ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ : মোঃ মোশারফ হোসেন

মানব সভ্যতার উন্নতি,অগ্রগতি ও সুষ্ঠুভাবে টিকে থাকার পথে প্রধান যে অন্তরায়গুলো রয়েছে তারমধ্যে মাদক বা মাদকজাতদ্রব্য সবার শীর্ষে। কারণ মাদক মানুষের অত্যন্ত মূল্যবান নিয়ামত জ্ঞান-বুদ্ধির আসল কার্যক্ষমতাকে নিষ্কৃয় করে দেয়। যে জ্ঞানের কারণে মানুষ অন্য প্রাণী থেকে আলাদা বা শ্রেষ্টত্বের দাবী রাখে। মাদক এমন এক ক্ষতিকর উপাদানের নাম যা মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধির বিলোপ সাধন করে থাকে। ফলে একজন মদ্যপ আর মানুষ থাকেনা; হয়ে ওঠে বিবেকহীন প্রাণী। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজ, দেশ ও জাতি। বর্তমানে আমাদের দেশে মদ,গাজা,হিরোইন,ইয়াবাসহ এমন সব মাদক দ্রব্য রয়েছে যা নীরবে আমাদের পুরো জাতিকেই যেন মাদকাসক্ত করে তুলেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আজ মাদক নেশায় মহাসক্ত! মাদকের সাথে কেউ জড়িত নেশায় কেউ জড়িত পেশায়। ফলে দেশের ১৯৯০ সালের বিদ্যমান মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে। আইনের জাল ছিঁড়ে মাদক অপরাধ যেন দেশ ও জাতির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এবং নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে প্রবাহিত হচ্ছে প্রতি নিয়ত। তাই এখন মাদক নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ আইন মৃত্যুদণ্ড করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। মাদকের এই বেপরোয়া লাগাম টানতে পুরো বিশ্ব যেমন সোচ্চার তেমনি মাদক সিন্ডিকেটও দিনে দিনে এতটাই সংঘটিত ও শক্তিশালী যে, যেকোন দেশের রাষ্ট্র যন্ত্রকেই অচল ও বিকল করে দিতে সক্ষম। তাইতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জেল-জরিমানার পাশাপাশি রয়েছে সর্বোচ্চ  শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এমনই কিছু দেশের তালিকায় রয়েছে মালয়শিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব,সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া। প্রশ্ন ওঠে তাই বলে এ সকল দেশ শত ভাগ মাদক মুক্ত? না;  কারণ একটি দেশের আইন প্রণয়ন ও সংস্কার নির্ভর করে ঐ দেশের জনগণের কল্যাণের চিন্তা করে। এতে ধর্ম-নৈতিকতা, প্রচলিত প্রথা, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত গঠন ও সুরক্ষার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ জনগণ মুসলিম। এখানকার পুরস্কার প্রাপ্ত সবচেয়ে ভাল মানুষটা যেমন মুসলমান তেমনি একজন অপরাধী হলেও সে একজন মুসলমান। এক্ষেত্রে অপরাধীদের বেশিরভাগই যেহেতু মুসলিম তাই তাদের বিচারের ক্ষেত্রে আইনের উৎসও হওয়া উচিত ইসলাম। যেমনটি আমরা ব্রিটিশ ভারতে লক্ষ করে থাকি। আমাদের সংবিধানে মুসলিম পারিবারিক আইন যার জ্বলন্ত উদাহণ। ইসলাম ধর্ম মতে মাদক উৎপাদন,পরিবহণ,ব্যবসা,পরিবেশন, গ্রহণ মূল্যগ্রহণ ও কমিশন ব্যবসা সবই হারাম তথা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অথচ মুসলমানদের দেশে যখন মাদকে সয়লাভ হয়ে যায় তার একমাত্র কারণ আদর্শ নাগরিক তৈরিতে ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্র নামক বৃহৎ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা।  মাদক সেবন অপরাধ প্রমাণিত হলে ইসলাম শারীরিক প্রহার হিসেবে ৪০ টি ক্ষেত্র বিশেষ ৮০টি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেছে। অথচ আমাদের দেশের বিদ্যমান জেল-জরিমানার মত লঘু শাস্তি তা ও সঠিকভাবে কার্যকর না থাকা যেন মাদকের সহায়ক পরিবেশকে উস্কে দিচ্ছে। মাদক গ্রহণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদাহরণ ইসলামের কোন যুগেই ছিলনা। কিন্তু ইসলামের সোনালী দিন গুলি মাদক মুক্ত ছিল প্রায় শত ভাগ। মাদকের জন্য মৃত্যু দণ্ড দিলে তা সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে সে ব্যাপারে ইসলাম আগে থেকেই সচেতন। মানবাধিকার সংস্থা আজ কথা বলছে মাদক নিয়ন্ত্রণে মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু মাদকের উপযুক্ত শাস্তি কী হওয়া উচিত তা বলতে পারেনি মানবাধিকার সুরক্ষাদাতা কোন সংস্থা। কিন্তু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা বলেই মাদকের যথাযত শাস্তি বিধান দেয়ার পাশাপাশি তা কার্যকর করে সর্বকালের সেরা সফলতার নজির স্থাপন করেছে। যে কোন অপরাধের যদি উৎস বন্ধ করা যায় তাহলে সমাজ থেকে সে অপরাধ খুব সহজেই নির্মূল করা সম্ভব। আর ইসলাম এ কাজটিই করে থাকে সর্ব প্রথম।

