একটি শোক সংবাদের গল্প ::আলম মুহাম্মদ

 একটি শোক সংবাদের গল্প

“”””””””””””””আলম মুহাম্মদ

প্রতিদিনের মত চাকুরী এবং আনুসাংগিক কাজ শেষে রাত ন’টায় বাসায় ফিরি। ছেলেটা তখনো জেগে থাকে। দরজায় টকটক শব্দ শুনলে তার মায়ের আগে সেইই দৌড়ে আসে দরজা খুলে দেয়ায় জন্য। এখনো দরজার লক ঠিকমত ছুঁতে পারে না।কিন্তু তার মায়ের আগে এসে দরজায় টানাটানি করে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায় পাপাকে দরজা খুলে দেবে। ততক্ষণে তার মা এসে দরজা খুলে দিলে অশুদ্ধ উচ্চারণে শরিরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোরেশোরে আসসালামু আলাইকুম বলে গলাটা জড়িয়ে ধরে। মাত্র একটা চুমো দিয়ে ফের দৌড় দেয় এবং তার পাপা এসেছেন বলে চিৎকার দিয়ে বাসার সবাইকে জানান দেয়।

ছেলের মা হাসিমুখে হাতের ব্যাগটা নেন। আমি রুমে ঢুকে কাপড় পাল্টানোর আগে ছেলেটাকে আবার জড়িয়ে ধরি। কুলে নেই, বুকের সাথে লেপ্টে ধরে তাকে আদর করি। নানান কথাবার্তা বলি। ভাত খেয়েছো? কি দিয়ে খেয়েছো? আম্মু আজ মারছে কি না? কোথাও ব্যথা পেয়েছো কি? দুষ্টুমি কতটুকু করেছো। ইত্যাদি নানান প্রশ্নের সে আধো বুলিতে জবাব দেয়। তাকে আরেকবার চুমো দিয়ে ছেড়ে দেই।নিজের কাপড় ছোপড় পালটিয়ে বাথরুমে ঢুকি। অজু করে বের হয়ে এশার নামাজটা পড়ে নিই। এই সময়ে ছেলের মা টেবিলে ভাত রেডি করে অপেক্ষায় থাকেন। নামাজ আদায় হলে সোজা ভাতের টেবিলে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে টেবিলে বসেই কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে নিলাম। তারও হাড়ি পাতিল গোছানো শেষ হলে ভাতের টেবিল থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে বিছানায় এসে গা এলিয়ে দেই। টিভির সুইচ অন করে এই চ্যানেল সেই চ্যানেলে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে অবশেষে ক্লান্তির কাছে নিজেকে সপে দিয়ে ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করি।এই উঠো, ফজরের নামাজের সময় হয়েছে। দুই তিন বার ডাক দিয়ে বউ বাথরুমে চলে যান। আমারো ঘুম ভেংগে যায়। দেখি ছেলেটা আমার শরিরের উপর পা তুলে গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমুচ্ছে। আমি তার পা টা সরাতে যাব,কিন্তু আমার হাত নড়াতে পারি না। চোখ মেলার চেষ্টা করছি, কিন্তু চোখের পাতা খুলতে পারছি না। বউ এসে আবার আমাকে উঠার তাগাদা দিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাড়াচ্ছে আমি ঠিকই বুঝতে পারছি। তাকে ডাক দেই,কিন্তু সে শুনে না। শত চেষ্টা করে ছেলেকে ছাড়াতে পারি না। পুরো শরির আমার অবশ হয়ে আছে।নামাজ শেষ করে বউ তাসবীহ তাহলীল পড়ে তার নিজের গোনাহখাতা, আমার ও আমাদের সকলের গোনাহখাতা মাফির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করছে। আরো কত কিছু চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেছে, আমি সবই শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি উঠতে পারছি না, নড়াছড়া করতে পারছি না, কথা বলতে পারছি না। নামাজ ও দোয়া কালাম শেষে বউ উঠে এলো। একটু রাগত হয়ে ডাক দিলো, নামাজের সময় চলে যাচ্ছে, উঠোনা। কিন্তু আমার কোনো সাড়া শব্দ নাই। এবার সে আমার শরিরে ধাক্কা দিয়ে ডাক দিলো। না,এবারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। আমি নিঃসাড় পড়ে আছি।এতক্ষণে বউ বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে। সে চিৎকার দিয়ে উঠলো। বাসার অন্যদের ডাক দিলো। সবাই তার চিৎকারে ছুটে এলো। সবাই বুঝে নিলো আমি আর এই দুনিয়ায় নাই। কি যে কান্নার রোল শুরু হলো। মাইকে ঘোষণা হতে লাগলো – একটি শোক সংবাদ।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!