চট্টগ্রাম বন্দরের কর্তৃত্ব ও মংলা বন্দর কব্জায় নিতে ভারতের তোড়জোড় 

 

করিডোর কিংবা ট্রানজিট চুক্তির আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ‘পরীক্ষামূলকভাবে’ এমভি ইরাবতী স্টার জাহাজে আনীত ভারতীয় পণ্য খালাস করা হয় ২০১৫ সালের ২ জুন। বন্দরের ১৩নং জেটিতে ভারতের তিনটি বন্দরগামী পণ্যভর্তি ৯২টি কন্টেইনার নামানো হয়। এরপর ৮৫টি কন্টেইনার নিয়ে ১৩ জুন’১৫ইং চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে এমভি ওশান প্রæব জাহাজ। পণ্যবাহী এসব কন্টেইনার ভারতের চেন্নাই, নভোসেবা, কোচিন বন্দরে নেয়া হয়।
 
বিগত ৬ ও ৭ জুন’১৫ইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক এবং উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি সই হয়। অথচ নয়াদিল্লীর বিশেষ আগ্রহে সেই কোস্টাল চুক্তির পর গত প্রায় তিন বছরে তিনটিও উপকূলীয় জাহাজ ভারত থেকে আসেনি। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, কোস্টাল চুক্তিটি শুধুই ‘সেরে’ নেয়া হয়েছে। তাহলে দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির আশ্বাস কোথায় গেল? আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর ব্যবহারের পর থেকেই চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে করিডোর সুবিধায় পেতে ভারত পীড়াপীড়ি করছে। এরজন্য পূর্ণাঙ্গ করিডোর চুক্তি চায়। উভয় বন্দরে ভারতের মালামাল নৌ, রেল ও সড়কপথে পরিবহন এবং হ্যান্ডলিং করার জন্য ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত ইয়ার্ড বা জায়গা’ সুনির্দিষ্ট করেও পেতে চাইছে। ডিসেম্বরে’১৬ইং অনুষ্ঠিত ঢাকা-দিল্লী নৌ-পরিবহন সচিব পর্যায়ের বৈঠকে ‘বিশেষায়িত ইয়ার্ডে’র বিপক্ষে যুক্তি সহকারে দুই বন্দরে কন্টেইনারসহ কার্গোজট এবং জাহাজের জট আরো বৃদ্ধির আশঙ্কার দিকগুলো তুলে ধরা হয়। তা সত্তে¡ও উভয় বন্দরে ট্রানজিট এবং ভূখন্ড ব্যবহার করে করিডোরের আবদার থেকে সরে আসেনি ভারত। এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরি হওয়ার আগেই চুক্তির জন্য পীড়াপীড়ি করছে। তাছাড়া ট্রানজিট ফি নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা, শুভঙ্করের ফাঁকি। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। যেমন- আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরের জন্য ২০১১ সালে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের কোর কমিটির ট্রানজিট ফি টনপ্রতি ১ হাজার ৫৮ টাকা। অথচ ১৯২ টাকা হারে নামেমাত্র ট্রানজিট ফি নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুল্ক-কর হিসেবে পায় মাত্র ১৩০ টাকা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৫২ টাকা এবং বিআইডবলিউটিএ ১০ টাকা।
 
বন্দর-শিপিং ব্যবহারকারী তথা স্টেক হোল্ডারগণ মনে করেন, ভারতকে করিডোর দেয়ার মতো আদৌ সক্ষমতা চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের নেই। আমদানি-রফতানিতে লিড টাইম ঠিক রাখতে গিয়েই বন্দরের হিমশিম দশা। ভারতকে কথিত ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেডিকেটেড ইয়ার্ড’ দেয়া যাবে কোথায়? আনোয়ারা ও মিরসরাইসহ চট্টগ্রামে আরো কয়েকটি ইকনোমিক জোন স্থাপিত হলে চাপ মোকাবিলা কঠিন হবে। দেশের সড়ক-মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়কের অবস্থা আরও নাজুক। ইতোমধ্যে ভারতের ট্রানজিট পণ্যের বাড়তি চাপের কারণে সিলেটের তামাবিল ও শেওলা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া অভিমুখী সড়ক ভেঙেচুরে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ট্রানজিটে চলতে গেলে হেভী ট্রাক-লরির বহর চলাচলে দেশের লাইফ লাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে। কেননা দেশের আমদানি-রফতানিমুখী পণ্যের ৮২ শতাংশ পরিবহন করা হয় এ মহাসড়কে। যার বেশিরভাগেরই গন্তব্য ঢাকা ও আশপাশ এলাকা।
 
চট্টগ্রাম বন্দরে ট্রানজিট ও দেশের ভূখন্ডের অবকাঠামোসমূহ করিডোর সুবিধায় পেতে ভারত তদবির ও প্রস্তুতি শুরু করে আগেই। এর অন্যতম ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি ভারতে পণ্য পরিবহন। ত্রিপুরার সাবরুমের আনন্দপাড়া থেকে রামগড়ের মহামুনি পর্যন্ত ৪১২ মিটার দৈর্ঘ এবং ১৪.৮ মিটার চওড়া সেতু নির্মিত হচ্ছে। এরজন্য ভারত সরকার ১২৫ কোটি রুপি দিচ্ছে। তাছাড়া ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে রেলপথ তৈরি হচ্ছে আখাউড়া পর্যন্ত। যে রুটে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যবাহী কন্টেইনার যাবে সরাসরি আগরতলা। বৃহত্তর সিলেটের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনরায় চালু হচ্ছে। এতে চট্টগ্রাাম বন্দর থেকে আখাউড়া-সিলেট করিডোর হয়ে করিমগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে সরাসরি মেঘালয়ে যাবে ট্রানজিট পণ্য। এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের ৫টি রাজ্যে। অন্যদিকে খুলনা-যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক-মহাসড়ক ও রেলরুটগুলো সংস্কার, উন্নয়ন করা হচ্ছে মংলা বন্দর ট্রানজিটের কব্জায় নেয়ার টার্গেটে।
 
