ইউনেস্কো শাহের মাজার এবং ‘চেতনার’ কারবার : মিনার রশীদ

 

 

‘বিপদ’ শব্দটির প্রতিশব্দ পৃথিবীর সবগুলো ভাষায় থাকলেও ‘আপদ’ শব্দটির অনুরূপ ভাব প্রকাশক কোনো শব্দ অন্য কোনো ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ‘আপদ’ শব্দটি বাঙালি তথা বাংলাদেশীদের একান্ত নিজস্ব। কারণ, বাঙালিদের মতো এ রকম আপদে অন্যরা কখনওই মনে হয়, পড়ে না। এই আপদ এখন এত জটিল ও বেকায়দাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বিপদ-আপদের পরে তৃতীয়- ‘আপদের বাপ’জাতীয় শব্দ সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এ দেশে মুখ খুললে বিপদ বাড়ে আর মুখ বন্ধ রাখলে আপদ বাড়ে। সেকুলারাইজেশনের নামে ধর্মীয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাদের বসানো হয়েছে, এদের প্রত্যেকেই জাতির জন্য একেকটা ‘আপদ’ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছেন।

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক দখল করার পর সেই আপদদের একজন অনেক বড় বড় কথা শুনিয়েছিলেন; কিন্তু দখলের বছর না ঘুরতেই অন্যতম সফল সেই ব্যাংকটিতেও এখন নাকি খেলাপি ঋণের পাহাড় জমা হচ্ছে। ওই বুজুর্গের নাতনি সিনেমার হার্টথ্রব নায়িকা।

অনেকের ভয় হচ্ছে, কখন আবার নানাকে বাদ দিয়ে নাতনিকে সেই চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয়। প্রিয় পাঠক, ভয়টি নিছক অমূলক নয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও শরিয়াহ ডিপার্টমেন্টের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সনাতন ধর্মের একজন ভদ্রমহিলাকে। এই পদে বসার প্রশাসনিক যোগ্যতা কিংবা এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে; তবে প্রতিটি পদের নিজস্ব ভাবগাম্ভীর্য বা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কাজেই বিজ্ঞ পাঠক এতক্ষণে বুঝতেই পেরেছেন, কেন আপদের বাপ নামক শব্দ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছি।

এখন বিপদ-আপদের কথা বাদ রেখে মূল প্রসঙ্গে আসি। শিরোনামে উল্লেখিত, ইউনেস্কো শাহের পরিচয় বিধৃত করার আগে একটা গল্প বললে ওই পীরের মুরিদদের মতিগতি ঠাহর করতে আরেকটু সুবিধা হবে।

আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক। বাড়ি চট্টগ্রামে। সেখানেই ব্যবসা। জীবনযুদ্ধের প্রথমপর্যায়ে তিনিও মধ্যপ্রাচ্যে গমন করেছিলেন। যে অর্থকষ্টের জন্য দেশ ছেড়েছিলেন, প্রবাসে গিয়ে তা না কমে আরও বেড়ে যায়। তাই বিদেশে বসে দেশী বুদ্ধি খাটাতে বাধ্য হলেন। হজরত নলি শাহ নামের আগে পরে আরও কিছু যোগ করে দেশ থেকে কয়েকটি রসিদ বই ছাপিয়ে আনলেন। তারপর মাথায় একটা টুপি ও গলায় মাফলার বেঁধে পীর মুর্শিদের নাম নিয়ে কালেকশনে বেরিয়ে পড়লেন। এর ফলে তার অর্থকষ্ট দূর হয়ে ব্যবসার কিছু মূলধনও হাতে এসে পড়ল।

এ ব্যাপারে তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যাও রয়েছে। ‘নলি’ হলো গলার কণ্ঠনালী, যা দিয়ে পেটে খাবার ঢোকে। কাজেই নলি শাহ তথা কণ্ঠনালীর খেদমতেই তিনি নাকি কাজটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কোনো রকম ‘প্রতারণা’ না করে সঠিক কথা বলেই জনগণের কাছ থেকে টাকা তুলেছেন। অর্থাৎ যার কথা বলে চাঁদা তুলেছেন, ঈমানদারির সাথে সেই খাতেই খরচ করেছেন। এই কণ্ঠনালী বা নলি শাহের প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর তিনি ব্যবসা শুরু করেছেন এবং সেই ব্যবসা থেকেই জীবনের বাকিটুকু করেছেন।

নলি শাহের মতোই এ দেশে সবচেয়ে বড় বা জিন্দাপীর হয়ে উঠেছে ইউনেস্কো। পুরো নাম ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশন, সায়েন্স অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন। এই ইউনেস্কো কোনো কিছুকে ‘হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করলে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। সোজা ওপরের গল্পের নলি শাহের মাজারের মতো শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করতে হবে।

