ইউরোপে বাংলাদেশ:নজরুল ইসলাম হাবিবী (লন্ডন )

 

স্বাধীনতা, একটি স্বাধীন দেশ ও একটি পতাকার কতটুকু মর্যাদা ও সম্মান বিদেশ থেকে অনুভব করা যায় বেশী।

এক প্রাচীন কবি কতই না সুন্দর লিখেছেন:
স্বদেশের প্রেম কত
সেই মাত্র অবগত
বিদেশেতে অধিবাস যার….
কতরূপ স্নেহ করি
দেশের কুকুর ধরি
বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।

এর প্রধানত: দুটি কারণ আছে বলে আমার মনে হয়। প্রথমত: দেশের জন্য মনের আবেগ ও আকর্ষণ অথবা বলা যায় স্বদেশ প্রেম।
কারণ, সেখানে যে মা, বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু, স্বজন সুজন এবং ছেলেবেলার ফেলে আসা স্কুলের সহপাঠি, খেলার সাথীরা যে থাকেন। তাদের নিয়ে কত স্মৃতি কত প্রীতি, তার কি কোন কিনারা আছে?না আছে শব্দে ছন্দে ব্যাখ্যা দেবার সুযোগ? না, নেই। এ মায়ার এবং মায়ের বন্ধনের নামই দেশপ্রেম, স্বাধীনতার প্রার্থনা।স্বাধীন দেশের স্বাদ।

দেশপ্রেম তখনই ফুলে ফলে সজ্জিত হয় যখন একটি দেশ স্বাধীন থাকে, দেশের একটি পতাকা থাকে, একটি মন ভরে গাইবার মত গান থাকে। অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধি থাক আর না থাক, মনে গর্ব থাকে যে, আমি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক।আমার আলাদা একটি পতাকা আছে।

স্বাধীনতার ধারণা অহংকারের আরেক নাম। বিশ্বে স্বীয় শীর সমুন্নত করে তুলে ধরার সীমাহীন গরিমার সোনালী দরজা। এ অহংকার হালাল, এ অহংকার স্বর্গে যাবার প্রতিযোগিতার পাঠ।

‘আমার একটি স্বাধীন দেশ আছে’- এ দরদমাখা বাক্যের কোন তুলনা হয় না পৃথিবীতে। পুরো দুনিয়া এক ইঞ্চি স্বাধীন-ভূমির সমান নয়। একখন্ড অধিন দেশ মানে গোটা বিশ্বের জন্য ক্যনসার। যেমন প্যালেস্টাইন। আজ ৬৫ বছর ধরে এই ইস্যুতে সারাবিশ্ব দু্‌ই ভাগে বিভক্ত। মাঝখানে স্বদেশহারা প্যালেস্টাইনীর ঝরছে রক্ত।
পৃথিবী সবার। ‘পৃথিবী’ একক কোন সীমানার নাম নয়। পৃথিবীর অবস্থান কিছু দেশ বা মহাদেশকে নিয়ে, সাগর বা মহাসাগরকে নিয়ে, কিংবা পাহাড়- পর্বতকে নিয়ে হলেও পৃথিবীর সীমানায় স্রষ্টার সম্মতি আছে। তাই যে দেশের সীমানা নেই সে দেশ ‘পৃথিবী’র জন্য কষ্টের! যে নদী ধারাহারা, তার উত্তাল তরঙ্গে বাঁধা বিপত্তি, সে নদী অসুস্থ। সে নদী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়; যা কিনা ‘পৃথিবী’র জন্য নিরানন্দের।

নদীর জল, জলের হাঁস, হাঁসের বাড়ি ঐ শ্যাওলাপনারও একটি জায়গা আছে, বিচরণ বা বয়ে যাবার মত সুযোগ আছে, এতটুকুন অধিকার বা সুযোগ অথবা স্বাধীনতা হাঁস ও শ্যাওলার না থাকলে হাঁস খাদ্যাভাবে, শ্যাওলা জল শুন্যতায় মারা যাবে। মানুষের স্বাধীনতা ঠিক একই রকম; তবে প্রায়োগিক বিচারে এর চেয়ে কিছুটা বেশী। কারণ, আমরা জানি, পশু, পাখি, শ্যাওলা ও শামুকের স্বাধীনতা সাময়িক বা অনেকটা ভাবলেশহীন। নন্দনতত্ব ও দর্শন-দেশনা সেখানে বেশী কাজ করে না। এদের বোধ-বিশ্বাস মানুষের মত তেমন প্রখর নয়। এদের চাহিদা জৈবিক ও ক্ষণিক। কিন্তু মানুষ সে সংকীর্ণ বা সংক্ষিপ্ত বিশেষনে আবদ্ধ নয়।

