আন্তর্জাতিক কৌশলগত ক্রসফায়ারে বাংলাদেশ!

মাসুম খলিলী

কৌশলগত গুরুত্ব বা অবস্থান অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের মতো। এটি যেকোনো রাষ্ট্রের এমন এক সুপ্ত সম্ভাবনা, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে। আবার লোলুপ শক্তিগুলোর দখল প্রতিযোগিতা ‘ক্রসফায়ারের মতো’ অবস্থাও সৃষ্টি করে দেশটির সামনে। আর এর ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজে’ পরিণত হয় অনেক নিরীহ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশে দেশে এর অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। জনসংখ্যার বিচারে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের নিশ্চয়ই একটি গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এর অবস্থানগত এমন কী রয়েছে, যার জন্য এটাকে কৌশলগতভাবে বৃহৎ শক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভাববে?

কৌশলগত ক্রসফায়ারে বাংলাদেশ! – ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ এমন এক প্রাকৃতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার আড়াই দিকে ভারত, অর্ধেক দিকে মিয়ানমার এবং বাকি দিকে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। এর অদূরেই রয়েছে মহাচীন। ভারতের সাথে সীমান্তের এক দিকে মূল ভূখণ্ড পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হলেও বাকি দেড় দিকে রয়েছে ‘সাত বোন’ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ভারতীয় প্রদেশগুলো, যেখানে মূল ভূখণ্ডের মতো, দেশটির প্রধান ধর্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠী হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবেও এখানকার জনগোষ্ঠীর সাথে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের। আবার এসব রাজ্যের ক’টির সাথে রয়েছে চীনের সীমান্ত। বাংলাদেশের সাথে বঙ্গোপসাগরের যে অংশটি সংশ্লিষ্ট, সেটিকে সামুদ্রিক সম্পদের দিক থেকে যেমন সমৃদ্ধ অঞ্চল মনে করা হয়; তেমনিভাবে এটি পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রাংশের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করে।

’৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যখন অভ্যুদয় ঘটে, তখন বিশ্বরাজনীতি ছিল স্নায়ুযুদ্ধে বিবদমান দুই পক্ষে বিভক্ত। বাংলাদেশ সৃষ্টির সাথে সে সময়কার ভূকৌশলগত বাস্তবতার ছিল বিশেষ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অবস্থা মোটাদাগে পরের দুই দশক প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও ’৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। আর বিশ্বে আমেরিকার একক প্রভাব বলয় সৃষ্টি হয়। ২০১০-এর দশকের শুরু থেকে এ অবস্থার ধীরগতিতে পরিবর্তন শুরু হয়। এখনকার বৈশ্বিক পরিস্থিতি আর আগের দশকের মতো একই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণের পথ ধরে একের পর এক সরকারের পতন ঘটার পর সিরিয়ায় সূচিত গৃহযুদ্ধ এই পরিবর্তনের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। স্নায়ুযুদ্ধকালে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রাজতন্ত্র বাদ দেয়া হলে তারা সোভিয়েত বলয়ের মধ্যেই ছিল। সিরিয়ার অবস্থানও ছিল তদানীন্তন সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি আমেরিকার প্রভাব বলয়ের সাথে একাত্ম হওয়ার পরিবর্তে স্থানিক ও আঞ্চলিক মেরুকরণ তৈরি করে নিজস্বভাবে হিসাব-নিকাশ তৈরির চেষ্টা করে। আরব জাগরণের সময় সিরিয়ায় গণবিদ্রোহ শুরু হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নেয় দেশটি। কৌশলগত কারণে ইরান সর্বাত্মকভাবে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। নানামুখী আঞ্চলিক সমীকরণের এই যুদ্ধে বাশার আল আসাদ পরাজয়ের কাছাকাছি এসে উপনীত হওয়ার পর ভøাদিমির পুতিনের রাশিয়া এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক সহযোগিতা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আমূল পাল্টে দেয়। বাশার আবার চালকের আসনে চলে গিয়ে দেশটির বেশির ভাগ অঞ্চলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। সর্বশেষ খবর অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে নিজের সৈন্যদের সামরিকভাবে একেবারে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

ট্রাম্পের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ওবামার সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিজেকে সঙ্কুচিত করার প্রবণতা দেখা যায়। এই প্রবণতার শুরু মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে শুরু হলেও তখনো ওবামা এশিয়াকে আমেরিকার নতুন ফোকাস পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ওবামা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির জের ধরে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের একটি সাল উল্লেখ করেছিলেন সত্য। কিন্তু তিনি সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০১৪ সালে গুটিয়ে নেননি; বরং ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে এশিয়ায় নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের একটি ছক তৈরি করেন। এই ছকে ‘দক্ষিণ এশিয়ার নেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় ভারতকে।

