গল্প: প্রবাসের কান্না:মুনীরুল ইসলাম

নিয়ন বাতির শহরে পূর্ণ চাঁদকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে শামিমের ৷ বিশাল অট্টালিকার শহরেও কেমন বিষাদ ছেয়ে আছে প্রতিটি ধুলিকণায়৷ পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে শহরজুড়ে ৷ দূর থেকে ভেসে আসছে বেদনার সুর ৷ মধ্য রাতের সঙ্গী বলতে পাশে বসে থাকা এই বিড়াল ছানাটিও কি করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শামিমের দিকে ৷ মর্মাহত শামিমের দুঃখগুলো এই বিড়ালকেও স্পর্শ করে গেছে ৷ হাত বাড়িয়ে আলতো করে স্পর্শ করে দিলো বিড়ালের তুলতুলে শরীরে ৷ গেল মাসে মাকে হারানোর পর থেকে সময় অসময় মায়ের কথা মনে পড়তেই চোখে জল চলে আসে ৷ বেদনাহত হৃদয়ে আরো বেদনার ঝড় উঠেছে একটু আগে ৷ বাবার শরীরটা নাকি বেশি ভালো না ৷ বাবার সাথে কথা বলতে গিয়ে কেমন হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলল সে৷ বাবার অস্পষ্ট কথার আওয়াজ আর শোনা হলো না কান্নায় ৷ রাতের খাবার না খেয়ে একাকি উদাস মনে বসে আছে বাসার ছাদে ৷ প্রবাসের বাড়িতে একাকিত্বের এই করুণ মুহূর্তগুলো আরো করুণ হয়ে আসে শামিমের ৷ আশপাশে আপনজন বলতে কেউ নেই ৷ কাঁধে হাত বুলিয়ে বলবে আয় খেতে আয়!

এই অচেনা দেশে দেখতে দেখতে তিনটি বছর গত হয়ে গেল তার ৷ যাবে যাবে করে এখনো যাওয়া হয়নি দেশে ৷ পরালোকগত মায়ের প্রচেষ্টায় বিদেশ এসেছিল শামিম ৷ মায়ের আকাশ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শামিম যখন প্রবাসে পা রেখেছিল- প্রথম কয়েকটা মাস রাতে ঘুমুতে গেলেই বাড়ির কথা খুব করে মনে পড়ত ৷ মনে পড়ত মায়ের বকুনি, বাবার শাসন, বড় ভাই শহিদের নালিশ, ছোট ভাই সাকিবের আবদারের কথা ৷ এখন আর কোনো কিছুই শুনছে না ৷ শুনছে না মায়ের মমতা-ভরা কথা, বাবার স্নেহমাখা ডাক ৷ পাচ্ছে না দূরন্ত ছুটে চলা খেলার সঙ্গী হিসেবে গাঁয়ের সমবয়সী বন্ধুদের ৷ কেউ নেই কাছে ৷ কাছে কিংবা আশপাশে ৷ এতসব ভাবনারা ভিড় করত রাতের ঘুমে ৷ চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে একাকার করে ফেলত শামিম ৷ আর তখনি মায়ের কথা আর ভবিষ্যতের চিন্তা শামিমকে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে সহায়তা করেছে ৷

প্রবাসে আসার ছ’মাস না যেতেই এক্সিডেন্ট করে বসে শামিম ৷ কাঁচের গ্লাসে পায়ের অনেকটা জায়গাজুড়ে কেটে যায় ৷ অচেতন শামিমকে হাসপাতালে নিয়ে যায় কোম্পানি ম্যানেজার গোলাম রসূল ৷ লোকটা খুব রগচটা ক্ষেপাটে হলেও পরোপকারী হিসেবে সুনামও রয়েছে বেশ ৷ ব্লাড বন্ধ করতে নিজের টিশার্ট ছিড়ে কাটা জায়গায় আলতো করে বেঁধে দিয়েছেন ততক্ষণাৎ ৷ সাতটা সেলাই পড়ে কাটা জায়গায় ৷ সেদিনের সেই আর্তচিৎকার শোনার মতো প্রিয়জন বলতে কেউ ছিল না ৷ দীর্ঘ রাতের অসহায় আর্তিগুলো রবের সমীপে প্রার্থনা ছাড়া কিছুই করার ছিল না শামিমের৷ একটু পর পর দীর্ঘশ্বাসে মায়ের নামটি বেড়িয়ে আসতো উচ্চ স্বরে ৷ প্রথম দু’দিন বাড়িতে জানায়নি মা কষ্ট পাবে বলে ৷ তৃতীয় দিন মা যখন জানলেন, মায়ের কান্নার সাথে শামিমের কান্নাও একাকার হয়ে গিয়েছিল ৷

