ইসলামী ব্যাংকগুলো কি ঘুরিয়ে সূদ খায়? জেনে নিন সত্যটাঃ-আবু নিশাত

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শরীয়াহ ভিত্তিক কিনা , তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে । কেউ কেউ মনে করেন এটি শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক , আবার কেউ মনে করেন ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত সুদী ব্যাংকের মত সুদ খায় , তবে সরাসরি না খেয়ে একটু ঘুরিয়ে খায় । তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হল , মন্তব্যকারীদের অধিকাংশই সুদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা খুবই কম রাখেন । তাই সুদ ও মুনাফার ধারণা পরিষ্কার হলেই বুঝা যাবে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শরীয়াহ ভিত্তিক কিনা ? এজন্য প্রথমে সুদ ও মুনাফার সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা পাওয়ার জন্য আলোচনা করা হল –
সুদ হচ্ছে ঋণকৃত অর্থের উপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিশ্চিত সুনির্দিষ্ট অতিরিক্ত পাওনা । অর্থাৎ সুদের সাথে ‘নিশ্চিত’ এবং ‘সুনির্দিষ্ট’ শব্দ দুটির সম্পর্ক রয়েছে । যেমন আপনি কারো নিকট হতে ২০% সুদে ১০০০ টাকা ঋণ নিলেন । এই ঋণকৃত টাকা আপনি ব্যবসায় খাটাতে পারেন , আবার শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারেন , আবার ভোগে ব্যয় করতে পারেন । এই ১০০০ টাকা নিয়ে আপনি যাই করেন না কেন , বছর শেষে ঋণ প্রদানকারীকে ২০০ টাকা প্রদান করতে হবে । এক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী নিশ্চিত জানে যে , বছর শেষে আপনার নিকট হতে সে নির্দিষ্ট ২০০ টাকা পাবে । এখানে ২০০ টাকা হল সুদের পরিমাণ , যা ইসলামে নিষিদ্ধ ।
অন্যদিকে মুনাফা হল ব্যবসা বা শিল্পখাতে বা উৎপাদনশীল কোন খাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনিশ্চিত অনির্দিষ্ট অতিরিক্ত পাওনা । অর্থাৎ মুনাফার সাথে ‘অনিশ্চিত’ এবং ‘অনির্দিষ্ট’ শব্দ দুটির সম্পর্ক রয়েছে । ‘অনিশ্চিত’ শব্দটি থাকার কারণে অতিরিক্ত পাওনার বিষয়টি নিশ্চিত নয় । অর্থাৎ কোন কোন সময় অতিরিক্ত পাওনার পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে । আবার ‘অনির্দিষ্ট’ শব্দটির কারণে বলা যায় যে , অতিরিক্ত পাওনার পরিমাণটি সুনির্দিষ্ট নয় । যেমন আপনি কারো নিকট হতে ১০০০ টাকা নিয়ে ব্যবসায় খাটাতে পারেন বা শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারেন । এক্ষেত্রে যার নিকট হতে আপনি টাকা নিয়েছেন , তাকে আগাম বলতে পারবেন না যে , আমি আপনাকে ২০০ টাকা মুনাফা দেব । বরং বলতে পারেন , অর্জিত মুনাফার বা ক্ষতির ৫০% আপনি পাবেন । এখন বছর শেষে অর্জিত মুনাফার পরিমাণ ৪০০ টাকা হলে এর ৫০% ২০০ টাকা অর্থপ্রদানকারী পাবে , যা মুল অর্থের (১০০০ টাকার) ২০% । আবার অর্জিত মুনাফার পরিমাণ ৩০০ টাকা হলে এর ৫০% ১৫০ টাকা অর্থপ্রদানকারী পাবে , যা মুল অর্থের (১০০০ টাকার) ১৫% । অর্থাৎ মুনাফার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট নয় , এটি মূল টাকার ২০% হতে পারে , আবার ১৫% হতেও পারে ।
