ঈগলের চোখ:মাসুম খলিলী

 ঈগলের চোখ – ছবি : সংগ্রহ

গেল শতাব্দীর চল্লিশের দশকের সবচেয়ে আলোচিত কবি ও সাহিত্যব্যক্তিত্ব ফররুখ আহমদের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ১৯ অক্টোবর। জাগরণের কবি হিসেবে খ্যাত এ ব্যক্তির সাহিত্যচর্চা ছিল বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। মৌলিক ও বড় কবি প্রতিভা হিসেবে ফররুখের খ্যাতি অনস্বীকার্য। তবে আলোচিত কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার সাহিত্যচর্চার সূচনা । শিশুসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে তার। তার কাব্যনাটক ‘নৌফেল ও হাতেম’ ঢাকা বেতার ছাড়াও তৎকালীন টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে অনেকবার। ফররুখ রচিত প্রতিবাদী নাটক ‘রাজ-রাজড়া’ মঞ্চস্থ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটি প্রযোজনা করেন মুনীর চৌধুরী। কিন্তু তিরিশ ও চল্লিশের দশকের সাড়া জাগানো কবি, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আলোচনার শীর্ষে থাকা এক ব্যক্তিত্ব ’৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যবনিকার ওপারে চলে গেছেন চরম অবহেলায়, অভিমানে।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষের মনের ওপর ঐতিহাসিক পলিমাটির এক ধরনের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। সাগরে মিলতে থাকা নদীবিধৌত পলিমাটিতে এ বদ্বীপ দেশটি গঠিত বলেই হয়তো এখানকার মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাসের উত্থান-পতন অনেকটা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। এক সময় যাকে নন্দিত করে মাথার তাজ বানানো হয়, তিনি হয়তো ক’বছর পর বনে যান খলনায়কে। আবার সময়ের ধারায় আবেগ-উচ্ছ্বাস পাল্টে যাওয়ার সাথে সাথে এখানকার সাহিত্যসেবী বুদ্ধিচর্চকদের মন-মননও পাল্টে যায়। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী পাঠে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যে মানস গঠনের পরিচয় মেলে, দুই দশক পরের অবস্থা সেই রকম থাকেনি। পাকিস্তান আন্দোলনের একজন অগ্রণী সৈনিক পরে পরিণত হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিতে।

রাজনৈতিক ময়দানের মতো সাহিত্যচর্চার জগতেও মন-মনন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হরহামেশাই ঘটে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। তিনি সত্য বিশ্বাস ও আদর্শকে জীবনে প্রতিফলিত করার ব্যাপারে ছিলেন নিরাপস। এ জন্য পার্থিব জীবনে তাকে মূল্য দিতে হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। অবশ্য সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন সব সময় একই মানদণ্ডের হয় না। কবির মানদণ্ডও সম্ভবত ছিল কিছুটা ভিন্ন। এই মানদণ্ডে তিনি অনেকের চোখের ব্যর্থতার মধ্যে দেখতে পেয়েছেন সাফল্য। সেই সাফল্যের স্থায়ী ঠিকানায় এখন কবির অবস্থান।

ফররুখ আহমদের সাহিত্যে অবদান নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখি একেবারে কম নয়। ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছরেই তিনি পেয়েছেন এ পুরস্কার। মৃত্যু-পরবর্তীকালে একুশে ও স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। ফররুখের সময়ের প্রধান মুসলিম কথাসাহিত্যিকের তালিকায় আবু রুশদ, আবু জাফর শামসুদ্দিন ও নাজিরুল ইসলামের পাশে রয়েছে তার নাম। মরণোত্তর পর্বে প্রকাশিত ফররুখ আহমদের গল্প তারই অসামান্য স্মারক। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর ১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর ১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (জুন ১৯৬১)- কাব্যনাট্য, মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর ১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি ১৯৬৩), হাতেম তায়ী (মে ১৯৬৬)- কাহিনীকাব্য, নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (আগস্ট ১৯৮০), হাবেদা মরুর কাহিনী (সেপ্টেম্বর ১৯৮১) ও দিলরুবা (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)। কবির শিশুতোষ বইয়ের মধ্যে রয়েছে- পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (ডিসেম্বর ১৯৮৫)। কবির পারিবারিক সূত্র অনুসারে, এখনো ফররুখের বেশ ক’টি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি রয়ে গেছে।

