হোম নির্বাচিত-কলাম আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে ‘শেখের বেটি’র আমলে এসব কি হচ্ছে? অর্কা ভাদুড়ী ,কলকাতা

আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে ‘শেখের বেটি’র আমলে এসব কি হচ্ছে? অর্কা ভাদুড়ী ,কলকাতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীরা ট্রাম্পের বিরোধিতা করেন, পুতিনের বিরোধিতা করেন, লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য— দেশে দেশে চলমান রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলেন। অথচ, ঘরের পাশের বাংলাদেশের দিকে তাকানোর সময় পান না। বাংলাদেশ সংক্রান্ত আলোচনা দেখলে মনে হয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, শামসুর রহমান থেকে শেখ মুজিব, আর শাহবাগ আন্দোলন— এই বাইরে কিচ্ছুটি নেই। মওলানা ভাসানি নেই, ন্যাপ নেই, ছাত্র ইউনিয়ন নেই। সিরাজ শিকদারদের মরে যাওয়া নেই। বাকশালের নামে স্বৈরাচারের জন্ম দেওয়া নেই। স্বৈরাচারি এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ফের তার সঙ্গেই জোট করা নেই। কলকাতার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে কিছুদিন চর্চার সুযোগ মিলেছিল। সেখানেও দেখেছিলাম, একাত্তরের পরের ইতিহাস নিয়ে কারও কোনও আগ্রহ নেই। বাংলাদেশ থেকে যে সরকারি সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবিরা কলকাতার সভাসমিতি আলো করতে আসেন, তাঁরাও মুক্তিযুদ্ধের পরের ইতিহাস, বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতি এবং সীমাহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে রা কাড়েন না। পেটের দায়, জান-মালের দায়— তাঁদের দোষ নেই।

বাংলাদেশে অবৈধ নির্বাচনে জিতে একটি ফ্যাসিস্ট দল রাজ করছে। তার নাম আওয়ামি লিগ। বিএনপি-জামাতের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্বঘোষিত ঠিকাদার এই দলটির প্রায় কোনও ফারাক নেই। কোনও কোনও সময় এই দলটির বর্বরতা এবং অত্যচার আইয়ূব-মোনেম জমানার কথাও মনে পড়িয়ে দেয়। বিএনপি সরকারে থাকার সময় যে কুকর্মগুলি করে থাকে, আওয়ামি লীগও ঠিক সেগুলিই করে চলেছে। কিন্তু বিপজ্জনক প্রবণতাটি হল, বিএনপি আমলে সরকারি দলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবিরা অনেকাংশেই সরব হন, কিন্তু ‘শেখের বেটি’র আমলে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ওম-মাখা স্মৃতি আঁকড়ে চুপ করে বসে থাকেন। বর্বরতাকে বৈধতা দেন।

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি কোটা সংস্কারের দাবি ঘিরে উত্তাল। বলে রাখা ভাল, এই কোটা ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের জাতিভিত্তিক কোটা ব্যবস্থার দূরদূরান্তেও কোনও মিল নেই। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে আপামর ছাত্রযুব চাকরিপ্রার্থীদের প্রতারণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। সিংহভাগ চাকরিই এই কোটার অর্ন্তভূক্ত। অভিযোগ, নামে মুক্তিযোদ্ধা কোটা হলেও আদতে এই ব্যবস্থা আওয়ামি লীগের কোটায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামি দলদাস না হলে চাকরি মিলবে না। এর প্রতিবাদে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, রংপুর থেকে রাজশাহী, সিলেট থেকে বরিশাল— সর্বত্র লক্ষ লক্ষ ছাত্রযুব জনতা পথে নেমেছেন। তাঁরা কোটা ব্যবস্থার বিলোপ চান না, চান যুক্তিসঙ্গত সংস্কার। সেই আন্দোলনের উপর বর্বরোচিত হামলা নামিয়ে এনেছে পুলিশ এবং আওয়ামি লীগের শাখা সংগঠন ছাত্রলীগ।

সম্প্রতি কোটা আন্দোলনকারীদের এক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিক বৈঠকের ডাক দেন। বৈঠক শুরুর মুখেই সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে, টিভি ক্যামেরার সামনে ওই ছাত্রনেতাকে মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর করে ছাত্রলীগ। রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে তিনি এক শিক্ষকের পা আঁকড়ে ধরেন। সেই শিক্ষকও হেনস্থার শিকার হন। আন্দোলনকারীদের অন্য নেতাদের কেউ গ্রেফতার, কারও খোঁজ মিলছে না।

এই সংবাদ প্রকাশ্যে আসতে গোটা দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হায়েনার মতো আক্রমণ করেছে ছাত্রলীগ। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তারিকুল নামে একজন আন্দোলনকারীকে ঘিরে ধরে মারতে মারতে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারপর হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁর দু’টি পা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে বেঁচে থাকা ফাসিস্তদের চরিত্র। অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের এক দাপুটে ছাত্রনেতা ‘সেঞ্চুরি মানিক’ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি শতাধিক মেয়েকে বলাৎকারের রেকর্ড গড়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ শব্দের রাজনীতি করে। ভারতে যেমন বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘পাকিস্তানের দালাল’ বলে দেগে দেওয়া হয়, আওয়ামি লীগও ঠিক তেমনই বিরোধীদের ‘রাজাকার’ অথবা ‘শিবির’ বলে দেগে দেয়। যে কোনও আন্দোলনে নৃশংস দমন নামিয়ে আনার পরে বলে, আন্দোলনকারীরা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অংশ। অথচ, এই মুক্তিযুদ্ধের স্বঘোষিত ঠিকাদারেরা যে পাকিস্তানি শাসকদের থেকে খুব কিছু আলাদা নয়, নীচের ছবিটি থেকেই তা স্পষ্ট।

