকা জাতি দিশেহারা হয়ে যায়।সেই সময় চট্রগ্রাম কালুরঘাট থেকে বেতারে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দেশপ্রেমিক সামরিক অফিসার তরুন মেজর জিয়ার কন্ঠ থেকে “স্বাধীনতার ঘোষনা”।পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষ কর্তার এ ঘোষনা দিশেহাতা জাতি ও মুক্তি বাহিনীর নয় মাসের সংগ্রাম শুরু ও শেষ করতে মুল প্রেরনার বিষয় হয়েছিল।শুধু এ ঘোষনাতেই তিনি ইতি টানেননি।নিজ নামের অদ্যক্ষর “জেড” অনুসারে গঠিত জেড ফোর্সের নেতৃত্বও দেন তিনি।স্বশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত জিয়ে জীবনবাজি রেখে লড়াই করেন শেষ পর্যন্ত।৭১র ১৬ই ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়া পর্যন্ত জিয়া ছিলেন যুদ্বের ময়দানে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে।তার পরিবারকেও কম শাস্তি পেতে হয়নি।তবুও দমেননি জিয়া।লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন তিনি।৬৫তে পাকিস্তানের পক্ষে জীবনবাজি রাখা মেজর জিয়া ৭১এ স্বজাতির স্বাধীনতার মহান ঘোষক হননি শুধু সাথে হয়ে উঠেন সংগ্রামের প্রতীক বীরযোদ্বা। দেশ স্বাধীন হল।শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দেশে এসে সরকার গঠন করলেন।সেনাবিহিনী পুনর্গঠিত হল।সিনিয়র হওয়া সত্বেও জিয়াকে পাশ কাটিয়ে কাপুরুষ কে এক সফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করা হল।জিয়া বীর প্রতিক উপাধী পেলেন।৭১র মহান ঘোষক রাণাঙ্গনের বীরযোদ্বা জিয়া একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে দেশপ্রেম থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন।রাজনীতিতে নাক গলানোর কোন প্রামান্য নজির নেই।রাজনীতিতে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে ৭৫র ১৫ই আগষ্ট নির্মমভাবে স্বপরিবারে(২কন্যা বাদে)নিহত হন দেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।জিয়া তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান।সেনা প্রধান অপদার্থ সফিউল্লাহ।শেখ সাহেবকে হত্যা করলেও সরকারে পরিবর্তন আসেনি।আওয়ামীলীগই ক্ষমতায় থাকে।শুধু প্রেসিডেন্ট পদে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট বন্ধু খন্দকার মোশতাকের পদোন্নতি ছাড়া গোটা মন্ত্রীসভা ছিল আওয়ামীলীগের।এরই মাঝে মোশতাক সরকার থাকাবস্থায় নানা মেরুকরন ও সেনাবিহিনীর মাঝে বিশৃংখল পরিস্থিতিতে সেনা প্রধানের দায়িত্বে আসেন জিয়া।কিন্তু দায়িত্ব পালনের আগেই তাকে ভারতের পেইড এজেন্ট খালেদ মোশাররাফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী একটি গ্রুপ বন্দি করে রাখে।সে অনেক লম্বা ইতিহাস।নানা নাটকীয়তা ও রহস্যে ভরা সেই কয়দিন জিয়ার উপর দিয়ে সাইক্লোন বয়ে যায়।অতঃপর ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার স্বতস্ফুর্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার পাদপীটে চলে আসেন জিয়া।সেনা প্রধান জিয়া হয়ে উঠেন রাজনীতিবিদ ও প্রেসিডেন্ট। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়া জিয়া সামরিক উর্দি ছেড়ে গনরায় নিয়ে নির্বাচিত হয়ে আসেন।রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের ৫৬হাজার বর্গমাইল চষে বেড়াতে শুরু করেন।রাজনৈতিক দলগুলোকে উম্মুক্ত করে দেন।বহুদলীয় গনতন্ত্র প্রবর্তন করেন।গনমাধ্যম স্বাধীন করেন।অল্প কয়দিনের মাঝেই সারাদেশে জিয়া জিয়া রব উঠে মানুষের মুখে মুখে।সেই রব মুখ থেকে হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নেয়।যার প্রমান পাওয়া যায় জিয়ার শাহাদাতের পর জানাজায় এবং আজো তার দলের জনপ্রিয়তায়।জিয়া মাত্র কয় বছর দেশ সেবার সুযোগ পেয়েছিলেন।

জিয়া মাত্র কয় বছর দেশ সেবার সুযোগ পেয়েছিলেন।কিন্তু এই সময়ের মাঝেই জিয়া দেশের গন্ডির বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিজ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপুর্ন চরিত্র হয়ে উঠেন।সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা জিয়া, ইরাক-কুয়েত যুদ্বের মিমাংসার মুল কেন্দ্রীয় চরিত্র জিয়া।আধিপত্যবাদিদের আতংকের কারন জিয়া।আবার দেশের সর্বস্থরের জনসাধারনের হৃদয়পটে থাকা বাংলার রাখাল রাজা জিয়া।সামরিক বাহিনীর বিভ্রান্ত কিছু অফিসার ও আধিপত্যবাদিদের নোংরা খেলায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও সেবক মাত্র অপেক্ষাকৃত তরুন বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু তার নাম রয়ে গেছে আজো।যতদিন এই দেশ থাকবে, এই দেশের ইতিহাস লিখা হবে ততদিন “জিয়া” নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যাবেনা।জিয়ার জীবনের মাত্র এক দশক পর্যালোচনা করলে কলমের কালি শেষ হবে কিন্তু লেখকের আত্মা তৃপ্ত হবেনা।ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় প্রেসিডেন্ট এই কামনা। মিমাংসার মুল কেন্দ্রীয় চরিত্র জিয়া।আধিপত্যবাদিদের আতংকের কারন জিয়া।আবার দেশের সর্বস্থরের জনসাধারনের হৃদয়পটে থাকা বাংলার রাখাল রাজা জিয়া।সামরিক বাহিনীর বিভ্রান্ত কিছু অফিসার ও আধিপত্যবাদিদের নোংরা খেলায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও সেবক মাত্র অপেক্ষাকৃত তরুন বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু তার নাম রয়ে গেছে আজো।যতদিন এই দেশ থাকবে, এই দেশের ইতিহাস লিখা হবে ততদিন “জিয়া” নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যাবেনা।জিয়ার জীবনের মাত্র এক দশক পর্যালোচনা করলে কলমের কালি শেষ হবে কিন্তু লেখকের আত্মা তৃপ্ত হবেনা।ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় প্রেসিডেন্ট এই কামনা।লেখক :মাহবুব সুয়েদ,পর্তুগাল প্রবাসী উদীয়মান সাংবাদিক!

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!