ইসলামের প্রসার ও প্রচারঃ যে জোয়ার ছিলো বিশ্বময় –ডঃ মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম

“ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি,
সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি।”
বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় জ্বাজল্যমান মুসলিম সভ্যতার গর্বিত অধ্যায় ফুটে উঠেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ চরণদু’টিতে। এ অধ্যায়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দুত সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মহান আল্লাহ পাকের সর্বশেষ প্রেরিত পুরুষ মুহাম্মাদ (সঃ)। অশান্তি অমানিশা আর পঙ্কিলতার মহাসগরে ডুবে থাকা আরব জাতির মাঝেই হয় তার জন্ম। চল্লিশ বছর বয়সে যখন হেরা পর্বতের গুহায় জ্যোতির্ময় পবিত্র কোরআন হাতে পেলেন তখন থকেই বিশ্ব মানবতার জন্য শুরু হয় এক মহা আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়। এ ছিলো এমন এক পরশ পাথর যার ছোঁয়ায় পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত মানুষগুলোকে একে একে নিখাদ স্বর্ণে রূপান্তরিত হতে শুরু হলো। একই সাথে সমকালীন স্বার্থবাদী এবং খোদাবিমুখ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের সাথে শুরু হলো সংঘর্ষ। রাসুলের (সঃ) ক্ষুদ্র দল যতই বড় হতে লাগলো, বাতিলের সাথে সংঘর্ষ-সংঘাত ততই পরিধি বিস্তার করলো। এক পর্যায়ে ভিটেমাটির সবকিছু ছেড়ে কর্মী বাহিনীকে নিয়ে গমন করলেন মদীনার বুকে। কায়েম করলেন ইসলামী রাষ্ট্র। মসজিদ, ভাতৃত্ব এবং সংবিধান এ তিনটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস ছিলো মহান আল্লাহ। সুবিচার, সমতা, সমান ধর্মীয় অধিকার, এবং পারস্পারিক সহমর্মিতা-সহযোগিতা ছিলো এ ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
এখান থেকেই শুরু হয় ইসলামের বিজয়ের যাত্রাপথ; অবশেষে তা মদীনার চৌহদ্দি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্তে। এ এমন যাত্রা যা এখনো চলছে পৃথিবীর বিভিন্ন রন্দ্রে; কখনো নীরবে নিভৃতে, কখনো প্রকাশ্যে। এ নিবন্ধে ইসলামের সেই সোনালী অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত আলোকপাতসহ কেন এই বিশাল বিজয় সূচিত হলো, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একই সাথে ‘ইসলাম তলোয়ারের সাহায্যে প্রচারিত হয়েছে’ ইসলামবিদ্বেষীদের এই ভুল ধারণার সমুচিত জবাব দেওয়া হয়েছে নিবন্ধের শেষাংশে।
ইসলামের প্রসার দেশে দেশেঃ
—————————————-
রাসুল (সঃ) এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী চার খলিফার বিস্ময়কর শাসন আমলে মক্কা-মদীনা-তায়েফ-খায়বরের গিরিপথ পেরিয়ে ইসলাম প্রসারিত হলো কুফা-সিরিয়া এবং পারস্য মুল্লুকে। রোমান সম্রাজ্যের গর্বের দেওয়ালে পাদাঘাত করে প্রসারিত হলো ইয়াকুসার প্রান্তরে। ডিঙ্গিয়ে গেলো মিশরের পিরামিড, সুদৃঢ় দুর্গ গড়লো ফুসতাত নগরীতে। এরই মাঝে পারস্য মুল্লুকে ইসলামের জন্য খুলে গেলো রাই, ফারিস, সিসতান, আজারবাইজান, এবং শেষে খোরাসান নগরী। ইসলাম অগ্রসর হলো লিবিয়া এবং আর্মেনিয়ার বিশাল প্রান্তরে। আব্দুল্লাহ বিন আবি আল সারার নেতৃত্বে গঠিত বিশাল মুসলিম নৌবাহিনী ভেদ করলো ভূমধ্যসাগরের বুহ্য, ভেঙ্গে চুরমার করলো রোমান (বাইজান্টাইন) সম্রাজ্যের দর্প। ইসলাম প্রসারিত হলো পূর্বের বসুন্ধরায়- পৌঁছে গেলো কাবুল, গজনী এবং হেরাতের মাটিতে। অর্ধ বিশ্ব এলো ইসলামের ছায়াতলে।