এখন সুদ ও মুনাফার উপরোক্ত ধারণা নিয়ে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শরীয়াহ ভিত্তিক কিনা , তা অনুসন্ধান করা যায় । এক্ষেত্রে মডেল হিসেবে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে লিমিটেড’ কে বিবেচনায় আনা হল । কারণ বাংলাদেশে এটিই প্রথম ইসলামী ব্যাংক এবং এই ব্যাংকের কার্যক্রম বাংলাদেশের সর্বত্র বিদ্যমান এবং একইসাথে অন্যান্য ইসলামী ব্যাংকের তুলনায় এই ব্যাংকের কার্যক্রম অধিকতর শরীয়াহ ভিত্তিক বলে অনেকে মনে করেন । তাছাড়া বাংলাদেশে কিছু সুদী ব্যাংক আছে , যারা তাদের কিছু শাখায় ইসলামী ব্যাংকিং চালু করেছে , কিন্তু অনেকেরই কাছে এ ধরনের ব্যাংকিং নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে । তাই বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে লিমিটেড’ এর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখব যে , বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং আছে কিনা ? পাঠকদের সুবিধার জন্য আলোচনাকে কয়েকেটি ধাপে বিভক্ত করা হল ।
(১) যে কোন সুদী ব্যাংকে আমানতকারী নির্দিষ্ট সুদের হারে অর্থ আমানত হিসেবে রাখে । কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারী লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করে । ইসলামী ব্যাংকে ‘মুদারাবা’ হিসাবে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাবে লাভ-ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ থাকে ।
(২) সুদী ব্যাংকে সুদের হার শতকরায় উল্লেখ থাকে । আবার ইসলামী ব্যাংকেও মুনাফার হার শতকরায় উল্লেখ থাকে । তাই একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় যে , সুদী ব্যাংক যেখানে ১২% সুদ বলে , সেখানে ইসলামী ব্যাংক ১২% মুনাফা বলে । অর্থাৎ উভয়ের ভিতর কোন মৌলিক পার্থক্য নেই । এই বিভ্রান্তির কারণ হল অনেকে অজ্ঞতাবশতঃ শতকরা হারকেই সুদ বলে মনে করে । প্রকৃতপক্ষে সুদ , মুনাফা , জনসংখ্যার বৃদ্ধি , প্রবৃদ্ধি , কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ইত্যাদিকে সহজে বুঝার জন্য শতকরা হারে রূপান্তর করা হয় । সুতরাং মুনাফার হার ১২% বলা দোষণীয় নয় ।
(৩) সুদী ব্যাংকে সুদের হার ১২% উল্লেখ থাকলে বছর শেষে আমানতকারী ১ লক্ষ টাকার উপর ১২ হাজার টাকা সুদ পাবে , তা নিশ্চিত । কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে যে ১২% মুনাফার কথা বলা হয় , তা হল প্রত্যাশিত মুনাফার হার । এটি বছর শেষে ১৩% হতে পারে , আবার ১১% হতে পারে । অর্থাৎ প্রত্যাশিত মুনাফার হার ১২% এ ১লক্ষ টাকা আমানত (প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগ) রাখলে বছর শেষে প্রকৃত মুনাফার হার ১৩% হলে আমানতকারী ১৩ হাজার টাকা এবং প্রকৃত মুনাফার হার ১১% হলে আমানতকারী ১১ হাজার টাকা পাবে । অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকে পূর্ব হতে মূল টাকার উপর মুনাফার হার নির্দিষ্ট করা যায় না ।
(৪) সুদী ব্যাংকে আমানতকারী তার মেয়াদী হিসাবের ৮০% হতে ৯০% ঋণ হিসেবে নিজে উত্তোলন করতে পারবে এবং উত্তোলিত টাকার উপর নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করতে হবে । অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারী তার মেয়াদী হিসাবের ৯০% ঋণ হিসেবে নিজে উত্তোলন করতে পারবে এবং উত্তোলিত টাকার উপর কোন ধরনের অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হবে না ।
(৫) বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী সুদী ব্যাংক তার রিজার্ভের ১৯% কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে এবং জমা রাখা টাকার উপর বাংলাদেশ ব্যাংক হতে সুদ গ্রহণ করে , যা সুদী ব্যাংকের একটি নিশ্চিত আয় । অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক তার রিজার্ভের ১১.৫% কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে এবং জমা রাখা টাকার উপর বাংলাদেশ ব্যাংক হতে কোন ধরনের সুদ গ্রহণ করে না ।
