ঐক্যফ্রন্ট সংঘাত চায় না, সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে সমঝোতা চায়

দাবি না মানলে রোডমার্চ, সমাবেশ, ইসি অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি

ঐক্যফ্রন্ট সংঘাত চায় না, সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে সমঝোতা চায় – সংগৃহীত

৭ দফা দাবি আদায় না হলে আপোষহীন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারী দিয়েছেন সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্যফ্রন্টের বিশাল সমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেতারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ঐক্যফ্রন্ট সংঘাত চায় না, সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে সমঝোতা চায়। যদি সংলাপের নামে নাটক করা হয়, আলোচনা ছাড়া তফসিল ঘোষণা করা হয়, তাহলে জনগন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলবে। তখন সরকাররের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না।

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন আপোষহীন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক দিয়ে বলেন, কথায় কথায় সংবিধানের কথা বলা হয়। অথচ সংবিধানের ষোলআানাই অপব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জনগন জেগেছে। এই জাগরনের মধ্য দিয়েই জনগন দেশের মালিকানা ফিরে পাবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ জনসভা থেকে রোডমার্চসহ বিভিন্ন বিভাগে সমাবেশ ও নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এই সরকার যদি সংলাপে আমাদের দাবি-দাওয়াগুলো মেনে না নেয়, তাহলে আগামীকাল ৮ নভেম্বর রাজশাহীতে যাত্রা শুরু করব রোড মার্চ করে। রাজশাহীতে ৯ নভেম্বর জনসভা হবে। রাজশাহীর পর খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহে ঐক্যফ্রন্ট জনসভা করবে। নির্বাচন কমিশন যদি সমঝোতার আগে তফসিল ঘোষণা করতে চায় তাহলে নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রা হবে। এরপর আমরা আরও কর্মসূচি ঘোষণা করব।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়াসহ ৭ দফা দাবিতে গতকাল এ সমাবেশ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সমাবেশে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে কয়েক লাখ নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়।

বেলা তিনটার মধ্যে মঞ্চের সামনে ও ডানে-বামে নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জনসভা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষের ঢল উদ্যান ছাড়িয়ে মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কে গড়ায়। নেতা-কর্মীরদের অনেকের হাতে এসময় দেখা গেছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সমাবেশে বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে নেতা-কর্মীরা নানা শ্লোগান দেয়।

গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর ঢাকায় এটি তাদের প্রথম জনসভা।

জনসভার মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিলো- অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহনযোগ্য নির্বাচন, মাদার অব ডেমোক্রেসী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তিসহ ৭ দফা দাবিতে জনসভা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, আজকে আপনারা এতো বাধা বিপত্তি করে এখানে সমবেত হয়েছেন, এটা প্রমান করে আপনারা দেশের মানুষ হিসেবে আজ এখানে দাঁড়িয়েছেন। সংবিধানে আছে এ দেশের মালিক জনগন। আপনারা সবাই এ দেশের মালিক। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আপনারা এসেছেন। আজ দেশে যা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না।

তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত। যেনতোনো ভাবে যাকে ইচ্ছা তাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করছি।

তিনি বলেন , দেশে গনতন্ত্র নেই। সরকারই আইন মানে না। তারা সব আইনের উর্ধ্বে। বিরোধী দলের জন্য এক ধরনের আইন, সরকারি দলের জন্য আরেক ধরনের আইন। প্রতিদিনই বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার-হয়রানি করা হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশে এভাবে চলতে পারে না।

তিনি বলেন, সত্যিকারের নির্বাচিত সরকারও এভাবে বিরোধীদের হয়রানি করতে পারে না, আর অনির্বাচিত সরকারেরতো হয়রানি করার কোন অধিকারই নেই। এটা অপরাধ। কাউকে বেআইনিভাবে আটক, গ্রেফতার করা মহা অপরাধ। আজ হোক কাল এসব অপরাধের জবাব দিতে হবে।