উমাইয়া শাসন আমলেও থেমে থাকেনি ইসলামের বিজয়, বরং আরো সম্প্রসারিত হয়ে পৌঁছে গেলো চীন, স্পেন এবং ফ্রান্স সহ আরো অনেক নতুন ভুবনে। প্রথমে ইরানের দক্ষিন পূর্বের মেকরান পেরিয়ে ইসলাম পৌঁছালো সিন্ধুতে (পাকিস্তান)। অন্যদিকে উকবা বিন নাফের নেতৃত্বে ইসলামের বীর মুজাহিদ জয় করলো তিউনিশিয়ার কায়রাওয়ান নগরী। খলিফা মারওয়ান বিন হাকাম (৬৮৩-৬৮৫) সুবিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে চালু করলেন ইসলামী মুদ্রা, পূণপ্রতিষ্ঠা এবং পূণনির্মাণ করলেন মসজিদুল আকছা, নির্মাণ করলেন ওয়াসিত নগরী। এসময় হাসান বিন নুমানের নেতৃত্বে ইসলাম পৌঁছালো আলজেরিয়া এবং মরক্কো সহ উত্তর আফ্রিকার বিশাল ময়দানে। ইসলামের অসামান্য বিজয় সূচিত হয় খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের (৭০৫-৭১৫) আমলে। পূর্ব বিশ্বে কুতাইবার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জয় করে বালখ (তাখারিস্তান), পেখন্ড, বোখারারা, সিসতান, চীনের ফারগানা, শাস, খোজান্ডা এবং খাশগার নগরী। আর মুহাম্মাদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে বীর মুজাহিদেরা জয় করে দেবাল এবং মুলতান নগরী। পশ্চিম বিশ্বে মুসা বিন নুসাইয়ের এর নেতৃত্বে বিশাল মুসলিম নৌবাহিনী প্রথমে জয় করে মাজোরকা, মিনোরকা এবং সানডারকা দ্বীপ; পরে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ৭১১ সালে স্পেনের রাজা রোডেভিচ (Rodevic) কে পরাজিত করে জয় করে আন্দালুসিয়া। এরপর একে একে গ্রানাডা, কর্ডোভা, তেলোডা, সারাগোসা এবং বার্সিলোনা ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়। স্পেন ও পর্তুগাল ইসলামী শাসনের আওতাভুক্ত থাকে সুদীর্ঘ ৮০০ বছর এবং ইউরোপের বুকে নির্মান করে এক সমুজ্জ্বল সভ্যতা।
আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুমহান এবং সুবিশাল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় আব্বাসীয় যুগে। সর্বশেষ তুরষ্কের ওসমানিয়া খেলাফত পর্যন্ত ইসলাম/মুসলিম বাহিনী রাশিয়া, বসনিয়া, বুলগেরিয়া, মধ্যএশিয়ার সকল অঞ্চল, এবং রোমানিয়া পার হয়ে অষ্ট্রিয়া ও ভিয়েনা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খেলাফতকাল বজায় থাকে।
এ বিজয় কিভাবে এলোঃ
———————————-
ইসলামের এই সুবিশাল বিজয়ে বৈষয়িক চেতনা এবং নিছক রাজ্য বিস্তার মূখ্য ছিলোনা, বরং বিশ্ব মানবতার কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শকে পৌঁছানোই ছিলো আসল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে আল্লাহর অকুতোভয় সৈনিকেরা যেখানে বাঁধার সম্মুখিন হয়েছে তা অপসারণ করেছে, নির্যাতিত মানবতার উপর চেপে থাকা জালেম শাসকদেরকে উচ্ছেদ করেছে, মুক্তির ব্যবস্থা করেছে মজলুম নর-নারীকে, কিন্তু কখনো ইসলামকে তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে কিংবা তলোয়ার দিয়ে জোরপূর্বক মুসলমান বানিয়েছে এমন নজির কোথাও নেই। তবে এত দ্রুত ইসলামের এই আশ্চর্য বিজয় কিভাবে এলো? যেসব সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে তা হলোঃ
