ইসলামি সভ্যতা —ড. আব্দুস সালাম আজাদী (লন্ডন)

Image may contain: 1 person

অনেকে ভাবেন ইসলামের একটা নির্ধারিত সভ্যতা আছে। যখন জিজ্ঞেস করি, সেটা কি? তখন হয় তোতলামি রোগে ধরে, অথবা বোবা জিনের খপ্পরে পড়েন বক্তা সাহেব। উলটা জিজ্ঞেস করেন, তাহলে আপনি ইসলামি সভ্যতায় বিশ্বাস করেননা? আবেগী প্রশ্ন! আমি কেন বিশ্বাস করবোনা। কিন্তু সেটা কি? একটু বুঝিয়ে বলেন। আমি খুব কম লোকের কাছে এর সদুত্তর পেয়েছি।

তবে সভ্যতার আগে সংস্কৃতির প্রশ্ন আসে। সংস্কৃতি কি? আরবীতে একে সাক্বাফাহ বলে। আমার উস্তায প্রফেসর ডঃ উমার বাহাযিক্বের একটা কথা আমার খুব ভালো লেগেছিলো। তিনি বলেছিলেন, সাক্বাফাহএর সবচেয়ে ভালো সংজ্ঞা হলো, “ মা তাসক্বিফু আলাইহিন নাস” যে সব নিয়ে তুমি একটা মানব সমষ্টিকে পাও। মানে আপনি একটা মুসলিম সমাজে আছেন। এখানে ঘুম ভাঙে আপনার আযানের শব্দে। সালাত হয় একতা বদ্ধ হয়ে। এখানে আল্লাহ, রাসূল, কিতাব ও আখিরাত, কাদর ও কিয়ামাত, ফিরিস্তা – জান্নাত- জাহান্নাম ইত্যাদি কেন্দ্রিক জীবন থাকে। ঈদ থাকে, আনন্দে মুসলিমের ভাষণ অভিভাষণ থাকে, গান থাকে। মানুষে মানুষে মুলাক্বাত থাকে। নারী পুরুষে মিলন হতে চাইলে বিয়ের ইজাব কবুল থাকে। পরিবার থাকে, সেখান থেকে বের হয় ইসলামের সৌন্দর্য। সেখানে হৃদয়কে আনন্দিত করার নানান প্রক্রিয়া থাকে, দেহকে ভালো রাখার সামগ্রিক দিক থাকে, খাওয়া দাওয়ার নানান ব্যবস্থা থাকে। হাতে ভাত খাইতে পাঁচ আঙুলের প্যাঁচে এক আলৌকিকতা নিয়ে মুখে পুরে ফেলার দৃশ্য থাকে। এই সব সংস্কৃতি।

আর সভ্যতার আরবী শব্দ, হাদারাহ। এটা হলো সংস্কৃতি থেকে উৎপন্ন এমন জিনিষ যা আপনার ও আমার কাছে “হাযির” থাকে, সমুপস্থিত থাকে।

একটা উদাহরণে এটা আরো স্পষ্ট হতে পারে। এই যেমন মুসলিম সংস্কৃতির একান্ত অংগ হলো ইবাদাত। বিশেষ করে সালাত আদায়। এটা মুসলিম সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংগ। সালাত আদায়ে কিবলাহ লাগে, পবিত্র যায়গা লাগে, পানির স্থান লাগে, ইমামের স্থান লাগে, ছেলে মেয়েদের জন্য আলাদা যায়গা লাগে, আযানের জন্য সর্বোচ্চ স্থান লাগে যেখান থেকে শব্দ ইথারে ভাসিয়ে লোকালয়ে পৌঁছানো যায়। এগুলো আমাদের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি সঠিক ভাবে চর্চার জন্য আমরা একটা যায়গা বাছাই করি। সেখানে তাওহীদকে ভিত্তি করে কাজ করি। আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটা স্থান বানানোয় অনেক হালাল টাকার স্তুপ বানাই। ঐ যায়গাটাতে কারো মালিকানা রাখিনা, আল্লাহর জন্য খাস করে দিয়ে সুন্দর করে একটা ঘর বানাই। এটা হয় কিবলাহের দিকে ফেরানো। ভেতরে ইমামকে রাখি সুন্দর সুরক্ষিত স্থানে। তাকে মেহরাব বলে দেই। তার কথা শুনতে সুবিধার জন্য একটা মিমবার বানাই। মুয়াযযিন হয় সুকণ্ঠী। তার সুরের লহরী দূর সুদূরে পৌঁছে দিতে বানাই সুউচ্চ মিনার। অযুর যায়গা, বাথরূম টয়লেট, মেয়েদের আসার পথ, তাদের জন্য পর্দাযুক্ত স্থান। এই সবের মিলিত একটা নয়নাভিরাম স্থানকে আমরা মাসজিদ বলি। এই ইসলামি সংস্কৃতির রূপ তৈরীকারী স্থান তাই হয়ে ওঠে ইসলামি সভ্যতা। এটাকে আমাদের গর্বের ধন করে দেয়, জগতকে মোহিত করে দেয়, মানুষ তা দেখার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে। এমনকি আমাদের নবীও (স) বলে ওঠেন, দুনিয়া ধর্মীয় স্থান ভ্রমনের জন্য কা’বা ঘর, আমার মসজিদ ও বায়তুল মাক্বদাসে যেতে পারো। কারণ তাওহিদী সংস্কৃতির দেয়া উপহার হলো ঐ গুলো। কাজেই ঐ গুলো আমাদের সভ্যতার প্রতীক।

