‘গাজীপুরে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ কারচুপি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না’: সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন আহমদ

প্রথম কথা হচ্ছে, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অনেক রকম কথা, নানা মত ও সমালোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, সেটি ছিল শান্তিপূর্ণ কারচুপির নির্বাচন। সেখানে অনেক অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন (ইসি) সেসব আমলে নেয়নি। গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে আমরা অনেক প্রত্যাশার কথা বলেছিলাম, তারা যেন আগের ত্রুটি ও অসংগতিগুলো পরিহার করে এবং দায়িত্বশীল হয়। আমরা মানববন্ধন করেছি, পরামর্শ দিয়েছি—ইসি যেন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করে। তারা যেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং যেকোনো ধরনের অঘটন শক্ত হাতে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করে। সর্বোপরি নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয়; আর তারা দায়িত্ব পালনে যেন আরো দৃঢ় হয়। এখন যেটি দেখতে পাচ্ছি, ইসি আগের কোনো অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা আমলে নেয়নি, কাজেও লাগায়নি। গত মঙ্গলবার তো নির্বাচন হয়ে গেল। এখানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়তো হয়েছে, উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো গণ্ডগোল বা মারামারি-কাটাকাটি হয়নি; কিন্তু কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। কেন বন্ধ ছিল, তা জানা যায়নি। একে শান্তিপূর্ণ কারচুপি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

নির্বাচন চলাকালে দুপুরবেলা দেখতে পেলাম, কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে। ফলে অনেক মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ব্যালট পেপার তো এভাবে শেষ হওয়ার কথা নয়। এটি কিভাবে সম্ভব? একটি সেন্টারে কী পরিমাণ ভোটার আছে বা ভোট পড়তে পারে, সে অনুযায়ী তো ব্যালট পেপার ছাপানো হয়। কিন্তু এ দৃশ্য আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হয়েছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিনিধি থাকেন, যাঁরা নানাভাবে নির্বাচন মনিটর বা দেখভাল করেন। তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন যে অনেক ভোটকেন্দ্রে আন-অথরাইজড লোকজন ছিল। এটি আমাকে বিস্মিত করেছে। ভোটকেন্দ্রে তো থাকবে শুধু পোলিং অফিসার এবং প্রার্থীর এজেন্ট। এর বাইরে তো আলগা লোক থাকার কথা নয়। কিন্তু তাঁরা দেখেছেন, সেখানে এর বাইরেও অনেক লোক ছিল, যারা নির্বাচিত দায়িত্বশীল সদস্য নয়। এটি তো শোভন নয়। এভাবে সুষ্ঠু ও ভালো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।

আরেকটি বিষয় আমাকে অবাক করেছে—বিভিন্ন সেন্টারে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও সদস্যদের ভোটকেন্দ্র ঘিরে রাখতে দেখা গেছে। সেখানে বিএনপির সদস্য বা তাদের নির্বাচিত এজেন্টদের একেবারেই দেখা যায়নি। এ পরিবেশ কিভাবে তৈরি হলো, কেন হলো—সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, যিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন—অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম, তিনি বিপুল ভোট পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের পরামর্শ ও ইসির দায়িত্ব অনুযায়ী নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। ইসি কোনো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি। তারা পূর্বাপর বিভিন্ন নির্বাচনের ব্যাপারগুলো জেনে কোনো কিছু কাজে লাগায়নি এবং পরিষ্কারভাবেই বলা যায়, নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় অনিয়ম নিয়ে কিছু অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ করলে সেটি কার্যকর হবে কি না এবং অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত—এসব নির্বাচন কমিশনের দেখা উচিত ছিল। তারা তা করেনি। বিএনপির একজন কাউন্সিলর প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, তা নিয়ে কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। ইসি সে বিষয়ে কোনো জবাবই দেয়নি। এর জবাব দিয়েছে অন্য দল। এটা তো ঠিক হয়নি। কোনো অভিযোগ থাকলে সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জবাব দেবে। কিন্তু দেখা গেল, জবাব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ ও ওবায়দুল কাদের। এটি অত্যন্ত অন্যায় ও অনিয়ম। কোনো দলের কোনো রকম অভিযোগ থাকলে ইসিকে তার জবাব দিতে হবে কিংবা ব্যবস্থা নিতে হবে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের জন্য তারা অপেক্ষা করবে কেন? এ রকম ক্ষেত্রে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে বলে আমি মনে করি এবং নিয়মও এটাই। এমন কার্যকর পদক্ষেপ নিলে তবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, না হলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।