(ক) তৎকালীন সবচেয়ে বড় দুই পরাশক্তি ছিলো রোমান এবং পারস্য সভ্যতা; কিন্তু তারা পারস্পরিক যুদ্ধ বিগ্রহে হয়ে পড়েছিলো ক্ষতবিক্ষত। তাছাড়া অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক ক্ষেত্রে ছিলো দুর্বল। উপরন্তু সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাসরত অধিবাসীরা ছিলো জালেম শাসকের যাতাকলে পিষ্ট, অতিষ্ট এবং সবধরণের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার বঞ্চিত। মুসলমানদের যখন ঐসব দেশে অগ্রসর হলো, তখন স্থানীয় অধিবাসীরাই মুসলামানদেরকে স্বাগত জানালো। ইসলাম তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অন্যান্য অধিকার ফিরিয়ে দিলো। এরাই পরবর্তীতে ইসলামের ছায়াতলে এসে ইসলামের নিশানবর্দার হিসেবে প্রতিভাত হলো।
(খ) আরব’রা জন্মগতভাবে কঠিন অবস্থা পেরিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহে পারদর্শী ছিলো। উপরন্তু তারা এমন এক নেতৃত্বের অধীনে প্রশিক্ষণ পেলো যা তদের যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিকশিত করার সুযোগ করে দিলো। তারা যে কোন রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিলো। এদের জীবনযাত্রা ছিলো আড়ম্বরহীন। অন্যদিকে তৎকালীন অন্যান্য শাসকবর্গ ছিলো বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এবং নৈতিক ও মানবিক শক্তিতে অত্যান্ত দূর্বল।
(গ) বিশ্ব মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী (সঃ) ছিলেন এ বীর সেনানীদের শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। মহান আল্লাহপাকের সরাসরি নির্দেশনায় তিনি এমন এক অকুতোভয় আল্লাহর সোইনিকদল বানাতে সক্ষম হন যারা ছিলেন ইতিহাসের সেরা মানুষ। এদের মধ্যে নৈতিক এবং বৈষয়িক জড়শক্তির সর্বোচ্চ মানদন্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রজ্ঞাশীল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব। সেই সাথে তৈরী হয় বিশ্ব কাঁপানো শতশত সিপাহসালার, যাদের কাছে দুনিয়ার সব বাধা-বিপত্তি ছিলো তুচ্ছ ফানুসের মত। এরাই ছিলো বিশ্ব মানবতার শ্রেষ্ঠ অহংকার। এদের মধ্যে এমন সব বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটেছিলো যা এখনো বিশ্ব মানবতাকে তাক লাগিয়ে দেয়ঃ
(১) এরা অত্যাচারের অগ্নিদহন সহ্য করে করে এমন এক নিখাদ স্বর্নে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো যে, যে কোন পরীক্ষার কষ্ঠি পাথরে যাচাই করেও তাদের মধ্য থেকে সামান্যতম খাদও বের করা সম্ভব হয়নি।
(২) এরা খাঁটিভাবে আল্লাহকে ভয় করতো, দুনিয়ার লাভ-ক্ষতির কিঞ্চিৎ পরোয়া করতোনা; ইসলামের পথে এরা এমন অনমনীয় ছিলো যে ইসলামের মূলনীতি থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ বিচ্যুতিও বরদাশত করেনি কখনো।
(৩) এই সত্যের সৈনিকেরা যখন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হন, তখন তাদেরকে অটল, অনড়, ও অনমনীয় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, এবং সকল প্রকার প্রলোভন, বিপদ-আপদ-আশংকা ও আতঙ্ককে তাদের সংকল্পের সম্মুখে প্রতিহত হতে দেখে সমগ্র দুনিয়া জাহান বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলো।
