কোমলমতিদের বিদ্রোহ: হার জিত শঠতা আর প্রতিশোধের গল্প!!!!

তিনি অনেক সৎ মানুষ। নীতিবান কর্মঠ মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন। সংগতকারণে সবার তার উপর অনেক আশা ভরসা ছিল। দিনের পর দিন সে আশা গুঁড়েবালি হয়েছে! তাঁর আমলে প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেল। আড়াই লাখ টাকায় জিপিএ ৫ কেনার চিত্র টিভির অনুসন্ধানী রিপোর্টে মানুষ দেখল। বার বার কঠোর হবার কথা বলা হলেও কোটি কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হলো না। বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া অবশ্যই প্রশংসার কাজ। কিন্তু সেই বইতেও নানা ভুল পাওয়া গেল। বিশেষ গোষ্ঠীর চাপে পাঠ্যবই থেকে দেশ বরেণ্য কবি সাহিত্যিকদের রচনা কবিতা বাদ দেয়া হলো। বার বার তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠল।কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তিনি তারপরও স্বপদেই বহাল থেকে গেলেন। সব দুর্নীতি অনিয়মে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলতেন, বলেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর এ সব পদক্ষেপের কার্যকারিতা প্রায়শ: দৃশ্যমান হয়নি। সেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবার সত্যি সত্যিই কঠোর হয়ে যেতে পারলেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি দেখিয়েছে, অংশ নিয়েছে, কথিত অপরাধ করেছে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তাদেরকে এ যাত্রায় ক্ষমা করার সুপারিশ করেছিলেন, কিন্তু না তিনি তাঁদের পরামর্শ উপেক্ষা করলেন। কোন ভাবেই কাউকে ক্ষমা করা যাবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন। অথচ এ সব উপাচার্যের অনেকে আছেন যাদের যোগ্যতা খোদ শিক্ষামন্ত্রী থেকেও অনেক বেশি, দলের প্রতি আনুগত্যও কম নয়।এরা অনেক পরীক্ষিত, বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামের অভিজ্ঞতাও অনেকের আছে। তাঁরা যথার্থই তাদের ভাষায় ক্ষমার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হয়নি, পত্রিকায় প্রিজন ভ্যানে এক খ্যাতনামা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের অঝোর কান্নার ছবি ছাপা হয়েছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ২২ জনকে একসাথে রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল এ শিক্ষার্থী তাদেরই একজন। অভিযোগ পাওয়া গেছে ওদেরকে রিমান্ডের সময় হেফাজতে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে। সব কিছুর মধ্যে যেন প্রতিশোধের ছাপ!

সে যাক, যা বলছিলাম শিক্ষামন্ত্রীর এ অবস্থান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানই নয়, অনেকে মনে করেন এটা সরকারেরই নীতি ও মনোভাবের প্রতিফলন। অথচ পুরো পরিস্থিতিকে সরকারের সুন্দরভাবে সমাধানের সুযোগ ছিল। তা বৈধতার সংকট থাকলেও সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক অনেক কিছু আনতে পারতো। দু শিক্ষার্থীর নৃশংস মৃত্যুর পর কোমলমতিদের যে আন্দোলন তাতো এক অর্থে সবারই আন্দোলন ছিল। রাস্তায় নিরাপত্তা কার দরকার নেই? মন্ত্রী এমপিরা বিশেষ প্রটোকলে থাকেন, হয়তো বাহ্যত তারা নিরাপদ, কিন্তু তাদের আত্নীয়স্বজন তো এ রাস্তায় চলাফেরা করেন। সাধারণ মানুষের কথা না হয় নাই বললাম, তারা কি নিরাপদ এ অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন বেপরোয়া ড্রাইভারের হাত থেকে? কোমলমতিরা সুশৃংখল আন্দোলন করেছে। তাদের শ্লোগানে বা প্ল্যাকার্ডে বিচ্ছিন্ন কিছু আপত্তিকর কথা থাকলেও তাতো সাধারণভাবে আন্দোলনের কথা ছিল না। পরিস্থিতি কি ভয়াবহ তাতো তারা দেখিয়ে গেল। মন্ত্রী এমপি বিচারপতি পুলিশের বড্ কর্মকর্তা দুদক এমনকী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গাড়িরও কাগজপত্র নেই। ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই! প্রতিবেশি ভারত দূরে থাক, কোন দেশে সামান্যতম গণতন্ত্রের চর্চা থাকলেও এসব গাড়িতে চড়ার জন্য অনেকে নিজে থেকে পদত্যাগ করতেন। সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্যের জন্য যাকে প্রধান দায়ী বলে ধরা হয়, একাধারে যিনি শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা এবং মন্ত্রী সেই শাহজাহান খানকে দু বাচ্চা শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি যে কায়দায় হাসতে থাকেন তা ছিল সম্ভবত: পৃথিবীর বীভৎসতম হাসিগুলোর একটি! তিনি বলে উঠলেন ভারতের মহারাষ্ট্রে এক সাথে ৩৩ জন সডক দুর্ঘটনায় নিহত হলেও এখানকার মত কথা হচ্ছে না। পর্যবেক্ষকরা বলেন, কোমলমতিদের আন্দোলনের বিস্তার ও ব্যাপকতার জন্য তার বক্তব্য ও বীভৎস হাসিও কম দায়ী ছিল না।