আরেকটি বিষয়—বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখলাম, আমি নিজেও পর্যবেক্ষণ করেছি, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্ট দেখা যায়নি বা তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে, তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে—এর বাস্তবতা কী, তা জানি না। কিন্তু এটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার বলে আমি মনে করি। কারণ এ অবস্থায় তো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। যেকোনো ধরনের ঘটনাই ঘটতে পারে; কিন্তু ইসির তো এগুলো দেখভাল করা কর্তব্য। দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেন পোলিং এজেন্ট ছিল না—এটি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। এটি না থাকা বা থাকতে না দেওয়া ভালো জিনিস নয়। কারণ সব দলের পোলিং এজেন্ট থাকতে হবে। পত্রিকায় বা টিভিতেও এ বিষয়ে কথা এসেছে। এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

আমাদের দেশে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে গেলে তিনটি জিনিস লাগবে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব যথাযথ ও নিরপেক্ষভাবে পালন করবে। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী কোনো অনিয়ম করবে না। তারা শৃঙ্খলা মেনে চলবে, কোনো অঘটন ঘটাবে না, প্রভাব বিস্তার করবে না এবং আইন-কানুন মেনে চলবে। আর তিন নম্বর হচ্ছে—সরকারকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাইতে হবে। সরকার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না চায় এবং সহযোগিতা না করে, তাহলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে না। সরকারের অনিচ্ছা বা অসহযোগিতা থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করা দুঃসাধ্য।

একটি উদাহরণ এখানে দিতে পারি। পূর্ব পাকিস্তানে আমরা ১৯৫৪ সালের নির্বাচন দেখেছি, তখন মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তারা ক্ষমতায় থেকেও নির্বাচনে হেরে গেল। কারণ তারা নির্বাচনে কোনো রকম প্রভাব বিস্তার করেনি। কোনো চালাকি করার চেষ্টা করেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে এসব চলে আসছে। নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়, নির্বাচন হয়। কিন্তু এভাবে চালিয়ে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন কোনোভাবে সম্ভব নয়। সামনে যে তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আছে—রাজশাহী, বরিশাল আর সিলেট; এসব নির্বাচনে যদি কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়, তাহলে ফল একই রকম হবে। এখানে কিছু বলার নেই।

আমরা যেটি প্রত্যাশা করি, আমাদের গণতন্ত্র সক্রিয় থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা তো প্যারালাইজড। সেই গণতন্ত্রকে বাঁচাতে এবং এগিয়ে নিতে হলে দরকার সঠিক উপায়ে নির্বাচন। সুষ্ঠু নির্বাচন। এটি যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়—বাস্তবায়ন করতে এর ভিত হচ্ছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন—তাহলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি স্থায়িত্ব লাভ করবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে যে কলুষতা আছে, সেগুলো দূর হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা সঠিক উপায়ে নির্বাচন করছি না এবং করতে দিচ্ছি না। সে জন্য গণতন্ত্রের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সামনে কোনো উন্নতির সম্ভাবনা আপাতত দেখতে পাচ্ছি না।

গাজীপুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিজয়ের পেছনে কিছু বিষয় চিহ্নিত করা যেতে পারে। যেমন—বিএনপির প্রার্থী অত্যন্ত বয়স্ক এবং তিনি ভালো করে হাঁটাচলা করতে পারেন না। সেই তুলনায় সরকারি দলের প্রার্থী তরুণ এবং বলা যায়, জনপ্রিয়। গতবার গাজীপুরে বিএনপির নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। তাঁরা পাঁচ বছর সেখানে ছিলেন। তিনি দায়িত্বে ছিলেন বা অসুস্থ ছিলেন; কিন্তু তিনি কোনো কাজ করতে পারেননি বা তাঁকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। কারণ তিনি বেশির ভাগ সময় কারাগারে ছিলেন। এটিও জনগণের মনে প্রভাব ফেলতে পারে। অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর নির্বাচিত হলে মানুষের জন্য কাজ করতে পারবেন এবং তাঁর বয়সও কম। এটিও ফ্যাক্টর বলে আমি মনে করছি।

আমাদের একটাই দাবি—তা হচ্ছে, যিনিই নির্বাচিত হোন না কেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এটি সমাজের কারো জন্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা,অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ, উৎস- নয়া দিগন্ত

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!