(৪) এরা আল্লাহ এবং তার রাসুলকে এমন ভালোবাসতো যে, দুনিয়ার অন্যসব কিছু এ ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ মনে হতো। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও আল্লাহর রাসুলের পায়ে সামান্য কাঁটা ফুটুক, এতটুকুও সহ্য করেনি কখনো।
(৫) এদের সামনে যখন কোরান পাঠ করা হতো এরা হয়ে যেতো পাগলপারা, চক্ষু বিষ্ফোরিত হয়ে গড়িয়ে পড়তো অশ্রুর বন্যা, কেঁপে উঠতো তাদের হৃদয়াদেশ, ভেসে যেতো এক মোহনীয় ঈমানের নিগুঢ় দ্যোতনায়।
(৬) পারস্পারিক ভালোবাসা ও মহব্বতে এরা এতদুর অগ্রসর হয়েছিলো যে নিজে উপোষ থেকে অন্যকে খাওয়ানোর মাঝে তারা পেতেন পরম আনন্দ, অন্যের সামান্য কষ্টে তাদের অন্তর ভেসে যেতো এক অসহনীয় চাপা কান্নায়। নিজের জীবনের চেয়ে ভালোবাসতেন অন্য দ্বীনী ভাইদেরকে।
(৭) জীবন থেকে মৃত্যকে এরা বেশী ভালোবাসতো। জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ভয়ে এরা সব সময় থাকতো ভীত-শংকিত। জাহান্নামের কথা শুনলেই এরা ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেলতো। আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দেওয়া ছিলো এদের জীবনের সর্বোচ্চ এবং সার্বক্ষনিক আকাঙ্ক্ষা।
(৮) এরা ছিলো অনমনীয় কঠিন প্রাচীরের মতো, দুনিয়ার অন্য কোন প্রলোভন এদের টলাতে পারেনি চুল পরিমান; ইসলামের পথে যে কোন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার কঠিন ও সুদৃঢ় হিম্মত এদের ছিলো।
(৯) এদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ ছিলো তীক্ষ্ণ। এরা দুনিয়া অপেক্ষা পরকালকে শ্রেষ্ঠ মনে করতো। এদের দৃষ্টিতে নৈতিক লাভ-ক্ষতির মূল্য ও গুরুত্ব পার্থিব লাভ-লোকসান অপেক্ষা বহুগুনে অধিক ছিলো। এদের জীবনের সকল প্রচেষ্টা, চেষ্টা-সাধনা ও দুঃখকষ্ট ভোগের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
(১০) ইসলামের প্রতি এদের বিশ্বাস এমন সুদৃঢ় ছিলো যে ইসলামের জন্য জীবনের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিতে এরা কিঞ্চিৎ কুন্ঠাবোধ করেনি। কঠিন সংগ্রাম আর ক্রমাগত সাধনার মধ্য দিয়ে এরা হৃদয়ের ইসলাম বিরোধী সকল চাওয়া পাওয়াকে একে একে নির্মূল করেছে এবং সর্বশেষ এদের হৃদয়ের চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহ ও তার রাসুলের (সঃ) চাওয়া পাওয়ার সাথে একাকার করে মিশিয়ে ফেলেছে।
(১১) জিহাদের মাঠে দুর্জয় আল্লাহর রাহে নির্ভয় এই অকুতোভয় আল্লাহর সৈনিকেরা ঝঞ্ছা বিক্ষুব্ধ বজ্রের ঝড় ঠেলে, মরু সাইমুম উপেক্ষা করে উত্তপ্ত মরু প্রান্তর, দুর্গম বন বনান্তর, পাহাড়-পর্বত পার হয়ে, দরিয়ার উত্তাল তরঙ্গমালা ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে। মৃত জমীনে প্রাণের ফোয়ারা জাগিয়ে রচনা করেছিলো ছায়া সুনিবিড় নীড়। অর্ধেক জাহানে সোনালো সুদিন এঁকে তারা লিখিছিলো শান্তির স্বরলিপি।
এ বৈশিষ্ট্যগুলোই মূলতঃ ইসলাম প্রচার এবং প্রসারের জন্য মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে। সত্য, ন্যায়, নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিই ছিলো ইসলামের প্রধান শক্তি ও অস্ত্র।
ভুল ধারণার অপনোদনঃ
———————————-
