খেতাব বাতিল হবে আর একটা বাজে দৃষ্টান্ত:সাঈদ তারেক

যে সমাজে শাষকের ইচ্ছাই আইন, বা কোথাও কোন জবাবদিহিতার বালাই থাকে না, সেখানে সরকার যেমনটা চাইবে তেমনটাই হবে- এটাই হিসাবের কথা। এখানে কার কি পদক-খেতাব থাকলো গেল তাতে যেমন অন্যের কিছু বলা বা করার থাকেনা তেমনি এসবে কারও কিছু যায় আসেও না।
তারপরও ভেবে দেখলাম এ বিষয়টায় কিছু বলা উচিত। অনেকটা বিবেকের তাড়নায়। কয়েকদিন যাবত মরহুম জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিল নিয়ে নানা বাক বিতন্ডা। আমি তার কোন গুনমুগ্ধ বা ভক্ত নই। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন সাড়ে পাঁচ বছরেরও কম সময়। পুরো সময়কালটাই আমার দেখা। তার অনেক অনুষ্ঠান সংবাদ সম্মেলন কাভার করেছি, সামনাসামনি কথা বলেছি। অনেক কাজ এবং নীতিরই তীব্র সমালোচনা করেছি। এই আমলে আমি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না। পুরোদস্তুর সাংবাদিক। আওয়ামী লীগের কথিত বা অনুমিত মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক খবরের’ বার্তা সম্পাদক হিসেবে জিয়ার শাষনকালের পুরোটা সময় ধরে বিরুদ্ধ-কলম চালিয়েছি। তার এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অসংখ্য রিপোর্ট এবং লেখালেখি করেছি। ’৮১তে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দলকে অনিবার্য ভাঙন থেকে রক্ষা করতে ‘শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী’- আট কলাম ব্যানার হেডিং দিয়ে স্রেফ টেবিলমেড স্টোরি লিখেছি। তাতে দল ভাঙন থেকে রেহাই পেয়েছে, কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভানেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তখন দিল্লীতে বাস করছিলেন। এই নিউজ ছেপে কয়েকদিন গোয়েন্দাদের ভয়ে পালিয়ে থেকেছি। না, জিয়াউর রহমান পুলিশ পাঠাননি, শেখ হাসিনার সভানেত্রী হওয়ায় বাধ সাধেননি বা তার দেশে ফিরে আসায় নিষেধাজ্ঞাও জারী করেন নি। এগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আবার জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে তার স্ত্রীর শাষনামলে ভিন্নভিন্ন কারনে তিন দফা নির্যাতিত নিগৃহিতও হয়েছি। কাজেই কোন পক্ষপাতমুলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমার এ লেখা নয়।
এক মন্ত্রী বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যায় তার সংশ্লিস্টতা পাওয়া গেছে। ভাল কথা। পয়তাল্লিশ বছর পর যদি তথ্য স্বাক্ষী প্রমান হাতে আসে তাহলে জিয়াউর রহমানের মরোনত্তোর বিচার হতে পারে। অপরাধি প্রমানিত হলে শুধু পদক-খেতাব বাতিল কেন মরোনত্তোর ফাঁসিও হতে পারে। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা না। তবে তার জন্য কিছু প্রসিডিউর আছে। মামলা হতে হবে, স্বাক্ষী প্রমান লাগবে। আদালতের বিচারে সংশ্লিস্টতা প্রমানিত হতে হবে। যতদুর জানি বঙ্গবন্ধু হত্যায় মূল আসামীদের পদক-পদবী বাতিল করা হয়েছে বিচার এবং সাজা কার্যকরের পর। জিয়ার নামে বঙ্গবন্ধু হত্যার কোন মামলা হয়েছে বা বিচারে তার সাজা হয়েছে এমনটা কখনও শোনা যায় নাই। তাহলে শুধু সন্দেহের বশে বা অনুমানের ওপর কিছু অভিযোগ এনেই যদি তাকে সাজা দেওয়া হয় তাহলে তো সরকারের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে কথা উঠবেই।