মাদক কীঃ

মাদক শব্দটির পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ হলো خمر।  যার অর্থ হলো ঢেকে দেয়া, গোপন করা, আচ্ছন্ন করা বা বিবেকের মধ্যে অন্যকিছুর মিশ্রণ যাতে বিবেক স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ইত্যাদি।

মাদকের সংজ্ঞায় বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেনঃكل مسكر خمر و كل خمر حرام   অর্থাৎ “প্রত্যেক নেশাদার বস্তুই মদ আর সব ধরণের মদই হারাম বা নিষিদ্ধ”। বুখারি- ৪/১৫৭৯, মুসলিম- ৩/১৫৮৫। মাদকদ্রব্যের এর চেয়ে সহজ ও ব্যাপক অর্থবোধক সংজ্ঞা আর হয় না। এ সংজ্ঞায় এমন কোন মাদক দ্রব্য নেই (যে নামেই ডাকা হোক না কেন) তা এর আওতায় আসেনি।

হুকুম বা বিধানঃ

 পবিত্র কুরানের অনেক আয়াত ও অসংখ্য হাদিস এবং এতদুভয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল ইসলামি বিশেষজ্ঞ একমত যে মাদক গ্রহণ করা হারাম বা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটাকে হালাল মনে করা কুফর বা ঈমান ভঙ্গের কারণ। আর মাদক থেকে বেঁচে থাকা ফরয। এমনকি মাদকের পাত্র ব্যবহার বা মাদক থেকে কোন ধরণের উপকার গ্রহণ করাও স্বাভাবিক অবস্থায় হারাম বলে হাদিসে এসেছে।

