হোম ধর্ম ও সমাজ ‘এপ্রিল ফুল’ বিতর্ক: কিছু মতামত

‘এপ্রিল ফুল’ বিতর্ক: কিছু মতামত

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসে এপ্রিল ফুল এর কোন ভিত্তি নেই
-সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
“স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসে এপ্রিল ফুল বলতে কিছু নেই এবং পহেলা এপ্রিলেরও কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অধুনা আমরা যে ‘এপ্রিল ফুল’ বলে বেদনাহত হই সেটাও নিতান্ত আবেগী অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে এপ্রিল ফুল বিষয়টি এলো কোথা থেকে? কেনোই বা এটি আমাদের সংস্কৃতিতে সংযোজিত হলো? সে বিষয়টিও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক।

তাহলে এপ্রিল ফুল আসলে কী?
প্রথমেই কিছু দরকারি কথা জানা থাকা দরকার। অনেকেই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি কেনো শুধু শুধু এমন প্রচলিত বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি? তাদের জানা প্রয়োজন, মিথ্যা দিয়ে কখনো সত্যকে বেগবান করা যায় না। ইতিহাসের যেটা সত্য আমরা সেটাকেই আমাদের ধর্মীয় মানসে লালন করবো। একটি অযাচিত আবেগী মিথ্যা দিয়ে কেনো আমরা কলঙ্কিত করবো আমাদের রক্ষিত ইতিহাসকে? স্পেনে মুসলমানদের পরাজয় এবং সেখান থেকে বিতাড়নের ইতিহাস অবশ্যই আমাদের জন্য বেদনার উপলক্ষ। আমাদের সোনালি ইতিহাসে একটি জ্বলজ্বলে ক্ষত। গ্রানাডা, কর্ডোভা (কুরতুব; আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা পাশ্চাত্যের কর্ডোভার আরবি নাম আসলে কুরতুব। বিখ্যাত তাফসিরকারক ইমাম কুরতুবির জন্ম হয়েছিলো এখানে, আলহামরা, আন্দালুস- এসব নাম আমাদের মুসলিম মানসে চিরায়তভাবেই মিশে গেছে। আমাদের চোখের শার্শী বন্ধ করলে এখনো আমরা যেনো আন্দালুসের সেই সটান দাঁড়িয়ে থাকা মিনার চূঁড়াগুলো দেখতে পাই। দেখতে পাই গ্রানাডা থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের নারকীয় দৃশ্যাবলি। এগুলো আমাদের অনেক পুরনো বেদনার অনুষঙ্গ, আমাদের জাগরুক চেতনার অগ্নিশিখা। কিন্তু তাই বলে একটি মিথ্যা দিয়ে তো আমরা আমাদের সেই জাগরুক চেতনাকে কলঙ্কিত করতে পারি না। হোক আমাদের বেদনার ইতিহাস, হোক তা শোকের; একটি নির্জলা মিথ্যাকে কেনো আমরা আমাদের ধর্মীয় আবেগের অন্দরবাড়িতে জায়গা দেবো? সত্য ধর্মের জন্য সত্য ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে।”
-সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
লেখক,গবেষক।

ফাহিম বাদরুল হাসান

এপ্রিলফুলকে চতুর্দশ শতাব্দিতে স্পেনে ঘটে যাওয়া জেনোসাইডের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে,হচ্ছে!যা খুবই নিন্দনীয়।
-ফাহিম বাদরুল হাসান।

তথ্য-বিভ্রাট করে মুসলিমরাই কি একে অন্যকে বোকা বানাচ্ছে, ধোঁকা দিচ্ছে! “এপ্রিলফুল”। দিবসটি এপ্রিল মাসের প্রথম দিন পালন করা হয়। এর উদযাপন হচ্ছে মূলতঃ “মানুষকে বোকা বানানো”। এই দিনে একজন আরেকজনকে মিথ্যা কথা বলে, আশ্বাস দিয়ে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিংবা মোবাইলে prank call/massage দিয়ে বেকুব বানায়। এটা কোনো ভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না। মিথ্যার আশ্রয়ে কারো সাথে জোক করা যে হারাম, এটাতে কেউ দ্বিমত করে না।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই এপ্রিলফুল’র সাথে স্পেনের মুসলিমদের উপর চালিত জেনোসাইডকে জড়িয়ে দিয়েছেন। যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়।