চার টার্ম মিলিয়ে সতের বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, এই দীর্ঘ সময়ে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা না হোক কেউ একটা এফআইআর কি দায়ের করেছে! ইতিপূর্বে দেখা গেছে জিয়ার নামে কিছু স্থাপনার নাম বদলানো হয়েছে। মাঝেমাঝেই শোনা যায় চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে তার কবরটাও উপড়ে ফেলা হবে। বোঝাই যায় কোন কারনে জিয়াউর রহমানের ওপর আওয়ামী লীগ ক্ষিপ্ত। তাদের এত রাগ-ঝালের কি কারন আমি বুঝি না। জীবদ্দশায় জিয়া এই দলটির কি সর্বনাশ করেছেন তাও বোধগম্য নয়।
১৯৭১এর ২৭শে মার্চ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান নামে যে কেউ একজন আছে, কেউই জানতো না। জাতির এক কঠিন সময়ে রেডিওতে একটি ঘোষনা পাঠ করে তিনি জাতীয়ভিত্তিক পরিচিতি পান। মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। তার বাহিনীর নাম ছিল নিজের নামের আদ্যাক্ষর ‘জেড’ দিয়ে ‘জেড ফোর্স’। এগারটি সেক্টরের একটির কমান্ডার ছিলেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার তাকে জীবিত যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ পদক ‘বীর উত্তমে’ ভূষিত করে। এগুলো তো ইতিহাস। জিয়াউর রহমান এই ইতিহাসের একটি অংশ। ইতিহাস কি কখনও কলমের খোঁচায় বা আইন তৈরী করে মুছে ফেলা যায়! অথবা কারও চাপাবাজীতে উল্টে যেতে পারে!
’৭৫এর ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াকে দেখেছি একজন লো প্রফাইলের সেনা অফিসার হিসেবে। ’৭১এ সেই রেডিও ঘোষনার কারনে তার নামটা আমরা স্মরনে রেখেছিলাম, কিন্তু কোন উচ্চাভিলাষী মতলবে ঘুরছেন এমনটা কখনও শোনা যায় নাই। একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা হিসাবে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে তারও কিছু দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তাঁর চেয়ে সিনিয়র এবং গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা যখন এ কাজে ব্যর্থ হয়েছেন তখন তার ব্যর্থতাটা আর খুব একটা আলোচনায় আসে নাই। এমনকি ৩রা নভেম্বর ৪ঠা নভেম্বর মোস্তাক ফারুক রশিদ ডালিমদের সাথে খালেদ মোশাররফ-শাফায়েত জামিলদের যে দ্বন্ধ- সেখানেও দেখা যায় জিয়া অনেকটাই দৃশ্যপটের বাইরে। ৭ নভেম্বব কর্ণেল তাহের সিপাহীদের দিয়ে পাল্টা অভ্যুত্থান করানোর পর বুঝতে পারেন এখানে একজন ইন-সার্ভিস সিনিয়র অফিসার দরকার। জিয়া তখন হাউজ এ্যারেস্ট। সাধারন সিপাহিদের মধ্যে তার