ইসলাম মেনে চলা কোথায় সহজ – পাশ্চাত্যে না মুসলিম দেশে? অহিদুল ইসলাম

 

পশ্চিমা অমুসলিম দেশ সমূহে ইসলামী জীবন যাপনের ক্ষেত্রে যে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই তা আমি বলছি না। তবে যে কোনো মুসলিম দেশের তুলনায় পাশ্চাত্যের অমুসলিম দেশে ইসলামী জীবন যাপন অনেক সহজ। কি বিতর্কিত কিছু বললাম? আপনার কাছে বিতর্কিত মনে হলেও আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি। অনেক উদাহরণ দিতে পারবো।

আজ দেশে আমার আদুরে এক ভাইঝির কথা শুনছিলাম তার মায়ের কাছে। খুব লক্ষ্মী মেয়ে। কি সদা হাসিখুশী মায়াবী চেহারার মামণি আমার। ক্লাস ফোরে পড়ে। ইদানিং তার প্রায় মাথা ব্যথা হয় যা আগে ছিলোনা। এটা ওটা শুনতে শুনতে জানলাম যে সে বোরখা পরে স্কুলে যেতে পছন্দ করে। বোরখা পরার কারণে স্কুলে তার সহপাঠীরা তাকে মুসল্লী বলে ডাকে। সে মন খারাপ করে থাকে। কারও সাথে মিশতে পারে না। বিষন্ন মন নিয়ে প্রতিদিন বাসায় ফিরে। ওদিকে শিক্ষকরা তাকে বোরখা ত্যাগ করে স্কুল ইউনিফরম পরতে চাপ দিচ্ছে। তাতে সে রাজী না। চিন্তা করুন, একটি মুসলিম দেশে সামান্য একটু ইসলাম অনুসরণের কারণে এতোটুকু ছোট্ট মেয়ের উপর কতো বড়ো মানসিক চাপ, মানসিক নির্যাতন!

আমার বড়ো মেয়ে যখন আমেরিকায় (নিউ ইয়র্কে) পাবলিক স্কুলে তার পড়ালেখার যাত্রা শুরু করেছিলো, তার মা তাকে সুন্দর করে হিজাব দিয়ে পরিপাটি করে দিতো। সে পোষাকে স্কুলে সে ছিলো সবার কাছে পুলুতের মতো। সবাই তার দিকে চেয়ে থাকতো। শিক্ষকরা তার হিজাবের প্রশংসা করতো। তাতে সে হিজাব পরতে আরও অনুপ্রাণিত হতো। কেনো হবেনা না? হিজাব পরার কারণে যদি সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া যায়, সবাই কিউট বলে প্রশংসা করে – এ সুযোগ কে ছাড়ে? আমি বলছি না যে হিজাব দেখে নাক সিটকানো মানুষ এখানে নেই। ব্যতিক্রম সব সমাজেই আছে। আমি বলছি সর্বসাধারণের কথা। পশ্চিমারা কিছু মূল্যবোধকে ধর্মের মতো মান্য করে। আইনের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, ধর্ম পালনের অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি তাদের কাছের ধর্মের মতোই অলঙ্ঘনীয়।

আমার বড়ো মেয়ে এখন ক্লাস টেনে এবং ছোটো মেয়ে ক্লাস এইটে। তারা বোরখা পরে স্কুলে যায়। মাঝে মাঝে কোনো কোনো শিক্ষক বা সহপাঠী তাদের মাথার হিজাব দেখে পুলকিত হয়ে জানতে চায় এতো সুন্দর ফ্যাশন তারা কোথায় পায়। হিজাবের কারণে কেউ কটুক্তি করবে এটা কারও বাবারও সাধ্য নেই। আইন সে সুনিশ্চয়তা দেয় এখানে। আর যে কোনো ধরণের মানসিক নির্যাতনের শাস্তি তো অনেক কঠোর। আইনের আদালতে যদি যান সেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষ আইন সবার জন্য সমান। অমুসলিম দেশে অমুসলিম পরিবেশে মুসলিম হয়ে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার পরও আইন, পরিবেশ ও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির এমন আনুকূল্যে তাদের দৃঢ়তা, মনোবল, আত্মবিশ্বাস ইত্যাদির কোনো ঘাটতির সুযোগ এখানে নেই। নামাজের সময় বিনা দ্বিধায় কোনো শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে অনুমতি নিয়ে নামাজ আদায় করে নিতে পারে। তাতে শিক্ষক আরও খুশী হন। তারা চায়লে লাইব্রেরীর কোনো এক কর্নারে জায়গা করে নামাজ পড়ে নিতে পারে। হিজাবী হিসেবে বা নামাজ পড়তে দেখে কেউ টেরা চোখে তাকানোর সাহসও পাবেনা। ইতিহাস ক্লাসে এক শিক্ষক যখন প্রসংগক্রমে প্রচলিত ধারণা মাফিক ইসলামের জিহাদ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছিলেন তখন আমার মেয়ে দাঁড়িয়ে জিহাদের প্রকৃত অর্থ, গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে শিক্ষকের ভুল ধারণা অপনোদন করে। তাতে শিক্ষক রাগেননি, অপমানিত হননি। বরং এতোদিনের লালিত ভুল শুধরিয়ে দেয়ার জন্য আমার মেয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

হঠাৎ আমার নিজের ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে। প্রাইমারী স্কুল জীবন থেকেই নামাজ-রোজাসহ ইসলামী অনুশাসন মেনে চলায় অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুল চলাকালে নামাজ পড়তাম বলে আমাকে আমার নিজ নামে কেউ ডাকতো না। আমার নাম হয়ে গেলো “হুজুর”, “মুন্সি”, “মোল্লা”, “মুসল্লি” ইত্যাদি। অনেকে আবার একধাপ এগিয়ে গিয়ে “ফুটো মুসল্লি” বলেও ডাকতো। সবাইকে যেখানে নিজ নিজ নামে ডাকা হতো সেখানে আমাকে ডাকা হতো এসকল বিশেষণে, একটি দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশে, যেখানে মানুষ নাকি খুবই ধর্মভীরু। ভাবতে অবাক লাগে কি অসহ মানসিক চাপ, যন্ত্রণা, নির্যাতনই না সেই শৈশবে সইতে হয়েছে একটি মুসলিম দেশের মুসলিম পরিবেশে শুধুমাত্র ইসলামী জীবন যাপনের কারণে!

আমার আদুরে মামণি ভাইঝি লাবীবার জন্য সত্যিই করুণা হচ্ছে। ওগো আল্লাহ, আরশের মালিক, তুমি ওর সহায় হও।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!