পবিত্র কুরয়ানে মাদক নিষিদ্ধ করণ পদ্ধতিঃ

ইসলামে এমন কোন বিষয় বা বস্তু নেই যা অনুমোদন বা নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে মানব জাতির কল্যাণের কথা চিন্তা করেনি। ইসলামের প্রতিটি আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানময় কল্যাণ ও উপকারীতা নিহিত থাকে। মাদকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নেশা ছাড়াও মাদকদ্রব্য মানব দেহের জন্য কতটা ভয়াবহ ক্ষতিকর তা আজ আধুনিক বিজ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরে এটাকে নিষিদ্ধ করার জন্য আইন করছে বিশ্বব্যাপী। আর ইসলাম তা প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই নিষিদ্ধ করে মানব মস্তিষ্ক ও দেহের সুরক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব কতটা সুদূর প্রসারী তা আজ বিশ্বব্যাপী সবার কাছেই সুস্পষ্ট। তাই যে মদ ইসলামের পূর্বে সামাজিকভাবে বৈধ ছিল সে মদ ইসলাম আসার পর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। এক্ষেত্রে ইসলামের প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন সর্বকালের জন্য শিক্ষণীয় অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালা চার ধাপে মদকে নিষিদ্ধ করেন। প্রথমতঃ উপদেশ প্রদান করে  মহান আল্লাহ বলেন, “(হে নবি!) তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে? বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারীতাও রয়েছে,তবে এগুলোর পাপ উপকারীতা অপেক্ষা অনেক বড়”।সুরা বাক্বারা আয়াত- ২১৯। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে মদের ব্যাপারে পাপের ভয় প্রদর্শন করে উপদেশ দেন মাত্র। অর্থাৎ কোন প্রতিষ্ঠিত সামাজিক অপরাধ দূর করতে হঠাত কঠিন আইন আরোপ করলে তা সমাজ গ্রহণ না করে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই প্রথমে নৈতিক উপদেশ দেয়া হলো বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। মানুষের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতাবোধ জাগিয়ে তোলাই প্রথম কাজ।  দ্বিতীয়তঃ মাদকের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে আল্লাহ বলেনঃ “হে ইমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছেও যেওনা; যে পর্যন্ত না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো”। সুরা নিসা আয়াত- ৪৩। এ আয়াতে দেখা যাচ্ছে মদের নিষেধাজ্ঞা শুধু নামাযের সময় ছিল। অন্য সময় মদ্যপানের অনুমতি ছিল। কৌশলগত কারণে একটু সময় নেয়া। তৃতীয়তঃ মাদকের ব্যাপারে জোরালো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আল্লাহ বলেনঃ “হে ইমানদারগণ! এই যে মদ,জুয়া,প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারকতীর সমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ বৈ কিছুই নয়। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও”। মাদক থেকে বেঁচে থাকা কতটা কল্যাণের তা একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির করুণবস্থার দিকে তাকালে সহজে উপলব্ধি করা যায়।সুরা মায়িদাহ আয়াত- ৯০। চতুর্থতঃ  মাদকের চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আল্লাহ বলেনঃ “নিশ্চয়ই শয়তান চায়,মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা এখনও কি নিবৃত হবে না”। সুরা মায়িদাহ আয়াত- ৯১। উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে মাদকের যে ক্ষতিকর মৌলিক নৈতিক উপদেশ ও নিষেধাজ্ঞা পাওয়া গেল তা হচ্ছে- ১। মাদক গ্রহণ কবিরা গুনাহ বা বড় অপরাধ। ২। এটা মূর্তিপূজা, লটারীর মত শয়তানি কর্ম। ৩। মাদক পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। ৪। এটা আল্লাহর যিকির থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে। ৫। নামায আদায় করা থেকে বিরত রাখে। এ থেকে বুঝা গেল যে মাদকের সাথে শয়তান সরাসরি জড়িত থেকে কিভাবে পারস্পারিক হিংসা-বিদ্ধেষ, শত্রুতা সৃষ্টির পাশাপাশি মানবিক উৎকর্ষ সাধনে বাধা সৃষ্টি করে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে ভুরি ভুরি। দেশের অধিকাংশ হত্যা,ডাকাতি,অনৈতিক ও সামাজিক কাজের মূল হোতা এই মাদক।