একটা ভাল ইমেজ ছিল। তাহের জিয়াকে পিক করেন, তার সমর্থকদের দিয়ে তাকে মুক্ত করান। তাকে বিপ্লবের নেতা হিসাবে সামনে তুলে ধরেন। ততক্ষণে মার্কিন দুতাবাস এবং অন্যান্ন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এর মধ্যে ইন হয়ে গেছে। তারা জিয়াকে কব্জা করে ফেলে। তাহেরের হাত থেকে অভ্যুত্থানের নাটাই চলে যায় দক্ষিণপন্থীদের হাতে। জিয়া তখন তাদের প্রতিভু হিসাবে আবির্ভূত হন। তাহেরদের দিন শেষ হয়ে যায়। এরপর জিয়া কঠোরহাতে সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনেন। নিজে চলে আসেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। ’৭৫এর নভেম্বর থেকে জিয়াকে আমি এভাবেই দেখেছি। ভিন্নভাবেও কেউ দেখে থাকতে পারেন, আমি সেখানে কোন বিতর্কে যাবো না।
তবে প্রথম তার নামটি শুনি ’৭১এর ২৭শে মার্চ। ’২৫শে মার্চ রাতে পাক আর্মির ক্রাকডাউনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। আমার কাছে মনে হয়েছে আর্মি যে এমন একটা পরিস্থিতির সৃস্টি করতে পারে বা তেমন হলে কি করতে হবে তেমন কোন প্লানিং বা সুষ্পস্ট দিক নির্দেশনা কারও কিছু ছিল না। ফলে ওই রাত থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে যে যেভাবে পেরেছেন ঢাকা থেকে পালিয়েছেন। আমিও ২৬ তারিখ ভোরে ঢাকা ছাড়ি। দুই একদিনের ভেতর খবর পাওয়া যেতে থাকে ভারত বর্ডার খুলে দিয়েছে এবং সেখানে গেলে প্রানের ভয় নাই। নেতারা একে একে কলকাতা গিয়ে উঠতে থাকেন। আমি জানিনা পাক আর্মি ক্রাকডাউন করলে কলকাতা গিয়ে ঠাঁই নিতে হবে এমন কোন নির্দেশনা নেতাদের ওপর ছিল কিনা। এর পরের উপাখ্যান অবশ্য আমাদের সবার জানা।
২৬ মার্চ ভোরে ঢাকা ছেড়ে সারাদিন সারারাত কখনও হেঁটে কখনও নৌকায় চেপে ২৭মার্চ পৌঁছেছিলাম মানিকগঞ্জে পদ্মা তীরবর্তী আমার নিজ এলাকায়। সে সময় নেট-মোবাইলের বালাই নাই। টেলিফোন সুবিধা কিছু শহর এলাকায়। গ্রামে গঞ্জে রিকশা চলারই রাস্তা নাই। আমরা পরিস্থিতির কোন খবরই জানতে পারছিলাম না। এপ্রিল মাসের প্রথম থেকে যখন গোপালগঞ্জে মুক্তিবাহিনী গঠন এবং পাক আর্মির প্রতিরোধ প্রস্তুতি নেয়া শুরু করি, তখনও আমরা অন্ধকারে। বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন তাইই জানি না! আট দশ তারিখের দিকে এক সন্ধ্যায় কলেজ মাঠে বন্ধু শেখ কামাল এলেন। কামাল ২৫মার্চ রাতে বাসা থেকে বের হয়ে কয়েকদিন এখানে ওখানে লুকিয়ে থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত আসতে পেরেছিলেন। আমি এক ফাঁকে শুধাই, লীডারের কি অবস্থা, তিনি মুক্ত আছেন তো? কামাল এ প্রশ্নের সড়াসড়ি উত্তর না দিয়ে শুধু বলেন, আব্বা ভাল আছেন। হয় সে-ও জানতোনা অথবা আমার কাছে লুকিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যে গ্রেপ্তার হয়ে পাকিস্তানীদের কারাগারে বন্দী সে ব্যপারে নিশ্চিত হতে পেরেছিলাম আমরা আরও পরে। এমনই ছিল সে আমলের যোগাযোগ ব্যবস্থা!