ড. কামাল বলেন, ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে এভাবে করছেন। হাইকোর্টে আমি সেদিন ছিলাম, বলেছিলেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাময়িক। সব দলের সাথে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেবেন। অথচ ৫ বছর হয়ে গেল। সরকারের কথার যে কোন দাম নেই, তা ৫ বছরে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৫ গেল, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ গেল, পুরা ৫ বছর চালিয়ে দিলেন। এটা কিভাবে আইনের শাসনের পরিচয়, সংবিধানের শাসনের পরিচয় হয়। অথচ মুখে মুখে গনতন্ত্রের কথা বলা হয়, সংবিধানের কথা বলা হয়। অথচ সংবিধানের ষোলআনাই উপেক্ষা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এরকম অবস্থায় আমাদের শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। যত বাধাই আসুক পায়ে হেটে হেটে, জেলায় জেলায় দাঁড়াতে হবে। দেশের মালিক কোন মহারাজা-মহারানী নন। যতো বাধাই আসুক না কেন আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, ঐক্যবদ্ধ থাকবো। আমরা সিদ্ধান্ত নেব, সব অন্যায় বন্ধ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে। আমাদের সবাইকে পাহাড়াদার হতে হবে। ভোট পাহাড়া দেয়া মানে স্বাধীনতাকে পাহাড়া দেয়া। স্বাধীনতা পাহাড়া দেয়া মানে জনগন দেশের মালিক। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য শপথ নিতে হবে। আপোষহীন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। এই রাষ্ট্র সবার। সবাই মিলে আমাদের ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হবে।
তিনি বলেন, দেশব্যাপী আরো জনসভা হবে। এর মাধ্যমে আমাদের যেটা প্রাপ্য তা আমরা আদায় করে ছাড়বো।

মালিকানা উদ্ধার করবো। তিনি বলেন, জনগন জেগেছে। এই জাগরনের মধ্য দিয়েই জনগনকে দেশের মালিক করে ছাড়বো।

সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে এই পিজি হাসপাতালে ছোট কক্ষে আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় বন্দি কাটাচ্ছেন। আমি জানি না, জনগনের এই উচ্চারণ পৌঁছাচ্ছে কিনা। আমি বিশ্বাস করি, তিনি সেখান থেকে শুনছেন এবং বলছেন, এগিয়ে যাও, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য এগিয়ে যাও, বিজয় নিশ্চিত করো।

কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি বলে গেছেন, আমি কারাগারে যেতে ভয় পাই না। তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে, জাতীয় নেতৃবৃন্দকে আহবান জানাবে। আজকে আল্লাহর কাছে এই শুকরিয়া আদায় করছি এই মঞ্চে জাতীয় নেতৃবৃন্দ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাচ্ছেন, জনগনের মুক্তি চাচ্ছেন।

সংলাপ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখনো আমাদের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন করা হচ্ছে। সংলাপে তথাকথিত প্রহসনের মতো বলা হলো যে, আর গ্রেপ্তার করা হবে না , মামলা তুলে নেয়া হবে। কিছুই করা হয় নাই। প্রতিদিনই গ্রেফতার করা হচ্ছে। এই জনসভা থেকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার কাছে লম্বা তালিকা আছে যা পড়ে শেষ করা যাবে না। শুধু গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ হাজার ৩৭১টি মামলা হয়েছে। ২৫ লাখ আসামী।

ফখরুল বলেন, আগামীকাল (আজ) একটা ছোট সংলাপের ডাক দিয়েছে। আমরা রাজী আছি। সংলাপে বিশ্বাস করি। আমরা চাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জনগনের সমস্যার সমাধান হোক, জনগন মুক্তি পাক। কিন্তু এটা নিয়ে নাটক করলে চলবে না। আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে, সংসদ বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নাই। আমরা আশা করবো, আপনাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে, জনগনের স্বার্থে ৭ দফা দাবি মেনে নেবেন।

দুপুর দেড়টায় ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ নেছারুল হকের পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। জনসভার শুরুতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের রুহের মাগফিরাত কামনা ও খালেদা জিয়ার রোগ মুক্তি কামনা করে মুনাজাত করা হয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং প্রধান বক্তা ছিলেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব। বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সহ প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিষ্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, আকরাম হোসেন, কামাল হোসেন পাটোয়ারি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের অধ্যাপক নূরুল আমিন ব্যাপারী, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জাতীয় পার্টির (জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিএনপির আব্দুল্লাহ আল নোমান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, আমান উল্লাহ আমান, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ফজলুল হক মিলন, জেএসডির আব্দুল মালেক রতন, বেগম তানিয়া রব, এম এ গোফরান, খেলাফত মজলিসের ড. আহমদ আব্দুল কাদের, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, ইসলামি ঐক্যজোটের এম এ রকিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নূর হোসাইন কাসেমি সহ ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির পক্ষে জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। আমরা কারো ফাঁদে পা দিতে চাইনা। আমাদেরকে আর ধোঁকা দেয়া যাবেনা। তিনি বলেন, অবিলম্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারের পদত্যাগ করতে হবে।

মওদুদ আহমদ বলেন, আমরা সমঝোতার মাধ্যমে চলমান সঙ্কটের সমাধান চেয়েছিলাম। কিন্তু সংলাপের কোনো কিছুই এখনো পাইনি। এতে কিছু না হলে আন্দোলনের কোনো বিকল্প থাকবেনা। ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরকারের পতন হবে। একদিকে সংলাপ অন্যদিকে গণগ্রেফতার। এই পরস্পর বিরোধী অবস্থান থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। এই সময়ে তফসিল দিবেননা।

