আলমাহমুদের “ডাকাতদের গ্রাম” নাকি উচ্চতর মাদ্রাসা:Dr Abdus salam Azadi

আলমাহমুদের “ডাকাতদের গ্রাম” নাকি উচ্চতর মাদ্রাসা

আমাদের যুগে যখন মাদ্রাসায় পড়তে যাই তখনও গ্রামের আল্ট্রা মডার্ণ চাচারাও হুজুর বলে ঠাট্টা করতেন। খারাপ লাগতো, তবে আমাদের উস্তায ও শুয়ুখগণ বলতেন, তোমরা যখন খালিস নিয়তে হাদীস কুরআন কাঁধে নিয়ে মাদ্রাসায় আসো, আল্লাহ ফিরিশতা পাঠায়ে দেন। তারা তাদের পাখা বিছিয়ে একদিকে তোমাদের সম্মান করেন, অন্য দিকে তোমাদের জন্য জান্নাতের পথটা সহজ করে দেন। আমরা ঐ স্পীরিচুয়াল শক্তিতে চাচাদের বা মডার্ণদের হুজুর “সারকাযম”, মেয়েদের হুজুর বা চাচা ইত্যাদি তাচ্ছিল্যের সম্বোধন, এমনকি বাসের অশিক্ষিত হেলপারদের “এই হুজুর এই দিকে সরেন” এর উন্নাসিকতা মূলক চিৎকার কিংবা সাধারণ মানুষের “মাদ্রায় পড়ে এই হুজুর খাবে কি” এর প্রশ্নবোধক দৃষ্টির সামনে মাথা উঁচু করে তবে চোখ নিচু ও মেজাজ বিনম্র করে রাস্তা দিয়ে চলতাম।

ভালো রেজাল্ট করে যেন অপরাধ করেছি, এটাই আমার জেনারেল লাইনের বন্ধুরা বুঝাতো। তারা বলতো মাদ্রাসায় পড়িস তো তাই এত মার্ক্স পাস, আমাদের হাই স্কুলে বা কলেজে আয়, দেখবি ফার্স্ট ডিভিশান পেতেও তোর মাথা ফেটে যাবে।

আমার মনে আছে, আমাদের পাসের গ্রামের এক ছাত্র যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে চান্স পায় সেবার গ্রামের সবাইকে তার বাবা গরু মেরে খাওয়ায়, অথচ তার আগের বার অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করি। সত্যি বলতে কি, ইংরেজিতে খুব ভালোমার্ক্স পেয়ে উপযুক্ত হয়েও ইংলিশ না নিয়ে আরবী নেয়ায় প্রফেসর ও ডীন ইয়াক্বীন উদ্দীন স্যারের ‘সাবাস বেটা’র শব্দের সাথে হাতের চড় এখনো পিঠে লেগে আছে।

মাদ্রাসা, মাদ্রাসার ছাত্র ইত্যাদি নিয়ে আমাদের সময়ে এই রকম মানসিকতা ছিলো মাদ্রাসার বাইরের প্রায় জনগণের। পরে জানতাম এই মানসিকতা চেইঞ্জ হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক স্যারের কথা, তার শব্দ চয়ন ও অংগভংগীর সাথে কেমন যেন একটা বেসুরো কান্না ও আমাদের কিছু রাজনৈতিক নেতার “আমার কাছে খবর আছে”র মত অহংকারী ভাব দেখতে পেলাম।

ইংল্যান্ডে ১৭২টা ইসলামিক স্কুল আছে, বিভিন্ন ধর্মের আছে আরো সাত হাজার ধর্মীয় স্কুল। সরকারের অর্থে চলে ১২ টা মাদ্রাসা। এসব মাদ্রাসার উপর সরকারের সর্বোচ্চ মান নির্ধারণ সংস্থাও বিভিন্ন ব্যাপারে খুশি। যেসব ব্যাপারে তারা বেশি খুশি তন্মধ্যে একটা হলো এর ছেলে মেয়েরা এই দেশের “রাসেল গ্রুপ” তথা প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়।