ওইরকম একটা ক্রান্তিকালে- হানাদার বাহিনীর আকষ্মিক আক্রমনে মানুষ যখন দিশাহারা, জানতে পারছে না নেতারা কোথায় কি করতে হবে, ঠিক তখনই ইথারে ভেসে আসা একটি কন্ঠ সেদিন সারা জাতির হতাশা কাটিয়ে তুলেছিল। তখনই জানতে পেরেছিল স্বাধীনতা ঘোষনা করা হয়েছে। এখন হানাদারদেরকে বিতাড়িত করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সে কন্ঠটিই ছিল তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের। আমি নিজে শুনেছি মেজর জিয়ার সে ঘোষনা। এই ঘোষনা কে দিয়েছে কার পক্ষ থেকে, এসব বিবেচনার চেয়ে একটা ভরষা পাওয়া গেছে- সেটাই ছিল সে মুহুর্তের মূল উপজীব্য।
সেদিন ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের পদ্মাপাড়ে আমার এক দাদার বাড়ীতে তরুন যুবকদের এক জটলায় পিন্টু কাকা তার ছোট ট্রানজিষ্টারের নব ঘুড়িয়ে চলছিলেন অনবরত, কোথাও থেকে কোন আভাষ ইঙ্গিত পাওয়া যায় কিনা। তখন রেডিওর খবর বলতে প্রধানত: রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা থেকে প্রচারিত সরকারি খবর। সেখান থেকে আসল চিত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। আকাশবানী সম্ভবত: তখনও পুরো খবর পাচ্ছিল না। বিবিসি ভোয়া প্রচার করছিল পাকিস্তান সরকারের অফিশিয়াল ভার্সন। পিন্টু কাকা খুঁজছিলেন অন্য কোন বেতারকেন্দ্র থেকে কিছু জানা যায় কিনা। সারাদিন তিনি কানের কাছে ট্রানজিস্টার নিয়েই থাকতেন।
আমরা কান পেতে আছি। হঠাৎ থমকে যান পিন্টু কাকা। একটা ওয়েভে এসে ভলিউম বাড়িয়ে দেন। আমরা কান খাড়া করি। পিন্টু কাকা চীৎকার করে ওঠেন, এইতো এইতো পাওয়া গেছে। (আমার এই মুক্তিযোদ্ধা কাকাটি আজই চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোকগমন করেছেন) ইথারে তখন বারবার ধ্বনিত হয়ে চলছে একটি কন্ঠ। একটি ঘোষনা। অনেক দুর থেকে ভেসে আসা ক্ষীন আওয়াজ। উপস্থিত সকলের চোখেমুখে আনন্দ উল্লাশ ফুটে ওঠে। পিন্টু কাকা বলেন, আর চিন্তা নাই। আমরা খাড়ায়া গেছি রে! এইবার মেলিটারিগো খবর হইয়া যাইবো! পরের দিন থেকেই গ্রামে মানুষের মনোবল বেড়ে যায়। কাঞ্চন ভাই (মরহুম আব্দুল মতিন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি) বাজারে মিটিং ডাকেন। এলাকায় মুক্তিবাহিনী গঠনের কাজ শুরু হয়ে যায়।
জিয়াউর রহমান সে মুহুর্তে নিজের না বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন বা তিনি নিজে থেকে রেডিওতে এসেছিলেন না তাকে ধরে আনা হয়েছিল সেটা কোন মুখ্য ব্যপার ছিল না। অথবা জিয়ার ওই ঘোষনার কারনে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধে অন্য সবার ভূমিকা বা অবদান গৌন হয়ে গেছে অথবা কোন এক মেজরের বাঁশির ফু’তে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এমনটা মনে করাও বাতুলতা ছাড়া কিছু না। প্রশ্নটা হচ্ছে সময় এবং প্রেক্ষিত। ওই মুহুর্তে আমাদের দরকার ছিল একটা ভরষা বা সাহস। গোটা জাতি পেয়েছিল সেদিন জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষনায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই মেজরকে তখন কেউ চিনতো না। যদি জিয়াউর রহমান না হয়ে সেদিন এমএ হান্নান বা ক্যাপ্টেন রফিকও বেতার কেন্দ্রে গিয়ে ওই ঘোষনা দিতেন মানুষ তাতেও উজ্জীবিত হতো। ঘটনাচক্রে জিয়াউর রহমান সেদিন এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমাদের কাছে কোন মেজর বা জিয়াউর রহমান বিষয় ছিল না, আমরা একটি কন্ঠে আপ্লুত হয়েছিলাম। সাহস ফিরে পেয়েছিলাম। আবার আশায় বুক বেঁধেছিলাম। এটা তো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। আমি তার স্বাক্ষী। রাজনৈতিক ভিন্নমত বা অন্য যে কোন কারনে এই সত্য কি অস্বীকার করা যায়!
