ইউক্রেইন যুদ্ধ : ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের শিক্ষা:লে. কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ (অবঃ)

লে. কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ (অবঃ)

পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহ বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এই তিন ভাগে বিভক্ত। বৃহৎ রাষ্ট্র আয়তনে লোকসংখ্যায় ও সম্পদে বৃহদায়তন। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের আয়তন, লোকসংখ্যায় ক্ষুদ্রায়তন হয়, তবে সবাই সম্পদে ক্ষুদ্র হয় না। যেমন- কাতার, কুয়েত বা মালদ্বীপ। আবার অধিকাংশ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রই সর্ববিষয়ে ক্ষুদ্রায়তন। আবার অনেক রাষ্ট্র প্রতিবেশী বৃহদায়তনের তুলনায় ক্ষুদ্রায়তন-জনসংখ্যা, সম্পদ ও আয়তন সত্ত্বেও। তেমনি, বাংলাদেশ ভারতের তুলনায়, ইউক্রেইন রাশিয়ার তুলনায়, মেক্সিকো আমেরিকার তুলনায় ক্ষুদ্রায়তন রাষ্ট্র। ইসরায়েল সৌদিআরব, মিশর, সিরিয়ার তুলনায় ক্ষুদ্রায়তন সত্ত্বেও অর্থ সম্পদে ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে বৃহৎশক্তির কাতারে তার অবস্থান। জাপান, তাইওয়ান চীনের নিকটতম ক্ষুদ্রায়তন রাষ্ট্র। কিন্তু জাপান অর্থশক্তিতে অতিশক্তিশালী। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষুদ্রায়তন সত্ত্বেও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান এবং আনবিক শক্তির অধিকারি। আমাদের বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্রায়তন রাষ্ট্র। বিশাল জনসংখ্যা সত্ত্বেও আয়তন ও সম্পদে দূর্বল রাষ্ট্র। জনসমৃদ্ধ এই দেশের কিছু মানুষ ভারতীয় আগ্রাসনের মোকাবেলায় দেশের অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দিহান। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনা, বুঝাতে পারিনা। অনেকেই স্বাধীনতাকে ভারতীয় অনুদান মনে করেন। আমাদের কৃষক শ্রমিকও সৈনিকদের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে আমাদের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে সত্য, তবে বিশ্ব জনমতের চাপে আমরা হয়তো ছয়মাসের মধ্যে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা হাসিল করতে পারতাম, ভারতের অংশ্রগ্রহণ ছাড়াই। আমাদের ভারতপন্থী দালাল বুদ্ধিজীবিরা মনে করেন, আমরা ভারতের বিরুদ্ধে তিন ঘন্টা যুদ্ধ করে টিকতে পারবোনা। ভারত দখল করে নেবে তিনদিনেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান মনে করেন, যুদ্ধ ঘোষণার একমাসের মধ্যে ভারত একতরফা যুদ্ধবিরতি করবে। এজন্য আজকের ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ পাঠ করা আমাদের প্রয়োজন। দেশপ্রেমের অনুভুতি যাদের আছে তারা মনে করেন, ভারত বাংলাদেশকে আক্রমণ করার সাহস পাবেনা। মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে, অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। তথাপি তিন বছরের মাথায় দেশপ্রেমিকরা ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। এইসব কারণে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বৃহৎ রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পাঠ করা আমাদের জন্য জরুরী।