ইসলামের এই জাঁকালো ইতিহাসের বরাত দিয়ে অনেক ইসলাম বিদ্বেষী মূর্খ ঐতিহাসিক এটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, ইসলামের প্রসার এবং প্রচার হয়েছে তলোয়ারের মাধ্যমে। অর্থাৎ জোর করে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। মূলত এ ধরণের প্রচেষ্টা চলে ক্রসেডের পরে, যখন পাশ্চাত্যের এক ইসলামবিদ্বেষী মহল ইসলামকে ঘায়েল ও বিতর্কিত করার জন্য নানা খোঁড়া যুক্তি তর্ক আবিস্কার করার চেষ্টা করে। বছর কয়েক আগে পোপ বেনেডিক্ট (১৬) চৌদ্দ শতকের এক বাইজান্টাইন ইসলাম বিদ্বেষী শাসকের বরাত দিয়ে বলেনঃ
“Show me just what Muhammad brought that was new; and there you will find things only evil and inhuman, such as his command to spread by the sword the faith he preached.”
অর্থাৎ “মুহাম্মাদ কিইবা এমন কিছু এনেছে আমাকে দেখাও। নতুন যা এনেছে তার মধ্যে শুধু শয়তানী (পাপ) এবং অমানবিক বিষয়ই দেখতে পাবে। যেমন- সে যে ধর্ম প্রচার করেছে, তা তলোয়ার দিয়ে প্রচারের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছে।”
পোপ এমন এক সময় একটুক্তি করেছেন যখন আমেরিকা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war on terror) নাম দিয়ে মুসলিম ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছিলো এবং মুসলামানদেরকে কিভাবে জোর করে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় তার বুদ্ধিবৃত্তিক উপকরণ তালাশ করছিলো। ফলে পোপের এ উক্তি মুসলামানদের জন্য “কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা”র মতই হয়েছে। ইসলাম যে তলোয়ার দিয়ে কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করেনি; নিন্মোক্ত যুক্তিগুলো দিয়ে তা দিবালোকের মত পরিষ্কার করা যায়ঃ
(১) ‘ইসলাম’ শব্দ এসেছে ‘সালাম’ থেকে যার অর্থ ‘শান্তি’। এর আরেক অর্থ হলো আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। কাজেই ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম, আর শান্তি অর্জিত হয় সেই মহান আল্লাহ পাকের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।
(২) দুনিয়ার সবাই সমাজে শান্তি এবং সম্প্রীতি বজায় রাখার পক্ষে। কিন্তু কিছু লোক আছে যারা তাদের নিজস্ব স্বার্থের (vested interest) কারণে শান্তির ব্যাঘাত ঘটায়। এ সময় জোর খাটানোর প্রয়োজন রয়েছে। আর এ কারণেই প্রতি দেশে শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার জন্য পুলিশবাহিনী রয়েছে এবং তারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে শক্তি প্রয়োগ করে থাকে। ইসলাম অনাচার অবিচার জুলুম এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার অনুসারীদেরকে সংগ্রাম করতে বলে। ইসলামে তলোয়ার বা শক্তি প্রয়োগ শুধু সমাজে শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্য, কাউকে জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য নয়।
(৩) ইসলাম যে তলোয়ারের দ্বারা প্রচারিত হয়নি- এ বিষয়ে সমুচিত জবাব দিয়েছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক De Lacy O’Leary তাঁর “Islam at the cross road” (পৃষ্ঠা ৮) এঃ
“History makes it clear however that the legend of fanatical Muslims sweeping through the world and forcing Islam at the point of sword upon conquered races is one of the most fantastically absurd myth that historians have ever repeated.”
