জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবি পার্টি

জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবি পার্টি। দলটির সহকারি সদস্য সচিব এবিএম খালিদ হাসানের পাঠানো এক প্রতিবাদ পত্রে বলা হয়েছে-

এবি পার্টি প্রসঙ্গে সম্প্রতি দৈনিক মানব জমিন, বাংলা ট্রিবিউন সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব ডা. শফিকুর রহমানের একটি ভিডিও ক্লিপে রিলিজ করা বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

সেখানে তার বক্তব্যের এক অংশে তিনি বলেন – “মে মাসের ২ তারিখে এবি পার্টি গঠনকালীন তারা তাদের দলীয় মেনিফেস্টো ঘোষনার সময় বলেছেন- এবি পার্টির নীতি ও কর্মকৌশল হবে তিনটা জিনিষের উপর ভিত্তি করে সাম্য, সামাজিক সুবিচার ও মানবাধিকার। এটার উপরে তারা কাজ করবেন। তারা তাদের সেশনে পরিস্কার করে বলেছে যে, তাদের কর্মসূচিতে তাদের এজেন্ডায় ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের এই চাপ্টার থাকবেনা। এটাকে বাদ দিয়েই হবে তাদের সবকিছু।”

জনাব শফিকুর রহমানের এই বক্তব্যে প্রদত্ত তথ্য ভুল, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে আমরা মনেকরি। তাই আমরা এর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।

তিনি একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা এবং দায়িত্বশীল পদে আসীন বিধায় আমরা তাঁর জ্ঞাতার্থে ও জাতির সামনে এ ব্যপারে সঠিক তথ্য তুলে ধরছি।

এবি পার্টি ২মে তারিখে দলের যে ৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তার প্রথম দফা হলো ‘জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা’। যেখানে বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যকার বিভেদ ও বিভাজন সৃষ্টিকারী সকল মত ও পথ পরিহার করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন মূলনীতির ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা”।
আমাদের কর্মসূচির একটি দফা কে তিনি সম্ভবত: ভুলবশত: পুরো দলের মূলনীতি ও কর্মকৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া এই তিন মূলনীতি মূলত: মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের প্রতিশ্রুত মূলনীতি। যেখানে ‘মানবিক মর্যাদা’র বিষয়টিকে তিনি অসাবধানতাবশত: ‘মানবাধিকার’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি আরও বলেছেন ‘এবি পার্টির কর্মসূচিতে ও এজেন্ডায় ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের এই চাপ্টার থাকবেনা। এটাকে বাদ দিয়েই হবে তাদের সবকিছু।”
তাঁর এই তথ্য ও বক্তব্য সম্পুর্ণ অসত্য এবং কল্পনা প্রসূত। এ ধরনের কোন কথা বা ঘোষণা আমাদের ২ তারিখের ঘোষিত মেনিফেস্টো, কর্মসূচি বা এজেন্ডায় উল্লেখ নেই। তিনি কিসের ভিত্তিতে এই ধরনের কল্পিত তথ্য উপস্থাপন করলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা চ্যালেঞ্জ করছি তিনি যেন তাঁর বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে নৈতিকতার পরিচয় দেন।
এক্ষেত্রেও আমরা সবার জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই যে, এবি পার্টির তৃতীয় দফা কর্মসূচি হলো ‘প্রেরণা সৃষ্টি’ যাতে বলা হয়েছে- ‘দেশপ্রেম, নৈতিক দৃঢ়তা, সুশাসন, ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মতৎপরতা পরিচালনা।”

এবি পার্টির প্রথম ও তৃতীয় দফা কর্মসুচি যে কোন সাধারণ মানুষ পড়লেই বুঝতে পারবেন যে, এখানে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পত্রে প্রদত্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ কে কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অথচ জনাব শফিকুর রহমান অকপটে বললেন আমাদের কর্মসূচিতে ও এজেন্ডায় ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের চাপ্টার থাকবেনা। এটাকে বাদ দিয়েই হবে আমাদের সবকিছু।”
তাঁর মত একজন দলীয় প্রধানের এহেন ভিত্তিহীন বক্তব্যে আমরা বিস্মিত ও হতবাক।