এই দিবসের উৎস ও ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য এবং তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে, ব্যাপক মতানৈক্য। অনুসন্ধান করলে এপ্রিলফুল’র আদিতে পাওয়া যায়, হরেক জাতির হরেক ইতিহাস।

এপ্রিলের সাথে গ্রীকদের ধর্মীয় ফেস্টিভাল যেমন জড়িত, হিন্দু ধর্মের ‘হুলি-উৎসব’ও জড়িত রয়েছে বলে বিদ্যমান। তন্মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে সর্বাধিক অগ্রগণ্য রয়েছে, ফ্রান্সের ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের ঘটনা।
বলা হয়, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ মার্চ মাসের ২৫তারিখ থেকে ৩১তারিখ পর্যন্ত বছরের শেষ-সপ্তাহ ঘোষণা করে, এপ্রিলের ১তারিখ থেকে নতুন বছর শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পরের বছর কেউই তা করলো না, বরং আগের মতই ১লা জানুয়ারি থেকে বছর শুরু করলো। এতে ক্যালেন্ডার পরিবর্তনে উদ্যোগীরা বোকা বনে গেল। এটাকে তারা “poisson d’Avril” (এপ্রিলের মাছ) বলে। (poisson d’Avril হচ্ছে, ফরাসি phrase যা কাউকে “বোকা” বোঝাতে বলা হয়।)

এপ্রিলফুল’র ইংল্যান্ডভিত্তিক রয়েছে আরো দু’টি ঘটনা।
প্রথমটি ১৬৯৮ সালের। সেই বছরের ১লা এপ্রিল সেন্ট্রাল লন্ডনে “The Lion Washed” তথা “সিংহ ধৌতকরণ” অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। কিন্তু, সেদিন হাজার হাজার দর্শানার্থী গিয়ে দেখল, কিছু নিগ্রো লোককে গোসল করানো হচ্ছে। দর্শানার্থীরা গিয়ে তো পুরাই বেকুব বনে গেল। এভাবেই মানুষদের বোকা বানানো হয়েছিল।

আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায়, ১৭৪৬ মতান্তরে ১৭৬৪ সালের। সে বছরের Evening Star পত্রিকায় মার্চের শেষসপ্তাহে প্রকাশিত হল, আগামী ১লা এপ্রিল ইংল্যান্ডের ইসলিংটন’এ একটি গাধার প্যারেড হবে। নির্ধারিত দিন হাজার হাজার লোক সেথায় সমবেত হল। কিন্তু, সারাদিন অপেক্ষা করেও প্যারেড অনুষ্টিত হল না। দিনশেষে ওরা বুঝতে পারলো, তাদেরকে গাধা বানানো হয়েছে। এভাবেই ওরা বোকা বনেছিল।

এরকম আরো অনেক কাহিনী রয়েছে। তবে এগুলোর সাথে ইসলামের কিংবা মুসলমানদের কোনো সম্পৃক্ততার সত্যতা কোনো সোর্সই প্রমাণ করে না।
কিন্তু অত্যন্ত ব্যাপকভাবে এপ্রিলফুলকে চতুর্দশ শতাব্দিতে স্পেনে ঘটে যাওয়া জেনোসাইডের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে, হচ্ছে!! যা খুবই নিন্দনীয়।

১৪৯২ সালে তদানীন্তন স্পেনের গ্রানাডা বা বালেন্সিয়ার সম্রাট মুসলমানদের সাথে চুক্তি করবে বলে, মসজিদে একত্রিত হতে বলেছিল। মুসলমানরা একত্রিত হলে, অত্যন্ত নির্মমভাবে মসজিদে আগুন ধরিয়ে সকল মুসলমানদেরককে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। এই কাপুরুষিত, লৌমহর্ষক ঘটনাটা হয়েছিল ২রা জানুয়ারি, মতান্তরে ৯ই এপ্রিল। এটাকে পহেলা এপ্রিলের সাথে অর্থাৎ “APRIL FOOL’S DAY” এর সাথে কোনো ভাবেই সংযুক্ত করা যায় না।

আমাদের মনে রাখা উচিৎ- ইসলাম যেভাবে নিষিদ্ধ করেছে, মিথ্যা কথা বলে, অনৈতিক আচরণের মাধ্যমে কাউকে বোকা বানানো; ঠিক তেমনি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, না জেনে কোনো কিছু প্রচার করা।