কংগ্রেসের দশককাল শাসনে ভারতের আমেরিকামুখী নীতি গ্রহণ শুরু হয়, যার কারণে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য অনেক সুবিধা তৈরি করে দেয়। একই সাথে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকে ‘ভারতীয় চশমায় প্রত্যক্ষ করা’র এক ব্যতিক্রমী নীতি নেয় ওয়াশিংটন। সেই নীতিরই অংশ হিসেবে এক দশক আগে বাংলাদেশে ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত দলটির শাসনক্ষমতায় আরোহণ ঘটে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এখানকার শাসন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনার কাজ শুরু করে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বিত হয় বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের স্বার্থ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত দুই স্বার্থ সমন্বিতভাবে এগিয়ে যেতে থাকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে পড়া ঢাকার সরকার চীনের বিরল সমর্থন লাভ করে।

এ সময় থেকে সরকারের কর্মকাণ্ডে কিছুটা কৌশলগত ভারসাম্য আনার টানাপড়েন দেখা দেয় চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে। অন্য দিকে, শেখ হাসিনার সরকার ’৭১-মুখী নীতির অংশ হিসেবে অন্তরালে রাশিয়ার সাথে এক বিশেষ সম্পর্ক নির্মাণে সক্রিয় হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভোটাভুটিতে রাশিয়াকে সমর্থন জানানোর একাধিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্টের মতো সংবেদনশীল প্রকল্পে রাশিয়াকে সম্পৃক্ত করেছে এই সরকার। অপর দিকে, এ সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উপেক্ষিত থাকে।

ওয়াশিংটনে নীতি প্রণয়ন পর্যায়ে নানা ধরনের টানাপড়েনে বাংলাদেশ তার প্রভাব বলয় থেকে ধীরে ধীরে বিচ্যুত হওয়ার এই ঘটনা খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এর মধ্যে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের নীতি বাস্তবায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় রকমের কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের সমঝোতার পরও একটা পর্যায়ে এসে দিল্লি রাশিয়ার সাথে পুরনো সম্পর্কে আবার গতি আনতে শুরু করে। নানা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়নে ধীরগতি নেমে আসে। এস ৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনাসহ দিল্লি বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্র্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করেছে রাশিয়ার সাথে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কট এ অঞ্চলে একটি বড় ধরনের দিক পরিবর্তক ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়। মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এর আগে শেখ হাসিনা সরকার রোহিঙ্গা স্রোত ঠেকালেও এবার সেটি আর করতে পারেনি। এর পেছনে চীন না যুক্তরাষ্ট্র, নাকি উভয়ের প্রভাব কাজ করেছে তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দক্ষতার সাথে এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে যে বিষয়টি আমেরিকার পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়, সেটি হলো এখানে পাশ্চাত্যের সামাজিক প্রভাবের গভীর শিকড়গুলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঐতিহ্যবাদী শক্তিগুলো, যারা পাশ্চাত্যের স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা রাখত, তারা ধীরে ধীরে প্রভাবহীন হয়ে পড়েছে। এখানকার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের প্রতিস্থাপন শুরু হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত এবং কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়ান স্বার্থ দিয়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পুরো প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভূমিকা পালনকারী যুক্তরাষ্ট্র ২০১৩ সালে দ্বিতীয় দফায় তারা ক্ষমতায় আসার সময় আড়ালে চলে যায়। এ সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে বিশেষভাবে সহায়তা করেন রাশিয়ার উপদেষ্টারা। সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি অঞ্চলের ‘বুলডোজার’ ফর্মুলায় বিক্ষোভ বা বিদ্রোহ দমনে রুশ বিশেষজ্ঞদের উপদেশ অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বাংলাদেশের শাসন কাঠামোর এই প্রভাব পরিবর্তনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী যেসব ৎযবঃড়ৎরপ ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আসে, সেগুলোকে আমেরিকা খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয়নি। আর তাদের রাষ্ট্রদূতের ওপর প্রাণনাশের মতো হামলার পর যখন বিষয়টি তারা উপলব্ধি করতে শুরু করেন, তখন পরিবর্তনের অনেক উপাদান আর তাদের হাতের মুঠোয় ছিল না। মূলত ২০১৩ সালে একতরফা নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন না করার পর থেকে শেখ হাসিনা সরকার বিকল্প আন্তর্জাতিক শক্তির দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ে। মার্কিনবিরোধী ৎযবঃড়ৎরপগুলো অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য করা হয় বলে আমেরিকানদের কাছে যুক্তি দেখানো হলেও রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার জন্য সরকার এটিকে কাজে লাগায়।

এ দিকে স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়ানরা আফগানিস্তান হারানোর পর বিকল্প ক্ষেত্র খুঁজতে থাকে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় মস্কো। অং সান সুচি সে দেশে ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথম দিকে এ ব্যাপারে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে নেপিডো’র ওপর চাপ বাড়লে রাশিয়া মিয়ানমারের সমর্থনে এগিয়ে এসে বেশখানিকটা স্থান করে নেয়। মিয়ানমারের একান্ত নির্ভরযোগ্য মিত্র চীনের সাথে রাশিয়ার কৌশলগত সমঝোতা থাকায় মস্কোর মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারে বেগ পেতে হয়নি। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশকেও রাশিয়া প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। ভারতের সাথে রুশ প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক নবায়নের ফলে ঢাকার রুশ সহায়তা লাভের ক্ষেত্রে দিল্লি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।