সর্বমহল থেকে এই ‘সড়ক মাফিয়া’ বলে কথিত মন্ত্রীর পূণরায় পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিলো কিন্তু তা মানা হয়নি। সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবি মেনে নেবার ঘোষণা দেয়া হলো। এই নয় দফার মধ্যে মাত্র তিনটি দফা ছিল কিছু সময় সাপেক্ষে বাস্তবায়নের ব্যাপার- বেপরোয়া গাড়ি চালনার জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন, প্রত্যেক সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিডব্রেকার স্থাপন, শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভারব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করা । আর বাকি ছয়টি দফা ছিল মূলত: তাৎক্ষণিক কিছু ঘোষণা ও পদক্ষেপের ব্যাপার -বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া যাবে না, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবেন না, ( কতিপয় সংশোধন সাপেক্ষে) শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের নিতে হবে, শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ‘ব্যবস্থা করা’, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারের নেয়া এবং নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। মন্ত্রী অবশ্য পরবর্তীতে ক্ষমা চেয়েছেন। বাকি দফাগুলোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলা হলেও কিভাবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বা নেয়া হয়েছে তা প্রথমত: এবং এখন পর্যন্ত সেইভাবে পরিস্কার করে বলা হলো না। এদিকে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির নেতাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘বুঝিয়ে শুনিয়ে’ ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী আহবান করার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ‘বুঝানো শুনানো’র অ্যাকশন দেখা গেল। মীরপুরে মাথায় হেলমেট পরা ছাত্রলীগ এক শিক্ষার্থী’কে পেটাচ্ছে সে চিত্র গণমাধ্যমে ছাপা হলো। একদিকে দাবির প্রতি বাহ্য সংহতি ও মেনে নেয়ার ঘোষণা অন্যদিকে এ আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে, ও উসকে দিচ্ছে বলে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব সৃষ্টি করা হলো।

শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী কোমলমতিদের উপর এমনকী কর্তব্যরত সাংবাদিকদের উপর দফায় দফায় হামলা হলো, খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে বাসা থেকে তুলে নেয়া হলো। হেফাজতে তাঁর উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হলো। হাইকোর্টের নির্দেশে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়ার পর হাসপাতাল থেকে আবারো দ্রুত ডিবি হেফাজতে ফেরত পাঠানো হলো। দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভিত্তিতে কুমির চাষ যিনি করেন সেই মুসতাক আহমেদকে একই কায়দায় তুলে নিয়ে যায় ডিবি। তুলে নিয়ে যায় অপরাজিতা সংগীতা নামের আরেক জন এক্টিভিস্টকে। পরে অবশ্য এ দুজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। অনলাইনে আন্দোলনে উস্কানি দেবার জন্য পটুয়াখালির কলাপাড়ায় এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফেইসবুকে শত শত আইডিকে চিহ্নিত করা হয়েছে উস্কানি দেয়ার জন্য। মামলা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোমলমতিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে গেছে।তাদের কাউকে কাউকে বহিস্কার করার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। রাস্তা ঘাটে তাদের নানাভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সবমিলিয়ে একটা অভূতপূর্ব আন্দোলনে কথিত গুজব ও উস্কানি দেয়ার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সংশ্লিষ্টতার ধোয়াশা তোলে যা চলছে তা প্রতিশোধমূলক হিসেবে ধরে নেয়ার অবকাশ আছে। আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ও পুলিশের তৎপরতা গুজবের ধোয়া তুলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার উল্লেখ করে যতই অস্বীকার করুক হোক না কেন, দেশে বিদেশে মানুষের কাছে তা দমনমূলক পদক্ষেপ বলেই স্বীকৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো, জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসব পদক্ষেপের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে ছাত্র ও সাংবাদিকদের উপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগের একাধিকজনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় মিডিয়ায় এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোন পদক্ষেপ নেবার কথা শোনা যায় নি। তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেছেন দেশের প্রয়োজনে দরকার হলে ফেইসবুক বন্ধ করে দেয়া হবে। প্রযুক্তি ও সভ্যতার উন্নয়নের এ যুগে এমন চিন্তা শুধু পশ্চাৎপদ ধ্যাণধারণার পরিচায়কই নয়, তা অনাকাংখিতও বটে। যে কোন প্রকার সমালোচনা, ভিন্নমত ও যৌক্তিক অযৌক্তিক যাই হোক না কেন যে কোন আন্দোলনে নিজেদের সুবিধামত একটা ট্যাগ লাগিয়ে দমন পীড়নের ভাবনা কোন কাজের কথা নয়। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে সরকার নিজেদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে এ যাত্রায় যে পরিচয় তুলে ধরলো তার জন্য ভবিষ্যতে তাদের রাজনীতির জন্য তা নেতিবাচকই হবে। সময় থাকতে ছায়া শত্রুর সাথে যুদ্ধ করা বন্ধ করতে হবে।

– শাহ আলম ফারুক : লন্ডনে নির্বাসিত
বাংলাদেশী মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী
সাবেক সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা,
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
faruk69@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!