সেদিন রেডিওতে এই ঘোষনাটি দেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান একটি স্বীকৃতি পেতেই পারেন। স্মরণে থাকতেই পারেন। তবে জীবদ্দশায় তাকে এই ঘটনা নিয়ে কখনও ফুটানি বা হামবড়াভাব প্রকাশ করতে দেখি নাই। আমি ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারবো না। যেহেতু নিজে এই বিষয় নিয়ে বিবাদমান দু’টি রাজনৈতিক দলের কোনটির সাথে সম্পৃক্ত নই বা কারও তোষামোদি চাটুকারিতা করে আখের গোছানোর ফিকিরে নাই আমি সত্যটাই বলি। ইতিহাসে যার যা ভুমিকা তা স্বীকার করতে আমি কুন্ঠিত নই।
আগেই বলেছি স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান অনেকটাই পেছনে থাকলেও আবার লাইমলাইটে আসেন ’৭৫এর নভেম্বরে। ক্যু পাল্টা-ক্যু জেলহত্যা গনবাহিনী বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা- সব পর্ব শেষে ক্ষমতায় পাকাপোক্ত হয়ে বসার পর শুরু হয় তার আর এক জীবন। শাষকের জীবন। তার শাষনকাল নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা আছে। তার পক্ষের লোকেরা বলবেন তিনি যা করেছেন সবটাই ভাল করেছেন, বিপক্ষরা বলবেন উল্টোটা। সব ভাল সব মন্দ নিয়ে কোন শাষনকাল হয় না। সব শাষনকালেই ভাল এবং মন্দ- দু’টো দিকই থাকে। ভাল’র জন্য কোন জাস্টিফিকেশন লাগে না। মন্দকে জাস্টিফাই করার জন্য শাষকদের কাছে অনেক যুক্তি থাকে। দরকার হচ্ছে নিরুপেক্ষ দৃস্টিকোন থেকে তার ভাল এবং মন্দ কাজগুলোর মূল্যায়ন।
জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ- তিনি অত্যন্ত ক্রুর এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ত্রাতা কর্ণেল তাহেরসহ সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্যকে হত্যা করেছেন। এ ব্যপারে তার পক্ষের লোকেরা কখনও মুখ খোলেন না। তবে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য এগুলো দরকার ছিল, জিয়া না হয়ে অন্য যে কেউই দায়িত্বে থাকতেন একই কাজ করতেন। জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্ত্তন করেছিলেন। বিচারপতিদেরকে প্রেসিডেন্টের পকেট থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। অবশ্য বাকশাল এবং কুখ্যাত রক্ষীবাহিনী বাতিল করেছিলেন খোন্দকার মোশতাক, বঙ্গবন্ধুর লাশ মাড়িয়ে সরকারপ্রধান হিসেবে গদীনশীন হবার পরপরই। জিয়া চাইলে বঙ্গবন্ধুর করা এই বাকশাল ব্যবস্থাটা রেখে দিয়ে নিজে বাকশালের চেয়ারম্যান এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে ঘোষনা করতে পারতেন। এটা করলে তখন তাকে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু তা তিনি করেন নি। জিয়া রাজনীতি চালু করার পর অবলুপ্ত আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করে স্বনামে রাজনীতি করার লাইসেন্স দিয়েছেন। শুধু তাই না, ৭৯’এর সংসদে এই দলের ৩৯জনকে এমপি করে এনেছিলেন। অন্যান্ন অনেক দল থাকলেও তিনি আওয়ামী লীগকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এসব কারনে আমার কখনও মনে হয় নাই জিয়া আওয়ামী লীগকে ধ্বংশ করতে চেয়েছেন। ’৮১র কাউন্সিলে যখন শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী নির্বাচিত করা হলো তিনি তাতে বাধ সাধেন নাই। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে এসে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন। জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর নামে কোন কটুকাব্য করেছেন এমনও শোনা যায় নাই। বরঞ্চ শুনেছি কেবিনেট মিটিংয়ে কোন সদস্য চাটুকারিতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্যঙ্গব্রিদুপ করলে তিনি তাকে থামিয়ে দিয়েছেন। সেই মন্ত্রীকে ভৎর্সনা করেছেন। জিয়ার সবচাইেতে বড় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ন্যয়নিষ্ঠ। অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতিকে কখনও প্রশয় দেন নাই।