ফররুখ আহমদের আর এক পরিচয় অসামান্য গীতিকার তিনি। কী দেশাত্মবোধক গান- [তুমি চেয়েছিলে মুক্ত স্বদেশ ভূমি], কী জাগরণমূলক গান [চলো বীর চলো নির্ভয়], কী প্রেমিক সত্তার গান [তারার দেশের রাণী] সবটাতেই তার প্রতিভার ছাপ রয়ে গেছে।
ফররুখের সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রথমে সুবিশাল বই লেখেন সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনি ফররুখ-মানসের ক্রমাগ্রগতি বর্ণনা করেন এভাবে : ‘সাত সাগরের মাঝি’র কবি-স্বপ্ন ‘সিরাজাম মুনীরা’তে খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনালোকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নের মধ্য দিয়েই প্রথম বাস্তবায়নের পথ খুঁজেছেন। সে বাস্তবায়নের পথ কবি প্রথম আবিষ্কার করেছেন ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাট্যে হাতেমের মতো এক ‘কামিল ইনসান’, ‘মর্দে মোমিনের’ সেবা ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের মধ্যে। ‘হাতেম তায়ী’তে কবি সেই আদর্শ-কর্মী, সেবাব্রতী, ত্যাগী ও সত্যসাধক হাতেমের অপরূপ জীবনগাথা রচনা করে তার মনোগত আদর্শটির কার্যকারিতায় নিঃসংশয়িত বিশ্বাসে উপনীত হয়েছেন।

এরপর তার সাহিত্য ও অবদানের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেছেন, কবি সমালোচক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, বিশিষ্ট কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও শাহাবুদ্দিন আহমদ। আব্দুল মান্নান সৈয়দ কবি ফররুখের ওপর সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন। ফররুখের ওপর তার বইয়ের সংখ্যা সর্বাধিক। এসব বইয়ে ফররুখের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন একান্তÍভাবে পক্ষপাতমুক্ত। তিনি আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নকে গ্রন্থীভুক্ত করেছেন। ব্যক্তি ফররুখকে বিশ্লেষণ করে তিনি বলেছেন, ফররুখ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আমৃত্যু অনুরাগী। বিশ্বাসের মেরুদূর বৈপরীত্ব সত্ত্বেও ফররুখ চরিত্রের দৃঢ়তা কোত্থেকে এলো, আমরা এখন খানিকটা আঁচ করতে পারি।

ফররুখের ওপর আলোচনাকারীদের মধ্যে আব্দুল কাদিরের মূল্যায়নটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। সেই ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে তিনি ফররুখ সম্পর্কে এক মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘বাংলার নবীন মুসলমান কবিদের মধ্যে ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস ও সৈয়দ আলী আহসান কালের হিসাবে অতি আধুনিক। কিন্তু কালের হিসাবেই শুধু নয়, যে ভঙ্গি অতি আধুনিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, তার প্রতি এদেরও অনুরাগ অত্যন্ত প্রবল। এই পঞ্চরথীর মধ্যে ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ।’

