ছাত্র রাজনীতি:প্রেক্ষিতবাংলাদেশ এম,এ,মান্নান আজাদ

নেতিবাচক ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস এবং যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় দেশের সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ছাত্রদের ভবিষ্যত্ নিয়ে সবাই শংকিত। আমরা জানি ছাত্র যার অভিধা, অধ্যয়ন তার তপস্যা। ভবিষ্যত্ জীবন সুন্দরভাবে গড়তে অধ্যয়নের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনই ছাত্রসমাজের প্রধান কাজ। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হয়ে পড়েছে ছাত্রসমাজ। ছাত্র রাজনীতির যে ঐতিহ্য ছিল, তা আজ বিলীন হতে বসেছে। শিক্ষার্থীদের কাছে নিয়মানুবর্তিতা, শৃংখলা ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ যেখানে কাঙ্ক্ষিত, সেখানে এর বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে বেশি।

ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশে এখন ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। অথচ এ দেশেই রয়েছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অতীত।  কিন্তু সে অবস্থা এখন আর নেই। স্বাধীন দেশে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এখন ছাত্ররা দেশের স্বার্থের কথা ভাবে না। ভাবে নিজেদের স্বার্থের কথা। রাজনীতিতে তাদের যে আদর্শ ছিল তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বার্থ যেখানে মুখ্য, সংঘাত সেখানে অনিবার্য। ছাত্র সংগঠনগুলো শুধু যে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে থাকে তা নয়, সংগঠনের অভ্যন্তরেও সংঘাত দানা বেঁধে ওঠে-স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগলেই। ছাত্র সংগঠনগুলো অতিমাত্রায় দলীয় রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়ায় তাদের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে। সংগঠনগুলো সামান্য কারণেই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হচ্ছে। অনেক মেধাবী ছাত্রের জীবন এভাবে অকালে ঝরে পড়ছে। সংঘাতের কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিঘ্নিত হচ্ছে লেখাপড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ।

বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ঐতিহাসিক ১১ দফা, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-র নির্বাচন, ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করার ভ্যানগার্ড হিসেবে তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অপরিসীম। পরবর্তীতে ’৯১-র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও এদেশের ছাত্র রাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকা। আর এ কারণেই জনগণের কাছে ছাত্র রাজনীতির আলাদা একটা গ্রহণযোগ্যতা আমাদের দেশে ছিল এবং এখনও কিছুটা রয়েছে।
ওই সময় ছাত্র রাজনীতিতে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের দূষণ পরিলক্ষিত হয়নি। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই নেতৃত্বে আসতেন এবং তারা সমাজে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও সম্মান পেতেন। ব্যক্তিস্বার্থ বা আর্থিক সুবিধার জন্য কেউ ছাত্র রাজনীতি করতেন না। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির বহুল পরিচিত চার খলিফা (নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন) থেকে শুরু করে ওই সময়ের অন্যসব জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ছাত্রনেতারাও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি করতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে ছাত্ররা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে পরবর্তীতে তারা প্রত্যেকেই এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে একেকটি পিলার হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি তারা প্রায় সবাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন।
ওই সময়ের ছাত্র রাজনীতির উন্মেষ ঘটেছিল জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা তৈরির অনুঘটক হিসেবে কাজ করার জন্য। সেই আমলে ছাত্রদের রাজনীতি ও আন্দোলন করার মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং অধিকার সচেতনতা ছিল। দেশ ও দেশের মানুষের স্বাধিকার ও অধিকার আদায়ের তীব্র বাসনা কাজ করত ছাত্রদের মধ্যে। বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে তাদের মধ্যে তীব্র আবেগ কাজ করত। যেই আবেগ দিয়ে তারা শোষণ,স্বৈরাচার আর সামরিক শাসকের হুংকারকে পরাজিত করতে পেরেছিল।
গত তিন দশকে ছাত্র রাজনীতির চারিত্রিক ও গুণগত মান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ওই সময়ে ছাত্র রাজনীতি তার চিরায়ত গণমুখী ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতামুখী দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে শেখে। তাই ছাত্র রাজনীতি আর আধিপত্যের সম্পর্ক একটি আরেকটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে পড়ে। হারিয়ে যাওয়া ছাত্র রাজনীতির সর্বোচ্চ হাতিয়ার ছিল লেখাপড়া, বইখাতা, কাগজ-কলম, লাঠি। আর এখনকার ছাত্র রাজনীতির হাতিয়ার হল- মদ-গাঁজা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভাড়ায় শক্তি প্রদর্শন, মাদক বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, হলে সিট বাণিজ্য, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, কাটা রাইফেল, রিভলবার। এগুলোর পরে যদি সম্ভব হয় তাহলে কিছুটা লেখাপড়া আর নামকাওয়াস্তে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শুধু ছাত্রত্ব ধরে রাখার জন্য। তাও নাকি বর্তমান সময়ের ছাত্রনেতারা নিয়মিত করেন না। যথাসময়ে পাস করে বের হয়ে গেলে নাকি পদ-পদবিপ্রাপ্ত নেতা হওয়া যায় না। যারা বর্তমান ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছে, তাদের প্রথমেই হতে হবে অপেক্ষাকৃত মেধাশূন্য অথবা ভান করতে হবে কিছুই জানে না এমন, হতে হবে ভালো চামচা, থাকতে হবে পেশিশক্তি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির সামর্থ্য। এগুলো থাকলেই উপরের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে এবং ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মিলবে।অবশ্য সম্মানজনক ব্যতিক্রম এখনো আছে!