পীর সাহেবরা কায়দা করে ঘরে ঢোকার দরজাটি নিচু করে রাখেন, যাতে ভক্তকুল ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই মস্তকটি অবনত হয়ে পড়ে। এ দেশে ইউনেস্কোর নব্য মুরিদ বা চেতনাবাজরা এমন কায়দায় ইউনেস্কোকে উপস্থাপন করে বসেছেন।

ইউনেস্কোর মুরিদদের মধ্যে সামনের সারিতে আছে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ড তাদের অধীনস্থ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও যথাযথ আড়ম্বরের সাথে ১৪২৫ সালের পয়লা বৈশাখ নববর্ষ পালনের নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ‘ইউনেস্কো কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ intangible cultural heritage-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে উদযাপন’ করার তাগিদ রয়েছে। এখানে ইনভার্টেড কমার ভেতরের অংশটুকু হুবহু সেই পত্র থেকে নেয়া হয়েছে। বাংলায় লিখিত এ অফিসিয়াল পত্রটিতে কেন এই ইংরেজি শব্দ কয়টি রেখে দেয়া হলো, তা বোধগম্য হচ্ছে না।

Intangible শব্দটির meaning হিসেবে ডিকশনারিতে যা দেয়া আছে তা হলো, unable to be touched; not having physical presence. কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করে বা Synonyms হিসেবে দেয়া আছে, non-physical, bodiless, abstract, invisible, airy, aerial, spiritual, ghostly, supernatural. এসব শব্দের অর্থ থেকে ধারণা করা যায়, এটার সাথে আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মীয় আবহের সম্পর্ক রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কোন ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত? যে প্রাণীগুলোর মুখোশ পরে এই শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সবগুলোই একটি বিশেষ ধর্মের বিভিন্ন দেবতার বাহন।

ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে intangible cultural heritage ঘোষণা করতে পারে; এতে কোনো দোষ নেই। কারণ, এই শোভাযাত্রায় বিশ্বের একটি ধর্মের আধ্যাত্মিকতা বা বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালিদের জন্য এটি intangible cultural heritage, যা পশ্চিমবঙ্গে বেশি প্রযোজ্য হওয়ার কথা। এখন সেটাকে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া সঙ্গত হতে পারে কি? এটা করা হচ্ছে সেকুলারাইজেশনের নামে এবং প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে।

মহররম উপলক্ষে ঢাকার শিয়া সম্প্রদায় তাজিয়া মিছিল বের করে। এটি শত শত বছরের ঐতিহ্য। এটাও intangible cultural heritage হতে পারে। এখন এই তাজিয়া মিছিলকে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সব মুসলমানকে কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীকে পালন করতে বাধ্য করলে বা তজ্জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হলে, সেটা হবে জুলুম বা অন্যায়।

ইসলাম এ দেশে রাষ্ট্রধর্ম হলেও এই ধর্মের কোনো অনুষ্ঠানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীকে বাধ্যতামূলকভাবে বা কোনো তথাকথিত সার্বজনীন কৌশল প্রয়োগ করে অংশগ্রহণ করানো হয় না এবং তা অনুচিত। তার পরও সুশীলসমাজের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে ক্ষেপে আছেন। সুযোগ পেলেই মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অথচ একই সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অন্যায় যখন মুসলিমদের ওপর, বিশেষ করে মাদরাসা ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর করা হচ্ছে, তখন এরা তাৎপর্যপূর্ণ নীরবতা পালন করছেন।

স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছর ধরে কিংবা তারও আগে থেকে সমাজের রক্ষণশীল অংশ এবং ‘নেভার মাইন্ড’ অংশের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে এসেছে। এগুলো নিয়ে এ দুইয়ের মাঝে এক ধরনের স্ট্যাটাস-কো অবস্থা বজায় ছিল। চারুকলা ইনস্টিটিউট, ছায়ানট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান পয়লা বৈশাখ ও অন্যান্য বাঙালিপনা তাদের মতো করে উদযাপন করতেন। তেমনি করে ধর্মীয় মহল মসজিদ-মাদরাসায় নিজস্ব ভাবগাম্ভীর্যে ধর্মকর্ম পালন করতেন।