প্রাসঙ্গিকভাবেই, ইউক্রেইন ও রাশিয়ার যুদ্ধের পর্যালোচনা জরুরী। জাতিগত যুদ্ধের চরিত্রপাঠ আমাদের প্রয়োজন। ইউক্রেইনে রাশিয়া বিজয়ী হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আমাদের ভারতপন্থীরা উৎফুল্ল। কিন্তু রাশিয়া ধীরে ধীরে পরাজয়ের দিকেই এগোতে থাকবে, ইতিহাস তাই বলে। দালাল বুদ্ধিজীবিরা রাশিয়ার সমর্থনে বলছেন, লিখছেন, সমর্থন ও দিচ্ছেন। ভালোভাবে ইউক্রেইনকে শিক্ষা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশে মারখাওয়া পাকিস্তান, কাশ্মিরে মার খাওয়া ভারত আফগানিস্তানে মার খাওয়া রাশিয়াকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
আফগান যুদ্ধ একটু পাঠ করি। রাশিয়া আক্রমণ করে আফগানিস্তান ছিনিয়ে নেয়। একটি তাঁবেদার নজিবুল্লা বসিয়ে তাদের দখলদারিত্ব বজায় রাখে। পরে দৃশ্যপট বদলে আমেরিকা দখল করে হামিদ করজাইকে বসায়। তার মাধ্যমে আফগান দখল নেয়। বীর আফগানরা বৃটিশের তাবেদারি করেনি। তাই কারো তাবেদারির বদলে তারা যুদ্ধ চালায় স্বদেশের পক্ষে। মার খেতে খেতে মার্কিনীরাও পালায়। তারপর অল্পশিক্ষিত মোল্লারা নিজ দেশ স্বাধীন করে এবং আফগানিস্তান বৃহৎ শক্তিধরদের চরম পরাজয়ের দৃষ্টান্ত হিসাবে দাঁড়িয়ে যায়। একটি অশিক্ষিত জাতির অল্পশিক্ষিত মোল্লারা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে অদম্য সাহস ও বীরত্ব দিয়ে নিজ দেশে একটি স্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্র কায়েম করলো। কিউবাকে মার্কিনীরা বহু অবরোধ ও নানামুখি পীড়নের মাধ্যমে একটু নড়াতে পারেনি পঞ্চাশ বছরে। সৌদি আরবের সামনে ছোট নুনু সাইজের কাতারকে নোয়াতে পারেনি আরবের দেশগুলোর জোট। কুয়েত দখল করে সাদ্দামকে কড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এসব দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনেই।
ইউক্রেইনীয়রা আলাদা জনগোষ্ঠি। এরা রাশিয়ান নয়। আদর্শবাদের অলীক স্বপ্নে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়লো ও ভাংলো তারা জাতি সমূহের উত্থানকে ঠেকাতে পারেনি। কিন্তু রাশিয়া আপাতত জিতে যাবে পরাজয়ের পথে। দেশের মাটি দখল করবে। সম্পদ লুট করবে। কিন্তু একটি জাতিকে না পারবে জিতে নিতে, না পারবে অনুগত রাখতে। তাদেরকে নিকটবর্তী ক্ষুদ্র জাতিরা সমর্থন ও সাহস যোগাবে। ইউরোপীয় ও মার্কিন পরাশক্তিরা যুদ্ধ করবেনা ঠিক তবে অস্ত্র রসদ যোগাবে স্বাধীনতা ফিরে না আসা পর্যন্ত। জনগন গেরিলা যুদ্ধে যাবে। জনসমর্থন খাদ্য রসদ ও লাজিস্টিক সাপোর্ট পাবে। অপরপক্ষে রাশিয়ান আগ্রাসী সেনারা ঘৃণা ও প্রতিরোধ পাবে। রাশিয়ানরা অন্যদেশ দখলের জন্য যুদ্ধ করছে তাই তাদের জয়ের পরেও মনোবল নীচে থাকবে। চাইবে একসময় ফিরে যেতে। এ পর্যন্ত যদি ৫/৬ হাজার রুশ সৈন্য মারা গিয়ে থাকে তাহলে রাশিয়ার মনোবল উঁচু থাকার কথা নয়। অপরপক্ষে ইউক্রেইনীয়রা যুদ্ধ করছে দেশ রক্ষার। মরলে তারা তাদের মতো শহীদ হবে। নিজদেশে সম্মানিত হবে।
