এক মহানায়কের বিদায়

✍️শামসুল আলম

নিঃসন্দেহে তা ছিল এক মহানায়কের বিদায়। তাদের প্রিয় প্রেসিডেন্টের মৃত্যুতে সেদিন কেঁদেছিল গোটা বাংলাদেশ। গৃহবধু থেকে আবাল বৃদ্ধ ছাত্র যুবা সকলে দিনের পর দিন শোক করেছিল!একদিন নয়, দিনের পর দিন শোক, দোয়া খায়ের- প্রায় প্রতিটা ঘরে রোজা রেখে দোয়া করেছিল মানুষ। কেনো করেছিল? এটা করেছিল, কারণ সেদিন তারা অভিবাবক হারিয়েছিল। যে মানুষটির মাঝে বাংলাদেশের জনগন খুঁজে পেয়েছিল সত্যিকারের একজন জাতীয় নেতাকে, যার সময়ে প্রথমবারের মত স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে পেরেছিল জনগন, সে মহামানবটিকে হারিয়ে অনেকেই দিশাহারা হয়ে পড়েছিল।

একজন জিয়া খুঁজছে বাংলাদেশ

রাষ্ট্রপতি জিয়া কেনো এত জনপ্রিয় ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাব লিখতে গেলে পাতার পর পাতা লিখতে হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, একাত্তরের সেই ভয়াবহ হামলার মুখে রাজনীতিবিদরা যখন পালিয়ে নিজেদের জান বাঁচাতে দৌড়ের উপর, জাতিকে দিগনির্দেশনা বা আশ্বস্ত করার মত কেউ ছিল না, তখন উত্থান হয়েছিল এক জিয়ার, যার হাত ধরে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের নাম মানুষ জানতো না। ২৫ মার্চ রাতে পূর্বপাকিস্তানের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নেতা ও আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাক বাহিনী। ঠিক একই সময়ে তখন চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয়, এবং পূর্ব পাকিস্তানকে “স্বাধীন বাংলাদেশ” হিসাবে ঘোষণা করেন জিয়া। এরপরে সেনাদের শপথ করিয়ে তিনি তাদের নিয়ে শহরের বাইরে গিয়ে ঘাটি গাড়েন, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ব্যবহার করে (নিজেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট পরিচয় দিয়ে) দেশবাসী জানান দেন, বাংলাদেশ স্বাধীন ঘোষণা করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদেরকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সামিল হতে আহবান জানান, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থন কামনা করেন। এরপর থেকে জিয়া উঠে এলেন দেশবাসীর কাছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে গঠিত প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১১ এপ্রিল ১৯৭১ এক বেতার ভাষণে মেজর জিয়ার সরকার সম্পর্কে জাতিকে জানালেন,“The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the People’s Republic of Bangla Desh, first announced through major Zia Rahman, to set up a fullfledged operational base from which it is administering the liberated areas.” (Bangladesh Document vol-I, Indian Government, page 284). অর্থাৎ, তাজউদ্দিন জাতিকে বলছেন, মেজর জিয়া রহমান প্রথমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সেখান থেকে মুক্ত এলাকা (Liberated Area) শাসিত (Administering) হচ্ছে।