(৬) সুদী ব্যাংক ‘কল মানি’ মার্কেটে অংশগ্রহণ করতে পারে । কিন্তু ইসলামী ব্যাংক ‘কল মানি’ মার্কেটে অংশগ্রহণ করতে পারে না । সাধারণত কোন ব্যাংকের তারল্য সংকট (গ্রাহকদেরকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করার মত অর্থ ব্যাংকে না থাকা) দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অতি উচ্চ সুদের হারে অন্য ব্যাংক হতে কিছু সময়ের জন্য ঋণ গ্রহণ করে থাকে । ফলে ‘কল মানি’ মার্কেটে অর্থ বিনিয়োগ করে সুদী ব্যাংক আয় অর্জন করতে পারে , সেখানে সুদের কারণে ইসলামী ব্যাংক এ ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে না ।
(৭) সুদী ব্যাংক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সুদের হারে অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করে । এক্ষেত্রে সুদী ব্যাংক এতটুকু বিষয় বিবেচনা করে যে , সুদসহ মূল অর্থ ফেরত আসার সম্ভাবনা কতটুকু । অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক কখনও বিক্রেতা হিসেবে , আবার কখনও অংশীদারী হিসেবে কাজ করে । যেমন বাড়ী নির্মাণের জন্য আপনার ৫ লক্ষ টাকার সিমেণ্টের প্রয়োজন । এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক সিমেণ্ট বিক্রয়কারী কোন প্রতিষ্ঠার হতে ক্রেতা হিসেবে ৫ লক্ষ টাকার সিমেণ্ট ক্রয় করবে এবং বিক্রেতা হিসেবে আপনার নিকট এই সিমেণ্ট কিস্তিতে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রয় করবে । অর্থাৎ সুদী ব্যাংকে ঋণ গ্রহণকারী সরাসরি নগদ টাকা ব্যাংক হতে পেয়ে যায় । কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগকারীর নগদ টাকা ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই , বরং ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী পণ্য , যন্ত্রপাতি , কাঁচামাল ইত্যাদি পেয়ে থাকে ।
(৮) ইসলামী ব্যাংক ক্রেতা হিসেবে সিমেণ্ট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হতে যে সিমেণ্ট ক্রয় করেছে , তার প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার এর ঘাটতি থাকলে , বছর শেষে ইসলামী ব্যাংকের অডিট শাখা এ লেনদেনকে সন্দেহযুক্ত লেনদেনের তালিকায় ফেলে দেন । এবং এই লেনদেন হতে প্রাপ্ত লাভের পরিমাণ ৬০ হাজার টাকা কারো মধ্যে বণ্টন না করে ব্যাংক ফাউন্ডেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয় , জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার জন্য । অর্থাৎ এই ৬০ হাজার টাকা আমানতকারীদের মুনাফা , শেয়ার হোল্ডারদের ডিভিডেণ্ট , ব্যাংক কর্মচারীদের বেতন হিসেবে বণ্টন করা হয় না ।
(৯) ইসলামী ব্যাংক আপনার নিকট যে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার সিমেণ্ট বিক্রয় করেছে , তা যদি আপনি নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর কিস্তিতে অথবা এককালীন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন এবং ব্যর্থ হওয়ার উপযুক্ত কারণ ব্যাংকে দেখাতে পারেন , তবে ইসলামী ব্যাংক আপনার নিকট হতে কোন জরিমানা আদায় করবে না । কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার উপযুক্ত কারণ না থাকলে ব্যাংক আপনার নিকট হতে জরিমানা আদায় করবে । কিন্তু জরিমানার টাকাটা বৈধ কিনা , তা নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকায় জরিমানার টাকা কারো মধ্যে বণ্টন না করে ব্যাংক ফাউন্ডেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয় , জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার জন্য । অর্থাৎ এই টাকাও আমানতকারীদের মুনাফা , শেয়ার হোল্ডারদের ডিভিডেণ্ট , ব্যাংক কর্মচারীদের বেতন হিসেবে বণ্টন করা হয় না ।