২০১৪ সালের মতো নির্বাচন আর হতে দেয়া হবেনা। তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলে যাবেননা। তার মুক্তির জন্য আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দ্বার গণতন্ত্র মুক্তি পাবে।

মির্জা আব্বাস বলেন, অবিলম্বে গুম, খুন ও গ্রেফতার বন্ধ করুন। আমরা ক্ষমতা নয় দেশের জনগণের দাবি আদায়ের জন্য কাজ করছি। সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমেই জায়গা মতো পাঠিয়ে দেয়া হবে।

পুলিশ দিয়ে জনগণের আন্দোলন দমানো যাবেনা মন্তব্য করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে। আজকে দেশের গণতন্ত্র নিখোঁজ। খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি নিতে হবেনা। তার প্রতি অনুকম্পা করে এমন মায়ের সন্তান বাংলাদেশে নেই। কিন্তু সময় আসছে প্যারোলে আপনাদেরকে কবরে যেতে হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে ও গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবেনা। ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা না মানলে দেশে কোনো নির্বাচন হবেনা।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ১৯৭১ এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের আহ্বানে আমরা স্বাধীনতা এনেছিলাম। আজ সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকেই বলে যাচ্ছি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণতন্ত্রকে মুক্ত করে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবোই।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি রাজাকারের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছে’ বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এই অভিযোগ সত্য নয়। আওয়ামী লীগই প্রথম রাজাকারের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরিষাবাড়ির রাজাকার নূরুল আলম, রাজাকার মহিউদ্দিন ও আশিকুর রহমানের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছে। তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমি বিএনপিতে নয় ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করেছি। নির্বাচনে যদি জয় আপনাদের হাতে, আর যদি আপনারা হারতে চান তাও আপনাদের হাতেই। শেখ হাসিনা আপানাদেরকে বিজয়ীও করতে পারবে না আবার পরাজিতও করতে পারবে না। যদি জিততে চান তাহলে নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপি ও সব ভুলে গিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শান্তির পতাকাতলে নির্বাচন পর্যন্ত হিমাদ্রির মতো সোজা হয়ে দাঁড়ান। আপনাদের নেতারা কিন্তু খুব চিন্তিত। আপনাদের কর্মীদের জেলে নেয়ার জন্য। আমি খুব খুশি আপনাদের পেছনে পুলিশ দৌঁড়ানোর কারণে। কেননা আপনাদের পেছনে পুলিশ দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হয়রান হয়ে যাবে তখন কিন্তু ভোট চুরি করতে পারবে না।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, জনসভাকে ভয় পেয়ে সরকার রাস্তায় গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। গাবতলী ও টঙ্গি বন্ধ। সব রাস্তা বন্ধের পরও আমার বোনরে একটু বলা উচিত একটু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আইসা দেইখা যাইয়েন। গত ৪ তারিখ উনি এখানে এসেছিলেন আল্লামা শফীর এক মিটিংয়ে। আল্লামা শফী ভুলতে পারেন কিন্তু আমি কাদের সিদ্দিকী ভুলি নাই। শাপলা চত্বরে ঈমানদারের রক্ত ঝড়িয়েছে। এই রক্তের বদলা না নিলে আমরা বেঈমানে পরিণত হবো।

তিনি আরো বলেন, নির্বাচন দিতে হবে হাসিনাকে। উপায় নাই। আমি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই না। কারণ আজকে বেগম খালেদার মুক্তি চাওয়ার কোনো দরকার নাই। আমাদের চিন্তা করতে হবে হাসিনার মুক্তি কবে হবে। খালেদা জিয়া জেলখানায় গিয়ে গণতন্ত্রের প্রতীক হয়েছেন। তিনি জেলখানায় বন্দি থেকে দেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। আমি জানি বাংলাদেশকে বন্দি রাখা যায় না, তাই বেগম খালেদা জিয়াকেও বন্দি রাখা যাবে না।

প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, একটা চারালের কথার মূল্য আছে কিন্তু সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথার কোনো মূল্য নাই।

