চীনের পুনঃদীক্ষা ক্যাম্পে হাজার হাজার কাজাখ মুসলিম

কাজাখদের জন্য ‘পুনঃদীক্ষা ক্যাম্পের’ নামে গোপন কারাগার প্রশ্নের মুখে চীন-কাজাখ সম্পর্ক – ছবি : সংগৃহীত

চীনের পশ্চিমাঞ্চলে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গোপন ‘পুনঃদীক্ষা ক্যাম্পে’ হাজার হাজার জাতিগত কাজাখ মুসলিমকে আটকে রাখা হয়েছে। কাজাখস্তানের আদালতে একটি মামলায় এমন তথ্য উঠে আসায় চীনের সাথে দেশটির সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

চীনে বসবাসকারী একজন জাতিগত কাজাখ সায়রাগুল সওতবের একটি মামলায় এ তথ্য উঠে আসে। কাজাখস্তানে থাকা স্বামী ও দুই সন্তানের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগ আনা হয় সায়রাগুলের বিরুদ্ধে; কিন্তু চীনের জিনজিয়াংয়ে ক্যাম্পে জোরপূর্বক কাজ করানোর ব্যাপারে ৪১ বছর বয়সী সায়রাগুলের সাক্ষ্যটিই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।

এক পাবলিক শুনানিতে সায়রাগুল বলেন, তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত ও গ্রহণযোগ্য কিছু ডকুমেন্ট প্রদান করেছেন, যা ‘পুনঃদীক্ষা কেন্দ্রগুলোর’ বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ব্যাপারে আলোকপাত করে। এসব কেন্দ্রের বেশির ভাগই পূর্ণ করা হয় সংখ্যালঘু মুসলিম গোষ্ঠীর সদস্যদের দিয়ে। চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সায়রাগুল যখন কসম করে বলেন, তিনি যে ক্যাম্পে কাজ করতেন, সেখানে আড়াই হাজার কাজাখ আটক রয়েছেন। তার এ বর্ণনা শুনে আদালতে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, চীন এ ধরনের ক্যাম্পকে ‘রাজনৈতিক ক্যাম্প’ বলে আখ্যায়িত করে, কিন্তু এগুলো আসলে পাহাড়ের ওপর স্থাপন করা কারাগার। সায়রাগুল এ সময়ে কাজাখ সরকারের কাছে তাকে আর কখানো চীনে না পাঠানোর অনুরোধ করেন। সায়রাগুলের ওই শুনানিতে চীনের দুইজন কূটনীতিক উপস্থিতি ছিলেন, তবে তারা সমাজকর্মী বা সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।

এই লোকটিকে গুম করে দেয়া হবে
সায়রাগুল ওই ধরনের হাজারো কাজাখের একজন যারা জিনজিয়াংয়ে জুলুম-নিপীড়নের পর আত্মীয়স্বজন থেকে পৃথক হয়ে গেছেন। চীনা প্রশাসন তাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও চরমপন্থী আখ্যা দিয়ে তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। জিনজিয়াংয়ে ১৫ লাখ কাজাখ বাস করেন।
চীনা কর্তৃপক্ষ উইঘুরদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তার তুলনায় কাজাখরা কিছুটা স্বাধীন ছিল। তারা স্বাধীনভাবে চীন ও তাদের ঐতিহাসিক মাতৃভূমিতে আসা-যাওয়া করতে পারত। ১৯৯১ সালে মধ্য এশিয়ার দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর দুই লাখ লোক কাজাখের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে; কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে চীনা সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ মুসলমানদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে। সে সময় গণ-আটকের ক্ষেত্রে এবং পুনঃদীক্ষা কেন্দ্রে অধিক হারে মুসলমানদের দেখা যায়। সে সময় মুসলমানদের পাসপোর্টের অধীনে আনার জন্য একটি অভূতপূর্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনা সরকার। এতে কাউকে পাসপোর্টের জন্য অফিসিয়াল অনুরোধ জানাতে তাকে আগে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

এ সময় সায়রাগুল একটি স্থানীয় কিন্ডার গার্টেনের পুনঃদীক্ষা কেন্দ্রে যুক্ত হন; কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার স্বামী ওয়ালি ইসলামের সাথে কয়েক মাস ধরে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। এ বছরের এপ্রিলে সীমান্ত অতিক্রম করার পর পরিবারের সাথে সায়রাগুলের দেখা হয়; কিন্তু ২১ মে কাজাখস্তানের নিরাপত্তাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে।

সায়রাগুলের আইনজীবী আবজেল কুসপানভ আদালতে বলেন, আমরা এটা বলছি না যে, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে সে কোনো অপরাধ করেনি। আমরা বিষয়টি আদালতে তুলেছি এবং সাজাভোগে আমরা প্রস্তুত; কিন্তু তাকে আর চীনে ফেরত পাঠাবেন না। কারণ তাকে যদি আবারো চীনে পাঠানো হয়, তাহলে সে নিশ্চিতভাবেই গুম হয়ে যাবে।

কূটনৈতিক উত্তেজনা
জিনজিয়াংয়ের কাজাখ জনগোষ্ঠীর এ পরিস্থিতি কাজাখ সরকারের জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। কারণ দেশটি মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রধান অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য রুট নির্মাণে চীন তার ট্রিলিয়ন ডলারের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজাখস্তানকে সাথে রেখেছে।

কাজাখ সরকার এ ব্যাপারে বেইজিংয়ের মুখোমুখি হতে দ্বিধাবোধ করছে। তবে দেশটির সরকারের ওপর এ দমননীতির বিরুদ্ধে কথা বলার চাপ বাড়ছে। জনচাপের কারণে কাজাখস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জিনজিয়াংয়ে আটক থাকা কাজাখদের ব্যাপারে একটি বস্তনিষ্ঠ ও ন্যায্য পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে দেশটিতে বেশির ভাগ বিনিয়োগ চীনের হওয়ায় কাজাখ সরকার এ ইস্যুতে অনেকটাই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

একজন কাজাখ রাজনৈতিক কর্মী সেরিকজান ম্যামবেথালিন বলেন, সায়রাগুলের এ শুনানি আসলে কাজাখস্তান ও চীনের সম্পর্কের পরিপূর্ণতার একটি পরীক্ষা; কিন্তু যদি কোনো কাজাখকে সরকার চীনে ফেরত পাঠায়, তাহলে জনগণ বলবে, সরকার তার জনগণকে রক্ষা করতে অক্ষম। সূত্র : এএফপি

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!