ফররুখ সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়নও বিশেষভাবে গুরুত্ব রাখে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে ফররুখ আহমদের কাব্যনাটক ‘নৌফেল ও হাতেম’ -এর একটি বেতার নাট্যরূপ প্রচার হয়েছিল। এ সম্পর্কে তিনি লিখেন : “নাটকটির পরিবেশনায় হয়তো উল্লেখযোগ্য নতুনত্ব ছিল না, কিন্তু এর রচনায় যে লক্ষণীয় নতুনত্ব আছে, তা অবশ্যি স্বীকার্য। প্রথমত, এটি কাব্যনাটক, সে হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানি সাহিত্যে প্রায় একক। দ্বিতীয়ত, এর কাহিনী পুঁথিসাহিত্য থেকে নেয়া, সেদিক থেকে পরীক্ষামূলক ও আকর্ষণীয় এবং বলা বাহুল্য এ দু’টি দিকই প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফররুখ আহমদের কাজ পথিকৃতের। অনেক আগাছার ভিড় থেকে সত্যিকার গাছটিকে চিনে নিতে হয় কী করে, তা তিনি দেখিয়েছেন। মোহাম্মদ দানেশ রচিত ‘চাহার দরবেশ’ পুঁথির একটি ঘটনার ইশারাকে বিকশিত করে তাকে ‘নৌফেল ও হাতেম’ কাব্যনাটকের চেহারা দিয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা, ঐতিহ্য চেতনা এখানে দায়ভার নয়, নতুন একটি কর্মের মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন ধারাগুলো এখানে সন্নিহিত।”

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘আধুনিক কবিতা’ সংগ্রহের সম্পাদক (বর্তমানে জাতীয় অধ্যাপক) রফিকুল ইসলাম আমাদের কবিতার ইতিহাসসম্মত এক পর্যালোচনা করেছেন। তাতে তিনি বলেন : নজরুলে যে আবেগ প্রথম বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত এবং যে জাগরণ সাধারণভাবে কাম্য, ফররুখ আহমদে তা বিশেষ অর্থে বিশেষ প্রেরণায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভিসারী। নজরুল চেয়েছেন নবজাগরণ আর ফররুখ পুনর্জাগরণ।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন লিখেছেন : ‘হাতেম তায়ী’ কবি ফররুখ আহমদের লেখা প্রায় সোয়া তিন শত পৃষ্ঠায় সমাপ্ত এক বিরাট মহাকাব্য। এ আখ্যায়িকা-কাব্যটি যখন সাময়িক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই কবি আবদুল কাদির, ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক প্রমুখ সাহিত্য-সমালোচকগণ একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আমিও মনে করি, সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করলে ভুল তো কিছু করা হবে না, বরং এতে যথার্থ মূল্যায়নই এর হবে।’

ফররুখ ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর এই কবির কবিতা প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন এবং বাক্প্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আধুনিকতার সব লক্ষণ তার কবিতায় পরিব্যাপ্ত। তার কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে তিনি যে কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন, তা স্বতন্ত্র এবং এ গ্রন্থ তার এক অমর সৃষ্টি।

তদানীন্তন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রশ্নহীন ছিলেন না ফররুখ আহমদ। তখন সবাই পাকিস্তান, পাকিস্তান আন্দোলন ও ইসলাম নিয়ে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি, এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেকের কথা বাদ দিয়েও কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহর ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে সঞ্চয়িতার মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা।’

অনেকের মতো, ফররুখ আহমদও চাইলেন নতুন রাষ্ট্রের নতুন সাহিত্যিক ভাষা। ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসির মিশ্রণে নির্মাণ করলেন অপূর্ব এক সাঙ্গীতিক মূর্ছনা, রোমান্টিক সম্মোহন। তার সমকালে একই ধারার কবিতায় তার জুড়ি নেই। এই ধারার আরেক শক্তিশালী কবি সৈয়দ আলী আহসান পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন। ফররুখের কবিতার এই মূর্ছনা, এই কবিত্বের প্রশংসা করেননি- এমন সমালোচক বাংলাদেশের সাহিত্যে বিরল।