রাশিয়ার বীরেরা বীরত্ব খেতাব পাবে। মরে গেলে তারা ইউক্রেইনীয়দের ঘৃণা ছাড়া কিছুই পাবে না। আফগানিস্তানে মারা যাওয়া মার্কিন বা রাশিয়ান বীরদের কাউকে পৃথিবীর কেউ কি সম্মান করে? আফগান বীরদের সমাধী হবে। শ্রদ্ধায় সম্মানে সংরক্ষিত হবে। তেমনি রুশ বীরেরা হারিয়ে যাবে। ইউক্রেইনীয় বীরেরা সম্মানিত হবে। দেশ প্রেম আজকের বড় বিষয়। আগ্রাসী যুদ্ধের বিপরীতে স্বাধীনতার যুদ্ধ একসময় সফল হবে। মস্কোপন্থী ইউক্রেইনীয় দালালরা আফগান দালালদের মত বিমানের পিঠে চড়ে পালাবে। একদিন ইউক্রেইনীয়রা নিজ দেশে নিজ পতকা নিয়ে গর্ব করবে। লেনিন আদর্শিক নির্যাতন ও ভালোবাসা দিয়ে সে সোভিয়েত নির্মাণ করেছিলো পুতিন তা মূলোৎপাটন করলো। ইউক্রেইনে একটি দালাল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বাধীনচেতা ইউক্রেনীয়রা গেরিলা যুদ্ধ যাবে। তারা বিশ্বশক্তির সহযোগিতায় একটি সেইফজোন গড়ে তুলবে। প্রলম্বিত গোরিলা যুদ্ধে একজন দুজন গেরিলা পাঁচ সাত জন আগ্রাসী সৈন্য হত্যা করবে, তারাও মরবে। কিন্তু যে মনোবল জেলোনস্কি তার জাতির বুকে সৃষ্টি করেছে, তারা পরাজয় মেনে নেবে না। দুবছর যুদ্ধ টানতে পারলে রাশিয়ার সৈন্যরা যুদ্ধে যাবার মনোবল ও প্রাণশক্তি হারিয়ে পাগল হতে থাকবে। পুতিন তখন ক্ষতিপূরণ দিয়ে আপোষ করে বাঁচতে চেষ্টা করবে। প্রলম্বিত যুদ্ধে যদি একলক্ষ ইউক্রেনীয় মারা যায় তবে পঞ্চাশ হাজার রাশিয়ানকে মরতে হবে। পুতিন এদের যোগাড় করতে পারবেনা। গেরিলা যুদ্ধে হতাহত সমানে সমান হবে। বিমান ও ফায়ার পাওয়ার গ্রাউন্ড দখলে কজে লাগেনা। এর মধ্যেই ইউরোপীয় প্রচারণা ও অবরোধে রাশিয়ান অর্থনীতি ও জনগনের যুদ্ধাগ্রহ সবই কমতে থাকবে। ইউক্রেইনীয়রা বাঁচা মরার লড়াই করবে। টগবগে তরুণ জেলনস্কির প্রেরণায় যুদ্ধ গতিশীল হবে। একটি রাশিয়ার সৈন্য মারা গেলে ইউক্রেনীয়রা উদ্দীপিত হবে। একটি ইউক্রেনিয় মারা গেলে তার স্বজাতি ঘৃণায় ও আক্রোশে ফুঁসে উঠবে। রাশিয়ার প্রতি আক্রমণকারীর প্রতি পুঞ্জিভুত ঘৃণা ইউক্রেনীয়দেরকে কঠোর করে তুলবে। তারা দৃঢ় হবে। নেতৃত্বের কারণে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বা আক্রান্ত রাষ্ট্র তাদের মনোবল অটুট রাখবে। মার্কিন ইউরোপীয় শক্তিসমূহ ইউক্রেইনকে অস্ত্র গোলাবারুদ ও রসদ যোগাবে। অপর পক্ষে ইরান পাকিস্তান রাশিয়াকে সমর্থন করলেও স্বাধীনতাকামী জনগনের বিরুদ্ধে কোন যোগান দেবে বলে মনে হয় না। ভারত হয়তো চেষ্টা করবে। খুব একটা সেও করবে না। চীন চাইবে রাশিয়া দূর্বল হোক, তার বিশ্বশক্তির একক দাপট বৃদ্ধি পাক। সূতরাং চীন স্বার্থ ছাড়া কিছুই করবেনা।
ইসরাইল, আমেরিকার ইহুদীলবি এবং ইহুদি জেলনস্কি একই সূতায় গাঁথা। তাই ইউক্রেইনকে ফেলনা ভাববার অবকাশ নেই। আবার রাশিয়া মশা মারতে কামান লাগাবে না। অর্থ্যাৎ ইউক্রেইনে বিশাল বিমান বহরের আক্রমণের অতিরিক্ত আনবিক শক্তি প্রয়োগ করবে না। পশ্চিমারা যুদ্ধে জড়াবেনা, কিন্তু ইউক্রেনীয়দের পাশেই থাকবে। একদিন রাশিয়াকে আফগান কায়দায় তাঁবেদার সরকার বসিয়ে হাত গোটাতে হবে। দালাল হবে পুতুল সরকার রাশিয়া আগ্রাসী শক্তি। একসময় তাঁবেদার পালাবে, রাশিয়ানরা পাততাড়ি গোটাবে। এই হলে সকল আক্রমণকারীর ছক। পরাক্রমশালী রাশিয়া একসময় পরাজয় বরণ করবে প্রথমে নৈতিক, পরে বাস্তবিক। জেলেনস্কি যদি নিহত হয়, তখন কী হবে ? ইউক্রেইনীয়দের ঘৃণা ও আক্রোশ আরো বাড়বে। তখন বলিষ্ট নেতৃত্ব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে। বিপ্লবি ও দেশপ্রেমিকেরা নেতৃত্বশূন্য হয় না। সামরিক বিজয়ের জন্য যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা অপরিহার্য্য, তা রাশিয়ার নেই। তার এককেন্দ্রিক ক্ষমতাধর সৈরাচারে ঐ নেতৃত্ব আসেনা। কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে বিপ্লবি নেতৃত্ব সহজে ও দ্রুত গড়ে উঠে। এখানেই ইউক্রেনীয়দের সম্ভাবনার বীজ নিহিত।

সূত্র : জালালাবাদ

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!