অর্থাৎ “মুসলমানেরা দুনিয়ার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে পরাজিত লোকদেরকে তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে – কিছু ঐতিহাসিকের তৈরি করা এমন আজগুবী ও মিথ্যা ধারণা সত্যিই বিস্ময়কর।”
(৪) মুসলমানেরা ৮০০ বছর ধরে স্পেন শাসন করেছে। মুসলমানেরা কখনোই সেখানে লোকদের তলোয়ার দিয়ে জোর করে মুসলমান বানায়নি। পরবর্তীতে বরং খ্রিষ্টান ক্রুসেডেরা এসে মুসলমানদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। তখন আযান দেওয়ার মত একজন মুসলামান অবশিষ্ট ছিলো না।
(৫) চৌদ্দশত বছর ধরে পুরো আরব বিশ্বে মুসলমানেরা শাসন করেছে। মাঝে মাত্র কয়েক বছর ব্রিটিশ এবং ফরাসীরা শাসন করেছে। সব মিলে ১৪০০ বছর মুসলামান শাসকেরা আরব বিশ্বের ক্ষমতায় আছেন। এরপরও আরব বিশ্বে এখনো ২০ মিলিয়ন খ্রিষ্টান রয়েছে যারা বহু প্রজন্ম আগে থেকে আরব বিশ্বে বসবাস করছে। মুসলমানেরা যদি তলোয়ার দিয়ে মানুষকে ধর্মান্তরিত করতো তাহলে আরব বিশ্বে আজ একজন খ্রিষ্টান পাওয়া যেতো না।
(৬) এক হাজার বছর ধরে মুসলমানেরা ভারত শাসন করেছে। তারা যদি চাইতো তাহলে ভারতের প্রত্যেক অমুসলিমকে জোর করে মুসলামান বানাতে পারতো। সে শক্তি ও ক্ষমতা তাদের ছিলো। আজ ভারতের ৮০ ভাগ অধিবাসী অমুসলিম। এই বিরাট সংক্ষক ভারতীয় অমুসলিমই আজ সাক্ষী যে ইসলাম তলোয়ার দিয়ে প্রচারিত হয়নি।
(৭) ইন্দোনেশিয়া আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। মালয়েশিয়ার বেশিরভাগ অধিবাসী মুসলামান। একজন প্রশ্ন করতে পারে- কোন মুসলিম সেনাবাহিনী ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়াতে গিয়ে এত লোককে জোর করে মুসলমান বানিয়েছে?
(৮) একইভাবে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করে। একইভাবে কেউ প্রশ্ন করতে পারে- ইসলাম যদি তলোয়ার দিয়েই প্রসার ঘটে থাকে, তাহলে কোন মুসলিম সেনাদল আফ্রিকার পূর্বুপকূলে গিয়েছিলো?
