ইসলামি বিশ্বাবিদ্যালয়গুলো কতটা ইসলামিক !!

Dr.Abdus salam Azadi

ইসলামি দুনিয়ায় এখন ইসলামি করণ প্রস্তুতি এবং দাওয়াত চলছে। সবকিছুকে ইসলামি করণের সবচেয়ে বড় ঢেওটা শুরু হয় বিশ শতকের প্রথম দিকে। এই সময়ে শায়খ ইলিয়াস কান্দেহলাভীর “ইলাল ইসলাম মিন জাদীদ” বা নতূন করে ইসলামের দিকে ফিরে আসার শ্লোগান, হারানো ইসলামী রাস্ট্রের পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে প্রথমে ভারতে খেলাফত আন্দোলন, পরে মিশরে ইখওয়ানুল মুসলিমূন এর আন্দোলন, এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র রক্ষার নিমিত্তে কবি ইকবালের দর্শন ও পরে সার্বিক ইসলামী সভ্যতা দর্শনের মাওলানা মাওদূদী ভার্সন সমূহ আমাদেরকে দুনিয়ার সিস্টেমকে ইসলামীকরণের দিকে উদবুদ্ধ করে।

এরপরে ডঃ ইসমাঈল ফারুকী শুরু করেন ইসলামাইজেশান ওব নলেজ বা জ্ঞানের ইসলামি করণের দাওয়াত। এতে আমেরিকার ট্রিপল আই টি এর সূচনা হয়, সত্যি কথা বলতে কি এদের ই হাতে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনা সিস্টেম শুরু হয়।

বিশ্বে আসা বা পরিচিত হওয়া জ্ঞান গুলোকে ইসলামি করণের কাজ শুরু হলে এতে যারা অংশ করেন, তাদের মধ্যে প্রফেসর মালেক বাদরীকে আমি মালয়েশিয়ায় দেখেছি, দেখেছি এই পথের আরেক গুরু নাক্বীব আলআত্তাসকে। এদের সাথে সাথে আরো কিছু বিশেষজ্ঞকে পেয়েছি হয় আমাদের শিক্ষক হিসেবে না হয় আমাদের আলোকিত ব্যক্তি হিসেবে। এদের মধ্যে সাঊদীর আব্দুল হামীদ আবূ সুলায়মান, ইরাকের তাহা জাবের আলওয়ানী, মিশরে ইউসুফ আলক্বারাদাওয়ী, সিরিয়ার উমার উবাইদ হাসানা, বাংলাদেশের ডঃ আলী আশরাফ প্রমুখ।

এদের কাজের প্রাথমিক দিকের কথা গুলো শুনলে একটু গা জ্বলতো। যেমন ডঃ মালেক বাদরী একবার মালয়েশিয়াতে জ্ঞানের ইসলামী করণের অগ্রযাত্রার কারগুযারী শুনাতে যেয়ে বলতে ছিলেনঃ আমরা যখন সুদানে ইসলামকে ইসলামি করণ শুরু করলাম, “লাম্মা বাদা’না ইসলামিয়্যাতাল ইসলাম ফীস সুদান” তখন আমি শুধু না, হলের অনেকেই বিস্ময়ে মুখটা বাংলা পাঁচের মত করে ফেলেছিলাম। এই কাজের ব্যাপকতা ছিলো এতো যে তারা ইসলামকেও ইসলামী করণের চিন্তা করেন। অবশ্য পরে শুনেছি, তিনি আসলে বলতে চেয়েছিলেন, ইসলামের ন্যারিটিভ বা বয়ানকে কুরআন ও সাহীহ সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণকরাইকে তারা ইসলামকে ইসলামীকরণ করা বুঝাতেন।

এরা জ্ঞানের ইসলামী করণের যে ধারা শুরু করেন তার তিনটা মৌলিক দিক ছিলোঃ
১। পৃথিবীতে অনেক অনেক জ্ঞানের শাখা প্রশাখা আবিস্কৃত হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সে গুলো পঠিত ও চর্চিত হচ্ছে, অথবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেগুলোকে বিস্তার ঘটাচ্ছে। সেগুলোকে আমাদের নতুন আংগিকে পড়া। যেগুলো ইসলামের শিক্ষার সাথে মেলে তাকে সেই ভাবে রাখা, আর ইসলামি শিক্ষার সাথে না মিললে তাকে ইসলামের ঢঙে নতুন করে সাজানো। এটাকে তারা ইস্লামিয়্যাতুল মাআরিফ আলইন্সানিয়্যাহ বা মানব জ্ঞানের ইসলা্মীকরণ বলে অভিহিত করতেন।