কাজ থেকে ফিরে প্রথমে মায়ের সাথে কথা বলত শামিম ৷ এটা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। কিন্তু আজ মোবাইলের ও প্রান্তে অন্য কারো কন্ঠ ভেসে উঠল৷ ভাবীর কন্ঠটা বেশ অস্পষ্ট ৷ কান্নার আবেশমাখা কথা বুঝতে একটু দেরি হলে ৷ আম্মা কোথায়? শামিম জানতে চায় ৷ প্রথমে মিথ্যে বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল ভাবী ৷ কিন্তু শামিমের দৃঢ়তার কাছে হার মানল ৷ আম্মা আজ দুপুরে ঢাকা গিয়েছে ডাক্তার দেখাতে ৷ লাইন কেটে দিয়ে কল দিলো মায়ের সাথে থাকা বড় ভাই শহিদের কাছে ৷ আম্মা কোথায়, শামিমের প্রশ্ন ৷ এইতো এখানে ৷ মায়ের কথার আওয়াজ শুনতেই হাউ-মাউ করে কেঁদে দিল শামিম ৷ মায়ের সান্ত্বনায় শান্ত হলো শামিম ৷ মা নিজে নিজেই বলে যাচ্ছেন ৷ আমার কিছুই হয়নি ৷ আমি সুস্থ আছি ৷ ডাক্তার তিনদিনের ওষুধ দিয়েছে ৷ তিনদিন পর দেখা করতে বলেছে ৷ আমি সুস্থ হয়ে দুদিন পরেই বাড়িতে ফিরে যাব ৷ তুই কোনো চিন্তা করিস না ৷ ধীরে ধীরে শামিম শান্ত হলো ৷ দুর্ভাবনা যেন কিছুতেই ছাড়ছে না শামিমকে ৷ রাতে ঘুমুতে এসে মায়ের অবদানগুলো বার বার নাড়া দিচ্ছিল হৃদয়জুড়ে ৷ দুচোখের পানি কোনোভাবেই সংবরণ করা যাচ্ছে না ৷

প্রবাসের বাড়িতে কাজ ছেড়ে বসে থাকা যায় না ৷ অগত্যা শামিমও অফিসে গেল খুব সকালে ৷ ক্ষণে ক্ষণে হৃদয়ের কোণে কোথায় যেন চিন চিন করে ব্যাথাটা বেড়েই যাচ্ছে ৷ দুপুর দিকে মায়ের কাছে ফোন দিয়েছিল শামিম ৷ মা বেশ ভালো আছেন ৷ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আবারো ফোন দিল ৷ তখনো মা ভালো আছেন জানতে পারল শামিম ৷ তারপরও মনকে বুঝাতে পারল না কিছুতেই ৷ এই দূর প্রবাস এত কষ্টের কেন? শামিমের প্রশ্ন ৷ গত মাসে প্রিয় চাচা ইব্রাহীম খলিল পাড়ি দিয়েছেন পরপারে ৷ চাচার কত স্মৃতি ভেসে উঠছে আনমনে ৷ এই প্রবাস এখন বুঝি ছিনিয়ে নিচ্ছে প্রিয় মায়ের মুখ ! এ ভাবনায় কাতর হয়ে উঠছে শামিম ৷ হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

ইশার নামাজ শেষে শামিমের বাবাকে কাছে ডাকলেন শামিমের মা ৷ প্রথমে স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন অতীতের ভুলের জন্য ৷ অতঃপর পাওনা-দেনার হিসেব-নিকেষ বুঝিয়ে দিলেন ৷ মৃত্যুর পর নিজের কবরটা যেন হয় প্রিয় শাশুড়ির কবরের পাশে ৷ এই আবদারটুকু করে গেলেন প্রিয়তম স্বামীর কাছে ৷ মায়ের সাথে থাকা একমাত্র মেয়েও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ৷ মায়ের হাত চেপে অঝোর কান্না করেই যাচ্ছে ৷ দু’গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে স্বামীরও ৷ আপনি আমাকে কালিমাটা পড়িয়ে দিন ৷ আমি শান্তির ঘুমে ঘুমিয়ে যাই! স্ত্রীর এমন কথায় নিজেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল শামিমের বাবা ৷ স্পষ্ট কালিমার আওয়াজে নির্বাক দৃষ্টিতে একসাথে তাকিয়ে রইল বাবা আর মেয়ে ওপারের বাসিন্দার দিকে।

লেখক: মালয়েশিয়া প্রবাসী

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!