ভারতের অবস্থান এখন এমন যে, নানা ব্যত্যয়ের পরও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দিল্লির রয়েছে এক ধরনের কৌশলগত সমঝোতা। অপর দিকে, এস ৪০০ চুক্তি ও পুতিনের ভারত সফরের পর রাশিয়ার সাথে সৃষ্টি হয় সম্পর্কের নবায়ন। গোখলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার নতুন মতবাদের আলোকে অভিন্ন ক্ষেত্রগুলোতে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ও শত্রুতা কমানোর নতুন নীতি নিয়ে এগোচ্ছে দিল্লি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেপথ্য প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ভারত দুই পক্ষের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। চীন রয়েছে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী অবস্থানে নীরব পর্যবেক্ষকের স্থানে। দেশটির নীতি-কৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো অবস্থান দেখা না গেলেও বেইজিং একেবারে নিষ্ক্রিয় যে নেই, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। ঢাকার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে খবর প্রচার করা হয়েছে, বরিশালে বিপুল অঙ্কের টাকাসহ চীনা নাগরিক গ্রেফতার। এ পর্যন্ত ১৭ জন চীনা নাগরিক গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। এসব খবরের নেপথ্যে অনেক ঘটনার দু-একটি প্রকাশ পেতে পারে।
এ কলামটি যখন পাঠকেরা পড়বেন, এর এক দিন পরই বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা। এই নির্বাচনের ধরন এ দেশে একেবারে ব্যতিক্রম। নির্বাচনে বিরোধী দল বা জোট অংশ নেয়ার পরও তাদের কোনো মুক্ত প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে দেয়া হচ্ছে না। বাঘা বাঘা বিরোধীদলীয় প্রার্থীর ওপর প্রাণহানি হওয়ার মতো মারাত্মক হামলা চালানো হচ্ছে। নেতাকর্মীদের তো গ্রেফতার করা হচ্ছেই, প্রায় ডজনখানেক প্রার্থীকে জেলে ঢোকানো হয়েছে। প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে নির্বিচারে। নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই নির্বিচার‘বুলডোজার’ কৌশলের সাথে রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের বুদ্ধি-পরামর্শের সংযোগ রয়েছে বলে মনে হয়।

প্রশ্ন হলো- গত প্রায় পাঁচ দশকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে কাঠামো ও অর্থনীতির ধরন তৈরি হয়েছে, তা কি রুশ প্রভাব বলয়ের সাথে একাত্ম হতে পারবে? বাংলাদেশের সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিশেষ আয়ের বড় উৎস হলো, জাতিসঙ্ঘের শান্তি মিশন। এই মিশন কার্যক্রমের ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য কয়েকটি পাশ্চাত্য দেশের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের তিন-চতুর্থাংশের গন্তব্য ইউরোপ-আমেরিকা। বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আয়ের বড় অংশ ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পায়। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, সেসব দেশ পাশ্চাত্যের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত।

এ অবস্থায় একতরফা নির্বাচন করতে চাইলে আন্তর্জাতিক অবরোধের মুখে পড়ার ব্যাপারে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মিলারের এক টুইটার বক্তব্যেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ ধরনের অবরোধ যে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে তা গত কয়েক দিনের ঘটনাপরম্পরায় অনেকখানি বাস্তব মনে হচ্ছে। আর ইরান বা উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক অবরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে কী ধরনের অবস্থার মুখে পড়েছে তা অজানা নয়। উত্তর কোরিয়া দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন চীন-রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ইরান ১৯৭৮ সালের বিপ্লবের পর আন্তর্জাতিকভাবে বৈরী নীতি মোকাবেলা করে এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যাতে অবরোধ জনগণের দুর্দশা কিছুটা বাড়ালেও রাষ্ট্র কাঠামো পাল্টে দেয়ার মতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। তবে এর আগে অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন নিজ শাসন টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

বাংলাদেশের অবস্থা ইরান-কোরিয়া থেকে ভিন্ন। এমনকি ইরাকের যে সহনীয় ক্ষমতা রাষ্ট্রীয়ভাবে ছিল, সেটিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নেই। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক অবরোধের ঝুঁকি বাংলাদেশ কতটা সামাল দিতে পারবে, বলা কঠিন। বাংলাদেশ অতীতে কোনো সময় আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে বলির পাঁঠা তথা ক্রসফায়ারের শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েনি। পরিণামদর্শী ও সতর্ক নীতি গ্রহণ করে এই ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে পেরেছে। জনমতের বিপরীতে গিয়ে ক্ষমতা অব্যাহত রাখার সর্বাত্মকবাদী কৌশলের নির্বাচন সেই ঝুঁকির ক্রসফায়ারেই কি ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে? জবাব ‘হ্যাঁ’ হওয়ার শঙ্কাই বেশি।(daily Noyadiganta)
mrkmmb@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!