হাদিসে মাদকের নিষেধাজ্ঞাঃ

মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বনবি ও মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) মানুষকে পরকালীণ ভীতিপ্রদর্শন করে বলেনঃ “তিন ব্যক্তির উপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন-১। মাদকাসক্ত ২। পিতা-মাতার অবাধ্য, ৩। দাইয়ূস অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের পরিবারের অশ্লীলতা মেনে নেয়”। আহমদ, আল মুসনাদ ২/৬৯ আলবানি সহিহুতারগিব ২/২৯৯। মাদকাসক্ত ব্যক্তি কখনো জান্নাতের যোগ্য হতে পারেনা। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরো বলেনঃ “ আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি মদ পান করবে আল্লাহ তায়ালা তার থেকে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কোন নামায ক্ববুল করবেন না”। সিলসিলাতুস সহিহা । অর্থাৎ মাদক ও ইসলামের ইবাদত একসাথে চলতে পারেনা। তিনি (সঃ) আরো বলেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন এমন খাবারের বৈঠকে না বসে যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়”। আহমদ। অথচ আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্লাব, বিদেশি ক্রেতাদের মনোঃতুষ্টি অর্জনে হোটেল-মোটেলে, নাইটক্লাবের বা আড্ডায়, জুয়া খেলার আসরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে, শহর, বন্দর এমনকি গ্রামের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত মাদকের যে লাগামহীন অবাধ বিচরণ তাতে মনে হয় না এটা কোন মুসলমানদের জনপদ। উল্লিখিত নৈতিকতা বিবর্জিত কর্ম যদি কোন সমাজ বা দেশে সর্বদা বিক্রিয়ারত থাকে তবে সে দেশ বা সমাজ কতটা অস্থিতিশীল হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হাদিসে মাদককে সকল পাপের উৎস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠিত অপরাধ সমাজ থেকে মূলোৎপাটনে হঠাত অভিযান বা কড়া শাস্তি কার্যকর নয়। বরং চোখ থেকে ময়লা পরিষ্কার করার মত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যেখানে শক্তি প্রয়োগ করতে গেলে চক্ষুটাই না নষ্ট হয়ে যায়। যে জাতির ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের মত অতি সংবেদনশীল অঙ্গসমূহ নেশার ছোবলে আক্রান্ত তা থেকে অবহেলা করে যেমন বাঁচা যাবেনা আবার তাকে ভুল পদ্ধতিতেও সুস্থ করা যাবেনা। যা ইসলাম দেখিয়েছে- কিভাবে ধাপে ধাপে সমাজ থেকে মাদক নামের মহাভিশাপ সুকৌশলে উঠিয়ে নিতে হয়। আর ইসলামের শ্বাশ্বত বিধান আসামাত্র আরবের নেশাখোর জাতি নিত্যদিনের পানীয় হিসেবে নিজেদের গৃহে মজুতকৃত মাদক মদিনার রাস্তায় ঢেলে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আমাদের এই ছোট্ট দেশ থেকে আমরাও পারব ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়ন করে মাদক নামের বিষবৃক্ষ সমূলে উপড়ে ফেলতে।

জান্নাত থেকে বঞ্চিত,জাহান্নামের ভীতিপ্রদর্শন, মাদক গ্রহণের পরকালীণ ভয়ঙ্কর পরিণতির বর্ণনা শুনেই সব মানুষ এ নেশা থেকে বের হয়ে নাও আসতে পারে। সমাজের চিপাগলিতে লুকিয়ে থাকতে পারে অসাধু প্রকৃতির কপটচারীরা। তাই ইসলাম শুধু স্নেহমাখা উপদেশ দিয়েই দণ্ডনীয় অপরাধ লালন-পালন করেনা। বরং নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি অবাধ্যদের জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর ও উপযুক্ত শাস্তির বিধানও রেখেছে; যাতে অপরাধ কখনো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তা সমাজে শিকড় গেড়ে স্থায়িত্ব লাভ করতে না পারে। পবিত্র কুরআন মাদকের অপরাধ বর্ণনা করে মানব জাতিকে এমন সময়ে নিবৃত করেছে যখন এটা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেটাও তৎকালীন মানুষ জানত না। আর এর শাস্তি বিধান মহানবি (স) এর মাধ্যমে মানব জাতির কাছে তুলে দেয়া হয় যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে। তাই রাসুল (স) এর ভাষায় মাদকের পার্থিব শাস্তি প্রকাশিত হয়েছে  অত্যন্ত নিখুঁত বর্ণনায় এবং কার্যকরও হয়েছে সমাজ বাস্তবতায়। সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে মাদকের শেকড় কতদূর বিস্তৃত হতে পারে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে রাসুল (স) বলেনঃ “মদ, তা পানকারী,পরিবেশনকারী,বিক্রেতা,ক্রেতা,উৎপাদনকারী ও শোধনকারী,যে উৎপাদন করায়, সরবরাহকারী, এবং যার জন্য সরবারাহ করা হয়- এদের সকলকে আল্লাহ অভিশাপ করেন”। আবুদাউদ- ৩৬৭৪।