আমার হাতে গড়া মাদ্রাসার ছাত্ররা এই দেশে অক্সফোর্ড, কেম্ব্রীজ, ইউসিএল, ইম্পেরিয়াল, লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স, কুইন মেরী ইত্যাদি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং, ইকোনমিক্স পলিটিক্স -সব সব বিভাগে সুনামের সাথে মাথা উঁচু করে পড়তেছে, পড়েছে। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পুলকিত হওয়া ছাড়া রাগ দেখায়নি। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ শিক্ষকমহোদয় ডায়াসে রাগের নর্তন ও কুর্দনের যে মহড়া দেখায়েছেন, তা ব্রাজিলের সাম্বা ড্যান্সকেও হার মানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমরা জানতাম এটা এমন বিদ্যাপিঠ যেখানে ফার্স্ট হতে পারলে নির্ঘাত শিক্ষক হবেই, এরা জ্ঞানের এতো মূল্য দেয়। আমরা নিজেরাও দেখিছি এখানে ভালো ভাবে পাস করতে যেয়ে থুতনির নিচে মাদ্রাসীয় দাড়ীও কোন সমস্যা করেনি। আমার বড় চাচা ঐখানে ছাত্র থাকা কালীন সময়ে পাগড়ি পরে যেতেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম একদিন। উনি বেশ রসালো করে বললেন, এতে মেয়েরা খুব সম্মান দেখায়, এবং ক্লাসমেটরা সমীহ করে, ফলে পড়াশুনায় ফোকাসড থাকা যায়। আমি যখন যেতাম ঐখানে শর্ষিণার গোল জামা ও মাথায় চরমোনায়ের টুপি পরে গেলেও কোনদিন অসম্মানের শিকার হইনি সেই আশির দশকে।

তবে অবস্থা চেইঞ্জ হয়েছে। কয়েকবার ক্যাম্পাসে যেয়ে মুখোমুখি হই ছাত্রদের বন্দুক যুদ্ধের। সূর্যসেন হলে একবার আমার শিক্ষক মাওলানা দ্বীন মুহাম্মাদের সাথে দেখা করতে যাই। তিনি তখন এডূকেশানে মাস্টার্স করতেছিলেন। রূমে বসে আছি অমনি বিপরীত দিক থেকে গুলি এসে শার্শি ভেদ করলো। আমরা দ্রুতু খাটের নিচে না গেলে নির্ঘাত ঐদিন মরতে হতো। জসীমুদ্দীন হল ও মহসিন হলের ছাত্রদের মাঝেও বন্দুক যুদ্ধের মাঝে পড়ি আমিও আমার বন্ধু বদরুল আলম। আল্লাহর রহমাত ও কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামের বদান্যতায় সেদিন জান বাঁচাতে পারি। এইসব যখন দুইচোখ দিয়ে দেখেছি, ছাত্রদের হাতে কলমের চেয়ে অস্ত্র শোভা পেতে দেখেছি তখন আসে আলমাহমুদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটা কবিতা। যাতে তিনি লেখেন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন ডাকাতদের গ্রাম”।

একবার জসীমুদ্দীন হলে আমার বড় ভাই সদৃশ আব্দুল বারী ভায়ের রূমে যাই দেখা করতে। রূমমেটদের একজন বাদে সবাই বাইরে ছিলো। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম ভায়ের কথা। বললেন,আব্দুল বারী ভাই বাইরে। আমি বসলাম তার চেয়ারে, অপেক্ষায় আছি। কিছুক্ষন পরে এক ভাই এলেন একটা ঝাঁঝালো গন্ধ নিয়ে। সাথে ‘আলজিন্স আল নাইম” তথা কোমল জেন্ডার। আব্দুল বারী ভায়ের রূম মেট বললেন, সালাম ভাই, চলেন বাইরে যাই। আমি রূম বন্ধ করে বাইরে যাবো। তিনি একপ্রকার জোর করেই আমাকে বের করলেন। তারা দুইজনেই থাকলো রূমে, বাইরে থেকে ভেজানোা হলো দরযাা। পরে এই ভাই আমাকে যা বুঝালেন তাতে ‘আঁধার প্রেমের” ঢেও দেখলাম। তিনি বললেন, এটা এখন ওপেন সিক্রেট। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের একটা দারুণ কবিতার অপেক্ষা করতে থাকলাম।