এই মেয়েটির নাম উম্মি হাবিবা বেনজির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং বামপন্থী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। উম্মির সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় নেই, কিন্তু বন্ধুদের কাছে শুনেছি বায়ো-স্ট্যাটিস্টিক এবং ইনফরমেটিক্সের এই মেধাবী ছাত্রী একজন সাহসী সংগঠক। কোটা সংস্কার আন্দোলনের উপর আওয়ামী লীগের বর্বর হামলার প্রতিবাদে সম্প্রতি ও একটি বক্তৃতা করে। সেখানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবৈধ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতাদখলের মাধ্যমে দেশবাসীকে প্রতারণার অভিযোগ তোলে। হ্যাঁ, এইটুকু, শুধু এইটুকুই ছিল ওর ‘অপরাধ!’ এরপর আসরে নামে ‘মাদার অফ হিউম্যানিটি’ শেখ হাসিনার অনুগামীরা। উম্মিকে ‘বেশ্যা’ বলা, ‘রেট’ জানতে চাওয়া, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ নিয়ে মন্তব্য তো আছেই, একাধিক আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রকাশ্যে ওকে ‘ডিম থেরাপি’ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। জানেন ডিম থেরাপি কাকে বলে? এর মানে হল প্রতিবাদী মহিলাদের যৌনাঙ্গে গরম সেদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দেওয়া। কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে ‘ফুচিকের বোন’ ইলা মিত্র এই অত্যাচার সহ্য করেছেন।

উম্মির ছবি পোস্ট করে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে অত্যাচারের নতুন নতুন তরিকা নিয়ে আলোচনা করছেন আওয়ামী সমর্থকেরা। ‘প্রতিবাদী মুজিব সেনা ঐক্য পরিষদ, অনলাইন ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক সংগঠন’ পেজে ওর ছবি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই বেশ্যা মাগীকে নিয়ে কী করা উচিত! প্রশ্নের উত্তরে দু’শোরও বেশি কমেন্ট করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাজেরা। হাসিনার নামে কটূক্তি করার অপরাধে প্রকাশ্যে ধর্ষণের প্রস্তাব এসেছে। দেখে মনে পড়ছিল, একাত্তরের সময় রাজাকারেরা ঠিক এই স্বরেই কথা বলত। চরমোনাই পীর বলেছিল, ‘‘এ সব আশ্রয়হীনা ভীত মেয়েরা হচ্ছে গণিমতের মাল। পাকিস্তানের বাহিনীর এদের ভোগ করা জায়েজ আছে।’’ । আজ বলছে আওয়ামী লীগ।

এ পর্যন্ত তাও ঠিক ছিল। বিরোধী মতের মেয়েকে সেঞ্চুরি মানিকের পার্টি তো এভাবেই চুপ করাতে চাইবে! কিন্তু তারপর একটি কমেন্ট দেখে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের এক সমর্থক একটি ছবি পোস্ট করেছে। সেখানে একাত্তরের এক বিবস্ত্রা বাঙালী নারীকে দু’দিক দিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দুই পাক হানাদার। তার তলায় তিনি মতপ্রকাশ করেছেন, উম্মিকে ঠিক এভাবেই পাক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত। তাঁকে সমর্থন করে আরেক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাজ মন্তব্য করেছেন, ঠিক কথা। তারাই পোষ মানাতে পারবে ভাল।
একবার ভেবে দেখুন বন্ধুরা! যে কোনও বিরোধী মতকে রাজাকার-জামাত-শিবির বলে দমন করা আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাদের অপশাসনের বিরোধিতা করায় একটি মেয়েকে সেই রাজাকার-আল বদর-পাক হানাদারদের হাতে তুলে দিতে চাইছে। এরা কারা! এরা মুক্তিযুদ্ধের উত্তরসূরি! এরা শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্টের ইতিহাস বহন করে! এরা ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে!

এরা আওয়ামী লীগ। এরা ফাসিস্ত, স্বৈরাচারী, গণহত্যাকারী। গত কয়েকদিনে ফেক এনকাউন্টারে ১৫০ জনকে খুন করেছে এরা। প্রতিটি প্রতিবাদ প্রতিরোধে বর্বর অত্যাচার নামিয়ে এনেছে। এরা উম্মির মতে মেয়েকে চুপ করিয়ে দিতে চায়। এদের হাতে আমার কাঁটাতারের ওপারের বন্ধুদের থকথকে রক্ত লেগে আছে। এদের ঘেন্না করি। এদের ঘেন্না করব। মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের সামান্যতম হলেও অবদান রয়েছে। এদের ঘেন্না করার অধিকার আমার আছে। পশ্চিমবঙ্গের যে বাসিন্দারা ওদেশে সাংস্কৃতিক কাজকর্ম করে পেট চালাতে হয় বলে আওয়ামি লীগের বিরোধিতা করতে পারছেন না, তাঁদের প্রতি রইল উড়ন্ত চুমু। আপনাদের বাংলাদেশি কাউন্টারপার্টদের জন্যেও।https://www.facebook.com/profile.php?id=100009085376629&hc_ref=ARRW93ZL0dQgQOhNyL6UOEN4Fks3Fvi54-y5hMWXLgafXEkM6XvBBrOMBA2gwpiibkw&fref=nf

https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=2000787656900727&id=100009085376629&hc_location=ufi Image may contain: text

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!