কিন্তু স্বাধীনতা লাভ করার পরের যে ক্ষুধা, দারিদ্র, রাস্তা ঘাটে ‍খুন লাশ, লুটপাট, লঙরখানা, চুরি ডাকাতি ছিনতাই রাহাজানির রাজত্ব শুরু হয়েছিল, তাতে মানুষের মোহভঙ্গ ঘটে। বাকশালতন্ত্রের জবাবে পটপরিবর্তনের পরে দেশে চুড়ান্ত অস্থিরতার মধ্যে আবার ধুমকেতুর মত উপস্থিত হলেন জিয়া। তিনি ক্ষমতায় আসার পরে একে একে সব অনিয়ম অশান্তি বদলে যেতে লাগলো। জনসাধারণ নিজেরাই দেখতে পেলো- দুর্ভিক্ষ থেমে গেছে, মানুষ কাজ পাচ্ছে, স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কেটে সবুজ বিপ্লবে ভরিয়ে দিচ্ছে সোনার বাংলা, তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ দুর্ভিক্ষের দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হলো, অভাবী মানুষরা ফুড-ফর-ওয়ার্কে কর্মসংস্থান পেলো, লক্ষ লক্ষ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে দেশের আইন শৃঙ্খলার অভাবণীয় উন্নতি ঘটলো, বন্ধ হয়ে গেলো রক্ষী বাহিনীর খুনের তান্ডব, শিল্প কলকারখানায় তিন শিফটে কাজ শুরু হলো, যুবকরা ইয়থ কমপ্লেক্সে যোগ দিয়ে কর্মসংস্থান হচ্ছে, এমনকি বিদেশেও যাচ্ছে, সমবায়ের ভিত্তিতে গরীব মানুষগুলো একত্র হয়ে নিজেরা বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পেলো, ভিক্ষুকের সংখ্যা কমে গেলো, নিরক্ষক মানুষদের গণশিক্ষায় সাক্ষরজ্ঞান শুরু হলো, পরিবার পরিকল্পনায় জনসংখ্যা বিস্ফোরণের লাগাম টেনে ধরা হলো, জিনিষপত্রের দাম সহনশীল হলো, মানুষের ঘরে আহার ও শান্তি ফিরে আসতে লাগল। স্বাধীনতার পরে এই প্রথম মানুষ দেখতে পেলো দেশটা ‘চোরের খনি’ থেকে কর্মীর খনি, সততার খনিতে পরিণত হয়েছে। এই প্রথম দেশের জনগন জানতে পারলো তাদের একটা সরকার আছে, যে তাদের খাইয়ে পড়িয়ে বাঁচাতে, জীবনমান উন্নত করতে তাদের রাজা মাইলের পর মাইল হেটে চলছে গ্রাম বাংলার পথে পথে, যে মানুষের সাথে হাত মেলায়, ঘরে ঢুকে খাবার চেয়ে খায়। জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে সমাজ ও মানুষের জীবনমানের যেমন দ্রুত পরিবর্তন আসে, তেমনি বর্হিবিশ্বেও দারুণভাবে পরিচিত হয়ে উঠে বাংলাদেশ। জাপানের মত শক্তিশালী দেশকে হারিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ, জাতিসংঘে নালিশ করে ভারতকে চাপে ফেলে ফারাক্কায় পানি আনলেন জিয়া, ইরাক-ইরান যুদ্ধ থামানো সহ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রচেষ্টায় ছুটে চলছেন বিশ্ব-কূটনীতিক জিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলির জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন SAARC, সারা বিশ্বময় দৌড়ঝাপ করে বাংলাদেশকে অতি উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। একজন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে স্মরণে রাখার জন্য সাধারন মানুষের জন্য এসব যথেষ্ট বৈ কি।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দূরদর্শীতা দেখিয়ে জিয়া জাতিধর্ম নির্বিশেষে পাহাড়ি বাঙালি সকল নাগরিকের জন্য মর্যাদাকর একক পরিচয় “বাংলাদেশী” নির্ধারন করলেন। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরে আওয়ামীলীগ নেতা মোশতাক যে সামরিক আইন ঘোষণা করেছিলেন, জিয়া তা প্রত্যাহার করেছিলেন, বিলুপ্ত হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে পূর্নজীবন দিলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চা শুরু করলেন, সংসদ চালু করলেন। জনগন রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে লাগল।

৩০ মে ১৯৮১, ঐ ভয়াবহ দিনটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে কত বড় হারানোর দিন ছিলো, তা নিজ অভিজ্ঞতায় এখনও অনুভব করি। স্বব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ! জনসাধারনের শোক এবং নিজের উপলব্ধি একাকার হয়ে গিয়েছিলো- সেদিন মানুষ বাংলার মানুষ কেবল তাদের রাষ্ট্রপতিকে হারায়নি, হারিয়েছিল স্বাধীন দেশের স্বপ্নকে, জাতির দিগদর্শনকে।