ছাত্রজীবন হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের সময়। জ্ঞান বিজ্ঞান, ইতিহাস দর্শন নিয়ে ভাবতে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা খুলে দেখতে পাই ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের চিত্র। অশুভ রাজনীতির হাতছানিতে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে তারা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ নষ্ট করছে। দলীয় রাজনীতির অশুভ স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিলে বিদ্যার্জন ব্যাহত হতে বাধ্য।

বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রদের সাধারণ মানুষ আদর্শহীন, চরিত্রহীন, অর্থলোভী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজ, মূর্খ সর্বোপরি সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মানুষ বলে মনে করেন। কিন্তু এ কথাও সত্য এবং ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত, ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছে এবং আদর্শবান ছাত্র নেতারাই রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেই ৫২, ৬২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর ঐতিহ্য আজ অনুপস্থিত। ইচ্ছা করলেই ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, মুক্তিযুদ্ধের মতো আবেগী অনুষঙ্গ আজকে তৈরি করা যাবে না। বর্তমান সময়ের অনুষঙ্গ নতুন, ক্ষেত্রবিশেষ অতীতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মত প্রকাশে বাঁধা, বেকারত্ব, হত্যা, খুন, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো ইস্যুগুলো এ দেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা তৈরির পথে প্রধান বাধা হিসেবে জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের সমাজের ওপর চেপে বসছে। এর থেকে মুক্তির জন্য আজকের ছাত্র সমাজ কেন ভূমিকা রাখতে পারছে না। এখনও তো সারা দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন সাধারণ ছাত্রদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ বন্ধ থাকার কারণেই ছাত্র রাজনীতি বর্তমান সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রতিযোগিতা ছাড়া কোনো ভালো কাজ সফলতার মুখ দেখে না। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সরকার ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছাত্র সংগঠন এমন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে রাখে যেখানে প্রতিযোগিতার কোনো পরিবেশ থাকে না। যেখানে ভিন্নমত, ভিন্নদল থাকবে না, সেখানে মেধাবী নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে না। ছাত্র রাজনীতিকে আবার দেশপ্রেমিক ও যোগ্য নেতৃত্বের সূতিকাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে সব রাজনৈতিক মত ও দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিদ্বন্দ্বি^তা নয়, প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিই পারে ছাত্র রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে আবার গ্রহণযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে। রাতের আঁধার যতই গভীর হোক না কেন, সকালের সূর্য অবশ্যই উদিত হবে। আমার বিশ্বাস নির্লোভ, আপসহীন ত্যাগের মানসিকতাসম্পন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে অচিরেই ছাত্র রাজনীতি সুষ্ঠু ও সঠিক ধারায় ফিরে আসবে আর তখনই ছাত্র রাজনীতির প্রতি জনগণ আস্থাশীল হবে।

লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক,সম্পাদক www.eurovisionbd.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!