জাহিলিয়্যাতের সেরা সাহিত্য লেখা হতো কা’বার গায়ে। ইসলাম আসার পরে দরকার হলো গানের। কবিতার। ছন্দের। দরকার হলো বাগ্মীতার, আগুন ঝরা বক্তৃতার। যে আলোচনা মানুষ দুনিয়ার জীবনকে তুচ্ছ করবে। আখিরাতকে পাওয়ার জন্য যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করে মুখ তৃপ্তির হাসি নিয়ে ঘুম পাড়াবে।

ইসলামে দরকার হলো কুরআন লেখার জিনিষ পত্র। দরকার হলো হাদীস লেখার মনোযোগ। হাদীস গ্রহনে লাগলো সত্য মিথ্যার বিচার বিশ্লেষণ। দরকার হলো কুরআন হাদীস থেকে হুকুম আহকাম, ব্যবহার ও আখলাক্ব বের করার নীতি মালা, ফিক্বহ ও উসূলে ফিক্বহ। এই সব ছিলো ইসলামী সংস্কৃতির একেকটি দিক।

এই দিক গুলো এক সময় কুরআনের মলাটে গ্রন্থিত হলো। হাদীসের কিতাবে ঘর ভর্তি হলো। হাজার হাজার মাসআলাহ ঋদ্ধ হয়ে ফিক্বহএর কিতাবে দেমাশক, কায়রো, বাগদাদ কিংবা মক্কা মদীনা ভর্তি হলো। কবিতার বই হলো। গদ্য রচনার ধারা তৈরি হয়ে জাহেয, ইস্ফাহানি, ইবন কুতায়বা, আবু আলী আল ফারেসীদের আগমন হলো। তাদের লেখা একত্রিত করে ঘরে আর যায়গা হলোনা, বায়তুল হিকমাহ বানাতে হলো। এই গুলো হয়ে গেল ইসলামি সংস্কৃতির একেকটা দলীল ও দস্তাবেজ। এই সাহিত্য সম্ভারের নাম হয়ে গেলো ইসলামি সভ্যতা।

আমাদের আর্মীরা আগে হতো মুসলিম তারপর যোদ্ধা। সেখানেও ইসলামি সংস্কৃতির চর্চায় আরেক ধরণের সভ্যতার উন্মেষ হলো।

আমাদের বিল্ডিং নেয় নবতর রূপ। হয় কর্ডোভার প্রাসাদ, বাগদাদের দৃষ্টি নন্দন নাগরিকতার নতুন দিগন্ত মোড়া মুসলিম শহর। চায়নায় গেলো তাদের ঘরের ডিজাইন, মালাকা বন্দরে তার নিদর্শন দেখা গেলো। যে কেও দেখে বললো এটা মুসলিমদের বাড়ি, ঘর দহলিজ, সরাই খানা। ইসলামি সংস্কৃতি দ্বারা রংগীন হয়ে ওঠা সুন্দর সভ্যতা।