জীবদ্দশায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার কাছে পৌছার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার চার বার। প্রেসিডেন্টের সাথে খুব কাছে থেকেই খাল কেটে নতুন রাস্তা নির্মানে শরিক হয়েছিলাম, রাষ্ট্রপতির সাথে হাত মেলানোর সৌভাগ্য হয়, জনসভায় স্টেজে খুব কাছে দেখা, ইয়থ কমপ্লেক্সের একটি অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলাম। এতগুলো ঘটনা ঐ বয়সেই কম কিসের? বরং নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। জিয়ার আমলটি আমার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন দেশ, রাষ্ট্র এবং রাজনীতি সম্পর্কে বাস্তব উপলব্ধি বলতে যা বোঝায়, সেটা ঐ কালোত্তীর্ন মানুষটির সময়কালে লব্ধ হয়েছিলাম। স্বাধীনের পরে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, গণডাকাতি, বাপ বেটা মিলে পালা করে রাত জেগে বাড়ি পাহারা দেয়া, চুহাত্তরে আকালের কষ্ট যেমন খুব কাছে থেকে দেখেছি; তেমনি পচাত্তরের ১৫ আগস্টের দিনের কথাও স্মৃতিতে আছে অনেকখানি। ৭৭ সালে জিয়ার ভোটের পোস্টার নিজ হাতে লাগিয়েছি, খুঁজলে হয়তে গ্রামের বাড়িতে দু’একটা পোস্টার মিলতেও পারে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে শনিবার। সেদিন খুব ভোরবেলা বাজারে গিয়েছিলাম পত্রিকা পড়তে। কিন্তু সাড়ে ছ’টা থেকে ৭ টার মধ্যে রেডিওতে হঠাৎ ঘোষণা শুনতে পেলাম- রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে নিহত! ইন্নালিল্লাহ। আচানক এ খবরে সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু করে – হতভম্ব, বিস্ময়ে বিমুঢ়। ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরে তিনদিন টানা টিভির সামনে- অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষন, চট্টগ্রামের বিদ্রোহের নানা খবর, বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে নানা বার্তা, চট্টগ্রামের বিদ্রোহ দমন। দু’দিন পরে শহীদ জিয়ার লাশ ফেরত আসে ঢাকায়। সর্বকালের সর্ববৃহদ জানাজা হলো। পত্রিকা জুড়ে সারা দেশে শোকের খবর। চলে ৪০ দিন দেশব্যাপী শোক।

সেদিন কি ঘটেছিল চট্টগ্রামে?
১৯৮১ সালের ২৯ মে চট্টগ্রামে এক রাজনৈতিক সফরে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। চট্রগ্রাম মহানগর বিএনপি তখন দুই ভাগে বিভক্ত, এক অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিন আহাম্মেদ, অন্য অংশের নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার সুলতান আহাম্মেদ চৌধুরী। বিরোধ মিমাংসার জন্য জিয়ার এ সফর। রাষ্ট্রপতি রাত্রিযাপন করেছিলেন সার্কিট হাউজে। কিন্তু ঐ সফরকে কেন্দ্র করে দেশী বিদেশী খুনীচক্র তাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায়।

