ফিলিস্তিন:এক নজরে ইসরাইলের জন্ম ও ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকট

টিআরটি ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে, মুহাম্মদ আল বাহলুল

Photo Credit: if america knew

ফিলিস্তিন ভূখন্ড অধিকারী ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টি রাতারাতি নয়। গত বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ফিলিস্তিন ছিল উসমানী সাম্রাজ্যের অধীন সিরিয়া প্রদেশের একটি অংশ। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি, তিন ধর্মের আবেগের কেন্দ্রস্থল এই অঞ্চলে তিন ধর্মের লোকই পরস্পর সহাবস্থানে বসবাস করতো।

বিংশ শতাব্দীর সূচনায় ইউরোপে যায়নবাদী আন্দোলনের সূচনার পর থেকেই ইহুদিদের প্রতি আহবান জানানো হয় একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। এই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যায়নবাদীদের পছন্দের স্থান ছিল ফিলিস্তিন। যায়নবাদীদের এই আহবানের প্রেক্ষিতেই ফিলিস্তিনে প্রথম দফা ইউরোপীয় ইহুদিদের আগমন ঘটে।

১ম বিশ্বযুদ্ধের শেষে উসমানী সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে ফিলিস্তিন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি শাসনের অধীনে আসে। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি সমর্থন জানায়। এই প্রেক্ষিতে ইহুদিদের আরেকদফা অভিবাসন ঘটে। ক্রমেই আরব ও ইহুদিদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি হতে থাকে। উভয়পক্ষের উত্তেজনা ও সহিংসতার মাঝে ব্রিটেন বাধ্য হয় ফিলিস্তিন হতে নিজেদের সরিয়ে নিতে। ফিলিস্তিন হতে ব্রিটেনের অপসারিত হওয়ার পর জাতিসংঘের অধীনে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষণের জন্য রাখা হয়।

১৯৪৭ এর নভেম্বরে, জাতিসংঘ বিবাদমান দুইপক্ষের মধ্যে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। ফিলিস্তিনের মোট ভূমির ৫৬.৫% নিয়ে ইহুদি-ইসরাইল রাষ্ট্র ও ৪৩.৫% ভূমি নিয়ে আরব-ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য বিভক্ত করে দেওয়া হয়। তিন ধর্মের কাছে পবিত্র জেরুসালেম নগরী জাতিসংঘের অধীন আন্তর্জাতিক জোন হিসেবে রাখার কথা প্রস্তাবে বিবৃত করা হয়।

ইহুদিরা জাতিসংঘের প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু অপরদিকে, আরবরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। এই প্রেক্ষিতেই শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ১ম আরব-ইসরাইল যুদ্ধের। এই যুদ্ধে ইসরাইল বিজয়ী হয় এবং জাতিসংঘ কর্তৃক প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি ভূমিও দখল করে নেয়। পুরো ফিলিস্তিন ভূখন্ড তিনটি খন্ডে বিভক্ত হয়ে পরে। জর্দানের অধীনে আসে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমের অংশ, গাজা উপত্যকা চলে যায় মিশরের অধীন এবং পশ্চিম জেরুসালেম সহ ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮% দখল করে নেয় ইসরাইল। সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি এই যুদ্ধের ফলে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনের ইতিহাসে এই ঘটনাকে স্মরণ করা হয় ‘আল-নাকবা’ বা ‘বিপর্যয়’ হিসেবে।

১৯৬৭ সালের ছয়দিনব্যাপী আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনে সম্পূর্নরূপে ইসরাইলের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। পশ্চিমতীর ও গাজা অধিকারের পর ইসরাইল সেখানে নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের সূচনা করে। যার ফলে ইসরাইলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়। এই প্রেক্ষিতেই গঠিত হয় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন ‘পিএলও’র। তাদের লক্ষ্য হয়, ফিলিস্তিনকে ইসরাইলি দখলদারিত্ব হতে যেকোনো উপায়ে মুক্ত করা। বছরের পর বছর সংঘাত চলতে থাকে।

ঘটনা পরিক্রমায় পিএলও একসময় ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে ভূমির বিভক্তিকরণ প্রস্তাব মেনে নেয়, কিন্তু সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক অবৈধ হিসেবে বিবেচিত অধিকৃত পশ্চিমতীর ও গাজা ভূখন্ডে ক্রমেই ইসরাইলি বসতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই প্রেক্ষিতেই শুরু হয় প্রথম ইন্তেফাদার (জাগরণ)। প্রথম ইন্তেফাদার মধ্য দিয়েই জন্ম হয় স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের, যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পশ্চিমতীর ও গাজায় ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধের।

১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পিএলও অসলো চুক্তি স্বাক্ষর করে যাতে পশ্চিমতীরের ভূখন্ডকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ কর্তৃত্বে এরিয়া, ফিলিস্তিন-ইসরাইল যৌথ কর্তৃত্বে এরিয়া বি এবং সম্পূর্ণ ইসরাইলি কর্তৃত্বে এরিয়া সি। কিন্তু এই সমাধান বরং সৃষ্টি করেছে অধিক সমস্যার। পশ্চিমতীরের অধিকাংশ কৃষিজমি ও জলাশয় এরিয়া সি এর অধীন পরে গিয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার সীমিত। এরফলে পরবর্তী শান্তি আলোচনাসমূহ ব্যর্থতায় পরিণত হয়। ফিলিস্তিনিদের হতাশা জন্ম দেয় দ্বিতীয় ইন্তেফাদার। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ইসরাইল বিভক্তকরণ দেওয়াল ও চেকপোস্টের নির্মাণ করে।

২০০৫ সালে গাজা উপত্যকা হতে ইসরাইল নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় কিন্তু পশ্চিমতীরের নতুন নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণের কাজ অগ্রসর হতে থাকে। হামাস গাজার শাসনক্ষমতা অধিকার করে নেয় এবং পিএলও এর অধিক আপোষকামী মনোভাবের কারনে নিজেদের পিএলও হতে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। এতে করে পশ্চিমতীর ও গাজা দুইটি ভিন্ন নেতৃত্বে শাসিত হতে থাকে, পিএলও শাসিত পশ্চিমতীর ও হামাস শাসিত গাজা উপত্যকা। ইসরাইল গাজা উপত্যকাকে ভূমি, জলপথ ও আকাশপথে অবরুদ্ধ করে।

২০১৭ সালে অবরুদ্ধ গাজা, অধিকৃত পশ্চিমতীর ও দখলীকৃত অপরাপর ফিলিস্তিন ভূখন্ড নিয়েই ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি। সমস্যা সমাধানে অসংখ্য প্রস্তাব হাতে রয়েছে কিন্তু এই সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে সেই প্রস্তাবসমূহের বাস্তব প্রয়োগই হচ্ছে এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!