হযরত আনাস (রা) রাসুলাল্লাহ (স) থেকে আরো বর্ণনা করেন, “ মাদকের সাথে সম্পৃক্ত দশ ব্যক্তির উপর রাসুল(স) অভিশাপ দিয়েছেনঃ ১। মদ প্রস্তুতকারী, ২। মদ প্রস্তুতের আদেশতদাতা, ৩। মদ পানকারী,৪। মদ বহনকারী,৫। যার জন্য মদ বহন করা হয়,৬। মদ পরিবেশনকারী,৭। মদ বিক্রেতা ৮। মদের মূল্যগ্রহণকারী, ৯। মদ ক্রেতা ১০। যার জন্য মদ কেনা হয়”। তিরমিযি- ১২৯৫, ইবনু মাজাহ-৩৩৮১। । এ হাদিসে মাদকের প্রতিটি স্তর যেখান থেকে মাদকের উপকারীতা পাওয়া সম্ভব তার সব ক’টি স্তর স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল(স) বলেছেনঃ “যিনাকারী ব্যক্তি যিনারত অবস্থায় মুমিন থাকেনা এবং মদ্যপানকারী যখন মদ পান করে তখন সে মুমিন থাকেনা”। বুখারি ও মুসলিম।

এ অর্থে আরো অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে যাতে মাদকের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স) অভিশাপ আরোপ করেছেন,জাহান্নামের ঘোষণা দিয়েছেন,ধ্বংস কামনা করেছেন।আর  অভিশপ্ত মানুষগুলো কোন সমাজ বা দেশে বাস করে নিশ্চয়ই উক্ত সমাজ বা দেশটাকে কলুষিত করবে এটাই স্বাভাবিক।

তাই কিছু শর্ত সাপেক্ষে তাদেরকে ধর্ম ও রাষ্ট্রের স্বার্থে ইসলাম নিন্মোক্ত শাস্তির প্রস্তাব করে-

মাদকের শাস্তি কার্যকরের শর্ত সমূহঃ-

* মাদকাসক্ত ব্যক্তি মুসলিম হওয়া। * প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া। * জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া। * ইচ্ছাকৃতভাবে মাদক সেবন করা। * মাদকের বিধান হারাম তা জানা থাকা।  * আত্মস্বীকৃত হওয়া অথবা  মদপানের প্রমাণ থাকা ( কমপক্ষে দুজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ ব্যক্তির সাক্ষ্য থাকা)।

মাদকের শাস্তিঃ

উপরিউক্ত শর্ত ও অবস্থায় কোন মুসলিম ব্যক্তি মদ্যপ প্রমাণিত হলে ইসলাম তাকে যে শাস্তি দিয়েছে তার দুটি ধারা বিদ্যমান রয়েছে। ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ এ দুটি মত পেশ করেছেন। * মৃত্যু দণ্ড । * শারীরিক প্রহার।

 মৃত্যু দণ্ডঃ

 মৃত্যু দণ্ডের পক্ষে ইমাম ইবনে হাজম (রা) এ মত পোষণ করেন এবং তাঁর সাথে আরো একদল বিশেষজ্ঞ সহমত পোষণ করেছেন। এ পক্ষের ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ দলিল দিতে গিয়ে তাঁরা বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর মাদক নিয়ন্ত্রণে যে হাদিস গুলো এনেছেন সে গুলো হল- বিশেষ করে যারা বারংবার মদ পান করবে তাদের শাস্তি মৃত্যু দণ্ড ঘোষণা এসেছে হাদিস গুলোতে।

১। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মদ পান করবে তাকে বেত্রাঘাত করো। যদি সে পুনরাবৃত্তি করে তাকে বেত্রাঘাত করো, যদি সে পুনরাবৃত্তি করে তাকে বেত্রাঘাত করো। কিন্তু যদি সে আবারো পুনরাবৃত্তি করে তবে তাকে হত্যা  করো। ইমাম আহমদ।

২। হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স) বলেছেনঃ “যারা মদ পান করবে তাদেরকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি তারা মদ পান করবে তাদেরকে বেত্রাঘাত করো,অতঃপর যদি তারা মদ পান করবে তাদেরকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি তারা মদ পান করবে তাদেরকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি তারা মদ পান করবে তাদেরকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি তারা মদ পান করে তবে তাদেরকে হত্যা করো”। তিরমিযি- ১৪৪৪, আবু দাউদ- ৪৪৮২, ইবনে মাজাহ- ২৫৭২-৭৩,সুনানে নাসায়ি, সহিহ ইবনে ইব্বান।

৩। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স) বলেনঃ “যদি কেউ নেশাগ্রস্ত হয় তাকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি সে নেশাগ্রস্ত হয় তাকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি সে নেশাগ্রস্ত হয় তাকে বেত্রাঘাত করো, অতঃপর যদি সে চতুর্থ বার পুনরাবৃত্তি করে তবে তার ঘাড়ের উপর আঘাত করো”। আবুদাউদ- ৪৪৮৪। এই অর্থে অনেক বর্ণনা যে এসেছে সে হাদিস গুলো প্রমাণ করে যেখানে কোন কোন হাদিসে তিন বা চার বার আবার কোন কোন হাদিসে উল্লেখ পাঁচ বার যদি কেউ মাদক গ্রহণ করে তবে তাকে মৃত্যু দণ্ড দিতে হবে।

শারীরিক প্রহারঃ অধিকাংশ ইসলামি বিশেষজ্ঞ মাদক গ্রহণের শাস্তি নির্ধারণ করেছেন শারীরিক প্রহার। আর তা হলো কমপক্ষে ৪০ টি অথবা সর্বাধিক ৮০ টি প্রহার করা হবে গাছের ডাল, জুতা বা কোন লাঠির দ্বারা। আর এ সিদ্ধান্তটিই রাসুল (স) কর্তৃক কার্যকর ছিল বলে এ মতটিই গ্রহণযোগ্য অভিমত। এ মতের পক্ষে অসংখ্য হাদিস বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে। তন্মোধ্যে থেকে কতিপয় হাদিস হলো নিম্নরূপঃ ১। হযরত জাবের (রা) হতে বর্ণিত। তিনি রাসুল (স) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (স) বলেন, “কেউ যদি মদ পান করে তবে তাকে বেত্রাঘাত করো; অতঃপর যদি সে চতুর্থ বার মদ পান করে তবে তাকে হত্যা করো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর এক ব্যক্তি চতুর্থবার মদপান করে আসল অতঃপর তিনি তাকে বেত্রাঘাত করলেন কিন্তু তাকে হত্যা করলেন না”। সুনানে নাসায়ি। ২। হযরত আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেছেন, নবি (স) মদ পানের জন্য গাছের ডাল বা জুতা দ্বারা মেরেছেন। আর আবু বকর (রা) ৪০ চাবুক লাগিয়েছেন”। বুখারি ও মুসলিম। ৩। সাইব ইবনে ইয়াযিদ (রা) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুল (স) এর যুগে ও আবু বকর (রা) এর খিলাফত কালে এবং ওমর (রা) এর খিলাফতের প্রথম দিকে আমাদের কাছে যখন কোন মদ্যপায়ীকে আনা হত তখন আমরা তাকে হাত দিয়ে, জুতা দিয়ে এবং আমাদের চাদর দিয়ে মারতাম। অতঃপর ওমর (রা) তাঁর খিলাফতের শেষ সময়ে ৪০ টি করে চাবুক মেরেছেন। আর এ সব মদ্যপায়ী যখন বাড়াবাড়ি করেছে এবং পাপে লিপ্ত হয়েছে তখন ৮০টি করে চাবুক লাগিয়েছেন”। বুখারি.