এ বিষয়টি হাসান হাফিজুর রহমান ঠিকই বুঝেছিলেন। আধুনিক কবি ও কবিতা (১৯৬৫) বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ফররুখ আমাদের কাব্যসাহিত্যে আধুনিক উত্তরণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং আঙ্গিকের প্রয়োগে।’ ফররুখকে বাদ দেয়া মানে, আমাদের জাতিসত্তার এবং কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেয়া। এই প্রবণতা বোধ করি পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসেই পাওয়া যাবে না। ফররুখ আমাদের বহুস্বর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বর হিসেবে আদরনীয় হোক। বহুস্বরের মধ্যে প্রধান স্বরের গুরুত্ব বাড়ে বই, কমে না। ব্যক্তি জীবনে কবি ছিলেন লোভ লালসার ঊধ্বের্, স্বেচ্ছায় সুযোগ-সুবিধা ত্যাগী একজন মানুষ। নিজের ব্যাপারে তিনি গভীর আস্থাশীল ছিলেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এ ভূখণ্ডের বেশির ভাগ কবি-সাহিত্যিকের মতো তিনিও মুসলমানদের আলাদা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ জন্য লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন ছিল আল্লামা ইকবালের মতো আদর্শগত, পরিবর্তন ও সুবিচারের স্বপ্ন। আর এ কারণেই ’৪৭-এর স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তিনি জোরালোভাবে কলম ধরেছেন। আবার পাকিস্তানের কৃষ্টি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তার ভাবনাকে বাইরের বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে তৎকালীন সরকার তাকে শুভেচ্ছা দূত করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। ষাটের দশকে তার সাহিত্যাঙ্গনে অবস্থান বা অবদানের সামান্যতম সুবিধা তিনি কর্মজীবনে গ্রহণ করেননি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে এই কবির বিশ্বাসের কারণে তাকে চাকরিচ্যুতি ও বঞ্ছনার চরম বৈরী এক অবর্ণনীয় অবস্থায় ঠেলে দেয়া হয়েছে। তার অবদানকে, তার কাব্য চর্চাকে বিতর্কের বিষয় বানানো হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক টেকেনি। ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের যে অনেক বড় একজন কবি ছিলেন, সেই মূল্যায়ন স্বীকৃতি লাভ করেছে। ক্ষুদ্র পরিসরের লেখা ছাড়াও আব্দুল মান্নান সৈয়দ বা শাহাবুদ্দীন আহমদের গভীর বিশ্লেষণে অসাধারণ ও মৌলিক কবি প্রতিভা হিসেবে বিশেষভাবে স্বীকৃত হলেন কবি ফররুখ আহমদ। ফররুখের এই অবদান নিয়ে অন্য শিবির থেকেও স্বীকৃতি আসতে থাকে। তার রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি, সিরাজাম মুনীরা, মহাকাব্য হাতেম তায়ী, কাব্যনাটক নৌফেল ও হাতেম, মুহূর্তের কবিতা নতুন করে মূল্যায়িত হতে থাকে। তাকে নিবেদন করে কবিতা লিখেছেন কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদসহ আরো অনেকে। ফররুখকে বিতর্কের ডামাডোলে ফেলে অবমূল্যায়নে অস্বীকৃতি জানানোর অবস্থা আর থাকেনি।

বাংলা ভাষায় ফররুখ নিয়ে যে চর্চা হয়েছে, অন্য ভাষাভাষীদের মধ্যে ততটা হয়নি। তার কবিতা অনুবাদ করেছেন আবু রুশদ, কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আব্দুর রশীদ খান, সুরাইয়া খানমের মতো ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু তাকে মূল্যায়ন করে লেখা গ্রন্থ ইংরেজিতে সেভাবে দেখা যায় না। এ ক্ষেত্রে ফররুখের স্নেহধন্য ব্যক্তিত্ব শাহ আব্দুল হালিম তার প্রচেষ্টা নিয়ে এগিয়ে আসেন। ‘ঈগল আই’ হলো তার সেই প্রচেষ্টা। খুব সুপরিসর গ্রন্থ নয় সেটি। এতে কবি প্রতিভার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বা কবিতার গভীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে বলা চলে না। তবুও এই প্রচেষ্টা ইংরেজিভাষীদের সামনে ফররুখকে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে মূল্যায়িত হবে।

এ ব্যাপারে কবি আল মাহমুদের মূল্যায়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ফররুখ আহমদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষে নতুন ভোর দেখতে আগ্রহী বাঙালি সাহিত্যের একজন বিখ্যাত কবি। ইংরেজিভাষী পাঠকদের সামনে তাকে উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘ দিন ধরে অনুভূত হচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘ঈগল আই’ বইটি ফররুখ আহমদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক গ্রন্থ, যাতে ইংরেজিতে কবির জীবন ও কাজগুলোর অনেক দিক নিয়ে গবেষণাধর্মী আলোচনা করা হয়েছে। কবি ফররুখকে তিনি যেমন ছিলেন, তেমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন লেখক।