হাঁ, ইসলামি সংস্কৃতিতে কিন্তু ইসলাম কাওকে হাত দিতে দেয়না। কারণ ঐ সংস্কৃতির যে রূপট সার্বজনীন তাকে বলা হয় ‘সাওয়াবিত’। মানে অপরিবর্তনীয়। যেভাবে কুরআন হাদীসে এসেছে, কিংবা ইজমা’ দ্বারা ধার্য হয়েছে, অথবা ইজতিহাদ দ্বারা প্রণীত হয়েছে, ঐভাবেই তা পালন করতে হয়।

কিন্তু সভ্যতা বিনির্মানে ইসলাম খুব উদার হয়। এটাকে দার্শনিক আব্বাস মাহমূদ আলআক্ক্বাদ বুঝাতে চেয়েছেন, “ইসলামি সভ্যতা, সারা দুনিয়ার সুন্দর জিনিষ গুলো বাছায় করে নেয়ার সভ্যতা”।

এই জন্য এই সভ্যতা এতই কালান্তর হয়, এতই সার্বজনীন হয়। ইমাম নাদাওয়ী এইটাকে বলেনঃ ইসলামি সভ্যতা বিনির্মানে মূল কথা হয় “আল ক্বাদীম আসসালেহ ওয়াল জাদীদ আন নাফি’” অর্থাৎ কাজে আসা পুরানো সম্পদ, ও উপকারী নতুন আবিস্কারের সমাহার।

উদাহরণ দেই; তা হলে বিষয়টা সুন্দর হবে। একবার খালিফা মুতাওয়ক্কালের কাছে আলী আলজাহমকে আনা হলো। তিনি আব্বাসী খলিফা মামুন, মু’তাসিম, ও ওয়াসিক্বকে দেখতে পারতেননা। কারণ তারা ছিলেন মু’তাযিলা, এবং ইমাম আহমাদকে নিপীড়নকারী। আলীর কবিতা ছিলো খুব শক্তিশালী। খলিফা মুতাওয়াক্কিল আহলুসসুন্নাহের অনুসারী হয়েছেন। তিনি আলীকে পাশে আনতে চাইলেন। আলী আসলে কবিতা রচনার নির্দেশ দেয়া হলো। তিনি কবিতা লিখলেনঃ

أَنتَ كَالكَلبِ في حِفَاظِكَ لِلوُدد …….وَكَالتيسِ في قِرَاع الخطُوبِ
أَنتَ كَالدلو لاَ عَدِمتُكَ دلوا………. من كِبَارِ الدلا كَثيِر الذنُوبِ

অর্থাৎ ভালোবাসা রক্ষার ক্ষেত্রে আপনি কুকুরের মত, যুদ্ধের মাঠে আপনি রণ-পাকা পাঠার মত। হারাতে চাইনা আমরা, আপনি তো বালতির মত (দানশীলতার অর্থে)নানা রশিতে বাঁধা বড় বালতির সেরা আপনি।

খলিফা বুঝেলেন কবি সাহেবের কাব্য প্রতিভা আছে, নেই সভ্যতার জ্ঞান। বাগদাদ ছিলো তখন সারা দুনিয়ার নানান মানুষের বাসস্থান। খলিফা তাই বললেন, কবি সাহেবকে দজলার ব্রীজের পাশে কুল কুল ধ্বনি তুলে বয়ে চলা নদীর ধারে বেঁধে রাখ। তবেই তার ভাষায় মরুর উষরতা কমবে। তাই করা হলো। এক বছর পরে কবির মুখে প্রথম যে কবিতা খলিফা শুনলেন, তাহলোঃ

عيون المها بين الرصافـة والجسـر **جلبن الهوى من حيث أدري ولا أدري
خليلـي مـا أحلـى الهـوى وأمـره ** أعرفنـي بالحلـو منـه وبالـمـرَّ !

পথের ধারে পুলের পারে হরীণীর ঐ নেত্র গুলো
বুঝেছি কি বুঝিনি কখন হৃদয় আমার টেনে নিলো
ও বন্ধু মোর, কী যে মধুর প্রেমের বাঁধন প্রেমের কারণ
মিষ্টতা তার বুঝিনু আজি, তিক্ততাও পেলাম তেমন।।

যাহোক, সুন্দর হৃদয় কাড়া শব্দ দিয়ে বুনা কবিতার মালা শুনে খলিফা গলে গেলেন, বললেন, থামাও ওকে। তা না হলে আমাদের সব গলিয়ে ফেলবে।