মুলত ঐ হত্যা পরিকল্পনা ছিল ভারতের। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির অনুমোদিত ঐ প্লান বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরে ভারতের পুরোনো গোলাম বাংলাদেশের সেনাপতি এরশাদের উপরে। ২৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির সাথে সফরসঙ্গী হিসাবে সেনাপ্রধান এরশাদের যাওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রামে, কিন্তু তিনি অযুহাত দেখিয়ে যাননি। জিয়া হত্যার পরে রাজনৈতিক সাপোর্ট জোগান দিতে ভারতে নির্বাসিত আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে এরআগেই দেশে পাঠানো হয় ১৭ মে। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী মতিয়ূর রহমান রেন্টু তার বইতে লিখেছেন, ২৩ ও ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক গোপন মিটিংয়ে আ’লীগ নেতা কর্নেল শওকত ৭১ ও ৭৫ এর যোদ্ধাদের জানান, চট্টগ্রামে গেলে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করা হবে, এরপরে আ’লীগ কর্মীরা অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের রেডিও টিভি সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করে নিবে।
সেনাপ্রধান এরশাদ রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করতে তার আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রামস্থ লে. কর্নেল মতিউর রহমানকে দায়িত্ব দেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ২৬ মে এরশাদ হঠাৎ করে চট্টগ্রাম সফরে যান বিএমএ পরিদর্শনের নাম করে। কিন্তু তিনি বিএমএতে না গিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে দিনভর গোপন মিটিং করেন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের সাথে, ঐদিন দুপরে লাঞ্চ ব্রেকে অফিসার্স মেসে লেঃ কর্নেল মতির সাথে লাঞ্চ সারেন এরশাদ। সেখানে মতি ব্যতিত আর কেউ উপস্থিত ছিল না। উল্লেখ্য লেঃ কর্নেল মতি ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এরশাদের অধীনে কাজ করেছিল। ৪দিন পরে এই মতিই ব্রাশফায়ার করে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে। পরে অবশ্য পরিকল্পনা মাফিক মতিকেও হত্যা করে এরশাদের নির্দেশে আরেক গ্রুপ। জিয়াকে হত্যা করতে হলে একটা সেনাবিদ্রোহ দেখাতে হয়, এই কারণে পরিবেশ সৃষ্টি করতে এরশাদ কায়দা করে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে ক্ষেপিয়ে তোলেন, রাষ্ট্রপতির সফরের দিনই তাকে অপমানজনক বদলী করে (ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড কলেজে), এই কলেজটি ছিল সিজিএসেএর অধীনে, যেখানে সিজিএস ছিলেন মঞ্জুরের ৩ বছরের জুনিয়র মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন খান। ধুর্ত জেনারেল এরশাদ চাচ্ছিলেনই যেন জেনারেল মঞ্জুরকে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আরও ক্ষেপিয়ে তোলা যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন বিমানে তখন কাটা ঘায়ে নুনের শেষ ছিটা দিতে ধুর্ত এরশাদ জেনারেল মঞ্জুরকে ফোন করে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট চাচ্ছেন যেনো মঞ্জুর প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্টে বা সার্কিট হাউজে না আসুক। এরফলে রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং জেনারেল মঞ্জুর দু’জন দু’জনকে ভুল বুঝতে থাকে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির পিএস লে.কর্নেল মাহফুজকে এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত করে তার বন্ধু লে.কর্নেল মতি। মূলত ২৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির সফর ছিল রাজশাহীতে, রাষ্ট্রপতির পিএস মাহফুজ ঐ প্রোগ্রাম বাতিল করে চট্টগ্রামে জরুরীভিত্তিতে কর্মসূচি দিয়ে লে. কর্নেল মতিকে জানিয়ে দেন। মতি তার লোকজন জুনিয়ার অফিসারদের ১৫/২০ জনের একটি দল নিয়ে তৈরি হতে থাকেন, যারা অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত করে ২৯ তারিখ দিবাগত রাত ৪টার দিকে সার্কিট হাউজে অভিযান চালায়। প্রথমে বাইরে থেকে মর্টার শেলিং করে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আঘাত করে দু’জনকে হত্যা করা হয়। এর আগে থেকেই সার্কিট হাউজের গেটের চাবি এবং রুম এলোকেশন মতিকে সরবরাহ করে রাষ্ট্রপতির পিএস মাহফুজ। আক্রমনের শব্দে রাষ্ট্রপতি ঘুম ভেঙে রুম থেকে বের হয়ে জানতে চান কি হয়েছে, ততক্ষণে নীচ থেকে উঠে এসে মতি তার সাব-মেশিনগান থেকে ট্রিগার টেনে হত্যা করে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে। এভাবেই বাংলাদেশ হারায় তার সর্বশ্রেষ্ট নেতাকে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যার পরে বিদ্রোহী সেনা অফিসাররা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে কব্জা করে এই বিদ্রোহের নেতা ঘোষণা করে। আবুল মঞ্জুর এতে কতটা জড়িত তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এদিকে ঢাকা থেকে এরশাদ খেলতে থাকে, সামরিক আইন জারী করার চেষ্টা করে অন্যান্য জেনারেলদের নারাজীতে ব্যর্থ হন। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তার থাকলেও এরশাদের ভুমিকাই প্রবল দেয়া যায়। জেনারেল মঞ্জুরকে রাষ্ট্রদ্রোহি ঘোষণা করে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিতে থাকেন। রেডিও টিভিতে এ সংক্রান্ত বার্তা প্রচার হয়। কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে চট্টগ্রামের দিকে বিশাল ফোর্স পাঠানো হয়, এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের বিদ্রোহী অফিসাররা সারেন্ডার করে। জেনারেল মঞ্জুর পালিয়ে যান হাটহাজারির দিকে। সেখানে পাইদং গ্রামে খৈয়াপাড়া চা বাগানে এক কুলির ঘরে আশ্রয় নেন। থানার ওসি কুদ্দুস খবর পেয়ে জেনারেল মঞ্জুরকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। (এই কুদ্দুস হচ্ছে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, এরশাদ তাকে প্রচুর টাকা পয়সা দেয়। সেই কুদ্দুস এখন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, ড্রাগন গ্রুপ ও রূপালী ইনশিওরেন্সের মালিক, এর আগে বিজিএমইএর সভাপতিও হন।) পরে ক্যাপ্টেন এমদাদের নেতৃত্বে একটি সেনাদল জেনারেল মঞ্জুরকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সেনানিবাসে। সেখানে এরশাদের নির্দেশে ঢাকা থেকে পাঠানো এক ব্রিগেডিয়ার একটি ঘরে মঞ্জুরের সাথে দেখা করতে যান, এবং এক মিনিটের ভিতরে বেরিয়ে আসেন, তারপরেই জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে মৃত পাওয়া যায়, কপালে একটি মাত্র গুলি। অবশ্য পরে এরশাদের নির্দেশে প্রচার করা হয়, উশৃঙ্খল সেনাদের হাতে নিহত হয়েছেন মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর, লে. কর্নেল মতি, ও লে. কর্নেল মেহবুবুর রহমান। এভাবে ধুর্ত এরশাদ রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করান, এবং হত্যাকারীদেরও হত্যা করেন, গুরুত্বপূর্ন সাক্ষী জেনারেল মঞ্জুরকেও হত্যা করেন কৌশলে। উল্লেখ্য, জেনারেল মঞ্জুর রাষ্ট্রপতির জিয়ার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারও ছিলেন, অন্যদিকে এরশাদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাঙ্গালি সেনাদের বিচারের নিমিত্তে গঠিত কমিটির প্রধান হয়েছিলেন। মঞ্জুর হত্যার সকল সাক্ষ্যপ্রমান এরশাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত। আর এটাকে জিম্মি করেই শেখ হাসিনা এরশাদকে কব্জায় রেখেছেন। খুনি এরশাদের এখন ভগ্নদশা, তবে এতগুলি খুন ও হত্যার দায়ে তার একটা জাগতিক শাস্তি পাওনা হয়ে আছে।