অন্য দিকে নাচনেওয়ালীদের নাচ দেখে সাধারণ মানুষ বিনোদিত হতেন এবং পরের দিন হুজুরের কাছে গিয়ে হাত ধরে তওবা করতেন। সমস্যা বা আপদ হলো, এই নাচনেওয়ালীরা এখন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দখল করতে চাচ্ছে এবং তাদের চিন্তাভাবনা ধর্মীয় মহলের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। এরা দোয়া মাহফিলের ব্যানার টানিয়ে এবং মঞ্চে উপস্থিত মাওলানা সাহেবদের দস্তরখানার সম্মুখে কোমর দুলিয়ে দেশের ধর্মীয় ব্রিগেডকেও বিনোদিত বা কলুষিত করতে চাচ্ছে। এ ধরনের অনেক অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। একই পাপ করে এখন পাপীতাপী জনতা কাদের কাছে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য যাবেন? কারণ, ধর্মীয় ব্রিগেডকেও পলিউটেড করার পরিকল্পনা এই নাচনেওয়ালীরা হাতে নিয়ে ফেলেছে। এরা চারুকলা ইনস্টিটিউট আর মাদরাসাকে একাকার করে ফেলতে চাচ্ছে।

একই কিসিমের আরেকটি আপদ মাদরাসার ওপর আপতিত হয়েছে। সেটি হলো, মাদরাসায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার নির্দেশ। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা গানটি লেখা হয়েছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গের বিচ্ছিন্নতা এই জমিদার কবি তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকেই মেনে নিতে পারেননি। এই কবি নিজেও হয়তো বা কল্পনাও করতে পারেননি যে, গানটি একদিন পূর্ব বাংলাকে নিয়ে সৃষ্ট বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হবে এবং তারও ৫০ বছর পর এটি সেখানকার মাদরাসায় গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। এটাকে বলা যায় ইতিহাসের ‘মাইনকা চিপা’। সেই চিপায় পড়েছে দেশের মাদরাসা শিক্ষা।

রবীন্দ্রনাথ হিন্দুধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং তার বিশ্বাসের প্রতিফলন তার লেখায় থাকাই স্বাভাবিক। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে তার এ গানটির ১২ লাইন নেয়া হয়েছে। এই ১২ লাইনের মধ্যে দেশকে ‘মা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ছয়বার। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি নির্দোষ একটি তুলনা। কিন্তু যারা ভারতীয় সংস্কৃতির ‘মা-দেবতা’ বা mother cult সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তাদের ভ্রূ একটু কপালে উঠতেই পারে। বিশেষ করে যারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা বিশ্বাস রাখেন, তাদের কাছে এ শব্দটি অস্বস্তিকর ঠেকতে পারে।

আজ একটি প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই দেখা দিয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও দেশপ্রেমিক জাতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য। তাদের জাতীয় সঙ্গীতে তাদের দেশকে ‘মা’ বলে ডাকা হয়নি। ইউরোপিয়ান কোনো দেশের সঙ্গীতে এ ধারাটি চোখে পড়ে না। ৫০টির বেশি মুসলিম দেশের কোনোটিতে এ ডাকটি থাকার সম্ভাবনা কম।

তারা যদি দেশকে মা না ডেকেও তাদের দেশপ্রেম দেখাতে পারেন, তবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে দেশকে ‘মা’ বলে ডাকা বাধ্যতামূলক করা হলো কেন? জাতীয় সঙ্গীত মূলত একটি জাতির শপথ বা প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো। ইন্ডিয়া বা ভারতের জন্য এটি ঠিক আছে। তারা এই সঙ্গীতের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাস মতোই প্রার্থনা করতে পারেন।

সরকারের অতি উৎসাহী ব্যক্তিরা এটা নিয়েও খোঁচাখুঁচি শুরু করায় এ প্রশ্ন নতুন করে উদয় হয়েছে। এখন যদি মাদরাসায় এই গান বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে সঙ্গত কারণেই এর জের ধরে এমন দাবি উঠবে সে ঠেলা কতটুকু সামলাতে পারবেন তা সরকারই ভালো বলতে পারবে।

এখন প্রশ্ন হলো, এ দেশের মাদরাসা শিক্ষার ওপর এই সাংস্কৃতিক বাড়াবাড়ি কে বা কারা চালাচ্ছেন? কেন চালাচ্ছেন?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সঙ্ঘটিত হত্যাযজ্ঞ নিঃসন্দেহে এ জাতির জন্য ছিল মহাবিপদ। কিন্তু সেই যুদ্ধকে ব্যবহার করে চেতনার কথা বলে এক শ্রেণীর লোক এখন যা করছে, তা জাতির জন্য রীতিমতো আপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন আবার সেই চেতনার রঙে রঙিন হয়ে অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষার পাঁয়তারা চলছে। এগুলো দেখে জাতির অসহায়ত্ব, কষ্ট, ক্ষোভ, জ্বালা-যন্ত্রণা, আফসোস, বেদনা প্রকাশ করতে বিপদ আর আপদ শব্দ দিয়েও কুলাচ্ছে না।