২। যে সব ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র সারা দুনিয়ায় “মাদ্রাসা” নামে বা “জামে'” নামে বা অন্য কোন নামে ছিলো, সে গুলোকে আলজামিয়াহ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নিত করা। এক্ষেত্রে তারা দুটো কাজ করেন। শহীদ ফায়সালকে উদবুদ্ধ করে কিছু নতূন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় তারা করেন। যেখানে পাশ্চত্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিষয় গুলো পড়ানো হবে। তবে ইসলামের ঢঙে সাজিয়ে। এর জন্য প্রথমে মদীনায়, সুদানে, পরে ইসলামাবাদে, এর পর ঢাকায়(যেটা জিয়াউর রহমান অযথা ভয়ে অস্বীকার করায় গ্রহন করে মাহাথির মোহাম্মাদ), আরেকটা হয় নাইজেরিয়ায়। এইগুলোতে আধুনিক বিষয়গুলো ইসলামের দৃষ্টিকোণে পড়াবার চেষ্টা শুরু হয়।

আমার মনে আছে, আমি রিয়াদের কিং সাঊদের ছাত্র ছিলাম। সেখানে অনার্স শুরু করার আগেই মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে চান্স পাই। আমি সেখানে যাবো কিনা এই ব্যাপারে ইস্তেখারা করছি। এই কথা আমার উস্তায সুদানের ডঃ আব্দুল খালেক শোনেন। তিনি আমাকে ডাকেন। মদীনায় যাবো কিনা ভাবছি এইটা শুনে তিনি রেগে গেলেন। বললেনঃ আল্লাহ তোমাকে ইসলামি বিশ্ব বিদ্যালয়ে নিতে চাচ্ছেন, আর তুমি বসে ভাবছো এই সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়বে কিনা? আমি হতভম্ব হলাম। বললাম, স্যার, এইটা সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়?
তিনি আমাকে সোশ্যাল সাইয়েন্সেস এর একটা বই দিয়ে বললেন, এই দেখ, এই বই এখানের ছাত্ররা পড়ে। এখানে ডারইউনের থিউরীর কোন চ্যালেঞ্জ এদের শেখানো হয়না, হয় তার দর্শন গুলো গেলানোর চেষ্টা। আসলে তখন হারুন ইয়াহিয়া বা মরিস বুকায়ের বই তো আসেনি, ডারউইনকে ভাঙবে কে? তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সেক্যুলার মনে করতেন।

যাহোক, এই ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মাধ্যমে মোটামুটি জ্ঞানের ইসলামী করণের কাজ করা হয়। কিন্তু যেটা আমার কাছে ধরা পড়েছে, এই সব তথাকথিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যলয়ে সাধারণ বিষয় গুলো যারা পড়েছে, তাদের মাঝে আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সাধারণ বিষয়ের পড়া ছাত্রদের মাঝে মৌলিক তেমন পার্থক্য আসেনি। অবশ্য ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবশ্যিক বিষয় নামে যেসব বিষয় পড়িয়ে ইসলামে পাকা করা হতো তার কিছু উপকার পাওয়া গেছে।

এই জন্য এই সব ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হতে জাফর সাদিকের মত বিজ্ঞানী, বা ইবনে সিনার মত চিকিৎসক হয়নি, কিংবা আলখাওয়ারিযমএর মত গাণিতিক বা ইবন খালদুনের মত কলা বিষয়ক বিজ্ঞানী আর আসেননি।

এরা আরেকটা কাজ করেছেন, তাহলো আগেকার পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন ভাবে সাজানোর প্রচেষ্টায় সরকারকে প্রভাবিত করেছেন। ফলে আলআযহারে আসে প্রভূত পরিবর্তন, যায়তুনাতে আনা হয় ভালো মানের কারিক্যুলাম, মরক্কোর ক্বারাওয়িয়্যীনেও আসে পরিবর্তন। এই সব পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় তাই হয়ে ওঠে আজো আধুনিক।

