কারবালার প্রকৃত ইতিহাস ও শিক্ষাঃ

আসলাম সাঈদী
আগামী শুক্রবারে ১০ই মুহাররম ৷ এইদিন হযরত মুসা আঃ ফিরাউনের কবল থেকে মুক্তি পান ৷ এইজন্য এইদিনের বিশেষ মর্যাদা ৷ ঘটনাক্রমে একই দিনে হযরত হোসাইন রাঃ ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে নির্মমভাবে শহীদ হোন ৷ তাই দিনটি ঘিরে আমাদের সমাজে অনেক কথা প্রচলিত আছে ৷ এবং ইয়াজিদ ও হোসাইন রাঃ কে নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করা হয় ৷ তাই সংক্ষেপে কারবালার প্রকৃত ঘটনাটি একটু আলোচনার প্রয়োজনবোধ মনে করছি ৷
★ হযরত আমীর বিন মুয়াবিয়া রাঃ ইয়াজিদকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করলে অনেক লোক তার হাতে বায়হাত গ্রহণ করেন ৷ কিন্তু মক্কা মদিনার অধিকাংশ জ্ঞানী ব্যাক্তিবর্গ এবং কুফার প্রায় সবাই তার হাতে বায়হাত নিতে অস্বীকার করেন ৷ এবং কুফাবাসীরা হযরত হোসাইন রাঃ কে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে ৷ কিন্তু কুফাবাসীরা দূর্বল প্রকৃতির লোক ছিলো ৷ তারা আগেও হযরত আলী রাঃকে কথা দিয়ে কথা রাখেনি ৷ তাই অনেক সাহাবা হযরত হোসাইন রাঃ কে কুফায় যেতে বারণ করলেন ৷ হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, মানুষের তিরস্কারের ভয় না করলে আমি তোমার ঘাড় মটকিয়ে হলেও কুফা যাওয়া থেকে বিরত রাখতাম ৷ কিন্তু তারপরও তিনি কুফা বাসীর ডাকে সারা দিয়ে সপরিবারে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন ৷ তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাননি ৷ তার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো কুফাবাসীর বায়হাত নিয়ে খেলাফতের দায়ীত্ব নেওয়া ৷ এইজন্য যাওয়ার সময় তিনি কোনো সৈন্য-অস্ত্র কিছুই নেননি৷ কিন্তু ইয়াজিদ এই খবর পেয়ে উবায়দুল্লাহ যিয়াদকে নির্দেশ দিলো, বর্তমান কুফার গভর্নর নোমান বিন বশীরকে বরখাস্ত করে তুমি তার দায়ীত্ব নিবে এবং কুফা বাসীকে এমন সাইজ করবে যাতে তারা হোসাইনের হাতে বায়হাত নেওয়ার সাহস না পায় আর হোসাইনকে ব্যারিকেড দিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিবে ৷ কিন্তু যিয়াদ হোসাইন রাঃ কে সপরিবারে কারবালায় আটক করলো এবং নির্মমভাবে সবাইকে শহীদ করলো ৷ হযরত হোসাইন রাঃ কে শহীদ করার জন্য ইয়াজিদের নির্দেশ ছিলো না ৷ কারন মৃত্যুকালে ইয়াযীদের শেষ কথা ছিল, ‘হে আল্লাহ! আমাকে পাকড়াও করো না ঐ বিষয়ে যা আমি চাইনি এবং আমি প্রতিরোধও করিনি এবং আপনি আমার ও ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের মধ্যে ফায়ছালা করুন’ (আল-বিদায়াহ ৮/২৩৯ পৃঃ) ৷ কিন্তু ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ হোসাইন রাঃ এর মস্তক ইয়াজিদের কাছে দিলে সে কোনো আক্ষেপ প্রকাশ করেনি, তাকে বরখাস্তও করেনি, কোনো শাস্তিও দেয়নি ৷ এতে বুঝা যায় এই হত্যায় পরোক্ষভাবে তার সমর্থন ছিলো ৷ আর সমর্থন না থাকলেও নিজে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো অবস্থাতেই নিজেকে দোষ মুক্ত রাখতে পারেনা ৷ অবশ্যই সেও তাদের মত অপরাধী ৷ তবে হোসাইন রাঃ এর মস্তকের সাথে ইয়াজিদ এই এই খারাপ আচরণ করেছে, হযরত হোসাইন রাঃ এর মস্তকে সে জুতা দিয়ে পিঠাইছে বলে বিষাদ সিন্ধুতে যা বলা হয়েছে সব মিথ্যা এবং বানোয়াট ৷
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
ইয়াজিদের ব্যাপারে আমাদের করণীয়ঃ
আমাদের সমাজে ইয়াজিদকে নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হয় ৷ কেউ তার নামের সাথে “লানাতুল্লাহি আলাইহি ” (তার উপর আল্লাহর অভিশাপ ) ব্যবহার করেন আবার কেউ “রহমতুল্লাহ আলাইহি” (তার উপর আল্লাহ রহম করুন) ব্যবহার করেন ৷ এক গ্রুফ তাকে কাফির আখ্যায়িত করে গালাগালি করেন ৷ আবার আরেক গ্রুফ তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ৷
এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, তাকে কাফির ফতওয়া দেওয়া কোন অবস্থায় বৈধ নয় ৷ তাছাড়া উপরে আমরা দেখেছি মৃত্যুর সময় সে তাওবাও করছিলো৷ তাই আমি মনেকরি ইয়াজিদকে জালিম শাসক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে “লানাতুল্লাহি আলাইহি ” ও “রাহমতুল্লাহি আলাইহি ” অর্থাত্ তাকে বদ দোয়া করা অথবা তার জন্য দোয়া করা দুটো থেকেই আমাদের বিরত থাকা উচিত এবং এই ব্যাপারে আমাদের নিরব ভূমিকা পালন করে তার বিষয়টা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়াই উচিত৷
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
কারবালার শিক্ষাঃ
১ ৷ হযরত হোসাইন রাঃ বীরের মতো লড়াই করে শহীদ হয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন, মুসলমানরা বাতিলের সামনে মাতা নত করতে পারেনা ৷
২ ৷ জালিমদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে ইয়াজিদ মৃত্যুবরণ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত তার বংশ থেকে কেউ খলিফা হতে পারে নি ৷ এবং সে সকল জাতির কাছে একজন নিকৃষ্ট শাসক হিসেবে পরিচিত এবং সকলের কাছে সে ঘৃণার পাত্র ৷ অপরদিকে হযরত হোসাইন রাঃ কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের মাথার মুকুট হয়ে থাকবেন ৷ ইয়াজিদ হযরত হোসাইন রাঃ কে শহীদ করে সাময়িকভাবে জয়লাভ করলেও স্থায়ীভাবে হযরত হোসাইন রাঃ বিজয়ী হয়েছেন আর সে স্থায়ীভাবে হেরে গিয়ে ইতিহাসের নিকৃষ্ট ব্যাক্তিতে পরিনত হয়েছে ৷ তাই আজও ইয়াজিদের উত্তরসূরি যারা হোসাইনের উত্তরসূরীকে ফাঁসী দিয়ে মনে করছে তারা বিজয়ী হয়েছে ৷ মূলত তারা হেরেগেছে, হোসাইনের উত্তরসূরীরা ফাঁসীতে ঝুলে স্থায়ীভাবে বিজয় লাভ করেছে ৷ কিয়ামত পর্যন্ত তাদের নাম মুসলমানদের হ্নদয়ে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে ৷ আর ইয়াজিদের মতো এরাও একদিন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে ইনশাআল্লাহ ৷

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!