কুলাঙ্গারদের কবলে উলঙ্গ দেশ

শিবলী সোহায়েল
মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। এ সপ্তাহে উপসম্পাদকীয়র জন্য একটি বিশ্লেষণধর্মী লিখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু অর্ধেকে এসে ঠেকে গেছি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনাটি জানার পর থেকে কিছুতেই আর ঐ লিখাটায় মন বসাতে পারছিনা। গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা খুললেই দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগ যেন ধর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মনে হচ্ছে ধর্ষণ এখন মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে দুটো মহামারীর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। একটি হচ্ছে করোনা এবং অপরটি ছাত্রলীগের ধর্ষণ। প্রতিদিনই খবর পাচ্ছি পরিচিতদের মধ্যে কেউ না কেউ করোনার আক্রমণের শিকার। অনেকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এবং অনেকে এখনও লড়ে চলেছেন। তার উপর একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা। মন ভাল থাকে কি করে?
এই কষ্টের মধ্যেও একটি খবর দেখে খুব হাসি পেল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে নাকি বলা হয়েছে, তাদের সাথে ছাত্রলীগের কোন সম্পর্ক নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, উনিশশো চুয়াত্তর সালের জুলাই মাসে এরকমই এক পরিস্থিতিতে শেখ ফজলুল হক মনি বাংলার বাণীতে বিবৃতি দিয়ে বলেন যে, আওয়ামী লীগ চরম দুর্নীতিতে লিপ্ত এবং আওয়ামী লীগের এই দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে যুবলীগের কোন সম্পর্ক নেই। ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি দেখে শুধু হাসিই নয় আমি তাজ্জবও বটে।
কার সাথে কার সম্পর্ক আছে বা নেই সেটা মানুষ ভালই বোঝে। এবং এটাও বোঝে যে কার আশ্রয়ে, কার প্রশ্রয়ে এই ধর্ষণ সংস্কৃতি আজ মারামারিতে রূপ নিয়েছে। এই ধর্ষণ মহামারীর প্রধান কারণ মূলত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মপন্থা। তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার স্পষ্ট প্রকাশ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম উনিশশো চুয়াত্তর সালে শেখ মনির কথা থেকে। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ও ড. আফতাব আহমাদের লিখা ‘দু:সময়ের কথাচিত্র: সরাসরি’ বইয়ে আফতাব আহমাদ উল্লেখ করেছেন উনিশশো চুয়াত্তর সালে ঢাকা প্রেসক্লাবে, ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আবদুল গাফফার চৌধুরী, কামাল লোহানী, নির্মল সেন ও সাইয়েদ আতীকুল্লাহ্ সহ বেশ কয়েকজন প্রবীণ সাংবাদিকদের সাথে শেখ মণির এক আলাপে, সাংবাদিক সাইয়েদ আতীকুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মনি হেসে বলেছিলেন, “কেন পত্রিকায় আমার বিবৃতি দেখেননি? আমি তো বলেছি, দেশ আজ আইনের শাসন চায় না; দেশ চায় মুজিবের শাসন। এই বাক্যটির মধ্যেই আমাদের পুরো সমাজ দর্শন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা encapsulated হয়ে আছে”। ভাবতেও অবাক লাগে যে এমন অগণতান্ত্রিক, অসভ্য উক্তি তিনি অবলীলায় কিভাবে বলতে পেরেছিলেন। আরও অবাক ব্যাপার, শুধু মুখে বলা নয়, পত্রিকায় বিবৃতি আকারে প্রকাশও করেছিলেন। আজকের অবস্থা দেখে কি মনে হয় তাদের ঐ সমাজ দর্শন ও কর্মপন্থার এখন কোনও পরিবর্তন হয়েছে?