জিয়াকে নিয়ে আওয়ামীলীগের উষ্মা ব্যাপক, যার পুরোটাই রাজনৈতিক। আওয়ামীলীগের দাবী , জিয়া শেখ মুজিব হত্যায় জড়িত ছিলেন। কিন্তু ডা. বি চৌধুরি তার পুস্তকে পরিষ্কার করেই লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের ঘটনায় জিয়া জড়িত ছিলেন না। কিন্তু তৎকালে দেশে যে একটা পরিবর্তন হবে, এটা কেবল জিয়া নয়, ক্যান্টমেন্টের সবাই তখন জানতো। মেজর ফারুক রশিদরা প্রায় সব সিনিয়র অফিসারদেকেই জানিয়েছিল। এটা জানতো সেনা প্রধান সফিউল্লাহ, সিজিএস খালেদ মোশাররফ, স্টেশন কমান্ডার হামিদ, ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডান্ট শাফায়েত জামিল সহ সিনিয়র অফিসাররা, এমনকি শেখ মুজিব নিজেও জানতেন। ১৫ আগস্টের দিন দশেক আগে জেনারেল জিয়া নিজে শেখ মুজিবকে সতর্ক করেছিলেন, ক্যান্টনমেন্ট ঝামেলা হচ্ছে, অথচ মুজিব যখন সেনাপ্রধান সফিউল্লার কাছে জানতে চান, তিনি বলেন সব ঠিক আছে। অথচ আ’লীগের কাছে এখন জিয়ার দোষ হয়, আর সফিউল্লাহ খালেদ মোশাররফের নামে তারা শিরনি দেয়! জিয়ার সাথে আ’লীগের বিরোধটা হলো রাজনৈতিক- কেনো জিয়া এমন একটি দল গঠন করলেন যা আওয়ামীলীগকে হঠিয়ে বার বার ক্ষমতায় যায়। এই বিএনপির কারনেই জিয়াকে তারা একবার খুনি বানায়, একবার রাজাকার বানায়, একবার পদক কেড়ে নেয়। অথচ যুদ্ধের পরে শেখ মুজিবই জিয়াকে বীর উত্তম খেতাব দেয়, আবার বিএনপিও শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা পদক দেয়! ক্ষমতার প্রতিযোগিতা না থাকলে আজ জিয়ার নামেও শিরনি দিতো আওয়ামীলীগ। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়, জিয়ার মৃত্যুর পরে শোক প্রস্তাব উঠলে জাতীয় সংসদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য জনাব আছাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, ‘জনাব স্পীকার, আজকে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়েই এখানে বক্তব্য রাখতে হচ্ছে। …আজকে মরহুম জিয়াউর রহমান সাহেব আমাদের মধ্যে নেই। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, জনাব স্পীকার। …তিনি ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। জাতি সেটা স্মরণ করবে।…’
বাংলাদেশ জাতীয় লীগের প্রধান ও সংসদ সদস্য জনাব আতাউর রহমান খান বলেছিলেন, ‘…তিনি সরল-সহজ নিরলস জীবনযাপন করেছেন, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। মানুষকে ভালবেসেছেন এবং বাংলার জনগণের সঙ্গে তিনি একাত্মতা ঘোষণা করে তাদেরই একজন হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ মনে করত, জিয়াউর রহমান আমাদেরই মতো একজন সাধারণ মানুষ। তাকে তারা নিজেদের করে নিয়েছিল। এই গুণ সাধারণত অনেক নেতার মধ্যে পাওয়া যায় না। যার মধ্যে পাওয়া যায়, তিনি সত্যিকার অর্থে দেশের নেতা হতে পারেন।’ গণতন্ত্রী পার্টির নেতা ও সংসদ সদস্য বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংসদে আনা শোক প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে বলেন, ‘…৩০ মে থেকে ৩ জুন যে লক্ষ লক্ষ জনতা শুধু ঢাকা নগরীতেই নয়, গোটা বাংলাদেশে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের মানুষের কত কাছাকাছি এবং প্রাণপ্রিয় ছিলেন। এটা বলতে যদি কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন, এটা তার মানসিক দৈন্য এবং তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব বলে আমি মনে করি। …এই যে লক্ষ লক্ষ জনতার স্রোত, কেন এসেছিল এই লাশটির পাশে, কেন এসেছিল জানাজায় ও গায়েবি জানাজায়? এসেছিল একটি মাত্র কারণে—সাবেক রাষ্ট্রপতির সততার প্রতি অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাতে। …আমি কীভাবে এ পার্লামেন্টে এলাম, কীভাবে আমি এখানে কথা বলছি? এটা সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং বাংলাদেশে সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এভাবে চলছে। …রাষ্ট্রপতিকে কখন হত্যা করা হলো? ১৯৮০-তে নয়, ১৯৮১ সালের মে মাসে যখন রাষ্ট্রপতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন, যখন রাষ্ট্রপতি দৃঢ় প্রত্যয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করলেন, যখন শোষণহীন সমাজব্যবস্থার কথা বলতে চাইলেন, দক্ষিণ এশিয়া, পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গেলেন, সিরিয়ায় গেলেন, যখন নর্থ সাউথ ডায়ালগ ওপেন করতে গেলেন, আর সেই মুহূর্তে তার ওপর আঘাত এলো।” সংসদ সদস্য জনাব রাশেদ খান মেনন বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পীকার, মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেবের ওপর আপনি যে শোক প্রস্তাব এনেছেন, তার প্রতি আমি আমার ব্যক্তিগত এবং দলের তরফ থেকে একাত্মতা ঘোষণা করছি। …মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়। তাকে সেভাবেই আমি দেখেছি, তাকে সেভাবেই আমি সম্মান করেছি। তার সঙ্গে তার যে কীর্তি, সেই কীর্তি অমর এবং অক্ষুন্ন থাকুক—এটা কামনা করি।”