এবি পার্টি গঠনের শুরু থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক শ্রেণীর উগ্র জামায়াত সমর্থক এবি পার্টিকে ধর্মহীন, সেক্যুলার, আদর্শহীন হিসেবে উল্লেখ করে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকে। জামায়াত দলীয় ভাবে কখনোই তাদের এই উগ্র কর্মীদের দায়িত্ব স্বীকার করেনি। আজ দলের আমীরের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে এই উস্কানীমূলক অপপ্রচারের পেছনে দলীয় হাই কমান্ডের মনোভাবই মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে যা খুবই দূ:খজনক।

তবে জামায়াতের আমীর কে আমরা ধন্যবাদ জানাই যে, তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের সাথে আমাদের আদর্শিক পথ একেবারে আলাদা।

আমরা অত্যান্ত সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই এবি পার্টির লক্ষ্য হলো-‘ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যান রাষ্ট্রে উন্নীত করা”।
এবি পার্টি কোন রাজনৈতিক দলকে তাঁর দলীয় কর্মসূচি ও নীতি দিয়ে মূল্যায়নে বিশ্বাস করে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কে দ্বীনের পরিপূর্ণ অনুসারী, কে কোন মাজহাব বা মতবাদে বিশ্বাসী সে বিচারে কাউকে পথভ্রষ্ট, বাতিল, দ্বীনে ইলাহীর অনুসারী ইত্যাদি বিভেদ সৃষ্টিকারী মন্তব্য করা অনুচিত বলে মনেকরে। দূ:খজনক ভাবে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলো একে অপরকে এ ধরনের ফতোয়া দিয়ে নিজেদের মাঝে হিংসাত্মক অনৈক্যের পরিবেশ তৈরী করছে।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই নাগরিকের অধিকার ভিত্তিক কল্যানরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এবি পার্টির আদর্শিক নীতি। এর বাইরে কেউ যদি অন্য কোন নীতি বা পরিচয়ে এবি পার্টিতে চিত্রায়িত করতে চায় সেটা হবে তাদের কল্পনা প্রসূত অনৈতিক অপপ্রচার।
জামায়াতের আমীর জনাব শফিকুর রহমান এবি পার্টির লোকদের ‘আল্লাহ যেন দ্বীনের পথে আবার পরিপূর্ণ ভাবে ফিরাইয়া আনেন” এই দোয়া করার আহবান জানানোয় এবং প্রাসঙ্গিকভাবে ‘মুসলমানের জীবন কখনো খন্ডিত হতে পারেনা” বলায় এটা মনেহয়েছে যে তিনি এবি পার্টির লোকদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত এবং খন্ডিত মুসলমান মনে করেন। একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য দোয়া করবেন এটা ধর্মীয় রীতি ও পুণ্যের কাজ। কিন্তু একটি দলের প্রধান অন্য একটি রাজনৈতিক দল সম্পর্কে ‘দোয়া’ করার নাম করে এরকম অশোভন ইংগিতপূর্ণ মন্তব্য বাংলাদেশে বিরল ঘটনা। আমরা তাঁর মত সম্মানিত ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের বিভেদ ও অপরাজনীতিমূলক আচরণে ব্যথিত। এরকম রাজনৈতিক চর্চা চালু হলে প্রত্যেক দলই একে অপর দলের জন্য হেদায়াতের পথে আসার, পরিপূর্ণ মুসলমান হবার জন্য দোয়া করতে থাকবে। যা এক ধরনের অসুস্থ সংস্কৃতির জন্ম দেবে এবং মূলত: ধর্মেরই অবমাননা হবে।

একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে জনাব ডা. শফিকুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের নিকট থেকে আমরা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও শিষ্ঠাচার প্রত্যাশা করি। আশাকরি তিনি ও তাঁর দলের কর্মীরা এ ব্যপারে সততা ও পরমত সহিষ্ণুতার স্বাক্ষর রাখবেন।
সূত্র: মানব জামিন

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!