মানুষের প্রয়োজন বহুবিদ, চেতনা সুগভীর, চিন্তায় থাকে সম্পূর্ণ উদার উদাস করা স্বাধীনচেতা দ্বিতীয় আরেকজন, সে অনেক কিছু চায়। (অবশ্য, ‘অনেকপ্রাপ্তি’র নেশা অনেক সময় স্বাধীনতা কিংবা স্বাধীনসত্ত্বার পরিপূরক নয়)। ভাবে থাকে ভাষা, চাওয়ার থাকে অর্থময় ব্যঞ্জনা, বলছিলাম, মানুষের স্বাধীনসত্ত্বা, স্বাধীন চেতনা, স্বাধীন জীবন যাপন পশু- পাখি ও কীট পতঙ্গ থেকে বহুগুণে বেশী ও ব্যাপক।

দ্বিতীয়ত: স্বাধীনতা শুধু অর্থের নয়, আত্মার জন্যও চাই। অর্থের প্রশান্তি স্বর্গে নেয় না- আত্মার প্রশান্তি নেয়। আত্মার প্রশান্তি আসে সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের পূর্ণ পূত বায়ু-বাতাস অর্থাৎ সঠিক মানবিকতার প্রয়োগ বা চাষাবাদ থেকে। সমাজ বা সভ্যতা অসুস্থ হলে মন মনন আত্মা সুস্থ হয় না। বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ-বিগ্রহ জনপদের দিকে তাকালে উল্লেখিত কথাগুলির সত্যতার প্রমাণ মেলে।

লন্ডনে আমি চ্যারিটির পক্ষে এক রিফিউজি ক্যাম্পে কিছু দিন কাজ করেছি। আমি অনুসন্ধান করে অনুমান করতে পেরেছি যে, ইরাক ও প্যালেস্টাইনের এক শ্রেণীর মানুষ এখন তত সামাজিক নয়। মনে হয় লাশ আর রক্ত দেখতে দেখতে তারা আর নান্দনিকতার মানে খুঁজতে যায় না। একই কারণে, আফ্রিকার কতক মানুষের মন ও মগজ এতই দুর্বিসহ হয়ে আছে যে, কয়েক শত বছরের আমেরিকা দ্বারা দাসত্বের নির্মম বেদনা আজো যেন ভুলতে পারছে না তারা। তারা জানে তারা দাস ছিল-স্বাধীন ছিল না। সে অপমান, সে কষ্টের বোঝা এখনো তারা যেন বয়ে বেড়ায়, রাস্তায় রাস্তায় মানুষকে কয়ে বেড়ায়।

বলাবাহুল্য, ইংল্যান্ডের জনপদে এখনো কতক কালোদের দেখা যায়, যারা নিজে নিজে কথা বলছে, কাউকে কখনো উচ্চ গলায়, কখনো নীচু কন্ঠে গালি দিচ্ছে অথবা অর্থহীন, লক্ষ্যহীন রাগ করছে। ইচ্ছেমত পোশাক পরিচ্ছদ, যেমন তেমন করে হাঁটা চলা-যেন তারা সমাজের একজন নয়।

আজ সারা দুনিয়ায় অধিন মানুষের হাহাকার। আমরা যারা ইউরোপে আছি আমরা আরো বেশী করে যেন বুঝি স্বাধীনতার অর্থ, স্বাধীনতার মান ও মর্যাদা। কারণ, অস্বাধীন বা স্বাধীনতাহারা, স্বদেশহারা মানুষ ইংল্যান্ডে প্রতিদিন প্রবেশ করছে। তাদের চোখের জল আমাদের বার বার বলে দেয় একটি অধীন দেশের মানুষের কত কষ্ট, কত অপমান। তার বিপরীতে স্বাধীনদেশের সাধ ও স্বাদ খুঁজে পাই সে দেশের মানুষের গর্ব, সম্মান ও হরষিত মন দেখে।