ভারতের বুকেও ছিলো অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়। পুরাতন সেসব গুলো বেঁচে নেই। তবে ১৮৬৭ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় দেওবন্দ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এটাই ভূভারতের একমাত্র বেশি পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে পরিবর্তন কিছু হয়েছে। অনেকে পরিবর্তন করতে চেয়ে পারেননি। ফলে তাদের এখান থেকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। অন্যত্র অন্য নামে প্রতিষ্ঠান করেছে্ন অনেকে। এরই সন্তা্নেরা নাদওয়াতুল উলামা করেছেন, সাহারানপুর করেছেন, পাকিস্তানেও নিয়ে এসেছেন অনেক পরিবর্তন এবং সে গুলোতে দেওবন্দী সিলেবাসের আধুনিকায়নই করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশে এই সেলেবাসের তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু শায়খ সুলতান যাওকে হাফিযাহুল্লাহ, ও বন্ধু ও শায়খ মুহাম্মাদ সালমানের দারুর রাশাদ ধর্মী কিছু পরিবর্তন লক্ষনীয়।

৩। জ্ঞানের ইসলামি করণের প্রবক্তাগণ আরেকটা খুব ভালো কাজ করেন। তাহলো ইসলামের আলোকে কারিক্যুলাম ও সিলেবাস নির্ধারণ করে ছাত্রদের হাতে তুলে ধরার মত পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়া। এতে তারা অনেক এগিয়ে গেছেন।

তবে এই সব ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মূল্যায়ন হওয়া দরকার। এই গুলো কতটুকু ইসলামিক তা বুঝা দরকার। আমি দুনিয়ার নামকরা ৩টা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। মদীনা, মালয়েশিয়া ও কুষ্টিয়ার। মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যলয়ে ইসলাম ও তার শিক্ষা ১০০% পেয়েছি। মালয়েশিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৬-১৯৯৮ এর দুই বছরে ইসলামকে খুব খুঁজতাম। দেখতাম কিছু ছাত্র ছাত্রীদের গায়ে পায়ে বুকে মাথায় ইসলাম লাগা ছিলো। অধিকাংশ শিক্ষকগণের দেহমনে ইসলাম টুইটুম্বর ছিলো, ছিলো ইসলামি বিষয় গুলোর যেসব ডিপার্টমেন্ট সে সবে ইসলামের সুর লহরী। কিন্তু বাকি যায়গায় ইসলামের লুকোচুরি খেলতে দেখেছি।

আর কুষ্টিয়ায় পড়তে যেয়েও ইসলামের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়েছে, তবে ইসলাম খুব মুখ গোমড়া করে আমাকে বের হতে বলতো।
ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক আছে। যেগুলোর জন্য পৃথিবী আমার কাছে অনেক বার ইসলামি জ্ঞানকে আবার ধুলির ধরায় নিয়ে আসতে বলে।

সেদিন মদীনায় প্রবাসী আমার এক দোস্ত বললেন, আব্দুস সালাম ভাই, আপনি এই যে ফ্রী ইসলামি বিষয় বিভিন্ন গ্রুপে পড়াচ্ছেন, এটাকে একটু স্ট্রাকচারে এনে আপনি কিন্তু ভালো ভাবে ইনকামের একটা ব্যবস্থা করতে পারেন। তিনি যে হিসেব দেখালেন, আমি যে হোয়াটসআপ ব্যবহার করে ৫/৬টা বিভিন্ন গ্রুপে ক্লাশ নেই, তাদের কাছে যদি ৫ ডলার করে যদি মাসে ফিস হিসেবে নেই তাহলে, তার হিসেব মত, আমি মাসে প্রায় ছয় হাজার ডলার ইনকাম করতে পারবো।

অঙ্কের হিসাবে এটা খুব সুন্দর হিসেব। ভাগ্য ভালো যে, গণিতে আমি বরাবরই খুব খারাপ নাম্বার পেয়েছি। তা না হলে এই অংকের যোগফলটা আমার মাথার নিউরোন গুলোকে রেস্ট নিতে দিতোনা।

আজ কায়রোতে থাকা আমার বন্ধু আব্দুল বাতেন একটা ভিডীও পাঠায় একটা গ্রুপে। সেটা দেখে বললাম, আহারে ইসলামি শিক্ষা ব্যবাস্থার এইটাই ছিলো আরেকটা বড় দিক। যেখানে পড়তে এসে কেও টাকা পয়সার ভয়ে পালাতোনা।

https://www.youtube.com/watch?v=ouI_AUfB7EM

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!