মরনশীল মানুষ জিয়া চলে গেছেন স্রষ্টার ডাকে, কিন্তু জনতার জিয়া রয়ে গেছেন সারা বাংলার ঘরে ঘরে, সাধারন মানুষের অন্তরে। তাই দেশে যখনই কোনো দৈব দুর্বিপাক আসে, তখনই বর্ষীয়ান মানুষেরা এখনও স্মরণ করে তাদের রাষ্ট্রপতি জিয়াকে। কি ৭১এর সেই দিগনির্দেশনাহীন জাতিকে পথ দেখাতে – ‘উই রিভোল্ট’ থেকে আমি মেজর জিয়া বলছি- বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি – কি ৭৫এর জাতীয় মহাদুর্বিপাকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার কঠিন সংগ্রাম সামাল দিয়ে দেশ পূনর্গঠনে আত্মনিয়োগ- যুদ্ধোত্তর দুর্ভিক্ষ দুর্নীতিপীড়িত একটি দেশের জনগনকে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে সঠিকভাবে টেক-অফ করতে ক্যারিশমেটিক লিডারশিপ। আজ দেশ যখন চরম রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ভূলুন্ঠিত, তখন দেশ উদ্ধারে জিয়ার মত একজনকে খুঁজছে বাংলাদেশ।

৩৮তম শাহাদাত বার্ষিকীতে শ্রেষ্ঠ এ নেতার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!