আমাদের এক ভাই ছিলেন জিনিয়াস। মাদ্রাসা এডূকেশান বোর্ডের তিনি ছিলেন সর্বকালের সেরা ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “কলা অনুষদের” সব চেয়ে বড় ও ভালো কলা ছিলো “ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স” বিভাগ। দেখলাম তিনি থুতনির চুলগুলো চামড়া সমান করেছেন, এবং শুনলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে মডার্ণ হবার সব কিছু তিনি আমল করতেছেন। একবার তিনি তামিরুল মিল্লাতে গেলে এই সবের হেতু জিজ্ঞেস করলে বলেলন, এখানে শিক্ষক হতে গেলে এইসব করা লাগবে। মানে বুঝাতে হবে আমি কিন্তু মাদ্রাসার কেও নই, মুসলিম হলেও দাজ্জালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এখানে শিক্ষক হতে হলে যত নিচে নামতে হয় নামবো, যত উঁচুতে রেজাল্ট করতে হয় করবো, যত জনের পা চাটতে হয় চাটবো, এবং যখনই দাওয়াত দিবা জ্বালো জ্বালোর মিছিলে, সবার আগে যাবো, আর নর্তন কুর্দনে কোনদিন কোমর সোজা পাবা না।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাসের পরে ঢাকা আলিয়ায় ১৩ নাম্বার রূমে রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে একটু কান্না কাটা করি। আমার বন্ধু আনিস সকালে জিগালেন, আব্দুস সালাম ভাই, রাতে অতো কাঁদলেন কেন। পেশাব করতে উঠে গেলে দেখলাম আপনি কাঁদছেন। আমি বললাম, ভাইরে, আমি রিয়াদ বিশ্ববিদ্যলয়ে দরখাস্ত করেছি। কাঁদলাম; আল্লাহ যেন আমাকে ওখানে কবুল করেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাইনা। ঐদিন ই আমি আলআযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপের এক্সেপ্টেন্স লেটার পাই, এরি কয়েক মাস পর পাই রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ।

ডঃ মুস্তাফিজ স্যারের কাছে নিলেন আমার চাচা। তাকে বলার সাথে সাথে রেগে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বিভাগের শিক্ষক হতে পারবা তুমি, তা বাদ দিয়ে যাচ্ছ রিয়াদে। অনেক কথা বুঝালেন, অনেক সুবুদ্ধি দিলেন। আমার চাচা বাসার বাইরে এসে কি করবো জানতে চাইলে বললাম, চাচা রিয়াদ যাবো। কারণ এখানে শিক্ষক হতে হলে আমাকে একটা পলিটিক্যাল পার্টির সাথে যোগ দিতেই হবে। তা না হলে হলে সিট পাবোনা, পরীক্ষায় আমাকে ফার্স্ট করা হবেনা, শিক্ষক হবার লাইনে থাকলে শেষ করা হবে।

নব্বই এর দশকে ছাত্র আন্দোলনের ফসল যখন রাজনৈতিক দল গুলো ভাগাভাগি করে নেয় সেখান থেকে শুরু হয় সম্মানিত শিক্ষকগণের মাঝে মারাত্মক দলাদলি। সাদা, কালো, বেগুনী ও নীল ইত্যাদি দলের রঙ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ দেহে প্রলেপ দেয়া শুরু করলেন। সেই থেকেই দেখছি পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই সুন্দর যায়গা টা কেন যে “র‍্যাগের” উন্মাতালে, আর টি এস সি বর্ষ বরণ জনিত দোষে কাপড় হরণের বেলাভূমি হয়ে যাচ্ছে। মুরতি হয়ে যাচ্ছে এ খানের চর্চিত আর্টস ও শিল্পকলা।

গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক উঁচু মানের (?) একজন স্যার ‘স্ট্যটিস্টিক্স’ এর তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমান করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয় নাকি এখন বড় মাদ্রাসা হয়ে গেছে।

এইবারই এবং এই ই প্রথম আমার জীবনে ঘটলো যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্র হিসেবে ভর্তি হবার ইচ্ছা জাগতেছে। এত বড় মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ায় কার না গর্ব আসবে?

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!