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বর্তমান এবং অদূর ভবিষ্যতের চাহিদা সামাল দিতে হলে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন। বৃহৎ চীনা বিনিয়োগে আগের পরিকল্পনায় ফিরে গিয়ে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে মেগাপ্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়নে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। সেই সাথে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের দক্ষতা-সক্ষমতা বাড়াতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা জরুরি। চট্টগ্রাম বন্দরের এমপিবি-সিসিটি-এনসিটি নির্মাণসহ অতীত থেকেই উন্নয়ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা প্রমাণিত। বর্তমানে সিংহভাগ (প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা) চীনা সহায়তার কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র, একাধিক চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতুসহ বড়সড় টেকসই প্রকল্পে চীন সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে।
 
বন্দর ও ভূ-কৌশলগত বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদদের অভিমত
 
বন্দর ও ভূ-কৌশলগত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ জানান, সমুদ্রবন্দরে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যতটা করছে পৃথিবীতে আর কোথাও আজ পর্যন্ত তা কাউকে দেয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারত সেই ১৯৭২ সাল থেকেই দাবি করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতের ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। এরজন্য চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কতটুকু রয়েছে সেই তর্কে না গিয়েও বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা সম্পর্কিত ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তাছাড়া বাংলাদেশের রেলওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য ভারত যে সর্বমোট ৩শ’ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছে সেটাও কৈ-এর তেলে কৈ ভাজার শামিল। বাংলাদেশকে ভারতীয় ঋণ সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া এই ঋণ ব্যবহার করেও যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে সে অবকাঠামো ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলেই সবার আশঙ্কা। ট্রানজিট একটি স্পর্শকাতর জাতীয় বিষয়। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত স্পর্শকাতর অথচ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের বিষয়টি গভীর বিবেচনার দাবি রাখে।
 
অথচ ভারতকে বন্দর ব্যবহার ও ট্রানজিট দেয়ার বিষয়ে স্পষ্টতা বিরাজ করছিল। এর পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্কও রয়েছে। তবে ট্রানজিটের বিষয়টি নিছক অর্থনৈতিক মানদন্ডে বিচার করা সম্ভব নয়। কারণ এতে আমাদের অর্থনৈতিক লাভালাভের বিষয়াদি ছাড়াও রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিশাল ঝুঁকিও রয়েছে। সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠেছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তথা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কোনো অর্থনৈতিক মানদন্ডে বিচার-বিবেচিত হয় না। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সমূহ হুমকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এমনটি আশঙ্কা অনেকেরই। আসলে ভারত বাংলাদেশের ভূমি এবং আশুগঞ্জ নৌবন্দর ব্যবহার করে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যে মালামাল পরিবহনে করিডোর সুবিধা নিয়েছে।
 
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান গত ১৯ মার্চ থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে (টিআইসি) এক অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ভূ-রাজনৈতিক গুরত্ব বিবেচনায় কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে সরে আসা ঠিক হয়নি। এটি ভূ-রাজনৈতিক কারণে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতসহ সকল প্রতিবেশীর সাথে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত সমমর্যাদার ভিত্তিতে। শুধুই ‘নেব আর নেব’ এই মানসিকতা নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে সর্ম্পক দৃঢ় হয় না। চীন হোক আর ভারত হোক সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।
 
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম গতকাল ইনকিলাবকে জানান, চীন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর (ডিপ সী-পোর্ট) স্থাপনে এগিয়ে আসে। কিন্তু চীনকে আসতে দিতে চায়নি ভারত। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত আপত্তি জানানোর কারণে চীন তা বাতিল করেছে। তখনই এটি (ভারতের এ মনোভাব) আমার পছন্দ হয়নি। আমাদের অর্থনীতি আকার-আয়তনে বড় হচ্ছে। এর সাথে সাথে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রয়োজন। বর্তমানে বড়সড় জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না। সিঙ্গাপুর, কলম্বো, মালয়েশিয়ায় গিয়ে গার্মেন্টসসহ রফতানি পণ্য বড় জাহাজে শিপমেন্ট করতে গিয়ে খরচ বেশি পড়ছে। এখন মাতারবাড়ীতে জাপানের পরিকল্পনা অনুসারে যে জ্বালানি হাব স্থাপিত হচ্ছে সেখানে যদি পর্যাপ্ত গভীরতা (চ্যানেলের ড্রাফট) থাকে তাহলে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থায়নে পটুয়াখালীতে ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরে জবরদস্তি করে পায়রা বন্দর করা বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের ট্রানজিট বা করিডোর সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করিডোর একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। আমার মনে হয় বাংলাদেশ সরকার করিডোর অনুমোদন করবে না। তবে অনুন্নত অঞ্চল ত্রিপুরা ও মিজোরামে পণ্য পরিবহনে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য তারা আগ্রহী। আসামের আগ্রহ নেই।
 
উৎসঃ   ইনকিলাব

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!