আসলে বাগদাদের স্নিগ্ধ শোভা, নদীর কুল ধ্বনি, পুলের উপর দিয়ে চলা ললনার চোখ কবিতায় নিয়ে আসে এক দারুণ কোমলতা। একই ঘটনা ঘটেছে সাহিত্য যখন ইউরোপে কর্ডোভাতে আসে, বা এশিয়ার ভারতে যায়। তখন ইসলামি এই সভ্যতা নবীর (সা) যুগের সভ্যতা থেকে আরো উন্নত রূপ পায়।

মদীনায় আমাদের নবী (সা) যে মসজিদ তৈরি করেছিলেন, ঐ রকম আর কোথাও হয়নি। সারা দুনিয়ায় নানা রকম মসজিদ ও প্রাসাদ ঐ সব দেশে যেয়ে নতুন রূপ লাভ করেছে।

আরবী ছন্দ ভারতীয় ৪ স্ট্রোক ছন্দে যেয়ে “মাজমাউল বাহরাইন” দুই সাগরের মিলন হয়েছে। আরবী সুর ও ভারতীয় সুরকে ঋদ্ধ করেছে। আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ৫/৬টা আরবী ছন্দ বাংলায় ঢূকিয়ে বাংলা কবিতাকে বলা যায় ঘেন ঘেনানি থেকে বের করে রক্তের তড়পে এনে বিপ্লবী সুর দিয়েছেন। তার,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে নাচিছে ঘুর্ণিবায়
জল তরঙ্গে ঝিল্‌মিল্‌ ঝিল্‌মিল্‌ ঢেউ তুলে সে যায়।।

কবিতার ভাষা ও সুর দেখেন কী অপূর্ব! হরফ প্রকাশনী কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি’ গ্রন্থের ভূমিকায় আবদুল আজীজ আল আমান লিখেছেন, এই গানটির সুর তিনি নিয়েছেন একটি প্রাচীন তুর্কি লোকগীতি থেকে। এই গানটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। আবার একই সুর ব্যবহৃত হয়েছে একটি আরবী গানে। নজরুলের গীতিগ্রন্থে দেখা যায় “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে” গানটির শীর্ষে নজরুলের হস্তাক্ষরে লেখা আছে ‘আরবি সুর’। অর্থাৎ তিনি আরবী গানটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

এইভাবে ইসলামি সভ্যতা বিকশিত হয়। ফার্সি সাহিত্য আরবীকে বিয়ে করে নতুন রূপ ধারণ করে। ফার্সি সাহিত্যের প্রভাবেও আরবি কবিতা ও গান বিকশিত হয়। ভারতীয় সাহিত্যের ধারা সমূহ দ্বারা প্রাভাবিত হয় আরবী কথা সাহিত্য। যে ‘আরব্য রজনী’ সারা দুনিয়া কাঁপিয়েছে তা ছিলো ভারতীয় সাহিত্যের আকর। যে “কালীলা দিমনা” আজো আরবি সাহিত্যের দিকপাল, তাও ছিলো ভারতে বেদবাসের গল্পের অনুবাদ। এইভাবে ইসলামি সভ্যতা বিশ্বজনীন হয়েছে। একে গ্রহন করতে কোন ভুখন্ডেরই সমস্যা হয়নি।

আমাদের যারা সংস্কৃতির জগতে পা দিতে চায় এইসব বিষয় গুলো মনে না রাখলে সব গুলিয়ে ফেলবেন। তাদের অনেকেই মনে করেন কবিতা লিখলে নজরুলের মত, বা ফররুখের মত হতে হবে। এই ভাবে মাটি কামড়ে না থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়, এগিয়ে নিতে হয়। কারণ সাহিত্য সমাজের দর্পন, ও সংস্কৃতির ফসল। কবি নজরুল তো সারা দুনিয়ার সাহিত্য থেকে রস নিয়ে বাংলার চারা কে অন্য রকম মহিরূহে রূপ দিয়েছেন। ফররুখ ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। তার সনেট গুলোতে সেক্সপিয়রের সুগন্ধি লাগানো আছে। কবি ইকবালের দার্শনিকতা ও নান্দনিকতার অনেক রং চিত্রিত হয়েছে তার অনেক গুলো কবিতায়।

আমাদের সভ্যতাকে উঁচু করতে সারা দুনিয়ার সেরা সৌন্দর্য চয়ন করে এগিয়ে যেতে হয়, এগিয়ে যেতে হবে।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!