(১০) বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় , বছর শেষে ইসলামী ব্যাংক ঐ সমস্ত ব্যাংক হতে বৈদেশিক মুদ্রায় সুদ পায় । এই সুদও কারো মধ্যে বণ্টন না করে ‌’ব্যাংক ফাউন্ডেশনে’ পাঠিয়ে দেয়া হয় , জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার জন্য । অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রায় অর্জিত সুদও আমানতকারীদের মুনাফা , শেয়ার হোল্ডারদের ডিভিডেণ্ট , ব্যাংক কর্মচারীদের বেতন হিসেবে বণ্টন করা হয় না ।
উপরের ধাপগুলো হতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে , প্রচলিত সুদী ব্যাংকের সাথে ইসলামী ব্যাংকের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে । আর এ পার্থক্য রচিত হয়েছে সুদের উপর ভিত্তি করে । তাই ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের ধরন প্রচলিত সুদী ব্যাংকের বিনিয়োগের ধরন হতে ভিন্ন হয় । ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ নিম্নোক্তভাবে তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত করে থাকে –
(১) মুদারাবাঃ এ পদ্ধতিতে ব্যাংক আমানতকারীদের নিকট হতে অর্থ গ্রহণ করে থাকে এবং ব্যাংক তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সে অর্থকে বিনিয়োগ করে । বিনিয়োগ হতে প্রাপ্ত লাভ ও ক্ষতি একটি নির্দিষ্ট হারে আমানতকারী এবং ব্যাংক গ্রহণ করে থাকে ।
(২) বাই মুরাবাহাঃ এ পদ্ধতিতে ব্যাংক আমানতকারীদের নিকট হতে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পণ্য ক্রয় করে বিক্রেতা হিসেবে অন্যের নিকট পণ্য ক্রয়ের খরচের সাথে মুনাফা যোগ করে বিক্রয় করে । যেমন ইসলামী ব্যাংকের একটি পণ্য ক্রয় করতে ১০০০ টাকা খরচ পড়ল । ব্যাংক এর সাথে ১৫০ টাকা মুনাফা যোগ করে ক্রেতার নিকট (যারা ব্যাংকের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করতে চায়) ১১৫০ টাকা দিয়ে বিক্রয় করল । এক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য ক্রেতা একটি ভবিষ্যৎ সময়ে এককালীন পরিশোধ করতে পারে , আবার কিস্তিতেও পরিশোধ করতে পারে । ২০১১সালে এ পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের ৫৭.৯২% ।
(৩) বাই মুয়াজ্জালঃ এই পদ্ধতিও বাই মুরাবাহা প্রায় অনুরূপ । তবে এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক বিক্রেতা হিসেবে তার পণ্যের স্থির মূল্য ঘোষণা করে । এই মূল্যের মধ্যে ব্যাংকের মুনাফা কত , তা ক্রেতাকে বলে না । ২০১১ সালে এ পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের ৫.২০% ।
(৪) মুশারাকাঃ এ পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংক এবং এক বা একাধিক ব্যক্তির মধ্যে অংশীদারীদের ভিত্তিতে কারবার পরিচালিত হয় । এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক এবং এক বা একাধিক ব্যক্তি মূলধন , ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অংশগ্রহণ করে থাকে । যেমন একটি প্রকল্পে ইসলামী ব্যাংক ১০০০ টাকা প্রদান করল এবং ব্যক্তি ৫০০ টাকা প্রদান করল এবং উভয়ই কারবার পরিচালনা করতে থাকে । কারবারের লাভ-ক্ষতি পূর্ব নির্ধারিত অনুপাতে উভয় পক্ষ গ্রহণ করে থাকে । ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ২য় বছরে অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে মুশারাকা পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের ২৫.