আসলে শেখ মণি উল্লেখিত সেই সমাজ দর্শন ও কর্মপন্থা তারা আজও বহন করে চলেছে। এবং এই কারণেই বর্তমানেও ধর্ষণের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। নোয়াখালীর ঘটনার দুদিন আগে, সিলেটে নিজু নামের এক ছাত্রলীগের হাতে চৌদ্দ বছরের কিশোরী ধর্ষিত হল (ডেইলি স্টার, ৩ অক্টোবর)। এর কয়েকদিন আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সবুজের হাতে ধর্ষিত হল এক তরুণী (ইত্তেফাক, ১ অক্টোবর)। এবং তার কিছুদিন আগে, ২৫শে সেপ্টেম্বর ঘটে যায় সিলেটের এমসি কলজে ছাত্রলীগের কুলাঙ্গারদের নারকীয় গন-ধর্ষণের ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য থেকে জানতে পারলাম, এভাবে গত নয় মাসে ধর্ষিত হয়েছে ষোলশ জনেরও বেশী। তার মানে প্রতিদিন গড়ে ছয়জন। এই অবস্থাকে কি কোনভাবেই স্বাভাবিক অবস্থা বলা যায়?
আমাদের বাংলাদেশটা কখনই এমন ছিলোনা। অন্ততপক্ষে আমার বয়সকালে এতটা ভয়াবহ অবস্থা আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু নির্মল সেনরা দেখেছিলেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন তাই উনিশশো তিয়াত্তর সালে লিখেছিলেন, “আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। মৃত্যু অনিবার্য। জন্মিলে মরিতে হয় এ আমি জানি। ……আমি স্বাভাবিকভাবে মরতে চাই। একজন সাধারণ নাগরিকদের মতো। খেয়ে-দেয়ে চাকরি করে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুখে-দুখে থেকে আমি মরতে চাই। আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।… কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কোথায়? এক-একদিনের খবর কাগজ খুললে মনে হয় স্বাভাবিক মৃত্যুর খবর যেন ছুটি নিয়েছে। সে মৃত্যুর কাহিনী আজ সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে থাকে। তাকে একটি একটি করে সাজালে মনে হবে আজ স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্যও প্রার্থনা করতে হবে” (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ ১৯৭৩)।
উপলব্ধি করা যায় কতটা নিদারুণ শঙ্কিত অবস্থায় নির্মল সেন এই কথাগুলো লিখেছিলেন? উনি কিন্তু বেঁচে ছিলেন আরও বহুদিন। দুহাজার তিন সাল পর্যন্ত উনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু উনিশশো পঁচাত্তর সালের পর থেকে এই দীর্ঘ সময় নির্মল সেনকে আর কখনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ভয়ে আতঙ্কিত হতে দেখা যায় নি। কিন্তু আজ সেই একই দলের ভয়ে সমগ্র বাংলাদেশ আবার নির্মল সেনের মতই আতঙ্কগ্রস্ত।
মন বিষণ্ণ থাকার আরও একটি কারণ হচ্ছে আমার বাবা, প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদ আজ দশ মাস ধরে বিনা বিচারে, বিনা চিকিৎসায় কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। গত সপ্তাহে উচ্চ আদালতে তাঁর জামিনের নির্দেশ হওয়ার পরও এখনও মুক্তি পেলেন না। জানতে পারলাম, মুক্তির জন্য সমস্ত কিছু গোছগাছ করে তাঁকে কারাগারের সদর দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই চেম্বার জাজের মাধ্যমে জামিন স্থগিত করিয়ে সেখান থেকে আবার তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। কতটা অমানবিক হলে আটাত্তর বছর বয়সী একজন বর্ষীয়ান লেখকের সঙ্গে এধরনের আচরণ করা সম্ভব?
বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে, উনার লিখা, ‘কাল পঁচিশের আগে ও পরে’ বইটির পাতা উল্টাচ্ছিলাম। বইটিতে তথ্যসূত্র সহ স্বাধীনতার পূর্বাপর রাজনৈতিক দৃশ্যপটের একটি ধারণা পাওয়া যায়। একেবারে শেষের দিকে এসে তিয়াত্তর-চুয়াত্তরের কিছু দুঃশাসনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল। সেখানে প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা শান্তি সেনের স্ত্রী, অরুণা সেনের বিবৃতিতে এসেছে, “৬ই ফেব্রুয়ারি (৭৪) রাত্রি ভোর না হতেই রক্ষীবাহিনী আমাকে ঘুম থেকে তুলল। আমাকে বাড়ীর বাইরে নিয়ে এলে দেখলাম রীণাও রয়েছে। আমাদেরকে নিয়ে তারা রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। ………অনেক রাতে রীণাকে ওরা উপরে দোতলায় নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম হৃদয়বিদারী চিৎকার। ……… আমাকে ও রীণাকে একসাথে ঝুলিয়ে দিয়ে রীণার বস্ত্র খুলে নেয়। ……রীণার সর্বাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরছে। …… নয় তারিখ দুপুরের অল্প পরে তারা হনুফা, রীণা ও আমাকে নিয়ে গেল পুকুরের ধারে। … বেত দিয়ে পিটিয়ে চুবানোর জন্য পানিতে নামাল”। এতো গেল চুয়াত্তর সালের কথা। কিন্তু আজও কি এই রীণা, হনুফা, অরুণাদের চিৎকার আমরা শুনতে পাইনা তনু, নুসরাত সহ অসংখ্য বিবস্ত্র ধর্ষিত মানুষের কণ্ঠে?
বাজিতপুর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাম্যবাদী দলের নেতা সাইফুল ইসলামের বর্ণনা থেকে সেসময়ের অনেক ঘটনা জানা যায়। যেমন, রক্ষীবাহিনী পিরোজপুরের আমিনার গায়ে কম্বল জড়িয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এমন আরও অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক, নাট্যকার, লেখক ও সাংবাদিক আহমেদ মুসা লিখিত ‘ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ’ বইতে।
সেই সময়ের ভয়াবহ অবস্থার চিত্র বিদেশী পত্র-পত্রিকাতেও প্রতিফলিত হয়। ১৫ জুলাই ১৯৭৫ সালে নিউজ উইক লিখে, “রক্ষী বাহিনী নামক একটি আধা সামরিক বাহিনী পুনরায় নির্যাতন এবং হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে দেশের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বলতে যেয়ে আজো পাকিস্তানী আমলের মতই মানুষ ভয়ে কেঁপে ওঠে”।
আমরা বুঝতে পারছি, সেই একই রাজনীতি, একই সমাজ দর্শন এবং তাদের আইনের শাসন বিমুখ কর্মপন্থা আজ আবারও দেশকে বিবস্ত্র করছে। সেই একই কুলাঙ্গারদের কবলে আজ দেশ আবারও ধর্ষিত, আবারও উলঙ্গ। কিন্তু এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? এই প্রসঙ্গে ড. আফতাব আহমাদের বয়ানে শেখ মনির সাথে সাংবাদিকদের সেই আলাপের আরেকটি কথা উল্লেখ করে এই লিখা শেষ করছি।
শেখ মণি তার রাজনৈতিক সমাজ দর্শন ব্যাখ্যা করার পর “…… সাইয়িদ আতীকুল্লাহ স্মিত হেসে ডলফিন মার্কা ম্যাচের ওপরে একটা আঙ্গুল বারবার টোকা দিতে দিতে শুধু বললেন, “মণি, রাজনীতিতে তোমাদের বন্ধ্যাত্ব এসে গেছে এবং তোমরা দীনতায় ভুগছ। ……… একটা কথা ভুলে যেও না, তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। তোমাদের পাপাচার ও দুরাচার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কার তূণে যে কি তীর তোমাদের প্রাণ সংহারের অপেক্ষায় আছে, তা তোমরা সামান্যতম আঁচ করতে পারবে না। কিন্তু সকলের অলক্ষ্যে যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালনা করেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি সবই জানেন। তোমাদের হাতে সময়ও বেশী নেই। যত পার নিজেদের শুধরে নাও এবং জনতার কাছে মার্জনা চেয়ে নাও। তাতেই মঙ্গল নিহিত”।
[আমারদেশে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক]

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!