(৯) তাহলে ইসলাম কোন তলোয়ার দিয়ে প্রসারিত হয়েছে? কোরানের পরিষ্কার ঘোষণা যে জোর করে কাউকে ধর্মান্তরিত করা যাবেনাঃ “ইসলামে কোন জোর-জবরদস্থি নেই। মিথ্যা থেকে সত্য সব সময় পরিষ্কার উদ্ভাসিত” (২:২৫৬)। ইসলাম বরং প্রচারিত এবং প্রসারিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক তলোয়ার (The sword of intellect) দিয়ে। এটা এমনই এক তলোয়ার যা মানুষের মন এবং হৃদয়াদেশকে জয় করে নিয়েছে। সুরা নাহালে আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা প্রজ্ঞা (wisdom) এবং উত্তম পন্থায় মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করো, এবং সর্বোত্তম পন্থায় তাদের কাছে যুক্তি পেশ করো” (১৬:১২৫)।
(১০) ১৯৮৬ সালে Reader’s Digest এ ১৯৩৪ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত অর্ধ শতাব্দীতে বিশ্বের ধর্মগুলোর প্রসারের খতিয়ান প্রকাশিত হয়েছিলো, পরে নিবন্ধটি “The Plain Truth” ম্যাগাজিনেও প্রকাশিত হয়। সে খতিয়ান অনুসারে ইসলামের অবস্থান ছিলো সর্বাগ্রে। অর্থাৎ গত পঞ্চাশ বছরে মুসলমান বৃদ্ধির হার ছিলো ২৩৫% আর খ্রিষ্টান বেড়েছে ৪৭% হারে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠেঃ গত শতাব্দীতে মুসলমানেরা কি যুদ্ধ করে এত লোককে (কয়েক কোটি) ইসলামের ছায়াতলে আনলো?
(১১) আজ আমেরিকা এবং ইউরোপে ইসলাম সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রসারিত ধর্ম (The fastest growing religion)। কোন তলোয়ার আজ এত লোককে ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করেছে?
(১২) ডঃ জোসেফ আদাম পিয়ারসন (Dr. Joseph Adam Pearson) ঠিকই বলেছেনঃ
“People who worry that nuclear weaponry will one day fall in the hands of the Arabs, fail to realize that the Islamic bomb has been dropped already; it fell the day Muhammad (pbuh) was born.”
অর্থাৎ “এ্যাটম বোমা একদিন আরবদের হাতে যাবে এটা নিয়ে যারা শঙ্কিত, তারা বুঝতে অক্ষম যে ইসলামী বোমা তো অনেক আগেই ফেলা হয়ে গেছে। মুহাম্মাদ (সঃ) যেদিন জন্ম নিয়েছিলেন, সেদিনই এটা ফেলা হয়েছে।”
শেষ কথাঃ
————–
মজবুত ঈমানী দ্বীপ্তি,ত্যাগের সীমাহীন মহিমা, শৈর্য্য-বীর্যের তীক্ষ্ণতা, দুনিয়া কাঁপানো বীরত্ব আর নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদন্ড একসময় মুসলামানদের শিরকে (মাথাকে) সারা বিশ্বের মাঝে মহাউন্নত করে রেখেছিলে, সারা দুনিয়ার শত-সহস্র মানুষ ইসলামের সুমহান দ্বীপ্তিতে আকৃষ্ট হয়ে স্থান নিয়েছিলো ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। ইসলাম পৌঁছে গিয়েছিলো পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্তে। এই সুবিশাল সম্পদ আর পরম গর্বের সেই স্বর্নোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে মুসলমানেরা আজ কতইনা বেখবর!
এ শতাব্দীর একজন সেরা দায়ী ইলাল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেনঃ
“এ দ্বীন ভীরু-কাপুরুষদের জন্য অবতীর্ন হয়নি। প্রবৃত্তির দাস এবং দুনিয়ার গোলামদের জন্য অবতীর্ন হয়নি। পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া পোকা মাকড়ের জন্যও অবতীর্ন হয়নি এ দ্বীন। মূলতঃ এটা অবতীর্ন হয়েছে তাদের জন্য যারা বাতাসের গতিকে পরিবর্তন করে দেওয়ার হিম্মত রাখে, যারা সমুদ্রের স্রোতের সাথে লড়াই করে স্রোতের গতি পরিবর্তন করে দেওয়ার সাহস রাখে, যারা আল্লাহর রঙকে দুনিয়ার সকল রঙ অপেক্ষা অধিক প্রিয় মনে করে, এবং এ রঙে তার গোটা দুনিয়াকে রঙ্গিন করার হিম্মত রাখে। মূলত সেই মুসলমান যে সমুদ্রের স্রোতে ভেসে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি।”
==================

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!