এই দশা দেখেই বোধহয় আসামের বিজেপি নেতা উৎসাহিত হয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ‘খামাখা’ই এ দেশটিকে স্বাধীন করে রাখা হয়েছে। ইচ্ছে প্রকাশ করার আগেই যারা কাপড় খুলে দেয়, তাদের সতীত্ব (দেশপ্রেম) সম্পর্কে হয়তো ভুল অ্যাসেসমেন্ট ছিল। বিজেপির এই নেতা রাখঢাক না রেখেই বলে ফেলেছেন, বাংলাদেশকে ভারতের অংশ না করে ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেস মারাত্মক ভুল করেছিল!

তার এই কথার প্রতিবাদ কোনো ‘চেতনা’ধারী এখনো করেননি। বিজেপি নেতার এই আস্ফালন ও স্পর্ধা দেখে মরহুম মেজর জলিলের ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ নামক বইটিসহ সংশ্লিষ্ট বইগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। আজ বেঁচে থাকলে এই সেক্টর কমান্ডারকেও হয়তো যুদ্ধাপরাধের মামলায় কোর্টে বিচারের মুখামুখি হতে হতো। অনেক প্রশ্ন মাথায় এলেও তা করা যায় না, বুদ্ধিবৃত্তিক লাঠিয়ালরা থামিয়ে দেয়। এই লাঠিয়ালদের কারা তৈরি করেছে, কেন তৈরি করেছে, তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।

এরা যে, এই গামছা গলায় পেঁচাবে এবং বিজেপি নেতা বাংলাদেশকে সংযুক্ত করার প্রকাশ্য ঘোষণা দেবেন, তা কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে আগেই টের পেয়েছিলেন?

২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত তিনি দৃশ্যত ইয়াহিয়া খানের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন। যা হোক, বিজেপি নেতারা যতই বিশেষ ধরনের খায়েশ প্রকাশ করবেন, এ দেশের মানুষের মনে ততই কিছু প্রশ্নের উদয় হবে।

এখানে আরেকটি ইন্টারেস্টিং বিষয় সামনে আসে। ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের আওতাভুক্ত করেছে। এটা অবশ্যই বাংলাদেশের গর্বের কথা। UNESCO যেসব কারণে কোনো ডকুমেন্টকে তাদের আর্কাইভে সংরক্ষণ করে, সে কারণগুলো হলো- UNESCO’s Memory of the World Programme is an international initiative launched to safeguard the documentary heritage of humanity against collective amnesia, neglect, the ravages of time and climatic conditions, and willful and deliberate destruction. অর্থাৎ ইউনেস্কোর মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। এখানে মানব জাতির ঐতিহাসিক দলিল সামষ্টিক, অবহেলা, সময় ও জলবায়ুর প্রতিকূলতা এবং ইচ্ছাকৃত ও স্বপ্রণোদিত বিলুপ্ত করা থেকে সংরক্ষণ করা হয়। কাজেই ৭ মার্চের ভাষণের সম্পূর্ণটা, এমনকি শেষ বাক্য, যা আওয়ামী লীগ willfully and deliberately destroy করেছে, তাকে পর্যন্ত সংরক্ষণ করা ইউনেস্কোর জন্য দায়িত্বের মতো। এ কারণেই এর এই মহৎ উদ্যোগ। ইউনেস্কো সত্যকে উদঘাটন করবে; তবে কোনো বিশেষ দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করবে না। এ কে খন্দকার, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানসহ আওয়ামী ঘরানার অনেকের জবানিতেই এ কথাটি এসেছে। কিন্তু এই সত্য কথা বলে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাতারাতি ‘রাজাকার’ হয়ে গেছেন। তার পরও বিবেকের তাগিদে তারা এই কথা জাতিকে জানিয়ে গেছেন। এসব সাপোর্টিং ডকুমেন্ট নিশ্চয়ই কেউ না কেউ একদিন ইউনেস্কোতে তুলে ধরবেন। ইউনেস্কোর হেরিটেজ মেমোরির চেয়েও জাতির মেমোরিতে এ কথাগুলো গেঁথে থাকবে বেশি। কোনো মহল তাদের লাঠিয়ালপনার মাধ্যমে জাতির মেমোরি থেকে তা সরাতে পারবে না।

minarrashid@yahoo.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!