আমি স্পর্ধিত, গর্বিত যে, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি ধন্য এক মানুষ কারণ, আমার একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ আছে, আমার একটি পতাকা আছে। যে পতাকাকে খুঁজে বেড়াই ইউরোপের পথে প্রান্তরে, টিভির পর্দায়, খেলার মাঠে, শপিং সেন্টারের মালামালে, পোশাকের লগোতে। আমি স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ যিনি আমাকে পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দর একটি দেশের নাগরিক করে পাঠিয়েছেন। আমার প্রাণের দেশ, গানের দেশ, ধানের দেশ, ধ্যানের দেশ বাংলাদেশ।

যাঁরা আমার দেশকে স্বাধীন করেছেন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

আজ অনেক অনেক বছর ইংরেজির দেশে। আমি মুহুর্তের জন্যও আমার বাংলাদেশকে ভুলে থাকি নি। কখনো কোনো বাঙ্গালীর সাথে আমি ইংরেজিতে কথা বলি নি, বলি না। আমার বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের তুলনা হয় না।আমি বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমন করেছি, বাংলাদেশের মত সুন্দর দেশ আমি আরেকটি দেখি নি। একমাত্র বাংলাদেশেরই চাষা, মাঝি-মাল্লা, সন্ত-সাধু, ভান্তে, বাউল, কুলি,মজুর, রিক্সাচালক এমন কি পথের ক্ষুধার্ত ভিখেরী মন খুলে, প্রাণ ভরে গান গাইতে পারে। আর কোন দেশে এত গান নেই, এত প্রাণ নেই। শত শত গানের শাখা-প্রশাখা এই আমার রক্ত মাখা সবুজ পতাকার দেশেই আছে।

প্রসংঙ্গত: বড়ই আগ্রহ নিয়ে দু্‌ই হাজার দুই সালের মে মাসে স্বপরিবারে ইতালী ভ্রমণের সময় পুছিনী শহরের পাহাড়-প্রকৃতি দেখতে গিয়েছিলাম। এলাকাটি অস্ট্রিয়ার সীমান্তরেখায় অবস্থিত। উল্লেখ্য, ইতালির উত্তরে অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ড, পূর্বে স্লোভেনিয়া এবং এড্রিয়াটিক সাগর ,পশ্চিমে ফ্রান্স এবং তাইরহেনীয়ান সাগর মাল্টা হয়ে মিশেছে লোনিয়ান সাগরের সাথে যার ওপাড়ে তিউনিসিয়া।

আমাদের ভারতীয় গাইড কাম-ড্রাইভার বলব: “আসুন, দেখুন, কী সুন্দর”! আমি অবাক হয়েছিলাম তার বলার ধরণ দেখে! পর মূহুর্তে আমার সকল আবেগ চুপসে যায়! রাঙ্গামাটির একটি পাহাড়ের মতও আকর্ষনীয় ছিল না সেই পুরো বিস্তৃর্ণ এলাকাটি।

আহা, রাজ কুমার! তুমি আমার বাংলাদেশ দেখ নি! তুমি জান না বাংলাদেশের কোন ক্ষুধার্ত গরুও এ রকম পাহাড়ের ঘাষ খায় না!

দুই মিনিটের মধ্যেই পাহাড় থেকে নেমে গাইডসহ রওয়ানা দিয়েছিলাম ইতালীর রাজধানী রোমের পথে। রোমে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে ভাই শাহা আলম। সে আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছে, সমাদর করেছে।

পাঠক, আমার এ কথাগুলি লেখা আছে আমার ‘মা’ কাব্যগ্রন্থে ‘মিলান স্মৃতি’ নামক কবিতায়। কবিতাটি উৎসর্গ করেছি আমাদের গাইডের ছোট মেয়ে সবিতাকে। এটি লিখেছিলাম রোমের হোটেল আরকো ডি টাভারটিনোতে অবকাশের সময়।
২৫.০৩.১৮
লন্ডন।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!