৬৫% । কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী শিক্ষা না থাকার কারণে মুশারাকা পদ্ধতিতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় । ফলে ২০১১ সালে মুশারাকা পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের মাত্র .০১২% অর্থাৎ ৩ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা । বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী শিক্ষার প্রবেশ ঘটলে অবশ্যই মুশারাকা পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে ।
(৫) হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্কঃ এ ধরনের বিনিয়োগে ভাড়া , ক্রয় এবং অংশীদারিত্ব এই তিনটি পদ্ধতির সমন্বয় হয়েছে । সাধারণত বাড়ী বা গাড়ীর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিনিয়োগ করা হয় । যেমন আপনি ১ লক্ষ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংক ৪ লক্ষ টাকা মোট ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি বাড়ী ক্রয় বা নির্মাণ করা হল । এক্ষেত্রে আপনি বাড়ীর ২০% এবং ইসলামী ব্যাংক ৮০% এর (মূলধন বিনিয়োগ অনুযায়ী) মালিক । এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক বাড়ীর ৮০% অংশ আপনার নিকট ইজারা বা ভাড়া দিবে । যদি বাড়ীর বাৎসরিক ভাড়া ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয় , তবে ইসলামী ব্যাংক এর ৮০% অর্থাৎ ৬০ হাজার টাকা পাবে । আপনি যদি বাৎসরিক ভাড়া ৬০ হাজার দেয়ার পরও আরও অতিরিক্ত ১ লক্ষ টাকা দেন , তবে বছর শেষে বাড়ীর মালিকানা আপনার ২০% হতে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০% এবং ইসলামী ব্যাংকের হ্রাস পেয়ে ৬০% হবে । এভাবে ভাড়া প্রদানের সাথে সাথে ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত ৪লক্ষ টাকা ক্রমান্বয়ে পরিশোধ করতে থাকলে বাড়ীর মালিকানায় আপনার অংশ বাড়তে থাকেবে এবং ইসলামী ব্যাংকের অংশ কমতে থাকবে এবং এক সময় আপনি বাড়ীর সম্পূর্ণ অংশের মালিক হয়ে যেতে পারবেন । উল্লেখ্য যে , এ পদ্ধতিতে বাড়ীর মালিকানায় আপনার অংশ বাড়ার সাথে সাথে আপনার প্রদত্ত ভাড়ার পরিমাণ কমতে থাকবে । ২০১১ সালে এ পদ্ধতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ হয়েছে মোট বিনিয়োগের ২৯.১২% ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি । ইসলামী ব্যাংকিং এর জন্য প্রয়োজন , কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি আলাদা ইসলামী শাখা , যা ইসলামী ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে । কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ ধরনের কোন ইসলামী শাখা নেই । তাই একটি সুদ ভিত্তিক অর্থনীতিতে ১০০% শরীয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক আশা করাটা কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে , তা পাঠকরাই ভাল বলতে পারবেন । তবে এতটুকু বলা যেতে পারে , প্রচলিত সুদী ব্যাংক হতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি আদর্শ ব্যাংক । আর এখানে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম আলোচিত হয়েছে , ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ এর ভিত্তিতে । কারণ বাংলাদেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে এই ব্যাংকটিই শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক ।
-আবু নিশাত ৩১ অক্টোবর ২০১২

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!