আবার পাশাপাশি দেখা যায় জাতীয় ঐক্যের নামে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধীদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছেন। এমপি বানিয়েছেন, মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়ীতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দিয়েছেন। এই কাজটা তিনি কেন করেছিলেন আমি তার কোন জাস্টিফিকেশন খুঁজে পাই না। শুধু তাই না, অরাজনৈতিক ব্যক্তি, পেশাজীবি, আমলা কামলা টুকিয়ে এনে রাজনীতিবিদ বানিয়েছেন। ডিজিএফআইকে রাজনীতির নিয়ন্তা বানিয়ে দিয়েছেন। বলেছিলেন ‘আই শ্যাল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর পলিটিশিয়ানস’। পরবর্তী সকল শাষক এই ধারাবাকিতা অব্যাহত রেখে ব্যবসায়ী- টাউট বাটপার মতলববাজ ধান্ধাবাজদেরকে রাজনীতিতে টেনে এনেছেন। কালেক্রমে রাজনীতি থেকে রাজনীতিবিদরা হয়েছেন বিতাড়িত, রাজনীতি চলে গেছে তষ্করদের কব্জায়। আবার জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশ নামের ভুখন্ডে বসবাসকারি জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে গেছেন, এটাও বাস্তবতা। সে জন্যই বলছিলাম, সব ভাল সব মন্দ নিয়ে কোন শাষনকাল হয় না। সব শাষন কালেরই ভাল এবং মন্দ- দু’টো দিক থাকে। জিয়াউর রহমানও দোষে-গুনে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আজ নাই। রয়ে গেছে তার কীর্তি। এমনই এক কীর্তির স্বীকৃতি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য খেতাব।
তিরিশ বছর আগে তথাকথিত গনতন্ত্রের আতুরঘরে যে প্রতিহিংসা ক্রুরতা স্বেচ্ছাচারিতা দাম্ভিকতার রাজনীতির পয়দা হয়েছিল, আশা করেছিলাম দিনে দিনে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। রাজনীতিকরা সভ্য হয়ে উঠবেন। হীনমন্যতা সংকীর্ণমনা প্রতিহিংসাপরায়নতার পরিবর্তে শ্রদ্ধা সম্মান স্বীকৃতি সহনশীলতার সংষ্কৃতি আমাদের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। তেমনটা হয় নাই। হঠাৎ, কথা নাই বার্তা নাই এই পদক বাতিলের উদ্যোগ এখন সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমি জানিনা শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত হবে, তবে তেমনটা যদি আসলেই ঘটে- নির্দ্ধিধায় বলা যায় তা হবে আর একটা বাজে দৃষ্টান্ত। মৃত্যুর এত বছর পর বিনা বিচারে শুধুমাত্র সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে যদি জিয়াউর রহমানের পদক-খেতাব বাতিল করা হয়- এর কোন জাস্টিফিকেশন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে জন্যই মনে করা হয় এটি হবে একটি প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ। আজ যদি এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে যায়, ভবিষ্যতেও তা অন্য কারও ক্ষেত্রে উদাহরন হয়ে থাকবে।
আমরা চাই, রাজনীতি থেকে চিরতরে হিংসা বিদ্বেষ দুর হোক।
(সমাপ্ত)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!