রাসুল সাল্লাল্লাহূ আলাইহিসালাম বলেন, “সবচে’ বড় মিথ্যাবাদী হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে কোনো কিছু শুনার পর যাচাই না করে, তা অন্যের কাছে বলে দেয়।”।
-ফাহিম বাদরুল হাসান
লেখক,চিন্তক।

নুফাইস আহমেদ বরকতপুরী

কোনো এক নির্দিষ্ট দিনে কাউকে বোকা বানানো ইসলাম কখনও সমর্থন করেনা। বরং এটা কবিরাহ গুনাহ। এটা কোনো মুসলমানের সংস্কৃতি নয়। মুসলমান হিসাবে এ গুলো থেকে দূরে থাকা জরুরি।

তবে জেনে রাখা উচিত, এপ্রিল ফুল’র সাথে মুসলমানদের জড়িয়ে কোনো ইতিহাস নেই। এপ্রিলে স্পেনের মুসলমানদের গণহত্যা করার যে ঘটনা বলা হচ্ছে এটা সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন। বানোয়াট।
অযথা এখানে মুসলমানদের টেনে আনা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মত। তাই এ মিথ্যা কথা গুলো প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।
-নুফাইস আহমেদ বরকতপুরী
লেখক, চিন্তক।

মঈনুদ্দীন খান তানভীর

সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য উপাত্ত পাওয়া না গেলে ও প্রাপ্ত তথ্যাবলীর নির্মোহ বিশ্লেষণপূর্বক একথা অবশ্যই বলা যায়-এটি বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ। সচেতন মুসলিম মাত্রই যা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য
-মঈনুদ্দীন খান তানভীর

সময়ের পরিক্রমায় প্রতিবছর আসে পয়লা এপ্রিল।দিনটিকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর মাধ্যমে উদযাপন করে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো একশ্রেণীর অবুঝ মানুষ। অথচ এ দিবস প্রবর্তনের স্থান কাল সম্বন্ধীয় সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য উপাত্ত পাওয়া না গেলে ও প্রাপ্ত তথ্যাবলীর নির্মোহ বিশ্লেষণপূর্বক একথা অতি অবশ্যই বলা যায়-এটি বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ। সচেতন মুসলিম মাত্রই যা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

শুধু এদিনের কথাই বা বলি কেন।নবীজি বলেন-‘যে ধোঁকা দেয়,সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’এতবড় সতর্কবাণীর পর ও কি কোন মুসলিম সহাস্যবদনে ধোঁকাবাজির কোন সংস্কৃতি পালনে জড়িত থাকতে পারে?

তবে হ্যাঁ,মনে রাখতে হবে- ১৯৯২ সালের এদিনে স্পেনে বোকা বানিয়ে মসজিদে ঢুকিয়ে নিরীহ মুসলিমদের উপর নির্মম গণহত্যা চালানোর যে মর্মস্পর্শী বিবরণ দেয়া হয় আজকাল,এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।নাহয় তৎকালীন কোন সত্যানুসন্ধানী মানবতাবাদী ইতিহাসবিদ তো বটেই।পরবর্তীকালের নির্ভরযোগ্য কোন মুসলিম গবেষক ও ঘটনাটি উল্লেখ করবেন না-এ তো ভাবাই যায় না।

রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও ঈসাবেলার কাছে তৎকালীন মুসলিম শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদের অসহায় আত্মসমর্পণ হয়েছিল ১৪৯২সালের ২রা জানুয়ারী। পয়লা এপ্রিলে নয়।নানাসময়ে নিপীড়নের স্টিমরোলার চালানো হয় সত্য।কিন্তু বোকা বানানোর এমন কোন ঘটনা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদিতে মিলে না।

অবশ্য ইহুদীদের উপর দেশত্যাগের যে খড়গ নেমে আসে তৎকালীন সময়।সেই অধ্যাদেশটি জারী হয়েছিল মার্চের শেষ দিন। অতএব সম্মিলিতভাবে বোকায় পরিণত হওয়ার কোন যুগসূত্র যদি আদৌ প্রমাণিত হয়,তা তাদের বেলায়।মুসলিমদের বেলায় নয়।

অহেতুক মিথ্যা প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে সাময়িক হা হুতাশ আর ক্রন্দনে নতুন করে নিজেরা জাতিগতভাবে এপ্রিলের বোকা সাজার কোন মানে হয় না।

মুফতী মঈনুদ্দীন খান তানভীর
উস্তাদ,মারকাযুত তাকওয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!