উপরিউক্ত দুটি শাস্তির মধ্যে রাসুল (স) এর জীবনে ও সাহাবী (রা) এর কারো শাসন আমলেই মৃত্যুদণ্ড শাস্তি কার্যকরের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ৪০ বা ৮০ টি বেত্রাঘাত প্রয়োগকালে কেউ মারা গেলে তার রক্তপণ দিতে হবে না মর্মে বিশেষজ্ঞগণ হাদিসের আলোকে মত দিয়েছেন। অন্যথায় মাদকের শাস্তি প্রয়োগকালে অতিরিক্ত শাস্তির ফলে কোন অপরাধী মারা গেলে রক্তপণের বিধানও ইসলাম দিয়ে রেখেছে। তাই মাদকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। তবে মাদকের নামে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করলে সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড লাঘব হবে না।

সতর্কতাঃ  

* অভিযোগ নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হওয়া * মসজিদে শাস্তি কার্যকর না করা। * অপরাধীর মুখের উপর আঘাত না করা। * অসুস্থ অবস্থায় শাস্তি কার্যকর না করা। এমনভাবে শাস্তি কার্যকর করা যাতে অপরাধী মারা না যায় * শাস্তি কার্যকরের ফলে মারা গেলে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক জরিমানা প্রদান করা।

 

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুগুলি বৈধ করেন আর নোংরা বস্তুগুলি নিষিদ্ধ করেন”।সুরা আ’রাফ আয়াত- ১৫৯। মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ “তোমাদেরকে যে পবিত্র রিযিক দিয়েছি তা থেকে ভক্ষণ করো আর তাতে সীমালঙ্ঘন করোনা”। সুরা তাওবা আয়াত- ৮৪। মানব সভ্যতায় যে কোন ধর্ম,সমাজ,দেশ ও জাতির নিকট সর্বাধিক ক্ষতিকর,ঘৃণিত,অননুমোদিত,অবৈধ,নিষিদ্ধ এবং অপবিত্র-নোংরা বস্তুর নাম হল মাদকদ্রব্য। হাজার হাজার বছর যাবত মানুষ নামের সভ্যজাতি মদের নেশায় এতটাই ডুবে ছিল যে মদের মোহময় মায়াজাল থেকে বের হতে পারছিলনা। একমাত্র ইসলাম এসে মাদকের ক্ষতিকরপ্রভাব ও ভয়াবহতা বর্ণনা করে এটাকে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে নেশার অতল গহ্বর থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষকে সভ্যতায় ফিরিয়ে দেয়। তাই একটি নেশামুক্ত সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠনে ইসলামি ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। পরিশেষে বলব মাদক নিয়ন্ত্রণে মৃত্যুদণ্ডাদেশ নয়, নয় মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রয়োজন ইসলামী নিয়মানুযায়ী মাদক উৎপাদন,বিপণন, ব্যবসা,আমদানী-রপ্তানিসহ সব ধরণের লাইসেন্স বাতিল করে মাদকের উৎস ও গতিপথ এবং মাদকের সঞ্চালন বন্ধ করা। মাদক গ্রহণের দায়ে ৮০ টি বেত্রাঘাত করা,দীর্ঘ মেয়াদী জেল দেয়া। এ ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটধারীদের নিয়ন্ত্রণে যাবজ্জীবন জেল প্রদান করে তাদেরকে আর্থিকভাবে বিকল করে দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণে মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত যে কোন রাষ্ট্রীয় শাস্তি আরোপ করাতে কোন দোষ নেই। মহান আল্লাহ আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে মাদকের কড়াল থাবা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

e-mail: professormosharafiu@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!