বইটিতে ফররুখের কাব্যগত অবদান এবং কবি রচিত লেখার উচ্চ সাহিত্য মানকে সংক্ষিপ্তভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফররুখ কিভাবে পুঁথিসাহিত্যকে নতুন জীবন দিয়েছেন তা নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন; কিভাবে চিত্তাকর্ষক পদ্ধতিতে আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছেন তা দেখিয়েছেন। একই সাথে উল্লেখ করেছেন তার সফলভাবে ব্যবহার করা রূপক নিয়ে।

বইয়ের লেখক তার প্রাথমিক ছাত্রজীবনে কবি ফররুখ আহমদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কবি তার মতো কয়েকজন কিশোরকে সাংস্কৃতিক জগতে তার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। এই সংস্পর্শের দায়বোধ থেকে লেখক ফররুখ এবং তার জীবন সম্পর্কে কিছু লেখার প্রয়োজন অনুভব করেছেন। তিনি সাহিত্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গভীর বিশ্লেষণে যাননি, তবে কবির জীবনের অনুদঘাটিত কিছু দিক আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। তাকে নিয়ে বিতর্ক বিশেষত স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের নানা বিষয় তুলে এনেছেন। তিনি ফররুখ সম্পর্কে সাহিত্য সমালোচকদের কিছু ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করেছেন। কবি সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা এখন পর্যন্ত আলোচনায় সেভাবে আসেনি।

ফররুখ ছিলেন সামাজিক অবয়ব বা বিন্যাসের একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক এবং তিনি তার চিন্তাভাবনা নিয়ে দেশবাসীর মানসিকতাকে প্রভাবিত করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেছিলেন। তার চিন্তাভাবনার সবটাই সাহিত্য সাধনাকেন্দ্রিক। তার নিজ জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি হাতিয়ার হিসেবে কবিতাকে ব্যবহার করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তিনি। নিজের সাহিত্যিক সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা ছিল। তিনি জীবন সংগ্রামের রুক্ষ সমুদ্রের মধ্যে একজন সতর্ককারী নাবিক ছিলেন। কবি ফররুখ আহমদ একজন ন্যায়পরায়ণ ও হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। তার চরিত্রের উজ্জ্বলতা কখনোই হারিয়ে যায়নি। ব্যথা বা দুঃখের মধ্যেও যেকোনো পরিস্থিতিতে তিনি কখনোই সাহস হারাননি। তিনি কখনো শির নত করেননি অযৌক্তিক চাপের কাছে । তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ পরাজিত হতে পারে কিন্তু আত্মার কোনো পতন হয় না। তিনি খ্যাতি এবং নিন্দা, উভয় বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। ফররুখ আহমদের সাহিত্যিক কাজগুলোর মধ্যে সমুদ্রের গভীরতা এবং পাহাড়ের উচ্চতার সাথে তুলনীয় কিছু গভীর বিষয় রয়েছে।

তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তার সময়কে নতুন করে তুলে ধরে তার সাহিত্যকে মূল্যায়ন করার জন্য যথাযথ সময় এখনই। আসলে তার উপস্থাপনা, স্বতঃস্ফুর্ততা এবং শৈল্পিক মাধুর্য সমসাময়িকদের চেয়ে বেশখানিকটা ভিন্ন। তিনি কখনোই মানবতাবাদের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। ফররুখকে মূল্যায়ন করার জন্য উপরি উক্ত লেখক তার প্রতি সব ধরনের দুর্বলতার পরও নির্মোহ থেকেছেন। সম্ভবত এটি ইংরেজি ভাষাতে একমাত্র কাজ, যাতে ফররুখের বিভিন্ন দিকে মনোনিবেশ করা হয়েছে। ৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটি রকমারি ডট কম-এ পাওয়া যাচ্ছে।
mrkmmb@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!