জনসভার প্রধান বক্তা আ স ম আব্দুর রব উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, এখন দেশের সব মানুষকে রাস্তায় বের করে আনতে হবে। আমাদের লড়াই বাঁচার লড়াই। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবনা। তিনি বলেন, অবিলম্বে গ্রেফতার বন্ধ করুন। মামলা না দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া সহ সব রাজবন্দীর মুক্তি দিন। তা না হলে জনতার আদালতে আপনাদের বিচার হবে। ছলচাতুরিতে কোনো কাজ হবেনা। সংলাপের মাধ্যমে আমাদের দাবি না মানলে খবর আছে এবং আপনি (প্রধানমন্ত্রী) বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, উন্নয়নের জোয়ারে সরকারের চোখে ছানি পড়েছে। দুর্নীতির কারণে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হয়েছে। আজকে আমাদের কি করণীয় সেই চিন্তা করতে হবে। গত ১০ মাসে নাশকতার নাম করে বিনা বিচারে সাড়ে চারশ জনকে সরকার হত্যা করেছে। এছাড়া কত হাজার লোককে হামলা, মামলা চালিয়েছে তার সবই আমাদের জানা। সরকার আজ কিছুই কানে শুনতে পায় না। আজকের এই জনসভায় যারা এসেছেন তারা সরকারের কানে আজকের আওয়াজ পৌঁছে দিবেন।

তিনি বলেন, দেশের এই অবস্থায় আমরা চুপ করে ছিলাম। কিন্তু আমাদের কিশোর ও তরুণেরা বললো রাষ্ট্রের চিকিৎসা প্রয়োজন, রাষ্ট্র মেরামতের প্রয়োজন। আজকে রাষ্ট্রের এই কথার ছবি তোলাতে শহিদুল আলম জেলে। একদিনে পাওয়া গেছে ৪৩ কোটি টাকার বান্ডেল। আর খালেদা জিয়ার কথিত ২ কোটি টাকার জন্য তাকে জেলে দিয়েছেন। জামিন তার মৌলিক অধিকার। যেখানে সরকারের এতো লোভ হয় সেখানে তারা ন্যায় বিচার করতে পারে না। সেই জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আজকের দিনের মতো ভোটের দিনও আপনারা সবাই এক হয়ে সকল বাঁধা অতিক্রম করে প্রতিটি ভোট কেন্দ্র পাহারা দিবেন। কেউ আপনাদেরকে ঠেকাতে পারবে না। তাতেই হবে খালেদা জিয়ার মুক্তি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পর সুবিচার সুনিশ্চিত।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গত ৫ বছরে যত নির্বাচন হয়েছে সব নির্বাচনে ভোট চুরি করেছে এ সরকার। ব্যাংক লুট করেছে। কোনো নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোট দিতে পারেনি। ৫ বছর ধরে একটা বিনা ভোটের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তারা দেশে একটা লুটের রাজত্ব কায়েম করেছে। আমরা গণতন্ত্র চাই বলে এখানে সব দল এক হয়েছি। তাই ৫ জানুয়ারি মার্কা আর কোনো ফোরটুয়েন্টি চলবে না জনগণের সাথে। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। একইসাথে দুই সংসদ চলতে পারে না। সংসদ ভেঙে দিতে হবে।

তিনি বলেন, নেতাকমীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, এসব চলবে না। সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেতাকমীদের মুক্তি দিতে হবে। তাদের গ্রেফতার করা চলবে না। সংলাপে বলেছি নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা যাবে না। তখন শেখ হাসিনা বললেন যাদের নামে মামলা আছে তালিকা দেন। তখন মির্জা ফখরুল বললেন কার হাতে তালিকা দিব? আপনার হাতে তালিকা আসতে কতদিন লাগবে? তিনি আশ্বাস দিলেন কিন্তু এখনো গ্রেফতার চলছে। আর কথায় কথায় গ্রেফতার করা চলবে না। লিখিত দিতে হবে। সংলাপের পর আর একটা নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা চলবে না, নেতাকর্মীদের গায়ে হাত দেয়া যাবেনা। এসব বাদ দিতে হবে।

বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ। এই সরকার তাকে জেলে মারতে চায়। কিন্তু আমরা নিজেরা জীবন দিয়ে হলেও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব। আমরা তাকে জেলে মরতে দিব না। তাকে মুক্ত করে আনবো। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে কোনো নির্বাচনও হবে না। এসময় তিনি জনসভায় নেতাকর্মীদের স্লোগান সম্বলিত ছবি বা ভিডিও প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেন। যাতে দেখতে পারে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে কত মানুষ জীবন দিতে রাজি!

পুলিশের উদ্দেশে মান্না বলেন, আপনারা ওপরের নির্দেশ মানেন তা আমরা জানি। এখন থেকে আর মানবেন না। জনগণ গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে যাবেন না। আমরা আবার ছোট সংলাপে যাবো। যদি আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় না হয়। তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজপথ প্রকম্পিত করে দাবি আদায় করা হবে। সংলাপে বলব- নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা থাকতে পারবেনা। সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে।

সমাবেশ উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গাছ-গাছালীতে টানানো হয় জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, হাবিব উন নবী খান সোহেল, আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনসহ কারাবন্দি নেতাদের ছবি সম্বলিত ব্যানার।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!